Home » আন্তর্জাতিক » তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

খেসারত মানুষের কোম্পানির মুনাফা

ফারুক চৌধুরী

triillion-dollar-economy-1-তেল লুটের নানা কায়দাকৌশলের একটি হচ্ছে উৎপাদন শরিকানা চুক্তি (উপচ)। এ চুক্তি কার্যত তেল কোম্পানিগুলোর স্বার্থই রক্ষা করে। আর উল্টো দিকে, খেসারত দিতে হয় দেশের আপামর সাধারণ মানুষকে।

এরই উদাহরণ হিসেবে উগান্ডা সরকারের সম্পাদিত উপচ উল্লেখিত হয়েছে পূর্ববর্তী সংখ্যার। এ ধারাবাহিকতায় এ চুক্তির সঙ্গে আরো কয়েকটি দিক তুলে ধরা হলো।

উল্লেখ করা দরকার যে, এ চুক্তির বিশ্লেষণ করা হয়েছে কন্ট্রাক্ট কার্যঃ উগান্ডাজ অয়েল এগ্রিমেন্টস প্রেস প্রফিট বিফোর অয়েল শীর্ষক প্রতিবেদনে।

মহাজনরা গ্রামাঞ্চলে এখন নানা রূপে দেখা দিচ্ছে। প্রচলিত চেহারার মহাজন ও দাদন ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি বিভিন্ন এনজিওর ও ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের কর্জপুঁজি এসব এনজিও ক্ষুদ্র ঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের গ্রুপ সদস্যদের হাত ঘুরে অধিকতর সুদের বিনিময়ে যাচ্ছে বর্গাচাষী, ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীর কাছে। ফলে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক চাষীকে, বর্গাচাষীকে পরিশোধ করতে হচ্ছে চড়া সুদ। এ পরিস্থিতি এসব কৃষকের উৎপাদন কাজে বিরূপ প্রতিক্রিয়ায় তো ফেলছেই, সেই সঙ্গে তারা চাপ তৈরি করছে শ্রম ও খাদ্য বাজারে। এ দু’বাজারের পরিস্থিতি প্রতিকূল হয়ে উঠলে এ কৃষকদের অবস্থা হয়ে উঠছে সঙ্গীন। খাদ্য সঙ্কটের প্রেক্ষাপটে এ দিকটি বিবেচনা করতে হবে।

প্রতিবেদনে বলা হয়, উগান্ডা সরকার সম্পাদিত চুক্তির ১৩ নম্বর ধারাটি উৎপাদন শরিকানা বিষয়ে। এখানে বলা হয়েছে খরচ উসুল হওয়ার পরে তেল উৎপাদন ভাগাভাগির নিয়ম হবে দৈনিক মোট উৎপাদন পাঁচ হাজার ব্যারেলের বেশি না হলে সরকার পাবে ৪৬%, কোম্পানি পারে ৫৪%। উৎপাদন পাঁচ হাজার ব্যারেলের বেশি হলেও তা যদি ১০ হাজার ব্যারেলের বেশি না হয়, তা হলে সরকার পাবে ৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ ও কোম্পানি পাবে ৫১ দশমিক ৫ শতাংশ, উৎপাদন ২০ হাজার ব্যারেলের বেশি হলেও তার ৩০ হাজার ব্যারেলের বেশি না হলে সরকার পাবে ৫৮ দশমিক ৫ শতাংশ ও কোম্পানি পাবে ৪১ দশমিক ৫ শতাংশ, উৎপাদন ৩০ হাজার ব্যারেলের বেশি হলো, অথচ ৪০ হাজার ব্যারেলের বেশি হলো না, তাহলে সরকার পাবে ৬৩ দশমিক ৫ শতাংশ ও কোম্পানি পাবে ৩৬ দশমিক ৫ শতাংশ, এবং উৎপাদন ৪০ হাজার ব্যারেলের বেশি হল সরকার পাবে ৬৮ দশমিক ৫ শতাংশ ও কোম্পানি পাবে ৩১ দশমিক ৫ শতাংশ। এই ভাগাভাগিতে বা শরিকানাতে রয়েছে শুভঙ্করের ফাঁকি। উল্লেখিত প্রতিবেদনে মন্তব্য করা হয় : কেবলই উৎপাদনের মাত্রার ওপরে নির্ভর করে ভাগাভাগি করা খুবই অস্বাভাবিক। কেননা, এভাবে ভাগাভাগি করার অর্থ দাঁড়াবে উগান্ডার খেসারতের বিনিময়ে কোম্পানি করবে অতিরিক্ত মুনাফা এবং সেটার ওপরে কোনো নিয়ন্ত্রণ থাকবে না। বিশেষ করে এটা করা হবে তেলের দাম যখন চড়া, সে সময়ে। ভাগাভাগির এ ধরনটি এতই ত্রুটিপূর্ণ যে, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফও একটি গোপন প্রতিবেদনে স্বীকার করে যে, উৎপাদন শরিকানা বিষয়ে চলতি চুক্তিগুলোর একটি বড় ধরনের ত্রুটি হচ্ছে শরিকানার এ ধরন। দ্য ইন্ডিপেন্ডেন্ট পত্রিকার ২০০৯ সালের ২২ ডিসেম্বর সংখ্যার উল্লেখ করা হয় : এ ধরনের চুক্তিগুলো একটি ভুয়া অনুমানের ওপর ভর করে প্রণয়ন করা হয়।

এ ভুয়া অনুমানটি হচ্ছে : প্রকল্পগুলোর মুনাফা যোগ্যতা কেবল উৎপাদনের মাত্রা দিয়ে নির্ধারিত হয়। অথচ এর উল্টোটাই সত্য। কেবল উৎপাদিত তেলের পরিমাণের ভিত্তিতে রাজস্বপ্রাপ্তির চেয়ে বেশি ভাগ পাওয়া যায় কোম্পানির মুনাফার ভিত্তিতে রাজস্বপ্রাপ্তিতে। আলোচিত উৎপাদন শরিকানা চুক্তির উশচ ১৪ ধারাটি কর সংক্রান্ত। তেল কোম্পানির মুনাফা উগান্ডার প্রচলিত হারে করপোরেশন করের আওতাধীন। এটা হচ্ছে ৩০%। তবে তা পরিবর্তন হতে পারে। ব্লকওয়ে প্রাথমিক উশচতে এ হার ধরা হয় ৩৫%। তবে এটা প্রযোজ্য হবে মুনাফা তেলের ক্ষেত্রে। এর প্রকৃত অর্থ দাঁড়ায় যে, কোম্পানিটির মুনাফার ওপর প্রকৃতপক্ষে কোনোই কর আরোপ করা হয়নি।

উৎপাদন হার ও তেলের দাম জানা থাকলে রয়্যালিটি হিসাব করে বের করা সহজ। আর মুনাফার ওপর কর এবং মুনাফা তেল শরিকানা নির্ভর করে মুনাফার সংজ্ঞার ওপরে। এ ক্ষেত্রে গণ্য হবে বিভিন্ন সরঞ্জাম, যন্ত্রপাতি, সম্পদ ব্যবহারের ফলে সেগুলোর দাম কমে যাওয়ার হার কিভাবে গণ্য হবে, কোন কোন খরচ অনুমোদনযোগ্য ও কোনটি অনুমোদনযোগ্য নয়, ব্যাংকের সুদসহ লগ্নি খরচ কিভাবে গণ্য হবে, ইত্যাদি। হিসাবের জটিলতা তারই পক্ষে যায়, যার রয়েছে হিসাব করার বেশি সামর্থ্য। এ ক্ষেত্রে কোম্পানি পায় আনুকূল্য। কারণ, নিজ ব্যবসার বিশদ খবর সরকারের চেয়ে কোম্পানি জানে বেশি। আবার, বৃহত্তর সমাজের কাছে কোম্পানির ব্যবসার খবর পৌছায় না। এসব মন্তব্য করা হয় উল্লেখিত প্রতিবেদনে।

উগান্ডা সরকারের ও তেল কোম্পানির মুখপাত্ররা জনসমক্ষে বার বার উল্লেখ করেছেন, মোট রাজস্বের ৮০%-এর বেশি পাবে উগান্ডা সরকার। অথচ, সরকারি এক নথিতে এর চেয়ে কম হার উল্লেখ করা হয়। একটি ব্লকে এ হার ৬৭ দশমিক ৫% থেকে ৬৯ দশমিক ৫% এবং অপর ব্লকে ৭২ দশমিক ১% থেকে ৭৪ দশমিক ২%। আর একটি তেল কোম্পানির পক্ষে এক ব্যাংকের করা হিসাব অনুসারে এ হার দাঁড়ায় ব্যারেল প্রতি মূল্য ৩০ ডলার অনুসারে ৫৫% ও ৭০ ডলার অনুসারে ৬৭%। এ তথ্য উল্লেখ করে প্রতিবেদনে বলা হয়, রাজস্বের কতটুকু সরকার পাবে তা নির্ভর করে তেলের দাম, তেল ক্ষেত্রের আয়তন, তেল ক্ষেত্র উন্নয়ন ব্যয় ও অন্যান্য বিষয়ের ওপর। তেলের দাম কম হলে, তেল ক্ষেত্রের আয়তন ছোট হলে ও তেল ক্ষেত্র উন্নয়ন ব্যয় বেশি হলে সরকারের ভাগে পড়বে রাজস্বের কম অংশ। আলোচিত তেল রফতানির উদ্দেশ্যে তেল পাইপলাইন বসানোর যে পরিকল্পনা ও প্রতিবেদন রচনাকালে চলছিল, সেটি বাস্তবায়িত হলে তেল বিক্রি করে উগান্ডার রাজস্বপ্রাপ্তির হার বিশেষভাবে হ্রাস পাবে। সম্ভাব্য কয়েকটি রূপ অনুমান করে দেখা যায়, পাইপলাইন নির্মিত হলে এ রাজস্বের হার দাঁড়াবে ৭০ দশমিক ৭% এবং পাইপলাইন নির্মিত না হলে ৭৫%। আর তেলে দর পড়ে ৩০ ডলার হলে রাজস্বের এ হার ধপাস করে পড়ে যাবে ৪৭ দশমিক ৪%-তে। আবার তেলের দর বাড়লে সরকারের রাজস্ব বৃদ্ধি পাবে। এই অনুমানের ক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের এনার্জি ইনফরমেশন অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের বা ইন্ধন তথ্য সংস্কার পূর্বাভাস থেকে তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে।

এ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, উগান্ডা সরকার যদিত তেল কোম্পানির সঙ্গে যৌথ উদ্যোগে ১৫% অংশ নেয় তাহলে সরকারের ভাগে রাজস্ব পাইপলাইন সমেত ব্যবস্থা ৭৭ দশমিক ৩% আর পাইপলাইন ছাড়া ব্যবস্থা হলে ৭৯ দশমিক ৫%-তে বৃদ্ধি করা যেতে পারে। চুক্তিতে রাষ্ট্রের অংশগ্রহণ বিষয়ে ১১ নম্বর ধারায় যৌথ উদ্যোগে অংশ নেয়ার কথা রয়েছে। যৌথ উদ্যোগে অংশ নেয়ার জন্য উগান্ডাকে খরচ দিতে হবে না, তা দেবে তেল কোম্পানিগুলো। সরকারের ডেভেলপমেন্ট লাইসেন্সের আবেদন প্রাপ্তির ১২০ দিনের মধ্যে যৌথ উদ্যোগে অংশ নেয়ার অধিকার দাবি করতে হবে। তেল কোম্পানিগুলো যে চড়া মুনাফার পূর্বাভাস দিয়েছে এবং রাষ্ট্রের ভাগে যে কম অংশ পড়বে, সে সবের তুলনায় এ সুযোগ না নেয়ার অর্থ দাঁড়াবে উগান্ডা থেকে রাজস্ব অপ্রয়োজনে তেল কোম্পানিগুলোর ঘরে তুলে দেয়া। উগান্ডা সংক্রান্ত এ বিশ্লেষণে ইরাকি কুর্দিস্তানে সিরিয়ায় দুটি উশচের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। দুটি ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সংশ্লিষ্ট দুটি সরকারেরই রাজস্ব প্রাপ্তির হার বেশি। এমনকি তেলের দাম কম হলেও সিরিয়া সরকারের রাজস্ব প্রাপ্তির হার ৬৫%-এর নিচে নামে না এবং দুটি ক্ষেত্রেই তা ৮০% পর্যন্ত ওঠে। ইরাকি কুর্দিস্তানের সঙ্গে সম্পাদিত চুক্তিটির সঙ্গে তুলনা করলে আরো বিস্মিত হতে হয়। বিস্ময়ের কারণ : ইরাকি কুর্দিস্তানে চুক্তি সই করেছে এই হেরিটেজ অয়েলই। হেরিটেজ উগান্ডায় বেশি সুবিধা হাতিয়ে নিতে পেরেছে। অথচ কুর্দিস্তানে আঞ্চলিক সরকার এখনো স্বীকৃত কোনো রাষ্ট্রের সরকার নয়, আলোচনা করার আইনগত কর্তৃত্ব সে সরকারের নেই। তেল বিষয়ে কর্তৃত্ব নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের সঙ্গে কুর্দিস্তান আঞ্চলিক সরকারের দীর্ঘ বিবাদটানাহেঁচড়া চলছে এবং বড় ধরনের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের মধ্যে একটি বিদেশী সেনাবাহিনীর দখলে রয়েছে অঞ্চলটি।

একটু ভিন্ন প্রসঙ্গ হলেও এক্ষেত্রে উল্লেখ করা দরকার যে, সিরিয়া ও কুর্দিস্তান নিয়ে নানা দেশের আগ্রহ, আতিশয্য, বৈরিতা, হস্তক্ষেপ, সংঘাত অস্থিরতার সঙ্গে তেলের এসব বিষয় যুক্ত কিনা, সেটা বোধ হয় ভেবে দেখার অবকাশ রয়েছে। একই সঙ্গে, এ ধরনের সম্পদ সমৃদ্ধ কয়েকটি দেশে এ ধরনের হস্তক্ষেপের অস্থিরতা তৈরির, বিশ্বস্তজন খুঁজে বের করার, বিশ্বস্তজনদের ভাবমূর্তি তৈরি করর চেষ্টা বা অপচেষ্টা ও সতর্ক চোখ এড়িযে যাওয়ার কথা নয়।

আবার কুর্দিস্তানে তেল তোলার কাজ করার জন্য কোনো কোম্পানি খুব চড়া শর্তে রিস্ক প্রিমিয়াম বা ঝুঁকি বাবদ মাসুল দাবি করতে পারে। উগান্ডা কঙ্গো সীমান্তে ঝামেলা থাকলেও তা ইরাক বা কুর্দিস্তানের মতো নয়। এ কথারও উল্লেখ করা হয় ওই প্রতিবেদনে। এমনই উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করা যায়, দক্ষিণ এশিয়াতে কোনো কোনো দেশে ঝুঁকি কিছুটা থাকলেও কোনো কোনো দেশে এ ধরনের ঝুঁকি নেই।

উল্লেখিত প্রতিবেদনের একটি অংশের আলোচনা করা হয়েছে কোম্পানির মুনাফা নিয়ে। এ অংশটির শিরোনাম করপোরেট প্রফিটস একসেসিভ?