Home » আন্তর্জাতিক » নীরবতা ভাঙার এখনই সময়

নীরবতা ভাঙার এখনই সময়

মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

matin luther king jrমার্কিন মানবাধিকার কর্মী, আফ্রিকানআমেরিকান ব্যক্তিত্ব, যাজক (১৯২৯১৯৬৮) . মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে নাগরিক অধিকার আদায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত। ১৯৬৭ সালের ৪ এপ্রিল নিউ ইয়র্ক সিটির রিভারসাইড চার্চে ‘বিয়ন্ড ভিয়েতনাম : এ টাইম টু ব্রেক সাইলেন্স’ শিরোনামে তিনি বক্তৃতা করেন। এতে তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা ঘোষণা করেন। এটি তার অন্যতম বিখ্যাত বক্তৃতা। তার সবচেয়ে আলোচিত বক্তৃতা হলো ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম।’ এখানে ‘বিয়ন্ড ভিয়েতনাম : অ্যা টাইম টু ব্রেক সাইলেন্স’ বক্তৃতাটির অনুবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে। নিউ ইয়র্ক সিটির রিভারসাইড চার্চে ১৯৬৭ সালের ৪ এপ্রিল বক্তৃতাটি করেন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র।

আজ রাতে এই মহান উপাসনাগৃহে আমার আসার কারণ হলো আমার বিবেক আর কোনো বিকল্প খোলা রাখেনি। এই সংগঠনের লক্ষ্য ও কর্মসূচির সঙ্গে আমি অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে একমত পোষণ করি বলেই আপনাদের সঙ্গে এই সভায় যোগ দিয়েছি, ভিয়েতনাম প্রশ্নে যাজক ও সাধারণ মানুষের সৃষ্ট উদ্বেগই আমাদেরকে একত্রিত করেছে। আপনাদের নির্বাহী কমিটির সাম্প্রতিক বিবৃতিই আমার নিজের মনের কথা, আমি যখন এর প্রথম লাইনটি : ‘এখন এমনই এক সময় যখন নীরবতা মানে বিশ্বাসঘাতকতা’পড়ি, তখন তার সঙ্গে নিজেকে সম্পূর্ণ একাত্ম দেখতে পাই। ভিয়েতনামের কারণেই আমাদের সামনে এই সময়টি এসেছে।

এসব কথার সত্যতা নিয়ে বিন্দুমাত্র সংশয় নেই, তবে এর মাধ্যমে যে মিশন শুরুর কথা বলা হয়, তা সবচেয়ে কঠিন কাজগুলোর অন্যতম। এমনকি বিবেক জর্জরিত হলেও মানুষের পক্ষে তাদের সরকারের নীতির বিরোধিতা করার কাজে নিয়োজিত হওয়া সহজ নয়, বিশেষ করে যুদ্ধের সময়। মানুষের নিজের সুপ্ত বাসনা এবং আশপাশের জগতের বোধশূন্য গড্ডালিকাপ্রবাহের সম্পূর্ণ বিপরীতে কেউই খুব সহজে এগিয়ে যেতে পারে না। অধিকন্তু যখন সামনে থাকা বিষয়গুলো হয় বর্তমান ভয়াবহ যুদ্ধের মতো জট পাকানো, তখন আমরা সবসময় অনিশ্চয়তার দোলাচলে বিহ্বল হয়ে পড়ার দ্বারপ্রান্তে উপনীত হই। কিন্তু আমাদেরকে অবশ্যই সামনে এগিয়ে যেতে হবে।

আমাদের যারা ইতোমধ্যেই রাতের নীরবতা ভাঙতে শুরু কেেছ, তারা দেখতে পাচ্ছে, কথা বলার আহ্বান যন্ত্রণাদায়ক একটি বিষয়ে পরিণত হয়েছে, কিন্তু তবুও আমাদের বলতে হবে। আমাদের সীমিত রূপকল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্য হয়, এমন সর্বোচ্চ বিনম্রতা আমাদের দেখাতেই হবে, তবে কথা আমাদের বলতেই হবে। একইসঙ্গে আমাদের আনন্দিতও হতে হবে, কারণ আমাদের জাতির ইতিহাসে নিশ্চিতভাবেই এই প্রথম ধর্মীয় নেতারা নির্ঝঞ্ঝাট দেশপ্রেমের বৃত্ত থেকে বেরিয়ে এসে বিবেকের তাড়না এবং ইতিহাসের শিক্ষার আলোকে প্রবল বিরোধিতার অনুকূল পথ বেছে নিয়েছেন। খুব সম্ভবত আমাদের মধ্যে নতুন চেতনা সঞ্চারিত হয়েছে। তাই যদি হয়ে থাকে, তবে আসুন আমরা এর গতিপথ ভালোভাবে খতিয়ে দেখি এবং প্রার্থনা করি যাতে আমাদের অন্তরাত্মা আমাদের পথ নিদের্শ করে। কারণ আমাদের প্রবলভাবে ঘিরে থাকা অন্ধকারের কঠিন বেষ্টনি ভেদ করতে হলে নতুন পথ আমাদের খুব বেশি প্রয়োজন।

গত দুই বছর ধরে, আমি আমার নীরবতার মুখোসটি ছিড়ে ফেলার দিকে অগ্রসর হওয়ায় এবং আমার হৃদয়ের যন্ত্রণার কথা বলতে থাকায়, এবং ভিয়েতনামকে ধবংস করার পথ থেকে সম্পূর্ণ সরে যাওয়ার আহ্বান জানাতে থাকায় অনেকেই আমার পথে যৌক্তিকতা নিয়ে আমাকে প্রশ্ন করেছেন। তাদের উদ্বেগের মূল জিজ্ঞাসাটি প্রায়ই বিশাল ও প্রবল হয়ে থাকে : . কিং কেন আপনি যুদ্ধ নিয়ে কথা বলছেন? আপনি কেন ভিন্ন মতালম্বীদের সঙ্গে সুর মেলাচ্ছেন? শান্তি আর নাগরিক অধিকারকে গুলিয়ে ফেলবেন না, তারা বলে। আপনি কি আপনার জাতির স্বার্থে আঘাত হানছেন না, তারা জানতে চায়? আর আমি যখন তাদের কথা শুনি, তখন প্রায় ক্ষেত্রেই তাদের উদ্বেগের মূল কারণ উপলব্ধি পারলেও ভীষণভাবে মর্মাহত হই, কারণ এসব প্রশ্নের অর্থ হলো প্রশ্নকর্তারা সত্যিকার অর্থে আমাকে চেনে না, আমার অঙ্গীকার ও আমার আহ্বান বোঝে না। বস্তুত, তাদের প্রশ্ন শুনে মনে হয়, তারা যে বিশ্বে বসবাস করে, সেটাকে তারা জানে না।

এ ধরনের ভয়াবহ বিভ্রান্তির প্রেক্ষাপটে আমি মনে করি আমার বিষয়টি স্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা উচিত এবং পরিষ্কার করে বলা দরকার কেন আমি ডেক্সটার অ্যাভেনিউ ব্যাপ্টিস্ট চার্চের পথটিমন্টগোমেরি, আলাবামার চার্চ, যেখানে আমার যাজকীয় কার্যক্রম শুরু হয়েছিলধরে আজ রাতে এই উপাসনালয়ে উপস্থিত হয়েছি।

আজ রাতে আমি এখানে উপস্থিত হয়েছি আমার প্রিয় জাতির কাছে একটি আবেগপূর্ণ আবেদন জানাতে। এই বক্তৃতা হ্যানয় বা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টকে উদ্দেশ করে নয়। এটা চীন বা রাশিয়াকে লক্ষ করেও নয়।

সার্বিক পরিস্থিতির দ্ব্যর্থবোধকতাকে উপেক্ষা করা এবং ভিয়েতনাম ট্রাজেডির সম্মিলিত সমাধানের প্রয়োজনীয়তা নিয়েও কোনো প্রয়াস নয় এটা। উত্তর ভিয়েতনাম বা ন্যাশনাল লিবারেশন ফ্রন্টকে পরমোৎকর্ষের আদর্শ হিসেবে তুলে ধরার কোনো চেষ্টাও নয় এটা। কিংবা সমস্যাটির সফল সমাধানে তারা যে ভূমিকা পালন করছে, সেটা এড়িয়ে যাওয়ার আমার উদ্দেশ্য নয়। তাদের উভয়েরই যুক্তরাষ্ট্রের সরল বিশ্বাস নিয়ে সন্দেহ পোষণ করার যথার্থ কারণ থাকলেও জীবন ও ইতিহাস এই সাক্ষী দেয়, উভয় পক্ষের বিশ্বাসযোগ্য লেনদেন ছাড়া সঙ্ঘাতের কখনো অবসান হয় না।

অবশ্য, আজ রাতে আমি হ্যানয় বা এনএরএফএর সঙ্গে কথা বলার ইচ্ছা নিয়ে আসিনি। আজ বরং আমি আমার আমেরিকান ভাইদের সঙ্গে কথা বলতে এসেছি, আমিসহ যাদের উপর দায়িত্ব রয়েছে একটি সঙ্ঘাত বন্ধ করারযা উভয় মহাদেশের কাছ থেকে চড়া মূল্য আদায় করছে।

ভিয়েতনামের গুরুত্ব

আমি বিশ্বাস করি, আমাদের যদি বিশ্ব বিপ্লবের সঠিক দিকে থাকতে হয়, তবে জাতি হিসেবে আমাদেরকে অবশ্যই মূল্যবোধের চরম বিপ্লবের পথ ধরতে হবে। আমাদেরকে অবশ্যই অবিলম্বে ‘বিষয়কেন্দ্রিক’ সমাজ থেকে ‘ব্যক্তিকেন্দ্রিক’ সমাজে পরিবর্তিত হতে হবে। যখন মানুষের চেয়ে যন্ত্রপাতি ও কম্পিউটার, মুনাফামুখী কার্যকারণ ও সম্পত্তির অধিকারকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করা হয়, তখন বর্ণবাদ, বস্তুবাদ ও সামরিকতন্ত্রের ত্রিমুখী দানবকে দমন করা যায় না। আমি পেশায় ধর্মপ্রচারক হওয়ায় আমি মনে করি ভিয়েতনামকে আমার নৈতিক রূপকল্পের মধ্যে আনার সাতটি প্রধান কারণ থাকা বিস্ময়কর নয়। ভিয়েতনাম এবং প্রথম সংগ্রাম এবং আমেরিকা জড়িত এমনসব যুদ্ধের মধ্যে শুরু থেকেই অত্যন্ত স্পষ্ট এবং প্রায় সরল যোগযোগ দেখা যাচ্ছে। কয়েক বছর আগে ওই সংগ্রামের একটি উজ্জ্বল মুহূর্ত ছিল। দারিদ্র বিমোচন কর্মসূচি সাদা ও কালো উভয় বর্ণের গরিব মানুষের জন্য সত্যিকারের আশার আলো হিসেবে প্রতিভাত হয়েছিল। যাচাইবাছাই, আশা, নতুন সূচনাসবই ছিল। কিন্তু তারপর এলো ভিয়েতনামের যুদ্ধপ্রস্তুতি। আর আমি দেখলাম, দারিদ্র বিমোচন কর্মসূচি পুরোপুরি বাতিল করে দেওয়া হলো, সমাজের কিছু কর্মহীন অলস রাজনৈতিক লোক যুদ্ধের জন্য উন্মাদ হয়ে গেল এবং আমি বুঝতে পারলাম, আমেরিকা তার গরিবদের পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল ও শক্তি আর কখনো ব্যয় করবে না, যতক্ষণ পর্যন্ত ভিয়েতনামের মতো অভিযানগুলো অনেকটা দানবীয় বিধ্বংসীকর শোষক নলের মতো মানুষ, দক্ষতা ও অর্থ টেনে নেওয়া অব্যাহত রাখবে। আর এই কারণেই আমি ক্রমবর্ধমান হারে যুদ্ধকে গরিবের শত্রু বিবেচনা করতে থাকলাম এবং সে অনুযায়ী তার উপর আক্রমণ চালাতে লাগলাম।

সম্ভবত বাস্তবতার আরো বেশি মর্মান্তিক স্বীকৃতি পাওয়া গেল, যখন এটা আমার কাছে পরিষ্কার হয়ে গেল, এই যুদ্ধ দেশের গরিব মানুষের আশা ধ্বংসের চেয়েও আরো ভয়াবহ ঘটনা ঘটাচ্ছে। আমেরিকা তাদের পুত্র, তাদের ভাই আর তাদের স্বামীদের যুদ্ধ করতে আর অবশিষ্ট জনসংখ্যার তুলনায় অস্বাভাবিক অনেক বেশি হারে মরতে পাঠাচ্ছে। আমরা আমাদের কৃষ্ণাঙ্গ তরুণদের, যাদের আমার সমাজই পঙ্গু করে দিয়েছে, বাছাই করে আট হাজার মাইল দূরের দক্ষিণপূর্ব এশিয়ায় স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পাঠাচ্ছি। অথচ এই তরুণরা দক্ষিণপশ্চিম জর্জিয়া ও ইস্ট হারলেমেও ওই স্বাধীনতা পায়নি। অর্থাৎ আমরা বারবার টিভির পর্দায় নির্মম পরিহাসের মতো দেখছি যে, নিগ্রো ও শ্বেতাঙ্গ ছেলেরা এমন এক জাতির জন্য একসঙ্গে হত্যা করছে ও মারা যাচ্ছে, যে জাতি তাদেরকে একই স্কুলে বসার ব্যবস্থা করতে পারেনি। আমরা তাদেরকে বর্বর সংহতিতে দরিদ্র পল্ল­ীর কুঁড়েঘরগুলো জ্বালাতে দেখছি, অথচ আমরা জানি, তারা কখনো ডেট্রোয়টে একই কক্ষে কখনো বসবাস করবে না। স্বার্থসিদ্ধির জন্য গরিব মানুষদেরকে এমন নির্দয়ভাবে ব্যবহার করতে দেখে আমি নীরব থাকতে পারি না।

আমার বর্তমান অবস্থান গ্রহণের তৃতীয় কারণ আরো গভীর সচেতনাবোধ থেকে উদ্ভূত। গত তিন বছরে, বিশেষ করে গত তিনটি গ্রীস্মে উত্তরের ঘাঁটিগুলোতে আমি যে পরিস্থিতিতে পড়েছি, তার আলোকে ওই সচেতনার সৃষ্টি হয়েছে। আমি বেপরোয়া, প্রত্যাখ্যাত ও ক্রুদ্ধ তরুণদের কাছে গিয়ে বলেছি, মলোটভ ককটেল ও রাইফেল কখনো তাদের সমস্যার সমাধান করতে পারবে না। আমি আমার গভীরতম সহানুভূতি দিয়ে তাদেরকে বোঝানোর চেষ্টা করেছি এবং সেইসঙ্গে এই বিশ্বাসও লালন করেছি যে, অহিংস পদক্ষেপের মাধ্যমেই সবচেয়ে অর্থপূর্ণ সামাজিক পরিবর্তন আসে। তারা আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, এবং তা অত্যন্ত যথাযথভাবেই, ভিয়েতনামের ব্যাপারটা তবে কি? তারা আমাকে প্রশ্ন করেছে, আমাদের দেশ কি তার কাক্সিক্ষত পরিবর্তন সাধনের লক্ষ্যে এই সমস্যায় সবচেয়ে বেশি মাত্রায় সহিংসতার আশ্রয় গ্রহণ করছে না? তাদের প্রশ্ন দেশকে আঘাত করেছে। আমি জানি ঘাঁটিগুলোর নিপীড়িত লোকদের সহিংসতার বিরুদ্ধে আর কখনোই কথা বলতে পারব না, যদি না আমি বর্তমান বিশ্বে সবচেয়ে সহিংসতার বিস্তারকারী আমার নিজের সরকারের বিরুদ্ধে স্পষ্টভাবে আমি প্রথম কথা না বলি। ওইসব ছেলের স্বার্থে, এই সরকারের স্বার্থে, আমাদের সহিংসতায় কাঁপতে থাকা লাখ লাখ মানুষের স্বার্থে আমি নীরব থাকতে পারি না।।

(চলবে…)