Home » বিশেষ নিবন্ধ » প্রতিটি মুহূর্তই হোক ‘মা দিবস’

প্রতিটি মুহূর্তই হোক ‘মা দিবস’

 

ফ্লোরা সরকার

mothers dayপেটের ভেতর প্রথম যেদিন শিশুটির নড়াচড়া টের পেলাম সেদিনও আমার অন্য রকম লেগেছিল। প্রথমবারের মতো লাথি মারলো আসলে ওটা মোটেও লাথি নয়। এটাই আমি সারাজীবন আশা করে বসে আছি। একটু মৃদু কম্পন, তিরতিরে অনুভূতি, যেন ছোট্ট জীবন্ত একটা প্রজাপতি আমার পেটের মধ্যে উড়ে উড়ে বেড়াচ্ছে। মাতৃত্বের আনন্দ হলো, আমার যেমন মনে হয়েছে, এটা কোন কর্তব্য বা দায়িত্বের কোন প্রক্রিয়া নয়, বইপত্র আমাদের যা বোঝায় তাও নয়, এটা অন্য কিছু, অন্য আরো কিছু। ভ্রণাকার থেকে শুরু করে বৃদ্ধির প্রতিটি পর্যায় আমাকে একটার পর একটা অনন্য অভিজ্ঞতা দিয়েছে সে অভিজ্ঞতা প্রকাশের ক্ষমতা কোন ভাষার নেই। মাতৃত্ব অন্য কিছু সবকিছুর পরেও অন্য আরো কিছু।” বিখ্যাত চিত্রাভিনেত্রী সোফিয়া লোরেন তার আত্মজীবনীমূলক বই “সোফিয়া লোরেন, তার আপন কথা” য় তার মাতৃত্বের অনুভূতি এভাবেই ব্যক্ত করেছেন, যে মাতৃত্বের নিগূঢ় অনুভূতি ব্যক্ত করার পরও অব্যক্ত থেকে যায়। কেননা মাতৃত্বের অনুভূতি সবকিছুর পরেও অন্য আরো কিছু, এই ‘অন্য আরো কিছু’ শব্দের বন্ধনীতে রেখে ব্যক্ত করার নয়, তা অব্যক্ত থাকে প্রতিটি মায়ের গভীর অনুভূতির এক অজানা স্থানে। মাতৃত্বের অনুভূতিকে তাই পৃথিবীর অন্য কোন অনুভূতি দিয়ে ব্যক্ত করা দূরে থাক তুলনাই করা যায় না। ঠিক যেভাবে মানুষ নিজের মায়ের সঙ্গে অন্য কারোর তুলনা করতে পারেনা। সোফিয়া লোরেনও তাই তার মায়ের কোন স্মৃতিই বিস্মৃত হতে পারেন না। নিত্য অভাবের মধ্যে বেড়ে ওঠা সোফিয়া লোরেন তার আত্মজীবনীর এক জায়গায় মায়ের স্মৃতিচারণে বলছেন “খাদ্যের আরো একটা উৎস আমার ছিল। আমার মায়ের গোপন উৎস। খুব সকালে, কাকভোরে, সূর্য ওঠার আগে মা আমার হাত ধরে বেরিয়ে পড়তেন। যেতে যেতে মা বারবার পেছন ফিরে দেখে নিতেন কি জানি কেউ আবার অনুসরণ করছে কিনা। গ্রামের খোলা প্রান্তর দিয়ে শহর ছাড়িয়ে বেশ কিছুটা দূরে পাহাড়ের গায়ে কতগুলো গুহামতো ছিল, তার একটিতে এক ছাগপালক থাকতো। তিনি ছিলেন আমার মামার বন্ধু। আমরা গেলেই সেই মানুষটি একটা ছাগল দুইয়ে ফেনা ওঠা এক মগ উষ্ণ দুধ আমার হাতে তুলে দিতেন। তুলনাহীন সেই আনন্দ! দুই হাতে সেই বড় মগ নিয়ে গরম দুধ যখন মুখে দিতাম আমি টের পেতাম উষ্ণ দুধের সেই স্রোত গলা বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে একটু একটু করে তরল সেই স্বর্গীয় উষ্ণতা নামছে আর আমি টের পাচ্ছি বড় হয়ে বিখ্যাত সব লোকের তৈরি বিশেষ খাদ্য আমি খেয়েছি কিন্তু এই সব কিছুর উপরে থেকে গেছে আমার শৈশবের দুটো স্মৃতি। একটা ফেনাওঠা সেই উষ্ণ দুধ, অন্যটা আমার নানিমার রান্না ঘরে টগবগে ফুটন্ত পাস্তই ফেগিওল।” যে মা‘এর জন্যে সোফিয়া লোরেন বিখ্যাত অভিনেত্রী ‘সোফিয়া লোরেন’ হতে পেরেছিলেন, এটা শুধু সেই মা’য়ের গল্প নয়, পৃথিবীর সব মা’য়ের গল্প। প্রতিটি মা এমনকি প্রতিটি প্রাণী পশুপাখী থেকে শুরু সমস্ত স্তন্যপায়ীঅস্তন্যপায়ী মা’য়েরা এভাবেই তাদের শিশুদের তাদের দুই ডানা দিয়ে আগলে রাখে, পুষ্টি জোগায়, মানুষ বা প্রাণী হয়ে গড়ে তোলার জন্য প্রাণ দিতে পর্যন্ত প্রস্তুত থাকে। মা’দের সহজাত প্রবৃত্তির কারণেই এসব হয়ে থাকে। সেই সহজাত প্রবৃত্তিকে যখন উৎসবের মোড়কে একটি দিবসে রূপান্তরিত করা হয় তখন তা হয়ে যায় উপর থেকে চাপানো কৃত্রিম ভাবে ব্যক্ত একজন ‘মা’ নামক কনসেপ্ট বা ধারণা। মায়ের জন্যে অনুভূতি কোন ধারণার ঘেরাটপে বন্দী করা যায়না। কিন্তু মা’য়ের জন্যে পৃথক একটা দিবস সাজিয়ে মা’কেই পৃথক করে কি দিচ্ছিনা? বিশেষ একটা দিনে বিশেষভাবে মা’কে স্মরণ করা কেন? কেননা, মা প্রতিদিনের। মৃত বা জীবিত মা আমাদের নিত্যসঙ্গী।

মা দিবস’ এর সংক্ষিপ্ত ইতিহাসের দিকে যদি আমরা দৃষ্টিপাত করি তাহলে দেখবো, পাশ্চাত্যের বিশেষত আমেরিকান দৃষ্টিভঙ্গির কতটা শক্তিশালী প্রভাব তার পেছেনে কাজ করেছে এবং কত বিচিত্র ভাবে আর বিচিত্র গতিতে দিবসটি পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। উইকিপিডিয়া অনুসারে মা দিবসের তাৎপর্যের মূলে আছে তিনটি বিষয় . সকল মা’দের প্রতি সম্মান প্রদর্শন ২. সকল মাতৃত্বের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং ৩. সমাজে মা’দের প্রভাবের প্রতিফলন। অন্যান্য আধুনিক দিবসের মতো ‘মা দিবস’ও একটি অধুনা সংস্করণ। ১৮৭২ সালে জুলিয়া ওয়ার্ড হওয়ির প্রচেষ্টায় একবার ‘মা দিবস’ পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। কিন্তু তা সার্থক হয়নি, কেননা সেই দিবস সকল মা’য়ের উদ্দেশ্যে পালনের জন্যে ছিল না। তা ছিল শুধু শান্তিকামী, যারা যুদ্ধের বিরুদ্ধে সেসব মা’য়ের জন্যে। ১৯০৮ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের আনা জারভিসের মা মারা গেলে তার মাকে স্মরণ করার উদ্দেশ্যে আনা জারভিস প্রথম ‘মা দিবস’ পালন করেন। তারপর থেকে প্রতি বছর ‘মা দিবস’ পালনের লক্ষ্যে আনা তার ক্যাম্পেইন বা প্রচারাভিযান শুরু করেন যা ১৯১৪ সালে সেই ক্যাম্পেইন স্বীকৃতি বা প্রতিষ্ঠা পায়। ১৯২০ নাগাদ পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি দেশে তার প্রচলন শুরু হয়ে যায়। তবে স্থানকাল ভেদে ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে সামনে তা পালন করতে দেখা যায়। যেমন রোমান ক্যাথলিকরা এই দিবসটি মা মেরিকে স্মরণের উদ্দেশ্যে পালন করে। হিন্দু সম্প্রদায়, বিশেষত নেপালে এই দিবস ‘মা’য়ের (ধর্মীয় দেবী) পাক্ষিক তীর্থযাত্রা’ নামে প্রতি বৈশাখ মাসের প্রথম চাঁদ ওঠার দিন তা পালন করে। সৌদি আরবে প্রতি বছর ২১ মার্চ, বসন্তের প্রথম দিনটিতে পালিত হয়। যেটা আবার তুরস্কের সাংবাদিক মোস্তফা আমিনের বরাত দিয়ে সৌদি আরবে প্রবেশ ঘটে। বিশেষত মোস্তফা আমিন যখন একজন বিধাব মা’য়ের গল্প শোনেন যিনি তার ছেলেকে অনেক কষ্টে ডাক্তারি পড়ান এবং ছেলে ডাক্তার হবার পর বিয়ে করে মা’কে ফেলে চলে যায়। ঘটনাটা তার মনে প্রচন্ড রেখাপাত করে এবং শুরু হয় ‘মা দিবস’ পালন। আর্জেন্টিনায় দিবসটি পালিত হয় প্রতি অক্টোবর মাসের তৃতীয় রবিবার, মা মেরির স্মরণের উদ্দেশ্যে। অস্ট্রেলিয়ায় ১৯২৪ সালে মিসেস জেনেট হেডেন যখন নিউইংটন স্টেট হোম ফর ওয়োমেন এ তার একজন রোগী দেখতে যান তখন অনেক মা’য়ের দেখা পান যারা নিঃসঙ্গ এবং সন্তানেরা যাদের ভুলে গিয়েছে। এসব নিঃসঙ্গ আর ভুলে যাওয়া মা’দের জন্যে ‘মা দিবস’ পালনের ব্যবস্থা করেন। চিন প্রজাতন্ত্রে ১৯৯৭ সাল থেকে দুঃস্থ মা’দের উদ্দেশ্যে দিবসটি পালন শুরু হয়। জার্মানিতে ১৯২০ নাগাদ বিভিন্ন কলকারখানায় নারী শ্রমিকের বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গীর পরিবর্তন শুরু হয়। নারীকে সম্মানের দৃষ্টিতে দেখা শুরু হয়। সেই দৃষ্টিভঙ্গী থেকে ১৯২৩ সাল থেকে ‘মা দিবস’ এর প্রচলন শুরু হয়। ইসরাইলে ইহুদি ক্যালেন্ডার অনুসারে শিভাত মাসের ৩০ তারিখে ( যা ৩০ জানুয়ারি থেকে ১ মার্চ এর কোন এক সময়ের অন্তর্গত) ‘মা দিবস’ পালন করা হয়। দিনটি হেনরিটা স্কল এর মৃত্যুদিবস। হেনরিটা যিনি কোন সন্তান ধারণ না করলেও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় অনেক ইহুদি সন্তানের প্রাণরক্ষার জন্যে সংগ্রাম করেন। মূলত তাকে উদ্দেশ্য করেই দিবসটি পালন করা হয়। ইরানে ইসলামিক ক্যালেন্ডারের জুমাদাআলথানি মাসের ২০ তারিখে ‘মা দিবস’ পালন করা হয়। তারিখটি হযরত মুহম্মদ (সাঃ) এর কন্যা ফাতিমার জন্মদিনকে সামনে রেখে পালিত হয়। বাংলাদেশ, ভারত আর পাকিস্তানে দিবসটি বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে দিয়ে মে মাসের দ্বিতীয় রবিবারে পালিত হয়।

কাজেই দেখা যাচ্ছে ‘মা দিবস’ এর উৎস মুখ যুক্তরাষ্ট্রে শুরু হলেও বিভিন্ন দেশ যার যার মতো করে বছরের ভিন্ন ভিন্ন সময়ে ‘মা দিবস’ এর লক্ষ্য আর উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে তা পালন করে। কিন্তু বাংলাদেশ, ভারত এবং পাকিস্তানে এ ধরণের কোন লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যের কোন ইঙ্গিত দেখা যায় না। বিশেষ করে বাংলাদেশে তো নয়ই। যেহেতু দিবসটি পশ্চিমের এবং আমাদের অচেতন মনে পশ্চিমে যা ঘটে বা ঘটবে সেটাই এখানে ঘটতে দেয়া হবে বা উচিত, এই বোধ কাজ করে। কাজেই এখানেও একটি ‘মা দিবস’ আমাদের প্রয়োজন। সেই দিবস কিন্তু আবার শহরের বিত্তশালী এবং মধ্যবিত্ত শ্রেণীর অচেতন মনের গন্ডিতেই বিরাজিত। আমাদের গ্রামের এবং দরিদ্র শ্রেণীর লক্ষ লক্ষ মা’য়েরা সেখানে অন্তর্ভূক্তি হন না বা হতে পারেন না। কারণ ‘মা দিবস’ এর কোন তাৎপর্য এই শ্রেণীর ভেতর বিরাজ করে না। কেননা এই মা’য়েরা এতোটাই আটপৌরে, এতটাই প্রতিদিনের যে তাকে কোন বিশেষ দিনে বিশেষ ভাবে বিশেষায়িত করার কথা তারা ভাবতেই পারেননা। যখনই কোন কিছুকে বা কাউকে ‘বিশেষ’ ভাবে বিশেষায়িত করা হয় তখনই, তা বা সেই ব্যক্তি আর দশজন থেকে পৃথক হয়ে পড়েন। এই ধরণের পৃথকিকরণের কোন ব্যবস্থা এই দরিদ্র শ্রেণীর ভেতর নেই। তাই আমাদের শহুরে বা বিত্ত এবং মধ্যবিত্ত সন্তানেরা ‘মা দিবস’ উপস্থিত হলে বিভিন্ন ধরণের বৈচিত্রময় কার্ড, খাবার, অনুষ্ঠান এবং ‘মা’ কে নিয়ে পত্রিকার পাতা, টিভি নাটক এবং অনুষ্ঠানে আবেগ, অনুভূতি আর ব্যাকুলতা দিয়ে ‘মা’ কে মহিমান্বিত করে তোলেন। একজন ‘মা’কে পৃথক ভাবে মহিমান্বিত বা মহীয়সী করার কিছু নেই। একজন ‘মা’ সব সময়, প্রতি মুহূর্ত্তেই একজন মা। দৈনন্দিনতার মাঝে যে মাকে আমরা পাই বা স্মরণ করি তার সঙ্গে আনুষ্ঠানিকতার মা’কে আমরা কোথায় যেন হারিয়ে ফেলি। মা, মাতৃত্ব এবং মায়ের প্রতি অনভূতির সঙ্গে পৃথিবীর আর কোনকিছুর তুলনা হয়না বলেই তা এতো বিরল। সেই বিরল আর দুর্লোভ অনুভূতি আমাদের মনের গভীরে সহজাত ভাবেই বিরাজ করে।

সর্বপরি একজন ‘মা’ একজন নারীও বটে। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায় আমরা আমাদের ‘মা’ কে যতটা আবেগ দিয়ে স্মরণ করি, নারী হিসেবে তাকে দেখি অনেকটাই অবহেলায়। একজন নারীকে হারিয়ে ফেলার অর্থ যে একজন মা’কেও হারিয়ে ফেলা এই সহজ বোধটুকু আমাদের মাথায় থাকে না। এই হারিয়ে ফেলার বোধের অভাবের কারণে সাংবাদিক রুনীর মতো মা’কে পৃথিবী থেকে বিদায় নিতে হয়। এই হারিয়ে ফেলার বোধের অভাবের কারণে পোষাকশিল্পকর্মী শাহীনাকে যখন উদ্ধারকর্মীরা বাঁচাতে যায়, তখন তার মাতৃত্বের সাহসিকতা আমাদের চরমভাবে বিস্মিত করে। শাহীনা নামের সেই মেয়েটিকে যখন বলা হয়েছিল তার বুক কেটে দিলে সে সেই ধ্বংসস্তুপ থেকে বের হয়ে আসতে পারবে। বেঁচে যাবে তার জীবন। কিন্তু সে তা করতে দেয়নি, কারণ শাহীনা জানায় এই বুকের দুধটুকু খেয়েই তার ছোট শিশুটি বেঁচে থাকে, সে তা হতে দিতে পারেনা। মাতৃত্বের এই তীব্র অনুভূতি, আবেগ, বিসর্জন পৃথিবীর আর কোনকিছুতে দেখা যায়না। শুধু একজন নারী অর্থাৎ একজন মা’ই পারেন জীবনবাজি রেখে তার সন্তানকে বাঁচাতে। একজন নারী সন্তানধারণ করেও এবং না করেও একজন ‘মা’ ই থাকেন শেষ পর্যন্ত। কাজেই একজন মা’কে শ্রদ্ধার দৃষ্টিতে দেখার অর্থ একজন নারীকে সেভাবে দেখা। মা একটি বটবৃক্ষের মতো, যার প্রতিদিনের ছায়ায় আমরা বেঁচে থাকি। তাই প্রতিদিন, প্রতিটি মুহূর্তই হোক আমাদের ‘মা দিবস’।।