Home » মতামত » বিদ্যমান অস্থিতিশীলতা নির্বাচনকেন্দ্রিক সঙ্কট – বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া

বিদ্যমান অস্থিতিশীলতা নির্বাচনকেন্দ্রিক সঙ্কট – বিশিষ্টজনদের প্রতিক্রিয়া

জাকির হোসেন

violence 3বর্তমান রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতাকে নির্বাচন কেন্দ্রিক একটি সঙ্কট হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশিষ্ট নাগরিকরা। তারা বলেছেন, নির্বাচনের সময় যতই ঘনিয়ে আসবে এই সঙ্কট ততই তীব্র হবে। এ সঙ্কট থেকে উত্তরণের জন্য সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহনযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য নির্বাচন পদ্ধতির পরিবর্তন জরুরি। তারা বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হওয়ার পর থেকে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে টানাপোড়েন বাড়তে থাকে। টানা হরতালসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক কর্মসূচি ও বিএনপির শীর্ষ নেতাদের ধরপাকড় এবং মামলাকে কেন্দ্র করে গত এক বছরে পরিস্থিতি আরো উতপ্ত হয়ে পড়ে। এরইমধ্যে একাত্তরের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারকে ঘিরে জামাতশিবিরের সহিংসতা ভয়াবহ রূপ নেয়। রাজনৈতিক মাঠে সর্বশেষ কওমি মাদ্রাসা কেন্দ্রিক সংগঠন হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি নতুন উত্তাপ যোগ করেছে। এ অবস্থায় রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানের কথা সব মহল থেকে ওঠে। এ প্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষ থেকে সংলাপের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। কিন্তুু এই সংলাপের পেছনে যদি সমঝোতার মনোভাব না থাকে তবে সংলাপ ফলপ্রসু হবে না। এ ব্যাপারে সমাজের কয়েকজন বিশিষ্ট ব্যক্তি আমাদের বুধবারএর কাছে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন।

এ ব্যাপারে প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক এবং প্রবীণ শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, বর্তমান সময়ে যেসব ঘটনা ঘটছে তার সবটাই হচ্ছে নির্বাচন কেন্দ্রিক। নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে সঙ্কট ততই ঘণিভূত হচ্ছে। নির্বাচন পদ্ধতির মীমাংসা না হলে এ সঙ্কট আরো বাড়বে। নির্বাচন পদ্ধতির পরিবর্তন না করে নির্বাচন করলে এর ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন উঠবে এবং নতুন সংকটের সৃষ্টি হবে। বর্তমান সময়ে আমরা পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ প্রত্যক্ষ করছি। তাই আমাদের উচিত হবে সকল দলের অংশগ্রহনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহনযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যবস্থা করা। রাজনৈতিক অস্থিরতা যদি নির্বাচনের মাধ্যমে মীমাংসা না হয় তাহলে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটবে। এই এক্ষেত্রে আমরা না চাইলেও অগণন্ত্রিক শক্তি ক্ষমতায় আসবে।

তিনি বলেন, তাই বর্তমান জটিল পরিস্থিতিতে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়া অন্য যত চেষ্টাই করা হোক না কেনসহিংসতা আরো বাড়বে।

সংলাপের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সংলাপের পেছনে যদি সমঝোতার মনোভাব না থাকে তবে সংলাপ সফল হয় না। বৃটিশ আমলে আমরা গান্ধি এবং জিন্নাহ্র সংলাপ দেখেছি, পাকিস্তান আমলে ইয়াহিয়া এবং শেখ মুজিবের সংলাপ দেখেছিআর স্বাধীন বাংলাদেশের দেখেছি আবদুল জলিল এবং আবদুল মান্নান ভূইয়ার সংলাপ। এসব সংলাপের পেছনে সমঝোতার মনোভাব না থাকায় তা সফল হয়নি। বর্তমান সময়ে সঙ্কট নিরসনে সংলাপের যে প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রী দিয়েছেন, এর পেছনে যদি সমঝোতার মনোভাব না থাকে তবে সংলাপ করে কোনো লাভ হবে না।

অপর এক প্রতিক্রিয়ায় প্রখ্যাত আইনজীবী ব্যারিস্টার রফিক উল হক সংলাপ থেকে সঙ্কট উত্তরণের উপায় বের করার তাগিদের পাশাপাশি বিরোধীদলকে শর্ত ছাড়াই আলোচনায় বসার পরামর্শ দেন দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, বিএনপি বলবে আমি কেয়ারটেকার চাই, আওয়ামী লীগ বলবে অন্তবর্তী চাই। এ করতে করতে একটা পয়েন্টে এসে মিট করবে এবং সেটি আমরা চাই। দেশে সুস্থ ও গ্রহণযোগ্য ইলেকশন হোক।’

এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীন মহাজোটের অন্যতম শরিক বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন বলেন, সংলাপের মাধ্যমে বর্তমান রাজনৈতিক সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কারণ বিএনপিজামায়াত যা করছে তা নির্বাচন কেন্দ্রিক। আলোচনার মাধ্যমে এ সঙ্কট থেকে বেরিয়ে আসা সম্ভব।

সিপিবি সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, সবচেয়ে বিপদের কথা হলোরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জামায়াতশিবির এখনো তাদের ষড়যন্ত্র অব্যাহত রেখেছে। এ অবস্থায় হেফাজতে ইসলামের চলমান সহিংসতা যুক্ত হয়ে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়েছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে জন্য বিএনপিকে জামায়াতের সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানতে হবে। তাহলে দেশের চলমান রাজনৈতিক সংকটের আপাত সমাধান হবে।

বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ড.মাহবুব উল্লাহ বলেন, বর্তমান সময়ে দেশ একটি বড় ধরনের সংকটের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিদিন নতুন নতুন রাজনৈতিক সংকটের সৃষ্টি হচ্ছে। দেশের গণতন্ত্র চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে রয়েছে। এ ক্ষেত্রে সরকারের দমননীতি পরিস্থিতিকে আরো জটিল করছে। তিনি বলেন, এই জটিলতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে বিদ্যমান সংবিধান সম্পর্কে আমাদের নতুন করে ভাবতে হবে। দেশের অধিকাংশ মানুষের আশাআকাঙ্খা অনুযায়ী জাতীয় ঐকমত্য সৃষ্টি করতে হবে। নিছক দমন পীড়নের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান হবে না। আশা করবো এ ব্যাপারে সরকারের শুভবুদ্ধির উদয় হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. আকমল হোসেন বলেন, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ধর্মাশ্রয়ীদের উত্থান অসম্প্রদায়িক এবং গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র বিনির্মানের একটি বড় বাধা। আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি এই সংকটের জন্য দায়ী। ক্ষমতার রাজনীতির জন্য তারা বিভিন্ন সময়ে ধর্মাশ্রয়ীদের প্রশ্রয় দিয়েছে। তাই বড় দুই দলকেই তাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান মনে করেন, দেশের স্বার্থে দুই দলেরই উদ্দেশ্য এক হওয়া উচিত। সংলাপ সফল না হলে দেশে মৌলবাদ আরও সক্রিয় হওয়ার আশঙ্কা করেন তিনি। তিনি বলেন, ‘সংলাপ ব্যর্থ হলে আমাদের রাজনৈতিক অস্থিরতা যত বৃদ্ধি পাবে তত বেশি অগণতান্ত্রিক শক্তি ও মৌলবাদি শক্তি এবং যেটা গণতন্ত্রের সহায়ক নয় সে শক্তি আরো বিকাশ ঘটার আরো সুযোগ হবে।’