Home » প্রচ্ছদ কথা » সৃষ্টি যখন স্রষ্টাকে বিনাশ করে

সৃষ্টি যখন স্রষ্টাকে বিনাশ করে

আমীর খসরু

violence 4মেরী শেলির বিখ্যাত বিজ্ঞানভিত্তিক কল্প উপন্যাসের চরিত্র ড. ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইন এমন এক দানব সৃষ্টি করলেন যে সৃষ্টি কিনা তার স্রষ্টাকেই বিনাশ করে এবং ধ্বংস করে ফেলে। সায়েন্সফিকশনটি প্রথম প্রকাশিত হয় ১৮১৮ সালে। এরপর থেকে ড. ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের ওই দানবীয় কল্প চরিত্রটি বিখ্যাত হয়ে আছে।

বর্তমান সরকার বিরোধী দল দমন, নিজেদের নানা কর্মকাণ্ড ঢাকা দেয়ার জন্য নিত্যনতুন ইস্যু সৃষ্টি করেই চলেছে। ক্ষমতাসীন হওয়ার পর থেকেই নির্বাচনী ইশতেহার আর জনগণকে প্রদত্ত ওয়াদা ভুলে গিয়ে জনস্বার্থের বিপক্ষে নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। এক পর্যায়ে নির্বাচনী ব্যবস্থাকে নিজেদের মতো করে সাজিয়ে, ক্ষমতা দীর্ঘস্থায়ী করার মানসে নিত্যনতুন কৌশলের আশ্রয়ও গ্রহণ করা হয়। এরই এক পর্যায়ে চট্টগ্রামভিত্তিক হেফাজতে ইসলামকে ক্ষমতাসীনরা তার প্রতিপক্ষকে মোকাবেলার জন্য মাঠে নামিয়েছিল। বিরোধী দল দমনের কৌশল হিসেবে তারা ইসলামী দলগুলোর সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা গ্রহণ করে। আর এরই প্রথম পর্যায়ে বেছে নেয়া হয়েছিল মাওলানা ফরিদউদ্দিন মাসুদকে। পরে আর এটি বেশিদূর এগোয়নি। সরকার আরো কিছু ইসলামী দল এবং গ্রুপের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা চালায়। কিন্তু এসব প্রচেষ্টায় কার্যকর ফল না পাওয়ায় চট্টগ্রামভিত্তিক হেফাজতে ইসলামকে মাঠে নামানো হয় এবং সরকারের মন্ত্রীনেতাদের সঙ্গে চট্টগ্রামে বসে দফায় দফায় বৈঠকও হয়। আর এটি করা হয়, তখনই যখন জামায়াতের সঙ্গে আঁতাতের বিষয়টি রুখে দেয় তরুণ কিছু ব্লগার। এর আগে জামায়াতের সঙ্গে আঁতাত এবং নির্বাচনী কৌশল হিসেবে এই দলটিকে বিএনপি থেকে বিচ্ছিন্ন করার জন্য নানা চেষ্টা চালানো হয়। জামায়াতের সঙ্গে আঁতাতের সময় এর বিরুদ্ধে তখন মহাজোটের নেতারাই বলেছিলেন, সাপের মুখে চুমু দিতে নেই। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, শাহবাগের তরুণদের আন্দোলনও তারা দলীয়করণের গ্রাসে নিজেদের সংগঠনে পরিণত করেছিল।

হেফাজতে ইসলাম মাঠে নেমে এমন সব দাবিদাওয়া উত্থাপন করেছে, যা অত্যন্ত বিপজ্জনক। কিন্তু সরকার সেই বিপজ্জনক পথেই হেটেছে। এ বছরেরই এপ্রিলের প্রথমদিকে হেফাজত যখন লংমার্চ করে ঢাকায় এসে সমাবেশ করেছে, তখনও সরকার ধারণা করেছিল, বিরোধী দলকে নতুন কৌশলে ঘায়েল করা গেছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ কয়েকজন মন্ত্রী হেফাজতকে ধন্যবাদও জানিয়েছিলেন। কিন্তু অচিরেই প্রমাণিত হয়েছে, তাদের এসব চিন্তাভাবনা ভুল। বিরোধী দলকে ঘায়েল এবং নির্বাচন যাতে তাদের নিজেদের গড়া পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়, সে লক্ষ্যে অসংখ্য নেতাকর্মীকে আটকের পাশাপাশি ভিন্ন কৌশল গ্রহণও চলতে থাকে। সেই ভিন্ন কৌশলের সৃষ্টি এখন স্রষ্টাবিনাশী পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। গত ৫ মে’র রক্তক্ষয়ী ঘটনা, তারই প্রমাণ এবং কূটকৌশল গ্রহণের সম্মিলিত নেতিবাচক ফলাফল। এখানে বলা প্রয়োজন যে, সরকার ইতোমধ্যে সেই হেফাজতকে ঠেকানোর জন্যই আহলে সুন্নতসহ আরো কয়েকটি সংগঠনকে মাঠে নামিয়েছে এবং মাঠে নামানোর চেষ্টা করছে।

গণজাগরণ মঞ্চকে দলীয়করণের মধ্যদিয়ে আরেকটি বিপজ্জনক পথ গ্রহণ করেছিল সরকার। এই সংগঠনটি দলীয়করণের কারণে সরকারের জন্য যতোটা না সম্পদ, তারচেয়েও বড় দায় হিসেবে আবির্ভূূত হয় এবং যথেষ্ট ক্ষতির কারণ হিসেবেই কাজ করেছে। এটিও স্রষ্টাকে, তার পক্ষপুটে থেকে তারই ক্ষতি করার আরেকটি উদাহরণ মাত্র।

৫ মে’র যে রক্তক্ষয়ী ঘটনা তা শুধু স্রষ্টার সৃষ্টি অথবা সৃষ্টির স্রষ্টাবিনাশী কর্মকাণ্ডের মধ্যেই সীমাবদ্ধতা রয়েছে তা নয় এর গভীর প্রভাব পড়েছে দেশের সামগ্রিক সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক পরিস্থিতির উপরে। সরকার এখন মনে করছে, রক্তক্ষয়ী পথে হলেও হেফাজতকে হঠিয়ে বা উচ্ছেদ করে পরিস্থিতি তারা শামাল দিতে পেরেছে। কিন্তু বাস্তবে হেফাজতের এই ঘটনা এখন শুধু ঢাকায় বা বড় বড় শহরগুলোতে সীমাবদ্ধ নেই, এটা ছড়িয়ে গেছে প্রত্যন্ত গ্রাম পর্যায় পর্যন্ত। এর যে সুদূরপ্রসারী প্রভাব এবং প্রতিক্রিয়া, তা সামাল দেয়া ভবিষ্যতে খুবই কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। সংঘর্ষ আরো অধিকতর সংঘর্ষের জন্ম দেবে সে পথই খুলে দিয়েছে সরকার। অথচ এই পরিস্থিতির সৃষ্টি হতো না, যদি সরকার একের পর এক কূটকৌশলের আশ্রয় গ্রহণ না করতো এবং এক ইস্যু চাপা দেয়ার জন্য নতুন ইস্যু সৃষ্টি না করতো। হেফাজতের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির আগেও নানা আলোচনা ছিল মানুষের মধ্যে। বলা হচ্ছিল, সাভারের ভবন ধসের মর্মান্তিক ঘটনাকে ধামাচাপা দেয়ার জন্য, হেফাজতের ঢাকা অবরোধ কর্মসূচিকে একটি ইস্যু হিসেবে কাজে লাগানো হবে। কিন্তু যেকোনো কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন মানুষই বুঝতে পারেন, এভাবে সামাল দেয়া যায় না। বরং নতুন নতুন বিপদ এবং আরো জটিলতার পথ এর ফলে সুগম হয়।

সরকারের বিপজ্জনক ইস্যু সৃষ্টির ফলে দেশের ভাবমূর্তি এখন তলানি ভেদ করে আরো নিচের দিকে নেমেছে। অথচ সরকার বিরোধী দলকে বলছে, দেশকে তারা সা¤প্রদায়িক এবং তালেবানী রাষ্ট্রে পরিণত করতে চাচ্ছে। কিন্তু ধর্মীয় দলগুলোকে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান থেকে বের করে রাজনীতির ময়দানে আনা, যে দাবিদাওয়া ছিল তাদের একান্ত নিজস্ব গন্ডির মধ্যে, তাকে রাজনীতির ইস্যু হিসেবে উপস্থাপনের পথ সৃষ্টি করে সরকার দেশ, জাতি এবং জনগণের যে ভয়াবহ সর্বনাশ করেছে, অতীতের কোনো সরকার তার ধারে কাছেও যেতে পারেনি।

পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপের মধ্যদিয়ে নতুন পর্যায়ের রাজনৈতিক সঙ্কট এই সরকারই সৃষ্টি করেছে। সে সঙ্কটের ধারাবাহিকতায় রাজনীতি ক্রমশ সাংঘর্ষিক হয়ে উঠছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বিলোপের দিন থেকে এখন পর্যন্ত সবাই বলে যাচ্ছেন, বাংলাদেশে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয়নি বা সরকার এমন কোনো সুষ্ঠু ও সুস্থ আচরণ করতে পারেনি যাতে দলীয় কোনো সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচনটি অনুষ্ঠান সম্ভব। কিন্তু সরকার কারো কোনো মত গ্রহণ না করে এবং পরামর্শকে উপেক্ষা করে, নিজ স্বার্থে নিজস্ব পথেই এগিয়ে চলেছে। আর এতে ভবিষ্যতে আরো সংঘর্ষসংঘাত সৃষ্টির সদর দরজা খোলা থাকছে।

সরকারের পক্ষ থেকে এখন সংলাপের কথা বলা হচ্ছে। বলা হচ্ছে, আলোচনায় বসার জন্য। কিন্তু তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিলের মধ্যদিয়ে যে সঙ্কট সৃষ্টি করা হয়েছে, সে সঙ্কট সমাধান না করলে কোনো মীমাংসা যে হবে না এবং মীমাংসা যে সম্ভব নয়, তা সরকার ভালো করেই জানে। আর জানে বলেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একদিকে আলোচনার কথা বলেন, অন্যদিকে সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা মেনেই নিতে হয় তাহলে সংলাপের প্রয়োজন কোথায়? এর মধ্যদিয়ে স্পষ্ট যে, সরকার তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বা নির্দলীয় কোনো সরকার পদ্ধতি মেনে নেবে না। আর এর মাধ্যমেই বোঝা যায়, সংলাপের ব্যাপারে সরকার কতোটা আন্তরিক। ফলে বিদ্যমান যে সঙ্কট তা অদূর ভবিষ্যতে আরো তীব্রতর হবে, গভীর থেকে হবে গভীরতর।

আর এটা সবারই জানা, নির্বাচন যতো এগিয়ে আসবে, ততোই সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির আরো অবনতি হবে। দেখা দেবে নিত্যনতুন উপসর্গ এবং রোগবালাই। যার এ পর্যায়ের উদাহরণ ৫ মে’র রক্তক্ষয়ী ঘটনা এবং এতে অসংখ্য মানুষের হতাহত হওয়া ও সম্পদহানি। যদি তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে ক্ষমতাসীনরা কূটকৌশলের আশ্রয় না নিতো এবং যদি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের সামান্য নিশানাটুকু দেখা যেতো, তাহলে একের পর এক রাজনৈতিক সহিংস পরিস্থিতির জন্ম হতো না। দেখা দিত না কোনো রাজনৈতিক উপসর্গ বা রোগবালাই। বিগত কয়েক মাসে সাংঘর্ষিক রাজনীতির কারণে কয়েকশ মানুষকে জীবনও দিতে হতো না। এখনো যদি সামান্য নিশ্চয়তা দেয়া হয় যে, আগামী নির্বাচনটি দলীয় সরকারের অধীনে নয়, নির্দলীয়ভাবে অনুষ্ঠিত হবে তাহলে পরিস্থিতির উন্নয়ন ঘটতে বাধ্য।

নির্বাচনের আর মাত্র কয়েক মাস বাকি। স্বাভাবিক নিয়মে চললে, এখন দেশটি নির্বাচনমুখী থাকার কথা ছিল। কিন্তু সামগ্রিক পরিস্থিতি এখন সাংঘর্ষিক। আর এমন অবস্থা সামান্য কিছুদিন চললে, পরিস্থিতি কোনো নিকশ কালো অন্ধাকারাচ্ছন্ন পথে যাবে তা কেউ বলতে পারছেন না। হলফ করে বলা যায়, ঘটনার স্রষ্টা সরকারও কোনো সদুত্তর দিতে পারবে না। কারণ ড. ভিক্টর ফ্রাঙ্কেনস্টাইনের সে দানবীয় চরিত্র স্রষ্টাকেই বিনাশ করে।।

১টি মন্তব্য

  1. Frankenstein er upomata darun hoyeche. Thik etai hoyeche ei deshe. Kintu tar mashul pohate hocche amader.