Home » অর্থনীতি » স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কৌতুক এবং পদার্থ বিদ্যার নতুন তত্ত্ব!

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কৌতুক এবং পদার্থ বিদ্যার নতুন তত্ত্ব!

হায়দার আকবর খান রনো

garments collapsed.jpg 2এরই নাম পুঁজিবাদ। কতো বর্বর, কতো নির্মম, কতো নিষ্ঠুর। আর এই হল আমাদের দেশের সরকারের মন্ত্রীরা। মানুষের মৃত্যু, অঙ্গহানি, দুর্বিষহ বিভীষিকা, কান্না আর বেদনা যাদেরকে সামান্যতম স্পর্শ করে না, যাদের মাথার মধ্যে সারাক্ষণ ঘোরে রাজনীতির প্যাচ। হ্যা, আমি বর্তমান সরকারের মন্ত্রীদের কথা বলছি। সাভারের রানা প্লাজায় মর্মান্তিক ট্র্যাজেডির পর প্রথমদিকে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর আচরণে মনে হয়নি যে, তিনি ট্র্যাজেডির গভীরতা বুঝতে পেরেছেন। তবে তিনি খুব শিগগিরই ঘটনার গভীরতা বুঝতে পেরেছেন বলে মনে হয়। শিগগিরই ঘটনার গভীরতা বুঝতে পেরেছেন বিরোধী দলীয় নেত্রী, যিনি দ্রুত হরতাল প্রত্যাহার করেছেন। কিন্তু পিএইচডি ধারী মন্ত্রীদের সেই বোধটুকুও নেই। মানুষের প্রতি দরদ কতোটুকু আছে, সেটাও সন্দেহের বিষয়। বিশেষ করে আমি বলছি, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীরের কথা। সারাজীবন আমলাগিরি যারা করেছেন, মানুষের প্রতি দরদ তাদের একটু কমই থাকে। কারণ, আমলাতান্ত্রিকতার মধ্যে থাকে জনসাধারণ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকার প্রবণতা। অন্যথায় মানুষের কান্নায় যখন বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে, ঠিক তখনই স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর বিরোধী পক্ষকে এক হাত নেয়ার আকাঙ্খায় এমন একটি উক্তি করলেন। বিরোধী হরতালকারীদের ধাক্কাধাক্কির কারণে নাকি রানা প্লাজাটি ধসে পড়েছিল। অতএব সাভারের এতো মানুষের মৃত্যুর জন্য কে দায়ী? স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলছেন, অবশ্যই বিরোধী দল, যাদের ধাক্কাধাক্কির কারণে ভবনটি ভেঙে পড়েছিল।

হাসবো না কাঁদবো? না হাসি এখন আর আসে না। যে মর্মান্তিক দৃশ্য দেখেছি এবং কয়েকদিন ধরে বিভিন্ন টিভি চ্যানেলে যা দেখা গেছে, তাতে সকলের মতো আমারও হাসি আর নেই। সামান্যতম মানতাবোধ যার আছে, সে স্বম্ভিত না হয়ে পারে না। অথচ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঠিক তেমনই সময়ে হাসির খোরাক যোগান দিলেন। বললেন, বিরোধী দলের ধাক্কাধাক্কিতে এতো বড় ভবনটি ভেঙে গুড়িয়ে গেল। ভদ্রলোককে চৌকস বলেই জানতাম। পাকিস্তান আমলের সিএসপি। তারপর সচিব ছিলেন। তারপরও আবার জিয়াউর রহমানের ‘খালকাটা বিপ্লবে’ ভূমিকা রেখেছিলেন। এই বিষয়ের ওপর ডক্টরেক্ট ডিগ্রিও পেয়েছেন। ব্যক্তিগতভাবেও আমি তাকে চিনি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে আমাদের উপর ক্লাসে পড়তেন। ১৯৯৬ সালে বিএনপি আমলে আমলা বিদ্রোহে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। সেই কারণে পরবর্তীতে তার কপাল খুলে গেল। আওয়ামী লীগ সরকারের ছোট মন্ত্রী, বড় মন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী পর্যন্ত হয়েছেন। আসলে মাথার মধ্যে শুধুই যদি ঘোরে কিভাবে বিরোধী দলকে ঘায়েল করা যায়, তাহলে অন্য কোন ভালো চিন্তার জন্য স্থান সঙ্কুচিত হয়ে আসে। যেই শুনলেন ভবন ধসে পড়েছে, তখনি ভাবলেন, এই তো মোক্ষম সুযোগ, হরতালকারীদের অভিযুক্ত করা যাবে। তিনি ভাবতেও পারেননি, এমন কথার দ্বারা নিজেকে কতোটা খেলো করে তুলছেন। তাই একবার নয়, একাধিকবার তিনি একই কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন।

এখন ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীরকে নিয়ে জোকস (কৌতুক) রচনা শুরু হয়েছে। জানতে পারলাম যে, কি^ছু তরুণ ফেসবুকের মাধ্যমে তার জন্য নোবেল পুরস্কার প্রস্তাব করেছেন। ব্যঙ্গ করে তারা বলেছেন, হরতালকারীদের ধাক্কাধাক্কিতে অতো বড় ভবনটি যদি ধসে, তাহলে নিশ্চিতভাবেই পদার্থ বিজ্ঞানে নতুন থিওরি সংযোজিত হবে, যার উদ্ভাবক স্বয়ং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মহিউদ্দিন খান আলমগীর। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এমন হাস্যকর কথাবার্তায় সরকারি দলের অন্যান্য কর্মকর্তারাও বিব্রতবোধ করেছেন। তারা তাকে সংযত হয়ে কথা বলতে বলছেন। তবু হুশ হয়নি স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর। এরপরও তিনি একই কথা বলেছেন একাধিকবার।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মাত্রই বোধ হয় একটু আবোল তাবোল বকেন। এর আগে আরেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনও একই রকমভাবে জনগনের জন্য হাসির খোরাক যুগিয়েছিলেন। পুলিশের মন্ত্রী হিসাবে তিনি একবার জনগণকে উপদেশ দিয়েছিলেন, ঈদের সময় ঢাকা ছেড়ে গ্রামে যাবার সময় তারা যেন বাড়িতে তালা লাগিয়ে যায়। এই কথা সেই সময় বেশ কৌতুক রসের জন্ম দিয়েছিল। মনে পড়ে, তখন অধ্যাপক বি চৌধুরী বলেছিলেন, ‘সবার আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর মুখে তালা লাগানো দরকার।’ বিগত বিএনপি সরকারের আমলে দুর্ঘটনায় মৃত্যু প্রসঙ্গে তখনকার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলতাফ হোসেন চৌধুরী উচ্চারণ করেছিলেন, তার সেই স্মরণীয় উক্তি ‘আল্লাহর মাল আল্লায় নিয়ে গেছে।’

এই সরকার, ওই সরকার, বর্তমানের ও অতীতের মন্ত্রীদের এই ধরনের ‘স্মরণীয়’ বাণীসমূহের উদ্ধৃতি বাড়িয়ে লাভ নেই। কারণ তা আমাদের শাসকবর্গের মান সম্পর্কে যে ধারণা তৈরি হবে, সেটা মোটেই সুখকর নয়।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী চেয়েছিলেন, ভবন ধসের ঘটনাকে বিরোধীদের কাজ বলে চালিয়ে দিতে। কিন্তু যে তথ্য বেরিয়ে আসছে তাতে বরং সরকারি দলই ধরা খেয়ে যায়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বোধহয় এতটা ভেবে দেখেননি। কারণ যিনি ভবনের মালিক, তিনি অবৈধভাবে নির্মাণ করেছেন। এ তথ্য এখন বেরিয়ে আসছে। কয়েকজন প্রখ্যাত বিশেষজ্ঞ ও প্রকৌশলী এটাকে গণহত্যা বলে অভিহিত করেছেন। তাহলে এই হত্যার জন্য দায়ী ভবনের মালিক। তাকে প্রশ্রয় দিয়েছেন স্থানীয় সংসদ সদস্য। ভবনের মালিক রানা যে স্থানীয় আওয়ামী লীগের কর্মকর্তা এটা বোধহয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর জানা ছিল না। তাই এমন বেফাস কথা তিনি বলতে পেরেছেন। অথবা জেনেশুনেই নিজ দলের লোকদের বাঁচানোর জন্য এমন কথা উচ্চারণ করেছিলেন।

অবশ্য জনগনের ক্রোধ ও উত্তেজনার চাপের ফলে সরকার নিজ দলের হলেও সেই রানাকে গ্রেফতার করেছে। খুব ভালো হতো যদি সরকার এর আগে তাজরিনের মালিককে গ্রেফতার করতো। তাজরিনের মালিককে গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক সর্বোচ্চ শাস্তি দিলে হয়তো এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হতো না। তাজরিনের মালিক যে শ্রমিকদের আগুনে পুড়িয়ে মারলো, অগ্নিকাণ্ডের সময়ও বাইরে বের হওয়ার গেট বন্ধ রাখলো, এর জন্য তো তার শাস্তি হওয়া উচিত ছিল, ১২৪ জন মানুষকে হত্যার অপরাধে। না সরকার তা করেনি। কারণ গার্মেন্টসের মালিকের স্বার্থের পাহারাদার এই সরকার। বিরোধী দলও তাই। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয়ই যে ধনীক শ্রেণীর দল, গার্মেন্টস মালিকের প্রতিনিধি, শ্রমিক বিদ্বেষী, তা বার বার প্রমাণিত হয়েছে।

রানা প্লাজায় ফাটল ধরেছিল। ভবন ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছিল। ব্যাংক কর্মচারীদের আগেই ছুটি দেয়া হয়েছিল। কারণ তারা মধ্যবিত্ত। কিন্তু গার্মেন্টস কারখানার শ্রমিকদের জোর করে কাজে ঢোকানো হয়েছিল। কারণ তারা শ্রমিক। শ্রমিক মরলে কি আসে যায়। পৃথিবীর মধ্যে বাংলাদেশে শ্রমশক্তি সবচেয়ে সস্তা। তার চেয়েও সস্তা শ্রমিকের জীবনের দাম। শ্রমিকদের লাঠি দেখিয়ে জোর করে কাজে ঢোকানো হয়েছিল। ঘোষণা করা হয়েছিল, সেই দিন কাজে না গেলে তিনদিনের বেতন কাটা যাবে। এমন অবৈধ ঘোষণা দিয়ে জোর করে ডেকে এনে যাদের হত্যা করা হলো, তাদের সেই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী গার্মেন্টস মালিকরাই। তাদের কাছে একদিনের মুনাফা শ্রমিকের জীবনের চেয়ে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। মুনাফাই এদের আরাধ্য দেবতা। মুনাফার জন্য মানুষ খুন করতে এদের বাধে না। তাজরিনের হত্যাকাণ্ড ও সাভারের হত্যাকাণ্ড তা আরেকবার প্রমাণ করলো। মুনাফালোভী পুজিপতিদের সম্পর্কে দেড়শ বছর আগে কার্ল মার্কস যা বলে গিয়েছিলেন তা এখনো প্রণিধানযোগ্য।

যথেষ্ট মুনাফা পেলে পুঁজি খুবই তেজী হয়ে ওঠে। ১০ শতাংশ মুনাফা নিশ্চিত জানলে সে যে কোন জায়গায় নিজেকে নিয়োজিত করবে, ২০ শতাংশ নিশ্চিত জানলে নিয়োগের আগ্রহ প্রবলতর রূপে দেখা দেবে। ৫০ শতাংশ সুনিশ্চিত হলে দেখা দেবে স্পর্ধা, আর মুনাফা যদি শতকরা ১০০ ভাগে পৌছানোর নিশ্চয়তা থাকে, তবে তার জন্য মানব সমাজের সমস্ত আইনকে পদদলিত করতে সে রাজি। আর যদি সে বোঝে মুনাফা ৩০০ শতাংশে পৌছাবে তবে এমন কোন অপরাধ নেই যা করতে সে দ্বিধান্বিত হবে। এমন কোন ঝুকি নেই যা সে নিতে পারবে না। এমনকি যদি তার ফলে পুজি প্রভূর ফাঁসি হয় তাতেও সে রাজি। (পুজি : প্রথম খন্ড)

বাংলাদেশের গার্মেন্টস শিল্পে মুনাফার হার খুব বেশি। তাই মালিকরা এখানে খুবই উদ্ধত। আগুনে পুড়িয়ে মারতে অথবা ভবন ধসের আশঙ্কা জানা সত্ত্বেও জোর করে কাজে ঢুকিয়ে খুন করতে তাদের বাধে না। উপরন্তু, এই নব্য ধনীক গোষ্ঠী এখনো আধুনিক পুজিপতি হয়ে ওঠেনি। তাই তারা ট্রেড ইউনিয়নও মানতে চায় না।

সাভারের ঘটনা একই সঙ্গে সমাজের দুই বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছে। একদিকে দেখেছি সাধারণ মানুষের কী অসাধারণ মানবিক চরিত্র, মমত্ববোধ। অন্যদিকে দেখেছি, কী নির্মম আচরণ, মানুষ খুন করতে যাদের বাধে না। আরও দেখেছি, . মহিউদ্দিন খান আলমগীরের মতো চরম দায়িত্বজ্ঞানহীন মন্ত্রীদের, গরিব মানুষের মৃত্যু যাদেরকে স্পর্শ করে না।

আমরা আরও কিছুদিন অপেক্ষা করবো। দেখতে চাই, সরকার তাজরিনের মালিক ও রানা প্লাজায় গার্মেন্টস কারখানার মালিকদের বিরুদ্ধে কি ব্যবস্থা নেন। একই সঙ্গে দেখতে চাই এই ব্যাপারে বিএনপির মতো বিরোধী দল কতোটা সোচ্চার ও তৎপর হয়। উভয়ের দেশপ্রেমের পরীক্ষা হবে এই রকম সুনির্দিষ্ট ঘটনার ভেতর দিয়েই।।