Home » অর্থনীতি » হারিয়ে গেছে হলমার্ক, বিসমিল্লাহসহ সব কেলেঙ্কারি

হারিয়ে গেছে হলমার্ক, বিসমিল্লাহসহ সব কেলেঙ্কারি

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

unstable-economy-1-রাজনৈতিক সহিংসতায় আর্থিক খাতে ঘটে যাওয়া কেলেঙ্কারি চাপা পড়ে গেছে। হলমার্ক ও বিসমিল্লাহ কেলেঙ্কারি এরই মধ্যে হারিয়ে গেছে সংবাদপত্রের পাতা থেকে। ডেসটিনিসহ অন্যান্য এমএলএমের অর্থ হাতিয়ে নেয়ার ঘটনাও সামনে আসছে আর। তদন্তে দুদকেরে অগ্রগতি সম্পর্কে খবর মিলছে না। সব যেন ঝিমিয়ে পড়ছে। এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রী হলমার্কের এমডিকে মুক্তি ও অর্থ দিয়ে কারখানা চালুর কথা বলে সমালোচিতও হয়েছিলেন। হলমার্কের ব্যাপারে নমনীয় হওয়ার কারণ হিসেবে ৩১ বছর আগের কিছু ঋণখেলাপির ব্যাপারে তৎকালীন সরকারের উদাহরণ সামনে আনেন অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘১৯৮২ সালে ১০ জন বড় ঋণখেলাপি ছিলেন। একেকজন পয়সা নিয়েছিলেন সাত থেকে আটটি ব্যাংক থেকে। কিন্তু তখন তা ফেরত দেওয়ার অবস্থা ছিল না তাঁদের। ঋণখেলাপিদের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সম্পদ ও দায় হিসাব করে একটি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। হলমার্কের ক্ষেত্রে এ রকম কিছু একটা হবে।’ ‘হলমার্ক যে টাকা নিয়ে গেছে, তা জনগণের টাকা। এই টাকা উদ্ধার করতে হবে। উদ্ধারের জন্য দরকার কারখানা চালু। আর সে জন্যই ওদের দরকার আরও ঋণ।’ হলমার্কে প্রশাসক নিয়োগের কথা উঠেছিলএমন প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘প্রশাসক নিয়োগ হতে পারে। আমি অবশ্য প্রশাসক নিয়োগের কথা বলিনি।’ এভাবেই অতীতে ঋণখেলাপীদের রক্ষা করা হয়েছে। সরকার এবার বাঁচাতে চাইছে হলমার্ককেও।

অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘তাঁরা জামিনে বের হয়ে আসতে পারেন। হলমার্কের শ্রমিক ও কর্মকর্তারা আমার কাছে দরখাস্ত করেছে। আর সরকার কেন জামিন দেবে? জামিন দেবে আদালত। আদালত সব সময়ই যৌক্তিক আচরণ করেন। হলমার্ক যে টাকা নিয়ে গেছে, তা জনগণের টাকা। এই টাকা উদ্ধারে সরকার উদ্যোগ ও ব্যবস্থা নিচ্ছেজনগণের কাছে এই বার্তা পৌঁছাবে।’ শুরু থেকেই হলমার্কের ব্যাপারে অর্থমন্ত্রী খুব একটা গুরুত্ব দেননি বরং তিনি বলেছিলেন, চার হাজার কোটি টাকা বড় কিছু না। তাতে জনগণ উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে।

সমঝোতার উদ্যোগ: কেলেঙ্কারি উদ্ঘাটনের পরপরই হলমার্কের সঙ্গে সোনালী ব্যাংক ও বাংলাদেশ ব্যাংককে নিয়ে একটা সমঝোতা চেয়েছিল অর্থ মন্ত্রণালয়। এই প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির মাধ্যমে হাতিয়ে নেওয়া অর্থের দায়দায়িত্ব হলমার্ককে দিয়ে স্বীকার করিয়ে নিয়ে ১৫২০ বছরের জন্য তা পুনঃ তফসিলের প্রচেষ্টা ছিল। এ নিয়ে এক দফা বৈঠকও হয়। তবে বাংলাদেশ ব্যাংক কৌশল করে হলমার্ক কেলেঙ্কারির তথ্যউপাত্ত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) কাছে পাঠিয়ে দেয়। ফলে তখন সেই উদ্যোগ আর সফল হয়নি।

আবার হলমার্ক কেলেঙ্কারি উদ্ঘাটনের পরও উদ্যোগ ছিল এই ঋণকে ২০ বছরের পুনঃ তফসিল করে দেওয়ার। প্রথম দিকে সোনালী ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে সরকারের সঙ্গে দেনদরবার করে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে প্রস্তাব পাঠানো হয়। এমনকি সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিরা বাংলাদেশ ব্যাংককে রাজি করানোর চেষ্টাও নেন। গত ১৪ ফেব্রুয়ারি হলমার্কের চেয়ারম্যান জেসমিন ইসলাম জামিনে বের হয়ে এসে ২০ বছরে পুনঃ তফসিলের প্রস্তাব পাঠান অর্থমন্ত্রী, গভর্নর, দুদকের চেয়ারম্যান, ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব, সোনালী ব্যাংকের এমডি ও রূপসী বাংলা শাখার ব্যবস্থাপক এবং দুদকের উপপরিচালকের কাছে।

এর ধারাবাহিকতায় ঢাকা থেকে বেশ কিছু সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমকে সাভারে নিয়ে গিয়ে কারখানা পরিদর্শন করানো হয়। বলা হয়, হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ ও কর্মসংস্থান রক্ষা করতে হলমার্ক চালু করতে হবে। অন্যদিকে, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে হলমার্কের শ্রমিক পরিবার রক্ষা এবং শিল্পকে ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচাতে ১১ মার্চ আমমোক্তারের মাধ্যমে আবেদন করে হলমার্ক কর্তৃপক্ষ, যার অনুলিপি দেওয়া হয় অর্থমন্ত্রী, গভর্নর, দুদকের চেয়ারম্যান, সোনালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান, ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) ও দুদকের একজন উপপরিচালকের কাছে।

হলমার্কের সম্পদের হিসাব: সোনালী ব্যাংকে হলমার্কের জামানত হিসেবে দেওয়া জমির আর্থিক মূল্যমান নিরূপণ করেছে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ। পৃথক একাধিক জমি জরিপকারী প্রতিষ্ঠান দিয়ে ব্যাংক এই মূল্যমান নিরূপণ করে। এতে দেখা যায়, হলমার্কে দুই হাজার ৬৮১ কোটি ৪৮ লাখ টাকার জালিয়াতির ঋণের বিপরীতে ব্যাংকের কাছে গচ্ছিত জমি, ভবন ও যন্ত্রপাতি পরিমাণের আর্থিক মূল্য হচ্ছে ৩৮৯ কোটি ৬১ লাখ টাকা। আর সম্প্রতি হলমার্ক ব্যাংকের কাছে কিছু জমি, ভবন ও যন্ত্রপাতি জামানত হিসেবে দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছে। ব্যাংকের জরিপকারী প্রতিষ্ঠান হিসাব করে বলেছে, এর আর্থিক মূল্যমান হবে ৭৫৬ কোটি ৬১ লাখ টাকা।

১৪ মার্চ অর্থ মন্ত্রণালয়সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে হলমার্ক কেলেঙ্কারি নিয়ে গঠিত উপকমিটি তাদের প্রতিবেদন উপস্থাপন করে। ওই বৈঠকে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিনিধি বলেছিলেন যে, হলমার্ক কেলেঙ্কারির অর্থ কোনোভাবেই আদায় হওয়ার সম্ভাবনা নেই। নামমাত্র জামানত রয়েছে এই বিপুল জালিয়াতির বিপরীতে। ফলে সরকারের উচিত হবে সোনালী ব্যাংকের পরিস্থিতি বিবেচনা করে মূলধন জোগান দেওয়া। অথচ সেই সুপারিশ না মেনে পাল্টা ঋণ দেওয়ার পরিকল্পনা করছে সরকার।

দুদক বলছে, হলমার্ক গ্রুপের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনার তদন্ত প্রায় সম্পন্ন করেছে তারা। বাংলাদেশের ব্যাংকিং ইতিহাসে ঋণ জালিয়াতির সেরা রেকর্ড হলমার্ক গ্রুপের বিরুদ্ধে। পাঁচটি বিদেশী, সাতটি সরকারি ও ৩০ বেসরকারিসহ ৪১টি ব্যাংকের ৯৪টি শাখা থেকে হলমার্ক গ্রুপের হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের ঘটনার তদন্ত প্রায় সম্পন্ন করেছে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক)। গত ৪ অক্টোবর ২৭ জনকে আসামি করে রমনা থানায় ১১টি মামলা করে দুদক। হলমার্ক গ্রুপের ঋণ জালিয়াতির মাধ্যমে সোনালী ব্যাংকের রূপসী বাংলা শাখা থেকে তিন হাজার ৬০৬ কোটি ৪৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেয়। এর মধ্যে মোট নগদ (ফান্ডেড) এক হাজার ৯১৮ কোটি ৮৭ লাখ ১৭ হাজার ১৯২ টাকা। আর বিভিন্ন ব্যাংকিং উপকরণের বিপরীতে বা ননফান্ডেড এক হাজার ৫০৬ কোটি ছয় লাখ টাকা। আর ফান্ডেড এক হাজার ৫৬৮ কোটি ৪৯ লাখ টাকা ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে গত ১ জানুয়ারি হলমার্কের সহযোগী অপর পাঁচ প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ফান্ডেড ৩৫০ কোটি ৩৭ লাখ টাকা ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে ২৬টি মামলা করে দুদক।

এদিকে, বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিদর্শন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সরকারিবেসরকারি পর্যায়ে বিভিন্ন পক্ষের যোগসাজশে বিপুল পরিমাণ অর্থ হাতিয়ে নিয়েছে বিসমিল্লাহ টাওয়েলস, মেসার্স আলফা কম্পোজিট ও হিন্দুলওয়ালি টাওয়েলস। এসব প্রতিষ্ঠানের নামে খাজা সোলায়মান জনতা ব্যাংক থেকে ৩৯২ কোটি ৫৭ লাখ, প্রাইম ব্যাংকের ৩০৬ কোটি ২২ লাখ, যমুনা ব্যাংকের ১৬৩ কোটি ৭৯ লাখ, শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকের ১৪৮ কোটি ৭৯ লাখ, প্রিমিয়ার ব্যাংকের ৬২ কোটি ৯৭ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। এ বিষয়ে দৈনিক আমার দেশএ গত ১৭ জানুয়ারি ‘ব্যাংকিং সেক্টরের আরেক লুটেরা খাজা সোলায়মান’ ও ২৭ জানুয়ারি ‘প্রিমিয়ার ব্যাংক থেকে ১৯৩ কোটি টাকা আত্মসাত’ শীর্ষক সংবাদ প্রকাশ পায়। এ সংবাদ প্রকাশের পর জানুয়ারির শেষ সপ্তাহে বিসমিল্লাহ গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান আলফা কম্পোজিটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খাজা সোলায়মান আনোয়ার চৌধুরী, তার স্ত্রী ও আলফা কম্পোজিটের চেয়ারম্যান নওরীন হাসিব এবং আলফা কম্পোজিটের পরিচালক মো. শফিকুল আলম চৌধুরী লাপাত্তা হন।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পর্যবেক্ষণে আরও দেখা যায়, আলফা কম্পোজিট টাওয়েলস এবং হামীম টেক্সটাইল মিলসের নামে প্রিমিয়ার ব্যাংকের মতিঝিল শাখায় যে অ্যাকাউন্ট খোলা হয়েছে, তাতে পরিচয়দানকারীর কোনো বর্ণনা ছিল না। শাখা ব্যবস্থাপক স্বপ্রণোদিত হয়েই দুটি অ্যাকাউন্ট খুলেছেন; যার অল্পদিনের মধ্যে ২০১১ সালের ১৩ নভেম্বর আলফা কম্পোজিটের অনুকূলে ২২ কোটি টাকা ঋণসীমা প্রিমিয়ার ব্যাংকের পর্ষদ অনুমোদন করে। তবে ঋণ প্রস্তাব বিবেচনার সময় বিসমিল্লাহ গ্রুপের প্রাইম ব্যাংকের মতিঝিল শাখা, যমুনা ব্যাংকের দিলকুশা শাখা, শাহজালাল ব্যাংকের ইস্কাটন শাখা, জনতা ব্যাংকের মগবাজার ও জনতা ভবন করপোরেট শাখা হতে বড় অঙ্কের ঋণ সুবিধা গ্রহণের তথ্যগুলো যথাযথভাবে বিশ্লেষণ করা হয়নি। তাছাড়া ঋণ প্রস্তাবে বিসমিল্লাহ গ্রুপের ২০১০ সালে ৫৪৭ কোটি ৯৭ লাখ টাকা এবং ২০১১ সালে ৬৯৬ কোটি ৪ লাখ টাকা রফতানি পারফরম্যান্স দেখানো হলেও কোম্পানির এত সক্ষমতা রয়েছে কিনা, তা যাচাইবাছাই করা হয়নি।।