Home » বিশেষ নিবন্ধ » অস্তিত্ব সঙ্কটে হেফাজত

অস্তিত্ব সঙ্কটে হেফাজত

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

hefazatযৌথ বাহিনীর অভিযানের মুখে মতিঝিলের শাপলা চত্বর ছেড়ে যাওয়ার পর অনেকটা অস্তিত্বের সংকটে পড়েছে ব্যাপক আলোচিতসমালোচিত সংগঠন হেফাজতে ইসলাম। শাপলা চত্বর থেকে হটিয়ে দেয়ার পরে সংগঠনের নেতারা আত্মগোপনে রয়েছেন। নেতাদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ থাকলেও তারা একসঙ্গে কোথাও বসতে পারছেন না। গ্রেফতার আতঙ্কে মিডিয়ার সামনেও কেউ মুখ খুলছেন না।

১৩ দফা দাবি আদায়ের লক্ষে গত ৫ মে ঢাকা অবরোধ করে সংগঠনটি। অবরোধ শেষে মতিঝিলের শাপলা চত্বরে সমাবেশে অংশ নেয়ার পর অনির্দিষ্টকালের জন্য অবস্থানের ঘোষণা দেয় হেফাজত। তাদের কর্মসূচিকে ঘিরে ওইদিন পল্টন, মতিঝিল ও গুলিস্তান এলাকায় ব্যাপক ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। হেফাজত দাবি করছে, এই তাণ্ডবের সঙ্গে তাদের সম্পৃক্ততা নেই। তবে সরকার এসব ঘটনায় হেফাজতকেই দায়ী করছে। এজন্য ওই রাতেই প্রশাসন অরাজকতা নিরসন ও রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার ঘোষণা দিয়ে শাপলা চত্বরে যৌথ বাহিনীর অভিযান চালায়।

এ ঘটনায় হেফাজত তাদের হাজার হাজার কর্মীসমর্থক নিহত হয়েছে বলে দাবি করলেও সরকার একে ‘স্রেফ গুজব’ বলছে। দেশীয় মিডিয়ায় হেফাজতের কর্মসূচি ঘিরে তাণ্ডবের প্রসঙ্গটি বড় করে এলেও ওই রাতের অভিযানে হতাহতের প্রসঙ্গটি গুরুত্ব পায়নি। তবে বিদেশী মিডিয়ায় কিছুটা গুরুত্ব পেয়েছে। বৃটেনের প্রভাবশালী পত্রিকা দ্য ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে হত্যাকাণ্ড চলছে কিন্তু মিডিয়ার ভূমিকা নতজানু। এছাড়া হিউমেন রাইটস ওয়াচসহ কয়েকটি মানবাধিকার সংস্থাও এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত দাবি করেছে। প্রধান বিরোধী দল বিএনপিও এ ঘটনাকে ‘গণহত্যা’ আখ্যায়িত করে আন্তর্জাতিক তদন্ত দাবি করেছে। প্রয়োজনে জাতিসংঘে যাবে বলেও হুমকি দিয়েছে দলটি।

ঘটনার পরদিন পুলিশ বাদি হয়ে ঢাকাসহ সারাদেশে প্রায় ৩১টি মামলা দায়ের করে। এতে হেফাজতে ইসলামের ঢাকা ও চট্টগ্রামের শীর্ষস্থানীয় ১৭৫ জন নেতা ছাড়াও দেশের বিভিন্ন জেলার লক্ষাধিক নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়। ইতিমধ্যে হেফাজতের মহাসচিব জুনায়েদ বাবুনগরীকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নয় দিনের রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। গ্রেফতার করা হয়েছে আরো অনেক নেতাকে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর অবস্থানের কারণে আত্মগোপনে চলে গেছে হেফাজতে ইসলামের শীর্ষ নেতারা। তাদের কাউকে এখন মোবাইলেও পাওয়া যাচ্ছে না। সেই সঙ্গে ছত্রভঙ্গ হয়ে গেছে সংগঠনটির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, মামলার আসামি হওয়া হেফাজত নেতাদের প্রায় সবাই বিভিন্ন কওমি মাদরাসার শিক্ষক। কওমি মাদরাসায় অতীতে এ ধরণের মামলামোকদ্দমায় জড়ানো বা আইনি মোকাবিলার অভিজ্ঞতা না থাকায় মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন তারা। তাছাড়া কওমি মাদরাসাগুলোর শিক্ষাবর্ষ শেষ পর্যায়ে। কিছুদিনের মধ্যেই কয়েকটি স্তরের কেন্দ্রীয় পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হবে। এ অবস্থায় বিপর্যস্ত প্রতিকূল পরিস্থিতিতে আপাতত সংঘটিত হওয়ার চেষ্টা না করে, এই মুহূর্তে মামলার আইনি বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হচ্ছে। কিছু দিন সময় নিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেয়ার পর দাবি আদায়ে আবারো সক্রিয় হওয়ার কথা ভাবছে তারা।

সূত্র জানায়, ঘটনার পরপরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে নির্দেশ দেয়া হয়েছিল হেফাজতের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত নেতাদের গ্রেফতার করতে। কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থার রিপোর্টে জানানো হয়, এই মুহূর্তে গ্রেফতার করলে পরিস্থিতি সরকারের অনুকূলে থাকবে না। পরে সরকার ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। সরকারপন্থী কয়েকজন আলেমকে হেফাজতের সঙ্গে লিয়াজোঁর দায়িত্ব দেয়া হয়। তারা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠক করে হেফাজত নেতাদের আশ্বস্ত করেন, মাদরাসাগুলোতে গ্রেফতার আতঙ্ক চালানো হবে না। তবে শর্ত দেয়া হয়, হেফাজত নেতাদের মুখ বন্ধ রাখতে হবে। যারা মুখ খুলবেন তাদেরই গ্রেফতার করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ওই বৈঠকে উপস্থিত একজন আলেম জানান, বৈঠকে বসেই হাটহাজারীতে ফোন করা হয়। আলোচনা করে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত হয়, রোববারের হরতাল প্রত্যাহার করবে হেফাজত। মাদরাসাগুলোর পড়াশুনার পরিবেশ ফিরে আনতে এবং তাদের মধ্যে সৃষ্ট আতঙ্ক দূর করতেই হেফাজত এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।

এদিকে, হেফাজতের নামে বেশ কিছু মামলা হলেও কোনো মামলায় আসামি করা হয়নি সংগঠনটির প্রধান আল্লামা শফীকে। জানা যায়, আল্লামা শফীর গ্রেফতার সরকারের জন্য বিপজ্জনক ছিল বলে আশঙ্কা করা হচ্ছিল। তাদের আশঙ্কা ছিল, আল্লামা শফীর গ্রেফতার ইস্যুতে নতুন করে সংঘর্ষ, তাণ্ডব ও প্রাণহানির ঘটনা ঘটতো। চট্টগ্রামসহ সারা দেশের বিভিন্ন স্পর্শকাতর জেলা শহরে নাজুক পরিস্থিতি তৈরি করতো বিশেষ মহল। এ কারণে আল্লামা শফীকে গ্রেফতার না করে চট্টগামে পাঠিয়ে দেয়া হয়। তবে প্রশাসনের চাপের মুখে তিনি ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের হাটহাজারী মাদরাসায় ফেরার পর বাইরের কারো সঙ্গে তেমন কথাবার্তা বলছেন না। গত মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করে রোববার হরতালের কর্মসূচি ঘোষণা করলেও সেখানে উপস্থিত হননি আল্লামা শফী। পরে সেই হরতালও স্থগিত করা হয়।

সূত্র জানায়, গত ৬ মে লালবাগ মাদরাসা ঘেরাও করে দীর্ঘ সময় মাদরাসার ভেতর পুলিশের অবস্থান, আল্লামা শফী বা হেফাজতের কেন্দ্রীয় ও মহানগরী নেতাদের সংবাদ সম্মেলন করতে না দেয়ার মধ্য দিয়ে, সরকার হেফাজত নেতাদের ওপর চাপ সৃষ্টির কৌশল প্রয়োগ শুরু করে। পুলিশ মাদরাসায় প্রবেশের সময় সেখানে হেফাজতের কেন্দ্রীয় ও মহানগরীর অনেক নেতা উপস্থিত ছিলেন। পরে পুলিশের মারমুখো আচরণ দেখে অনেকে সটকে পড়েন। পুলিশ আল্লামা শফীর রুমে দীর্ঘ সময় অবস্থান করে তাকে চট্টগ্রাম যেতে বাধ্য করে। অন্যদিকে মওলানা বাবুনগরী তার সঙ্গে চট্টগ্রাম যেতে চাইলে তাকে যেতে দেয়া হয়নি সন্ধ্যায় তাকে গ্রেফতার করে পুলিশ।

এদিকে, এই মুহূর্তে হেফাজত যেন ঘুরে দাঁড়াতে না পারে সেজন্য সংগঠনের নেতাকর্মীদের চাপে রাখার কৌশল গ্রহণ করেছে সরকার। গত ৭ মে সন্ধ্যায় জাতীয় পার্টির সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ হাটহাজারী মাদরাসায় গিয়ে আল্লামা শফীর সঙ্গে একান্তে দীর্ঘ সময় কথা বলেন। মূলত কঠোর কোনো কর্মসূচি যাতে না দেয়া হয় সে জন্য আল্লামা শফীকে বিভিন্নভাবে বোঝানোর চেষ্টা করেন। আল্লামা শফীকে গ্রেফতার না করা, তাকে মামলায় না জড়ানোর বিষয়গুলো স্মরণ করিয়ে দিয়ে হেফাজতকে আন্দোলন থেকে দূরে রাখতে চাইছে সরকার।

বিএনপি ও ১৮ দলীয় জোটের সঙ্গে হেফাজতের যোগসূত্রতাও পর্যবেক্ষণ করছে সরকার। সূত্র মতে, হেফাজতের নেতারা ১৮ দলের প্রতি ঝুঁকে পড়লেই তাদের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে যাবে সরকার। এতগুলো মামলায় অজ্ঞাত হাজার হাজার আসামি রাখা হয়েছে হেফাজতকে চাপে রাখতেই। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এই মুহূর্তে হেফাজত জোরালোভাবে সমর্থন করবে না।

অস্তিত্বের মুখে পড়া সংগঠনটি বিএনপিসহ ১৮ দলের প্রতি কিছুটা ক্ষুব্ধ বলেও জানা গেছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে হেফাজতের এক কেন্দ্রীয় নেতা ক্ষোভের সুরে বলেন, “আমরা খালেদা জিয়ার আশ্বাসেই মতিঝিলে অবস্থানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। কিন্তু তিনি তার দলের নেতাকর্মীদের নির্দেশ দিলেও কেউ আমাদের পাশে এসে দাঁড়ায়নি। বিএনপির নেতাকর্মীরা আমাদের পাশে থাকলে সরকার এভাবে আমাদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারতো না।”

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হেফাজতের আরেক নায়েবে আমির জানিয়েছেন, আগামীতে তারা কোনো দল বা জোটের ওপর নির্ভর করে আন্দোলন করবেন না। তাদের নিজস্ব শক্তিতেই আন্দোলন চালিয়ে যাবেন। হেফাজত নেতাদের আত্মগোপনের বিষয়টিকে তিনি কৌশল হিসেবে দেখছেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আত্মগোপনে থাকা নেতারা গোপনে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছে। হেফাজতের নামে বিভিন্ন বিবৃতি দেয়া হচ্ছে তাদের নির্দেশেই। এছাড়া ওইদিনের অভিযানে কতজন হতাহত হয়েছে এর একটি তালিকা প্রস্তুত করছে হেফাজত। শিগগির পূর্ণাঙ্গ তালিকা করে, তা প্রকাশ করা হবে বলে জানিয়েছে সংগঠনের দায়িত্বশীল সূত্র। হতাহত ও নিখোঁজদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করে নতুনভাবে কর্মীদের উজ্জীবিত করতে চাচ্ছে হেফাজত।

সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলোতেও চলছে হেফাজতের প্রচারণা। নামেবেনামে ব্লগ ও ফেসবুকে হেফাজতের আন্দোলন চাঙ্গা করতে সক্রিয় রয়েছে হেফাজতের সমর্থকরা। হতাহত ও নিখোঁজদের তালিকা করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে তারা। মাঠেময়দানের কোনো কর্মসূচি না থাকায় অনেকেই সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমগুলোকে হেফাজতের প্রচারপ্রচারণার মাধ্যম বানিয়েছেন। এছাড়া বিভিন্ন ছবি, স্ট্যাটাস ও ভিডিও পোস্ট করে ওই রাতের ভয়াবহতা তুলে ধরার চেষ্টা করছেন হেফাজত কর্মীরা।।