Home » অর্থনীতি » এতো রিজার্ভ দিয়ে হবে কি?

এতো রিজার্ভ দিয়ে হবে কি?

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

money-1-প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের উপর ভর করে সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বেশ শক্তিশালী অবস্থানে দাঁড়িয়েছে। রেমিট্যান্সের প্রবাহ বাড়লেও বিনিয়োগের পরিবেশ না থাকায় কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি বাড়ছে না। ফলে রিজার্ভ বাড়ছে। বিনিয়োগ না বাড়ায় রিজার্ভের সঞ্চয় আশা জোগাতে পারছে না। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বিনিয়োগের প্রসারতাও আসতে হবে। অন্যথায় রিজার্ভের সুফল পাওয়া যাবে না। যে হারে দেশের রিজার্ভ বাড়ছে ও ডলারের দাম কমছে তাতে বিনিয়োগের জন্য কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি হলে উদ্যোক্তারাও লাভবান হতে পারবেন। তবে দেশের অবকাঠামো পরিস্থিতি, জ্বালানির অপ্রতুলতা ও রাজনৈতিক অস্থিরতার বিবেচনায় শিল্প উদ্যোক্তারা বিনিয়োগে আসতে পারছেন না।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক সময়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভে রেকর্ড পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা সঞ্চয় হয়েছে। মার্চে রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে এক হাজার ৪১০ কোটি ৫০ লাখ ডলারে। ২০১১ সালের ডিসেম্বর শেষে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৯৬৩ কোটি ডলার। ২০১২ সালের ডিসেম্বর শেষে তা প্রায় ৩০০ কোটি ডলার বা শতকরা ৩২ ভাগ বেড়ে যায়। চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শুরুতে রিজার্ভের পরিমাণ বেড়ে এক হাজার ৩০৫ কোটি ডলারে দাঁড়ায়। আর মার্চে রিজার্ভের পরিমাণ এক হাজার ৪১০ কোটি ৫০ লাখ হয়েছে। রেমিট্যান্স প্রবাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি বিনিয়োগ প্রবণতা কমে আমদানি ব্যয় কমে যাওয়ায় এ পরিমাণ রিজার্ভের পরিমাণ বেড়েছে বলে বাংলাদেশ ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে। পরিস্থিতি এমন হয়েছে যে এখন অনেক বাণিজ্যিক ব্যাংকের কাছেই প্রয়োজনের অতিরিক্ত ডলার রয়েছে। কারও কারও সংরক্ষণ সীমাও অতিক্রম করছে। ফলে বাংলাদেশ ব্যাংককে নিয়ম অনুসারে ডলার কিনতে হচ্ছে। মুদ্রাবাজারে ডলারের তেমন চাহিদা নেই। টাকা দিন দিন শক্তিশালী হচ্ছে। মূল্যমান খোয়াচ্ছে মার্কিন ডলার। টাকা শক্তিশালী হলে প্রবাসীআয় (রেমিট্যান্স) ও রফতানি কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মধ্য মেয়াদে এই দুই পক্ষই নিরুৎসাহিত হয়। যে কারণে বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে ডলারের মূল্যমান ধরে রাখার একটা চ্যালেঞ্জ নিয়ে থাকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। বাজারভিত্তিক ব্যবস্থা হলেও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটা প্রচ্ছন্ন তৎপরতা থাকে ডলারের মূল্য ধরে রাখার।

কিছুদিন আগেও এ রকম পরিস্থিতি ছিল না। তখন ডলারের জন্য হাহাকার ছিল। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) মাধ্যমে জ্বালানি তেল আমদানি করতে ডলার জোগান দিতে গিয়ে হিমশিম খেতে হচ্ছিল রাষ্ট্র মালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে। বাংলাদেশ ব্যাংকও নানা বুদ্ধিপরামর্শ দিয়ে আসছিল। আইডিবির কাছ থেকে শেষমেশ একটা বড় সহায়তা মেলে। আগে একশ কোটি ডলারে একটা ঋণসুবিধার ব্যবস্থা ছিল। এখন তা ২৫০ কোটিতে উন্নীত হয়েছে। এর মধ্যে যে পরিমাণ অর্থ জ্বালানি কিনতে ব্যয় হবে, আইডিবি তা পরিশোধ করবে। আর ছয় থেকে নয় মাসভিত্তিতে সেগুলোকে পরিশোধ করতে হচ্ছে। আবার সমসাময়িক সময়ে সার্বিক বৈদেশিক বিনিময় পরিস্থিতির কথা চিন্তা করে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) কাছ থেকেও সরকার একশ কোটি ডলার ঋণ নেয়। যার একটি কিস্তির অর্থ জমা হয়েছে, বুধবার আরও একটা কিস্তির ১৩ কোটি ৯০ লাখ ডলার রিজার্ভে যোগ হবে।

সব মিলিয়ে সার্বিক আমদানি ব্যয় কমেছে। ব্যয় কমেছে দুভাবে। আন্তর্জাতিক বাজারে পণ্যমূল্য কমে যাওয়ায় আমদানি কমেছে, আবার পরিমাণেও কমেছে আমদানি। ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎ প্রকল্পের যন্ত্রপাতি আমদানিও বন্ধ। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি কমেছে। কমেছে খাদ্যসহ অন্যান্য আমদানিও। বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রানীতি বিভাগের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১২১৩ অর্থবছরের প্রথম ৮ মাসে ২ হাজার ১২৫ কোটি ৭৪ লাখ ডলারে পণ্য আমদানিতে ঋণপত্র (এলসি) নিষ্পত্তি হয়েছে, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ হাজার ৩৯০ কোটি ৩৪ লাখ ডলার। সে হিসেবে এলসি নিষ্পত্তি কমেছে ১১ দশমিক ০৭ শতাংশ। এ সময়ে আমদানিতে ঋণপত্র খোলা হয়েছে ২ হাজার ৩১৫ কোটি ২০ লাখ ডলার, যা গত অর্থবছরের একই সময়ে ছিল ২ হাজার ৪২৪ কোটি ৮৩ লাখ ডলার। সে হিসেবে ঋণপত্র কেনার হার কমেছে ৪ দশমিক ৫২ শতাংশ। আমদানির চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, শিল্প খাতের পরিস্থিতি নাজুক। এ খাত মধ্যবর্তী পণ্য, শিল্প কারখানায় ব্যবহৃত কাঁচামাল, মূলধনী যন্ত্রপাতি ও বিবিধ শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আমাদানির ওপর নির্ভর করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদনে দেখা যায়, আলোচ্য সময়ে শিল্পখাতের উন্নয়নের সঙ্গে সম্পর্কিত সব ধরণের পণ্য আমদানি কমেছে। জুলাইফেব্রুয়ারি সময়ে গত অর্থবছরের একই সময়ের তুলনায় মধ্যবর্তী পণ্যে ৯ দশমিক ৯৪ শতাংশ, শিল্পে ব্যবহৃত কাঁচামালে ৬ দশমিক ৮৪ শতাংশ, মূলধনী যন্ত্রপাতিতে ১৮ দশমিক ৪৬ শতাংশ, বিবিধ শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতিতে ১০ দশমিক ১৬ শতাংশ কিমেছে। একইভাবে পোশাক শিল্প খাতে ব্যবহৃত কাঁচামাল আমদানিও কমেছে। জুলাইফেব্রুয়ারি সময়ে ইয়ার্ন আমদানিতে ১৪ দশমিক ২৭ শতাংশ এবং কাঁচাসুতা ও সিনথেটিক ফাইবার আমদানিতে ৭ দশমিক ৮০ শতাংশ ঋণপত্র নিষ্পত্তি কমেছে। আর টেক্সটাইল ফেব্রিক্স ও গামের্ন্টে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতি আমদনিতে ঋণপত্র নিষ্পত্তি শুন্য দশমিক ৩৮ শতাংশ বেড়েছে।

শিল্পের যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল কমার কারণ হিসেবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশে ব্যবসাবাণিজ্যের সুষ্ঠু পরিবেশ নেই; নেই বিনিয়োগের পরিবেশ। বিনিয়োগের আস্থা না থাকলে বিনিয়োগ হবে না এটাই স্বাভাবিক। তবে বর্তমানে আমদানি যে কম হচ্ছে তার নেতিবাচক প্রভাব পরবর্তী ৩ থেকে ৫ মাস পরে স্পষ্ট হয়ে উঠবে। বর্তমানে যে হারে শিল্পের কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতির আমদানি কমছে, তা দেশের শিল্পব্যবস্থার জন্য মোটেও ইতিবাচক নয়। এভাবে আমদানি কমার অর্থই হলো দেশে বিনিয়োগের কোনো পরিবেশ নেই, যা সরাসরি বেসরকারি খাতের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নতুন শিল্পকারখানার জন্য বিদ্যুত ও গ্যাসের সংযোগ না পাওয়ায় বিনিয়োগের পরিধি বাড়াতে পারছেন না। উপরন্তু বিনিয়োগ সংকুচিত করে আনছেন। তাই যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি কমছে।

ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, গ্যাস, বিদ্যুৎ সঙ্কট চলছে দীর্ঘ দিন ধরে। ঘন ঘন লোডশেডিংয়ের কারণে জ্বালানি তেল পুড়িয়ে জেনারেটরের মাধ্যমে কারখানা চালু রাখা হচ্ছে। পাশাপাশি রয়েছে চলমান রাজনৈতিক সঙ্কট। রাজনৈতিক সঙ্কটের কারণে ব্যবসা ব্যয় বেড়ে চলছে। নতুন করে কেউ বিনিয়োগ করছে না। এ অবস্থায় ‘মড়ার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে দেখা দিয়েছে সাভারে ভবনধস। এটি যেন দেশের তৈরী পোশাক খাতে ধস বয়ে নিয়ে এসেছে। এ পরিস্থিতিতে সামনে রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা সম্ভব হবে না বলে তারা জানিয়েছেন।

আমদানি কমে যাওয়ায় ডলারের চাহিদা দিন দিন কমে যাচ্ছে। ফলে ডলারের দামও কমছে। এরই ধারাবাহিকতায় গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে টাকার মূল্যমান ডলারের বিপরীতে শূন্য দশমিক ১৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। আর গত সাড়ে ১৩ মাসের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে টাকার মান বেড়েছে ৫ টাকা ৯০ পয়সা। শতকরা হিসাবে এ সময় ডলারের বিপরীতে টাকার মান বেড়েছে প্রায় ৭ শতাংশ। এদিকে দেশের রিজার্ভ বাড়তে থাকলেও সে হারে নীট ফরেন এসেট বাড়ছে না। ফলে দেশের মোট ব্যবসায়িক ঋণ বৃদ্ধি পাচ্ছে না। শিল্পোদ্যোক্তারা চাহিদা অনুযায়ী ঋণ না পাওয়ায় শিল্প প্রসার হচ্ছে না। কমছে নতুন কর্মসংস্থান তৈরির সুযোগ। যা অর্থনীতিতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। বিনিয়োগ কমে আসার প্রবণতা বুঝার জন্য বিনিয়োগ বোর্ডে বিনিয়োগ প্রস্তাবনার তথ্যের দিকে নজর দিলেই বুঝা যাবে। বিনিয়োগ বোর্ডের সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী ফেব্রুয়ারি মাসে দেশীয় ১২১টি বিনিয়োগ প্রকল্পের নিবন্ধন হয়েছে। বিদেশি এবং যৌথ বিনিয়োগ প্রস্তাব নিবন্ধন হয়েছে মাত্র ২১টি প্রকল্পে। এক মাস আগে জানুয়ারি মাসেও দেড় শতাধিক বিনিয়োগ প্রস্তাব এসেছিলো দেশে। গত বছরের জানুয়ারি থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত শুধু দেশীয় বিনিয়োগকারীরা ১৬৫৫টি শিল্প নিবন্ধন করেছেন।

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, দেশের রিজার্ভ অতিরিক্ত বেড়ে গেলে খুব একটা আত্মতুষ্টিতে ভোগার কিছু নেই। কারণ রিজার্ভ স্বল্প মেয়াদী। আর রিজার্ভ স্বল্প মেয়াদি হওয়ায় স্বল্পমেয়াদি স্থিতি দিয়ে দেশের দীর্ঘ মেয়াদি উন্নয়নের পরিকল্পনা করা সম্ভব নয়। তাছাড়া রিজার্ভ যে কোনো সময় কমতে পারে। বিশ্ব মন্দার প্রভাব, শ্রমিক রফতানি কমে যাওয়ায় সামনে এ আশঙ্কা বড় হয়ে উঠতে পারে। তাই রিজার্ভ নিয়ে বড় কোনো স্বপ্ন দেখা বা উচ্চবাচ্য করার সুযোগ নেই। বর্তমানে আমাদের রিজার্ভ বেড়ে যাওয়ার নেপথ্য কারণ হলো রেমিট্যান্স। সামপ্রতিক সময়ে আমাদের রেমিট্যান্স বেড়েছে প্রায় ৪০৪৫ শতাংশ। এ ধরণের প্রবণতা শ্রমিক রফতানিকারক অন্য দেশগুলোতেও বিদ্যমান। তবে রেমিট্যান্সের অর্থ বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অনুৎপাদনশীল খাতে ব্যয় হয়। যা মূল্যস্ফীতিকে উসকে দেয়। আর রেমিট্যান্স যেহেতু গ্রামাঞ্চলেই বেশি যায় তাই গ্রামাঞ্চলে বৈষম্য ও মূল্যস্ফীতির হারও বেশি।

গবেষণা প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন অন্বেষণ এর মতে, কৃষি খাতের প্রবৃদ্ধির হার যে হারে কমছে, শিল্প খাতের প্রবৃদ্ধির হার তার চেয়ে কম হারে বাড়ছে। অন্যদিকে, সেবা খাতের প্রবৃদ্ধির হার প্রায় স্থির। এতে দেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের আরোপিত শর্ত পালন করতে গিয়ে সরকার বাণিজ্য উদারীকরণ ও রফতানিমুখী শিল্পনীতি বাস্তবায়ন করছে, অন্যদিকে আমদানি বিকল্পন শিল্পায়ন বাধার সম্মুখীন হচ্ছে। একইসাথে নীতিনির্ধারকরাও শিল্পনীতির দীর্ঘকালীন সমস্যা সমাধানে কার্যকর টেকসই নীতি গ্রহণে উদাসীনতা দেখাচ্ছেন।।