Home » আন্তর্জাতিক » তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

রাষ্ট্রের মুনাফা খেয়ে ফেলে বিদেশি কোম্পানি

ফারুক চৌধুরী

coal power-1উগান্ডার তেল আহরণে উৎপাদন শরিকানা চুক্তি (উশচ) বা প্রডাকশন শেয়ারিং এগ্রিমেন্ট (পিএসএ) নিয়ে আলোচনায় বিভিন্ন বিষয়ূ স্থান পায়। এসব বিষয়ের মধ্যে রয়েছে খরচ উসুল, উৎপাদন ভাগাভাগি বা শরিকানা, পাইপ লাইন, প্রাকৃতিক গ্যাস ও তা পুড়িয়ে ফেলা, প্রশিক্ষণ ও চাকরি, পরিবেশ ধ্বংস, দেশের সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ্য করা, বিরোধ নিষ্পত্তি, গোপনীয়তা, হিসাব নিরীক্ষা, মানবাধিকার লঙ্ঘন, নিরাপত্তা এ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা করা হয় একটি প্রতিবেদনে। এ প্রতিবেদনের শিরোনাম কন্ট্রাক্ট ফার্ম উগান্ডাজ অয়েল এগ্রিমেন্টস প্লেস প্রফিট বিফোর পিপল।

খরচ উসুল বিষয়ে একটি উশচতে যা বলা হয়েছে : তা উল্লেখ করে প্রতিবেদনে একটি মন্তব্য করা হয় : স্ট অয়েল বা খরচ তেল হচ্ছে যে তেল খরচযোগ্য। খরচ তেলের পরিমাণ বেড়ে গেলে প্রফিট অয়েল বা মুনাফা তেলের পরিমাণ কমে যায়। মুনাফা তেল ভাগাভাগি হয় রাষ্ট্র ও তেল উত্তোলনে নিয়োজিত কোম্পানির মধ্যে। তাই অনুমোদনযোগ্য খরচের বোঝা রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপে। মুনাফা তেলের পরিমাণ রাষ্ট্রের ভাগে কমে যায় অনুমোদনযোগ্য খরচের বোঝা রাষ্ট্রের ঘাড়ে এসে পড়ার ফলে। প্রতিবেদনটিতে বলা হয় : খরচযোগ্য ব্যয় কি কি এবং এগুলো সরকার কিভাবে যাচাই করে তা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। উশচের ক্ষেত্রে কোম্পানিসমূহ সচরাচর যে কর্মপন্থা অনুসরণ করে, তাহচ্ছে খরচ তেল থেকে মুনাফা করা। বহুজাতিক কোম্পানিগুলো খরচযোগ্য খাতে বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় করার অন্যতম কারণ এ প্রক্রিয়ায় নিজেদের মুনাফার ভাগ বৃদ্ধি করা। এটা করার কয়েকটি পন্থা রয়েছে। এমন একটি পন্থা হচ্ছে এমন সব ক্ষেত্র থেকে খরচ উসুল করার চেষ্টা, যে ক্ষেত্রগুলোতে ব্যয় খরচযোগ্য হিসেবে গণ্য হওয়া উচিত নয়। আরেকটি পন্থা হচ্ছে, বহুজাতিক কোম্পানির কোনো অঙ্গ কোম্পানিকে ঠিকাদার হিসেবে নিয়োগ করা এবং ঠিকাদারকে এমন দর দেয়া, যে দর থেকে মূল কোম্পানিরই মুনাফা হয়।

প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয় যে, উগান্ডায় ২০০৪ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০০৬ সালের অক্টোবর পর্যন্ত হেরিটেজ অয়েল তেল আহরণে যে সব খরচ দেখায়, সেগুলো নিরীক্ষা করে দেখা যায় যে, হেরিটেজ পাঁচ লাখ ৮৬ হাজার ৫১১ ডলার অতিরিক্ত দাবি করেছে। এ ব্যাপারে হিসাব নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান সতর্ক করে দেয়। বিশেষভাবে সতর্ক করা হয় উগান্ডার বাইরে খরচের ক্ষেত্রে। করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি (সিএসআর) খাতে খরচকে হেরিটেজ আদায়যোগ্য বা উসুলযোগ্য হিসেবে দেখায়। হিসাব নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান এ ব্যয়কে উসুলযোগ্য খরচ হিসেবে গণ্য করার দাবি প্রত্যাখ্যান করে। অনির্দিষ্ট ব্যয়কে উসুলযোগ্য খরচ হিসেবে দেখানোর ব্যাপারেও হিসাব নিরীক্ষা প্রতিষ্ঠান সতর্ক করে দেয়। এ ক্ষেত্রে যুক্তি হচ্ছে যে, সিএসআর বা করপোরেট সোশ্যাল রেশপন্সিবিলিটি খাতে খরচ করা হয় একটি কোম্পানির সুনাম বৃদ্ধি বা ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করার জন্য। তাই কোনো একটি কোম্পানির এ খাতের খরচ রাষ্ট্রের ঘাড়ে চাপানোর যুক্তি নেই, কেবল তাই নয় এটা নিন্দনীয়ও বটে। এখানে উল্লেখ করা দরকার যে, কেবল তেল আহরণ ক্ষেত্রেই নয়, অন্যান্য ক্ষেত্রে ব্যবসারত বহুজাতিক কোম্পানিগুলো এমন সব খাতে খরচ এত বিপুল পরিমাণে করে যে, তাতে মুনাফা কম দেখিয়ে যাতে রাষ্ট্রকে কর কম দিতে হয়। তারা এটা করে রাষ্ট্রকে কম অর্থ প৩্রদানের উদ্দেশে। রাষ্ট্র অর্থ পেলে সে অর্থ ব্যয় হয় রাষ্ট্র পরিচালিত বিভিন্ন কর্মক্ষেত্রে বা জনগণের জন্য। এসব ক্ষেত্রের মধ্যে থাকে শিক্ষা, চিকিৎসা অবকাঠামো নির্মাণ ইত্যাদি। উদাহরণ দেয়া যেতে পারে : বহুজাতিক কোম্পানি ‘ক’ নিজ কর্মচারীদের জ্জ বছর পর পর নতুন গাড়ি কিনে দেয়। অন্যান্য সুযোগসুবিধা দেয় বিপুল পরিমাণে। কর্মচারীদের এত অল্প সময়ের ব্যবধানে নতুন গাড়ি কিনে দেয়ার কোনো যুক্তি নেই। অথচ ‘ক’ এটি করে তার খরচ দেখানোর জন্য। এতে খরচ বেশি এবং মুনাফা কম দেখানো যায় বলে ‘ক’কে কর দিতে হয় কম। এটা করে একদিকে ‘ক’ একান্ত অনুগত একদল কর্মী পায় যারা মনপ্রাণ দিয়ে ‘ক’ এর মুনাফা বৃদ্ধির জন্য কাজ করতে থাকে ‘ক’ আরোপিত কঠোর শৃঙ্খলা মেনে : অপরদিকে রাষষ্ট্রকে বা জন খাতকে বঞ্চিত করা হয় তাদের প্রাপ্য অর্থ থেকে। এ ক্ষেত্রে মতলব হচ্ছে : পাবলিক বা জনগণের জন্য পয়সা দেব কেন? পাবলিকের জন্য পয়সা না দিয়ে সে পয়সা খরচ করব আমার কর্মচারীর জন্য, আমার কর্মচারী দাসতুল্য শৃঙ্খলার মধ্যে আবদ্ধ থেকে পরম ও চরম আনুগত্যের সঙ্গে দিবানিশি কাজ করে যাবে আমার মুনাফা বৃদ্ধির জন্য। আবার সিএসআর খাতে খরচ জনসাধারণ্যে প্রকাশ করা হয় না। এ খাতে খরচ উল্লেখিত হয় না সিএসআর হিসেবে। এ খাতের খরচ করা হয় বিনোদনে, অথচ যে সমাজে বিনোদনে এ খরচ করা হলো, সে সমাজে বিনোদনের চেয়েও জটিল গুরুতর, আশু সমস্যা রয়েছে অনেক। উদাহরণ দেয়া যেতে পারে। কোনো একটি সমাজে রাস্তা ভাঙা, পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে, বিদ্যুতের বিপুল ঘাটতি, হাসপাতালে দরকারি যন্ত্রপাতি নেই, স্কুলের ভবনে ছাদ নেই, গবেষণাগারে সরঞ্জাম নেই। সে সমাজে দেখা যাবে বহুজাতিক কোম্পানি ‘খ’ করপোরেট সোশ্যাল রেসপন্সিবিলিটি বা কোম্পানির সামাজিক দায় খাতে খরচ করছে ইন্দ্রিয়কেন্দ্রিক কার্যক্রমে বা রূপ মাধুর্য্যরে গুণকীর্তনে। এতে ‘খ’ কোম্পানির সুনাম ছাড়লো আর সমাজটি পড়ে থাকলো পুরনো সমস্যাগুলোর আবর্তে। আবার সামাজিক দায়ের খরচ করার কাজে সমাজের মাথাদের জড়িয়ে ফেলতে পারলে ‘খ’ কোম্পানির সমালোচনা, কার্যক্রম নিরীক্ষা, ইত্যাদির কণ্ঠস্বরও বন্ধ করে দেয়া সম্ভব হলো। সমাজের মাথারাও ‘খ’ কোম্পানির ‘সামাজিক দায়ের’ কাজ এগিয়ে নিলেন প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ নানা সুবিধার বিনিময়ে। আর সমাজের যারা নিচে পড়ে থাকেন, সে হতভাগারা একইভাবে নিচে পড়ে রইলেন, সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পেলেন না, নিম্নবিত্ত শিক্ষকের দিন গুজরান কঠিন হলো, ইত্যাদি উগান্ডায় আলোচিত তেল কোম্পানির ক্ষেত্রেও এমন হয়েছে। এমন হয় বহু দেশে, বহুজাতিক কোম্পানিগুলোর ক্ষেত্রে। এটাও লুটের একটি ধরণ।

উগান্ডায় আলোচিত উশচের একটি সংযোজনীতে একটি কথা প্রায় লুকিয়ে রাখা হয়। অর্থাৎ এমনভাবে লেখা হয় যা সহজে চোখে পড়বে না। বাক্যটি হচ্ছে : ‘অমুক এলাকা নিয়ে কোনো মামলা হলে সে মামলা সামাল দেয়ার বা কোম্পানি কোনো মামলা করলে সে মামলা চালানোর সব খরচ উল্লেখযোগ্য। এ কথার অর্থ দাঁড়াচ্ছে যে, উগান্ডার কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান বা মন্ত্রণালয় তেল কোম্পানিটির কোনো কাজের কারণে আদালতে কোম্পানিটির নামে মামলা দায়ের করলে, সে মামলা মোকাবেলায় তেল কোম্পানিটি যে আইনজীবী নিয়োগ করবে, সে আইনজীবীর খরচের একাংশ দেবে উগান্ডা রাষ্ট্র। আর কোম্পানিটির যে কাজের কারণে মামলা হতে পারে সে কাজটি হয়তো পরিবেশ দূষণ বা পরিবেশ আইন লঙ্ঘন। অথবা তেল কোম্পানি উগান্ডার কোনো নাগরিকের বা প্রতিষ্ঠানের বা সরকারের নামে মামলা করলে, সে মামলা পরিচালনারও আংশিক খরচ চাপাবে রাষ্ট্রের ঘাড়ে এবং সে খরচ উসুল করা হবে উগান্ডার তেল বিক্রি করে। অর্থাৎ দেশের স্বার্থরক্ষার জন্য কেউ দাঁড়ালে, তাকে মোকাবেলার খরচ যোগাবে দেশেরই নাগরিকদের অর্থে চালিত রাষ্ট্র। দেশেরই নাগরিকদের অর্থ খরচ করে এবং তাতে সুবিধা পাবে তেল কোম্পানি। এমনই চুক্তি হয় দেশে দেশে। এও এক ধরণের লুট এবং কেবল লুটই নয়, তা নিপীড়নের পর্যায়ে পড়ে। এ হচ্ছে আমাদের অনেক শোনা প্রবচন আমার শীল, আমারই নোড়া, ভাঙ্গো আমারই দাঁতের গোঁড়া। আগামীতে এমন আরো কাহিনী থাকবে।।