Home » অর্থনীতি » নিও লিবারলিজম ও ভবন ধ্বসে চাপা পড়া শ্রমিক

নিও লিবারলিজম ও ভবন ধ্বসে চাপা পড়া শ্রমিক

কাজী জেসিন

savarরানা প্লাজা ধ্বসের সতের দিন পর সারা বিশ্বকে তাক করিয়ে দিয়ে, আজ, ধ্বংস¯তূপের নিচ থেকে একটি শ্রমিককে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। আলো, বাতাসের অভাবে, একটি ধ্বংস স্তুপের নিচে কি করে রেশমা সতের দিন বেঁচে ছিলো, তা নিয়ে নানান জল্পনাকল্পনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ এটিকে সৃষ্টিকর্তার অশেষ রহমত এর নিদর্শন বলছেন, কে কে যেন নানাভাবে প্রমাণে ব্যস্ত হয়েছেন এটা কোনো মিরাকেল ঘটনা না। আবার কেউ কেউ পুরো বিষয়টিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে দেখছেন। যুম ইন করছে হাতের নখে, ভ্রূযুগলে, অভিব্যক্তিতে। এরপর নিজমনে ভাবছেন, ভালোই তো হলো, এবার মানুষ, বিশ্বমিডিয়া ভুলে যাক শাপলা চত্তরের ঘটনা, কিংবা পারলে ভুলে যাক হাজার মানুষের মৃত্যুযাতনা। কারণ আমরা যে এভাবেই ভুলি, ভুলে গেছি বারবার।

এই লেখা যখন লিখছি তখন সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী রানা প্লাজা ধ্বসে মৃতের সংখ্যা এগারশ ছাড়িয়েছে একটি ব্রিটিশ পত্রিকা, ডেইলি মেইল ধারণা করেছে এই সংখ্যা ১৪০০ ছাড়িয়ে যেতে পারে। এখনো অনেকের সন্ধান পাওয়া যায়নি। এখনও অনেক স্বজন তাদের প্রিয়জনের লাশের অপেক্ষায় রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে খেয়ে না খেয়ে, প্রহর গুণছে। বিখ্যাত কোনো এক কবি লিখেছেন, ‘ছিল, নেই, মাত্র এই’। একটি কমার মধ্যে দিয়ে তিনি ’থাকা’ ও ‘না থাকা’কে তুলে ধরেছেন। শ্রমিকের মৃত্যু যেন ছিল, নেই, মাত্র এই। তবু আমরা বুঝতে চাই এই ‘না থাকা’র, এই হত্যার ব্যাকরণ।

শাহিনা, বিধ্বস্ত ভবনের নিচে বিমের মাঝে চাপা পড়ে, খাদ্য, অক্সিজেন, আলো, বাতাস, পানির অভাব স্বত্তেও মনের জোরে, বেঁচে থাকার জন্য যুদ্ধ করে গেছে ১২০ ঘন্টা। ১২০ ঘন্টার এই যুদ্ধের মধ্য দিয়ে সে আমাদের দেখিয়েছে পুঁজিবাদী অর্থনীতি আর অধিক মুনাফা লোভীদের বিমের নিচে সে তো চাপা পড়ে ছিল বহুদিন! কারণ তার আর কোনো উপায় ছিল না নিজেকে বাঁচিয়ে রাখার, তার সন্তানকে বাঁচানোর। আর তার বেঁচে থাকার জন্যে রোজগারের আর কোনো উপায় না থাকাটাই আজ বাংলাদেশে গামেন্টর্স শিল্প বিকাশে বাংলাদেশের একমাত্র পুঁজি। শাহিনার জন্য আমরা অনেকেই কেঁদেছি। কারণ ধীরে ধীরে তার মৃত্যু, তার পরাজয়, সন্তানের জন্য তার বেঁচে থাকার আকুতি যেন আমাদের কাছে দৃশ্যমান ছিল। তবুও মৃত্যু যখন শুধু সংখ্যা মাত্র, তখন প্রতিটি মৃত্যু যে ক্ষত, যে করুন গল্প সৃষ্টি করে, তা আমরা শুধু অনুমান করতে পারি, অনুভব করতে পারিনা। আর তাই যখন স্পেকট্রা ভবন ধ্বসে, তাজরীন গার্মেন্টস কারখানার আগুনে শত শত মানুষ মরে যায়, পুড়ে যায়, তখন আমরা স্বল্প সময়ের জন্য আহাজারি করি, অতপরঃ একসময় সকলে ভুলে যাই। আর তাই অতীতে বড় বড় বিপর্যয়ে, শ্রমিক মৃত্যুর ঘটনার কোনো বিচার আমরা হতে দেখিনি। এবার, ইতিহাসের বর্বরোচিত রানা প্লাজা ধ্বসের ঘটনায়, দেশের মানুষ যখন থমকে গেছে, তখন ভবনের মালিক সহ চারজন গার্মেন্টস মালিককে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের যথোপযুক্ত শাস্তি হবে কিনা, তা পরের বিষয়। এর আগে একটু গভীরে গিয়ে বোঝা দরকার এইভাবে বাংলাদেশে শ্রমিকের মৃত্যু কেন হচ্ছে? কয়েকজন গার্মেন্টস মালিক আর রানার বিচার হলেই কি বন্ধ হবে শ্রমিকের এমন অমানবিক মৃত্যু? কেন প্রতিটি সরকার শ্রমিকদের অধিকার প্রশ্নে শুধু বাণী সর্বস্ব কথা বলেন? কেন প্রধানমন্ত্রী শ্রমিক অধিকার রক্ষায় শ্রমিকদের সংগঠন গড়ার সুযোগ সৃষ্টি না করে বলেন, ‘তিনি নিজেই শ্রমিকদের হয়ে মালিকদের সাথে দেনদরবার করেন’?

নিও লিবারেলিজম বা নয়া উদারনৈতিকতাবাদের ফসল এই গার্মেন্টস শিল্প বাংলাদেশে যাত্রা শুরু করে আশির দশকে। এরপর বহু বসন্ত এসেছে, বহু ফুল ফুটেছে, দেশের গার্মেন্টস শিল্প এগিয়ে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম পোষাক রপ্তানীকারক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, মালিকেরা একটির পর একটি নতুন কারখানা গড়েছে, কিন্তু শ্রমিকদের জীবনের অনিরাপত্তা, দারিদ্রতা কাটেনি। গার্মেন্টস খাতে ধ্বস সংক্রান্ত আলোচনা এলেই আমরা বলতে শুনি, এমন দূঘটনা ঘটতে থাকলে, হাজার হাজার শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়বে (যদিও রানা ভবন ধ্বস কোনো দূর্ঘটনা নয়)। যেন গার্মেন্টস শিল্পের পদযাত্রা শুরু হয়েছে শ্রমিকদের স্বার্থে! এই গার্মেন্টস খাত এগিয়েছে বিশ্ববাজার থেকে সুবিধা আদায়ে সরকারের কৌশলগত কারণে নয়, কিংবা মালিকেরা বিদেশী ক্রেতাদের সাথে দেনদরবার করে ন্যায্য মূল্যে অর্ডার আনে বলে নয়। বাংলাদেশে গার্মেন্টস খাত এগিয়েছে বিদেশী ক্রেতাদের কাছে আমাদের শ্রমিকের শ্রম, পণ্য হিসেবে সস্তা ও আকর্ষনীয় বলে। তবু যুগে যুগে শ্রমিকের নিপীড়নের পেছনে ভূমিকা রেখেছে আন্তর্জাতিক ও রাষ্ট্রীয় জাতাকল।

একটি ভবনের মধ্যে ক্রমাগত হাত চালিয়ে কাজ করছে একটি মেয়ে। ক্লান্তিতে একটু থামলেই সুপারভাইজারের ধমক, হুমকি। ভেতরে একই ফ্লোরে একইভাবে কাজ করছে শত শত শ্রমিক। কারো সঙ্গে কারো কথা বলার উপায় নেই। ভিষণ গরম। কখনও এতো গরম, যা শরীরের সহ্য ক্ষমতার বাইরে। একটানা মেশিনের শব্দ। এমনকি অসুস্থ হলেও ছুটি নেই। এই বিবরন শুনে যে কারো মনে হতে পারে এটা হয়তো কোনো জেলখানা বা কনসেনট্রেশন ক্যাম্প। মূলত এই চিত্র হচ্ছে ইপিজেড ও একই মডেলে চলমান গার্মেন্টস ফ্যাক্টরীগুলোর। ১৯৫০ এর শেষদিকে, অবাধ বাণিজ্যের প্রসারে ইপিজেড প্রথম স্থাপিত হয়েছে ম্যাক্সিকোতে। ম্যাক্সিকোতে এই যোনকে বলা হয় মাকুইলাডোরাস, গুয়াতেমালায় শোয়ালো কোম্পানীস, চীনে স্পেশাল ইকোনোমিক যোন, বাংলাদেশে এক্সপোর্ট প্রসেসিং যোন। মুক্ত বাজার অর্থনীতির প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে বিশ্বজুড়ে বেড়ে যা ইপিজেডের সংখ্যা অথবা উল্টো করে বলা যায় বিশ্বজুড়ে ইপিজেড এর সংখ্যা বাড়ার সাথে সাথে আরও প্রসার ঘটে মুক্ত বাজার অর্থনীতির যার সুফল বরাবর ঘরে তোলে উন্নত দেশগুলো। ইপিজেড মডেলের প্রাথমিক লক্ষ্য হলো বিদেশী সরাসরি বিনিয়োগের ক্ষেত্র তৈরী করা। আর যে কমন বৈশিষ্ট্য প্রতিটি ইপিজেড শেয়ার করে, তা হলো . পণ্য প্রস্তুত করণে প্রয়োজনীয় সিমাহীন ডিউটি ফ্রি কাঁচামাল আমদানী সুবিধা ২. দীর্ঘমেয়াদী ট্যাক্স হলিডে। ইপিজেড এর ফিচারে কোথাও শ্রমিক সংগঠনের বৈধতা দেয়া হয়নি। বলা বাহুল্য, আজ পর্যন্ত শ্রমিক সংগঠনের দাবী নিয়ে আন্দোলন হলেও কোনো ইপিজেড এ শ্রমিক সংগঠন গড়ে ওঠেনি সরকার ও মালিক উভয় পক্ষের বাঁধায়। আন্তর্জাতিক ক্রেতারা ততদিনই একটি দেশ থেকে সোর্সিং করেন যতদিন তারা সেখানে সস্তায় শ্রম কিনতে পারেন। এসব বড় বড় কোম্পানীগুলো ক্রেতাকে প্রভাবিত করতে মার্কেটিং স্ট্রাটেযির অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ দিক ‘পিপল’ ও ‘প্লানেট’ এর জন্য তারা কী কী পদক্ষেপ নিয়েছে বা নিয়ে থাকে তা তুলে ধরে। নিশ্চিতভাবে বলা যায় বেশিরভাগ কোম্পানিই মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে থাকে,নীতিহীনভাবে তারা শুধু সস্তা শ্রমের পিছু ছোটে, আর তাই, তাদের বাণ্যিজ্যের প্রসারে যে শ্রমিকেরা কাজ করে, তাদের কর্মপরিবেশ যুগ যুগ ধরে এতো অনিরাপদ, মজুরীর পরিমান এতো অমানবিক। এমনকি উন্নত দেশগুলোর স্থানীয় প্রতিনিধিরাও শ্রমিকদের এই অমানবিক জীবন স্বচক্ষে অবলোকন করেও নিজ নিজ দেশের কর্পোরেট স্বার্থ রক্ষায় নীরব ভুমিকায় থাকে। বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোর অবস্থা যখন এরকম যে দাতা দেশগুলোর ইশারা ছাড়া গণতন্ত্র থমকে যায়, তখন আমাদের বুঝতে বাকী থাকেনা কেন বারবার আন্দেলোনের পরও শ্রমিক ইউনিয়নের অনুমতি দেওয়া হয়না। বারবার তাই আমাদের ইপিজেড এর কমন ফিচারের কথা মনে পড়ে যায়। এই মিল আমাদের কাছে আন্তজার্তিক আকাঙ্খাকে স্পষ্ট করে তোলে। এতদিনে পশ্চিমারা অনেক নীতিকথা বলছেন। সম্প্রতি আমেরিকা শ্রমিকনেতা আমিনুল হত্যার ঘটনায় খুব সরব। আমেরিকা বাংলাদেশকে দেয়া জিএসপি সুবিধা বন্ধ করে দিতে চায়। বাংলাদেশে শ্রমিকের অধিকার রক্ষা করা না হলে আমেরিকায় বাংলাদেশের পোষাক রপ্তানী বন্ধ হয়ে যাবে, অত্যন্ত খাঁটি কথা। যদি তা সাবলীলভাবে হয়, কিšতু কোটা সুবিধা বন্ধ করে দেয়া হবে এই কথা মুক্ত বাজার অর্থনীতির বিরোধী। পুঁজির জন্য আমরা আমাদের দূয়ার খুলেছি বহু আগে, অথচ এখনও আমরা পন্যেও অবাধ গতির অধিকার আদায় করতে পারিনি, এখনও আমদের কোটা বন্ধের ভয় পেতে হয়। এটা অবশ্যই আমাদের সরকারের ব্যর্থতা। প্রশ্নজাগে, এত জল গড়াবার পর, এতদিনে কেন আমেরিকা আমাদের এইসব নীতিকথা বলছে? আমেরিকার ভেতরে, অর্থনৈতিক ধ্বস নামায়, সেখানে সৃষ্ট বেকারত্বের কারণে, আমেরিকনিরা তাদের বড় বড় কোম্পানীগুলোর বিদেশ থেকে সোর্সিং এর বিরোধিতা করছে। বেকারত ঘুচাতে,বিদেশ থেকে সোর্সিং বন্ধ করে, নিজ দেশে কর্ম সংস্থান সৃষ্টির জন্য সেখানে চলছে আন্দোলন। ই্উরোপীয় ইউনিয়ন, পক্ষান্তরে, শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করা হলে, তাদের প্রয়োজনীয় সুবিধা দিলে বাংলাদেশকে আরো কোটা সুবিধা প্রদান করবে বলেছে, যা অবশ্যই একটি ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি। গ্লোবালাইজেশনের ক্ষতিকর প্রভাব, উপরোক্ত আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপট সত্বেও শ্রমিকদের অধিকার রক্ষা করা যেত যদি আমাদের সরকারের সদিচ্ছা থাকতো।

দ্বিতীয় যে স্তরে, বিভিন্নভাবে শ্রমিকদের ঠকানো হচ্ছে তা ব্যাখ্যা করতে গেলে বলতে হয় আমদের রাষ্ট্রযন্ত্র বরাবর ব্যবহৃত হয়েছে শ্রমিক অধিকারের বিরুদ্ধে। প্রথমত, গ্লোবাল ইকেনোমিতে প্রবেশের জন্য আমরা নিঃর্শত ভাবে সব মেনে নিয়েছি। দ্বিতীয়,রাষ্ট্রের সকল মেশিনকে ব্যবহার করে প্রতিটি সরকার সমস্ত সুবিধা দিয়েছে শুধু মালিকদের। মালিকরা একাধারে ব্যাক টু ব্যাক সুবিধা, পণ্য প্রস্তুতিতে প্রয়োজনীয় সবকিছু ট্যাক্স ফ্রি আমদানরি সুযোগ থেকে শুরু করে দীর্ঘমেয়াদ ট্যাক্স মওকুফের সুযোগ পেয়ে থাকে। অথচ যে শ্রমিকদের জন্য এই খাত দাঁড়িয়েছে, রাষ্ট্র তাকে কোনো সুবিধা দেয়নি। পরিবহন সংকট, আবাসন সংকটে থাকার পরও রাষ্ট্র তার জন্যে সেসব সুবিধা দেয়নি। নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মূল্য বৃদ্ধিতে নিজেদের সংকটের কথা বললেও, প্রয়োজন অনুযায়ী তাদের মজুরী বৃদ্ধি করা হয়নি কিংবা রেশনে সরকার তাদের নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্য সরবরাহ করেনি। অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করা স্বত্বেও সরকার কখনও তাদের স্ব্যাস্থবীমা করে দেয়নি কিংবা দেয়নি তাদের কোনো স্বাস্থ্য ভাতা। যে বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের রেমিট্যান্স এই শ্রমিকেরা বাংলাদেশের অর্থনীতিতে যোগ করছে, সরকার কি তার ১ শতাংশ কিংবা দশমিক ৫০ শতাংশ কি শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে ব্যায় করতে পারতো না? বারবার বলছি সরকার দেয়নি বা সরকার পারতো কিনা, এইজন্য যে সরকারই মালিকদের নানাবিধ ইনসেনটিভ দিচ্ছে, তাহলে এই খাতকে এগিয়ে নিতে যাদের প্রধান ভূমিকা তাদের কেন কোনো সুবিধা দেওয়া হয় না এর পেছনে কারণ কী এই যে, শ্রমিকেরা রাজনৈতিক দলগুলোকে চাঁদা দেবার ক্ষমতা রাখেনা? এখানে আমরা প্রতিটি সরকারের নিষ্ঠুরভাবে পুঁজির দিকে ঝুঁকে থাকতে দেখি যেমন দেখি কারকানা মালিকদের। সম্প্রতি পরপর প্রতিবছর সবোচ্চ ২৫ শতাংশ করে মজুরী বৃদ্ধি করায় অনেক ক্রেতা চীন থেকে ঘুরে অন্যান্য দেশে চলে গেছে, এই কথাটা আমরা মালিকদের কাছ থেকে খুব শুনতে পাই। একবার দেখে নেই আসলেই কি আমাদের মালিকদের অবস্থা এমন যে তারা মজরী বাড়ালে ক্রেতারা বাংলাদেশ থেকে চলে যাবে? চীনে এখন নূন্যতম মজুরী প্রদেশভেদে ১৩৮ ইউএস ডলার থেকে ২৩৮ ইউএস ডলার। ব্রাজিলে ৩৩৫ ইউএস ডলার, ভারতে ৬৬ ইউএস ডলার থেকে ১০২ ডলার, ম্যাক্সিকোতে ১৪৮ ডলার পাকিস্তানে ৮২ ইউএস ডলার, ভিয়েতনামে ৯৫ ডলার, আফগানিস্তানে ১০০ ডলার, যেখানে বাংলাদেশে নূন্যতম মজুরী ৩৫ ডলার। বাংলাদেশ ব্যতিত উপরোক্ত অন্যান্য দেশের মধ্যে সবনিম্ন নূন্যতম মজুরী দিচ্ছে ভারত, যা বাংলাদেশের নূন্যতম মজুরীরর চেয়ে প্রায় দ্বিগু। অন্যান্য দেশে মালিকরা যদি বাংলাদেশের মালিকদের চেয়ে দ্বিগুণ, তিনগুণ, কয়েকগুণ বেশী মজুরী দিয়ে পোষাক রপ্তানীকারক দেশ হিসেবে নিজদেশকে টিকিয়ে রাখতে পারে তাহলে বাংলাদেশের গার্মেন্টস মালিকরা কেন পারেন না? ষ্পষ্টতই এখানে আমরা মালিকদের অধিক মুনাফার প্রবনতা টের পাই। মালিকরা নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সংগঠন করেছেন, বিজিএমইএ। মালিকরা তাদের স্বার্থে প্রতিষ্ঠান গড়বে এটাই স্বাভাবিক কিন্তু যখন মালিকরা শ্রমিকদের স্বার্থ রক্ষা না করে, শ্রমিকমালিক মুখোমুখি থাকে, তখন রাষ্ট্রের শ্রমিকদের স্বার্থে, শ্রমিক ইউনিয়ন করতে না দেওয়াটা অস্বাভাবিক। আমরা দেখতে পাই, রাষ্ট্র তার প্রতিটি নাগরিককে, প্রতিটি শ্রেণীকে সমান দৃষ্টিতে দেখছেনা। আর তারই সুযোগে মালিকেরা, তাদের সংগঠন কে বরাবর ব্যবহার করে আসছে শ্রমিক ঠকিয়ে, নিজেদের স্বার্থ হাসিলে।

সবশেষ যে কারণটি শ্রমিক শোষন কে সবোচ্চ পর্যায়ে নিয়ে গেছে, তা হলো দেশের অনিয়ন্ত্রিত দুর্নীতি। দুর্নীতি আমাদের সমাজে প্রতিটি স্তরে, রন্ধ্রে রন্ধ্রে এমনভাবে ঢুকে গেছে যে তা শ্রমিককে প্রতি পদে পদে অসহায় করে রাখে। স্থানীয় যুবলীগ নেতা সোহেল রানাকে তার অপরাধের কারণে গ্রেফতার করা হলো কিন্তু এমন একজন ব্যক্তিকে যে নেতা বানালো, সে ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে গেলো! কে তাকে এতোপ্রশ্রয় দিলো, কেন দিলো? গোড়ার এই প্রশ্নগুলোরমীমাংসা যতোদিন না হবে, ততোদিন একটার পর একটা সোহেল রানা তৈরী হতেই থাকবে। ঘটতেই থাকবে অমানবিক ঘটনা। রাজনীতিতে যতোদিন পর্যন্ত টাকা দিয়ে সভাসমাবেশে লোক আনা হবে, যতোদিনপর্যন্ত টাকা দিয়ে ভোট কেনা হবে, ততোদিন পর্যন্ত সাভার ট্র্যাজেডির বিচার অসমাপ্ত থেকে যাবে।

বুলেট দিয়ে কাপড় বোনা যায় না। শ্রমিকের মৃত্যু হতে থাকলে, শিল্পের মৃত্যু একদিন না একদিন ঘটবে। রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন না হলে, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিলে সর্বোপরি, শ্রমিকদের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন না হলে শ্রমিক নিপীড়ন বন্ধ হবে না। মৃত্যুর মিছিলের মধ্য দিয়ে, শত শত মানুষের দীর্ঘশ্বাসের মধ্য দিয়ে কোনদিন, কোন দেশ, সুখী সমৃদ্ধ দেশে পরিণত হতে পারে কি?

১টি মন্তব্য

  1. Chomotkar ekti lekha porlam. Bishesh kore Export Processing Zone ebong Labor wage er bishoiti lekhar gobhirotak aro bariye diyeche.