Home » রাজনীতি » মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা মিছিল

মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা মিছিল

শাহ আহমদ রেজা

farakka michilবাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে যে কয়েকটি ঘটনা গুরুত্বপূর্ণ ও দিকনির্ধারণী হিসেবে উল্লেখযোগ্য হয়ে রয়েছে, মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা মিছিল সেগুলোর মধ্যে অন্যতম। মৃত্যুর মাত্র ছয় মাস আগে, ৯৬ বছর বয়সে অসুস্থ শরীর নিয়ে ১৯৭৬ সালের ১৬ মে মওলানা ভাসানী এই ঐতিহাসিক মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। ফারাক্কা মিছিল সে সময়ে জাতীয় স্বার্থে খুবই ফলপ্রসূ অবদান রেখেছিল। এখনো ফারাক্কা মিছিলের তাৎপর্য বিশেষভাবে অনুধাবন করা দরকার। কারণ, ভারতের যে পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে মওলানা ভাসানী মিছিলটির আয়োজন করেছিলেন, সে পানি আগ্রাসন এখনো অব্যাহত তো রয়েছেই, ক্রমাগত আরো ব্যাপক ও ভয়ংকরও হয়ে উঠছে। ভারত আমাদের শুধু পানির ন্যায্য হিস্যা থেকেই বঞ্চিত করছে না, বাংলাদেশকে পানিপ্রতিবন্ধী রাষ্ট্রেও পরিণত করতে চাচ্ছে। সুতরাং ফারাক্কা মিছিলের ইতিহাস স্মরণ করার পাশাপাশি বেশি গুরুত্বের সঙ্গে দরকার ভারতের পানি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী আন্দোলন গড়ে তোলা। জাতিকে পানিপ্রতিবন্ধী হওয়ার মারাত্মক পরিণতি থেকে রক্ষা করার চেষ্টা চালানো।

কৃষকশ্রমিক ও বিভিন্ন শ্রেণীর মেহনতী মানুষ থেকে শুরু করে রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মি, কবিসাহিত্যিক, সাংবাদিক, শিক্ষকঅধ্যাপক ও বুদ্ধিজীবী পর্যন্ত লাখ লাখ নারীপুরুষ ফারাক্কা মিছিলের মিছিলে অংশ নিয়েছিলেন। রাজশাহীর মাদ্রাসা ময়দানে মওলানা ভাসানীর দেয়া মাত্র ১০ মিনিটের এক ভাষণের মধ্য দিয়ে মিছিলের শুরু হয়েছিল। রাজশাহী, প্রেমতলী, নবাবগঞ্জ ও শিবগঞ্জ হয়ে কানসাটে গিয়ে ১৭ মে মিছিলের সমাপ্তি টেনেছিলেন মওলানা ভাসানী। পায়ে হেঁটে দু’দিনে প্রায় একশ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করেছিলেন মিছিলকারীরা। কানসাট হাই স্কুল ময়দানের মিছিলের সমাপ্তি ঘোষণার আগে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, গঙ্গার পানিতে বাংলাদেশের ন্যায্য হিস্যার ন্যায়সঙ্গত দাবি মেনে নিতে ভারত সরকারকে বাধ্য করার জন্য আমাদের আন্দোলনের এখানেই শেষ নয়। ফারাক্কা সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়ে মওলানা ভাসানী আরো বলেছেন, ‘ভারত সরকারের জানা উচিত, বাংলাদেশীরা আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় পায় না। কারো হুমকিকে পরোয়া করেনা।যে কোনো হামলা থেকে মাতৃভূমিকে রক্ষা করা আমাদের দেশাত্মবোধক কর্তব্য এবং অধিকার।’

ফারাক্কা মিছিল কোনো আকস্মিক ঘটনা ছিল না। মওলানা ভাসানীর পক্ষ থেকেও ছিল না কোনো বিচ্ছিন্ন বা আকস্মিক কর্মসূচী। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সমর্থন দেয়ার যুক্তিকে সামনে এনে স্বাধীনতাউত্তর প্রাথমিক দিনগুলো থেকেই ভারতের সম্প্রসারণবাদী সরকার ও তার এদেশী সহযোগীরা বাংলাদেশকে অবাধ লুণ্ঠনের ক্ষেত্রে পরিণত করেছিল। শেখ মুজিবুর রহমানের নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ সরকারের ব্যর্থতা ও সহযোগিতার সুযোগে গোপন ও প্রকাশ্যে বিভিন্ন চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশকে দ্রুত ভারতের ইচ্ছার অধীনস্থ করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়াকে আরো এগিয়ে নেয়ার উদ্দেশ্যে ১৯৭৪ সালের ১৬ মে দুদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান ও ইন্দিরা গান্ধী নতুন একটি চুক্তি স্বাক্ষর করেছিলেন। এ চুক্তির মাধ্যমে বাংলাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ বেরুবাড়ি ভারতকে দেয়া হয়েছিল এবং একই সঙ্গে ভারত পেয়েছিল ফারাক্কা বাঁধ চালু করার প্রশ্নে বাংলাদেশের সম্মতি। বাংলাদেশের জন্য মরণ বাঁধ হিসেবে চিহ্নিত ফারাক্কা বাঁধ চালু করার লক্ষ্যে ভারতের পক্ষ থেকে প্রথমে চাতুরিপুর্ণ কৌশল নেয়া হয়েছিল। মুজিবইন্দিরার যুক্ত ইশতেহারে বলা হয়েছিল, ফারাক্কা বাঁধ। সম্পূর্ণরূপে চালু করার আগে শুল্ক মৌসুমে প্রাপ্ত পানির ব্যাপারে পরস্পরের কাছে গ্রহণযোগ্য বণ্টনসমঝোতায় পৌঁছানোর জন্য ভারত পরীক্ষামূলকভাবে ফিডার ক্যানেল চালু করবে। যুক্ত ইশতেহারের সিদ্ধান্ত অনুসারে ভারত ১৯৭৫ সালে ৪১ দিনের জন্য (২১ এপ্রিল থেকে ৩১ মে পর্যন্ত) ফারাক্কা বাঁধ চালু করেছিল। কথা ছিল, ৪১ দিনের নির্ধারিত সময়ে ভারত ১১ হাজার থেকে ১৬ হাজার কিউসেক পানি ফিডার ক্যানেল দিয়ে হুগলী নদীতে নিয়ে যাবে। কিন্তু ৪১ দিনের সময়সীমা পেরিয়ে যাওয়ার পরও ভারত ফিডার ক্যানেল দিয়ে পানি প্রত্যাহার অব্যাহত রাখে এবং বাংলাদেশের সঙ্গে কোনো সমঝোতা বা চুক্তি না করেই ’৭৬ সালের শুল্ক মৌসুমে একতরফাভাবে গঙ্গায় পানি নিয়ে যায়। ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে পানির তীব্র সংকট দেখা দেয়। ভারতের একতরফা পানি প্রত্যাহারের প্রতিক্রিয়ায় বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলে সর্বনাশ সূচিত হয়।

দেশ ও জাতির সেই সংকটকালে অভয় ও আশ্বাসের বাণী মুখে নিয়ে এগিয়ে এসেছিলেন মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে ভারতের শাসকগোষ্ঠী বিরোধী আন্দোলনের অংশ হিসেবে তিনি প্রথম থেকেই ফারাক্কা বাঁধের বিরোধিতা করেছেন, দাবি জানিয়েছেন বাংলাদেশকে গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা দেয়ার জন্য। এই প্রক্রিয়ায় তিনি ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত মুজিবইন্দিরা চুক্তির কঠোর বিরোধিতা করেছেন এবং এক বিবৃতিতে ভারতকে বেরুবাড়ি না দেয়ার দাবি জানিয়েছেন। ১৯৭৪ সালের ১৭ মে প্রদত্ত ওই একই বিবৃতিতে মওলানা ভাসানী বলেছিলেন, ‘সাম্প্রতিক শীর্ষ সম্মেলনে ফারাক্কা বাঁধের পানি বণ্টনের মীমাংসা বাংলাদেশের সাড়ে ৭ কোটি মানুষের জন্য হায়াত ও মউতের প্রশ্ন ছিল। কিন্তু এর কোন মীমাংসা করা হয়নি।’

১৯৭৬ সালের শুল্ক মৌসুমে পরিস্থিতির মারাত্মক অবনতি ঘটে। একদিকে ভারতের পক্ষ থেকে একতরফা পানি প্রত্যাহারের ফলে সৃষ্ট সংকট এবং অন্যদিকে সীমান্তে সশস্ত্র আক্রমণ ও সামরিক তৎপরতার ফলে স্বল্প সময়ের মধ্যে ভারতবালাদেশ সম্পর্কে শীতল হয়ে পড়ে। এ কথা প্রচারিত হতে থাকে যে, ’৭৫এর রাজনৈতিক পরিবর্তনকে ভারত সরকার সুনজরে দেখেনি এবং তার পরিপ্রেক্ষিতেই সুপরিকল্পিতভাবে সীমান্তে গোলযোগ সৃষ্টি করা হচ্ছে। জনগণকে সঙ্গে নিয়ে ভারতের এই সম্প্রসারণবাদী কর্মকান্ড মোকাবিলা করার উদ্দেশ্যে মওলানা ভাসানী ’৭৬ সালের জানুযারি মাস থেকে ব্যাপকভাবে সীমান্ত এলাকা সফর করেন। সন্তোষে ফিরে এক বিবৃতিতে তিনি অভিজ্ঞতা বর্ণনাকালে বলেন, ‘আক্রমণের কলাকৌশল ও ধ্বংসলীলার ব্যাপকতা দেখিলে যে কোনো নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষকই স্বীকার করিবেন যে, সাধারণ দুষ্কৃতকারীদের দ্বারা এই কাজ সম্ভব নহে; বরং ইহা অভিজ্ঞ ও দক্ষ সামরিক প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের দ্বারাই সংঘটিত হইয়াছে।’ (৮ ফেব্রুযারি, ১৯৭৬) মওলানা ভাসানী এ সময়ে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে চিঠি লেখেন এবং নিজের চোখে সীমান্ত পরিস্থিতি দেখে যাওয়ার জন্য আহ্বান জানান। ’৭৬ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক ‘খোলা চিঠি’তে ইন্দিরা গান্ধীকে নিজের কন্যা হিসেবে সম্বোধন করে মওলানা ভাসানী লেখেন– “আমার আন্তরিক আশা, আপনি স্বচক্ষে দেখিলেই ইহার আশু প্রতিকার হইবে এবং বাংলাদেশ ও হিন্দুস্থানের মধ্যে ঝগড়াকলহের নিস্পত্তি হইয়া পুনরায় ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব কায়েম হইবে। ফারাক্কা বাঁধের দরুণ উত্তরবঙ্গের উর্বর ভূমি কিভাবে শ্মশানে পরিণত হইতেছে তাহাও স্বচক্ষে দেখিতে পাইবেন।”

উদাত্ত আহ্বান জানানো সত্ত্বেও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে কোনো ইতিবাচক সাড়া না পাওয়ার পরই মওলানা ভাসানী ফারাক্কা মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করেছিলেন। ফারাক্কা দুর্দশা কবলিত উত্তরবঙ্গ সফর শেষে ’৭৬ সালের ১৮ এপ্রিল ঢাকায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন মিলনায়তনে মওলানা ভাসানী এক জনসমাবেশের আয়োজন করেন। সমাবেশে তিনি ঘোষণা করেন, ‘গঙ্গা আন্তর্জাতিক নদী। ফারাক্কা বাঁধের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বিধান অনুযাযী ভারত এককভাবে এই নদীর পানি ব্যবহার করতে পারে না।’ ১৯৭৪ সালে ইন্দিরামুজিব চুক্তির তারিখ ১৬ মে ফারাক্কা মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণা করে সমাবেশে মওলানা ভাসানী আরো বলেন, ‘ভারত সরকার পানি প্রত্যহারের মাধ্যমে একটি স্বাধীনসার্বভৌম দেশের ন্যায্য অধিকারের উপর হামলা চালালে বাংলাদেশের আট কোটি মানুষ তা জীবন দিয়ে প্রতিরোধ করবে।’

ফারাক্কা মিছিলের কর্মসূচি ঘোষণার পাশাপাশি মওলানা ভাসানী ভারতের প্রধানমন্ত্রীর কাছে একটি চিঠিও পাঠিয়েছিলেন। এই চিঠিতে তিনি ফারাক্কা সমস্যার সমাধান এবং বাংলাদেশকে গঙ্গার পানির ন্যায্য হিস্যা দেয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী চিঠির উত্তর দিয়েছিলেন ৪ মে। মওলানা ভাসানীর চিঠিতে তিনি ‘ব্যথিত ও বিস্মিত’ হয়েছেন জানিয়ে ইন্দিরা গান্ধী লিখেছিলেন– ‘এ কথা কল্পনাও করা যায় না যে, যিনি আমাদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন এবং পরবর্তীকালে বাংলাদেশে নিজের জাতীয় মুক্তি সংগ্রামে দুঃখ ও আত্মত্যাগের মাধ্যমে শরিক হয়েছেন, সেই তিনি এখন কিভাবে এতটা মারাত্মকরূপে আমাদের ভুল বুঝেছেন, এমনকি প্রশ্ন তুলেছেন, আমাদের উদ্দেশ্যের সততা সম্পর্কে।’ ১৫৬ কোটি রুপি ব্যয়ে নির্মিত ফারাক্কা বাঁধ পরিত্যাগ করা সম্ভব নয় জানিয়ে ইন্দিরা গান্ধী মওলানা ভাসানীকে লেখেন– ‘আমার মনে হয়, বাংলাদেশের উপর ফারাক্কা বাঁধের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে আপনাকে অত্যন্ত অতিরঞ্জিত এবং শুধু একটি দিকের তথ্য জানানো হয়েছে। আপনি যদি চান তাহলে আমাদের হাই কমিশনার নিজে গিয়ে আপনাকে ব্যক্তিগতভাবে বিষয়টির অন্য পিঠ সম্পর্কে অবহিত করবেন।’ চিঠির শেষাংশে ইন্ধিরা গান্ধী লেখেন– ‘আমি আপনাকে আশ্বাস দিয়ে বলতে চাই, যে কোনো যুক্তিসঙ্গত আলোচনার জন্য আমাদের দরজা খোলা থাকবে। কিন্তু কারো একথা মনে করা উচিত নয় যে, ভারত কোনো হুমকি বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত অযৌক্তিক দাবির কাছে আত্মসমর্পণ করবে।’

চিঠির শেষে ‘শ্রদ্ধাসহ আপনার একান্ত ইন্দিরা গান্ধী’ লিখলেও ভারতের প্রধানমন্ত্রীর চিঠিতে মওলানা ভাসানীর অনুরোধ উপেক্ষিত হয়েছিল এবং বিশেষ করে শেষ বাক্যে দেয়া হয়েছিল প্রচ্ছন্ন হুমকি। জবাবে ইন্দিরা গান্ধীকে মওলানা ভাসানী লিখেছিলেন, ‘পারস্পরিক সহযোগিতা ও সমঝোতার মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে আমি আপনার মনোভাবের প্রশংসা করি। কিন্তু সে সমাধান হতে হবে স্থায়ী ও ব্যাপকভিত্তিক। এই সমাধান শুধু শুষ্ক মৌসুমের জন্য হলে চলবে না, বছরব্যাপী পানির প্রবাহ একই পরিমাণ হতে হবে।’

১৬ মে অনুষ্ঠিত ফারাক্কা মিছিল ছিল ওলানা ভাসানীর সমগ্র কর্মসূচির একটি অংশ। ’৭৬ সালের ১৮ এপ্রিল কর্মসূচী ঘোষিত হওয়ার পর সমগ্র জাতি ঐক্যবদ্ধ হয়েছিল, আওয়ামী লীগ এবং ভারতপন্থী কয়েকটি মাত্র রাজনৈতিক দল ছাড়া, সকলে সমবেত হয়েছিল মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে। ‘চলো চলো ফারাক্কা চলো’ স্লোগান মুখে সারাদেশ থেকে নারীপুরুষ গিয়েছিল রাজশাহী, ফারাক্কা মিছিলের সূচনাস্থলে। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে শান্তিপূর্ণ মিছিল ফারাক্কা অভিমুখে কানসাট পর্যন্ত গিয়ে থেমেছিল বাংলাদেশের সীমানার ভেতরে। এই মিছিলের আতঙ্কে ভারত সরকার রীতিমত যুদ্ধের প্রস্তুতি নিয়েছিল এবং এর পরিপ্রেক্ষিতে মওলানা ভাসানী তাঁর ভাষণে বলেছিলেন, ‘বাংলাদেশের দরিদ্র নিরস্ত্র মানুষের ভয়ে ভারতকে যখন সীমান্তে সৈন্য সমাবেশ করতে হয়েছে, তখন তার অবিলম্বে ফারাক্কা সমস্যার সমাধানে এগিয়ে আসা উচিত।’

এ কথা সত্য যে, ভারতের বৃহৎ প্রতিবেশীসুলভ এবং সম্প্রসারণবাদী মনোভাবের কারণে মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা মিছিল সমস্যার স্থায়ী সমাধান অর্জন করতে পারেনি, কিন্তু এ কথাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে, মূলত এই মিছিলের জনপ্রিয়তা এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এর ব্যাপক প্রচারণার ফলেই ভারতকে বহুদিন পর বাংলাদেশের সঙ্গে আলোচনার টেবিলে বসতে হয়েছিল। মওলানা ভাসানীর নেতৃত্বে জনগণের ঐক্য, সামরিক শাসক জেনারেল জিয়াউর রহমানকে সাহস যুগিয়েছিল। তিনি ১৯৭৬ সালেই জাতিসংঘে ফারাক্কার প্রশ্ন তুলে ধরেছিলেন। সাধারণ পরিষদের রাজনৈতিক কমিটির ২৪ নভেম্বরের সর্বসম্মত বিবৃতির ভিত্তিতে ভারত ও বাংলাদেশের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠক শুরু হয়েছিল এবং এই প্রক্রিয়ায় দীর্ঘদিন পর ১৯৭৭ সালের ৫ নভেম্বর ঢাকায় স্বাক্ষরিত হয়েছিল ‘ফারাক্কা চুক্তি’। আংশিকভাবে হলেও স্বীকৃত হয়েছিল গঙ্গার পানির ওপর বাংলাদেশের ন্যায়সঙ্গত দাবি ও অধিকার। বাংলাদেশের অনুকূলে ‘গ্যারান্টি ক্লজ’ ছিল চুক্তিটির উল্লেখযোগ্য বিষয়। (উল্লেখ্য, অবস্থায় পরিবর্তন ঘটেছিল ১৯৯৬ সালে, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ক্ষমতায় আগত আরেক আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। ১৯৯৬ সালের ১২ ডিসেম্বর সরকার ভারতের সঙ্গে ৩০ বছর মেয়াদী গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। স্বাক্ষরিত হওয়ার পর পর, ১৯৯৭ সালের মার্চেই ভারত চুক্তি লংঘন করেছিল। সর্বনিম্ন পরিমাণ পানি পাওয়ার রেকর্ডও স্থাপিত হয়েছিল ১৯৯৭ সালের মার্চেই২৭ মার্চ বাংলাদেশ পেয়েছিল মাত্র ছয় হাজার ৪৫৭ কিউসেক। এখনো বাংলাদেশকে বঞ্চিত করে চলেছে ভারত।)

ফারাক্কা চুক্তি’র মাধ্যমে গঙ্গার পানির ওপর বাংলাদেশের ন্যায়সঙ্গত দাবি ও অধিকারের স্বীকৃতি ছিল মওলানা ভাসানীর ফারাক্কা মিছিলের প্রত্যক্ষ অবদান। ফারাক্কা মিছিলের কারণে শুধু নয়, মওলানা ভাসানী স্মরণীয় হয়ে আছেন জাতির সঙ্কটকালে বলিষ্ঠভাবে এগিয়ে আসার কারণেও। ৯৬ বছর বয়সে অসুস্থ শরীর নিয়েও তিনি বৃহত্তর জাতীয় স্বার্থে নেতৃত্ব দিয়ে গেছেন, নতিস্বীকার করেননি কোনো হুমকির কাছে। স্বাধীন বাংলাদেশে তিনি দেশপ্রেমিক প্রধান জাতীয় নেতার অবস্থানে থেকেছেন এবং ভারতের শোষণমূলক সম্প্রসারণবাদী নীতি ও বাংলাদেশকে ইচ্ছাধীন করার কর্মকান্ডের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। এরই ধারাবাহিকতায় তিনি ফারাক্কা মিছিলের ডাক দিয়েছিলেন, সে মিছিলে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীসহ ভারতীয়রা হুমকি দিয়ে এবং সীমান্তে যুদ্ধ প্রস্তুতি নিয়েও মওলানা ভাসানীকে এক চুল পরিমাণ টলাতে পারেনি। সম্পূর্ণ সাফল্য অর্জন করতে না পারলেও ফারাক্কা মিছিলের মাধ্যমে মওলানা ভাসানী গঙ্গার পানির ওপর বাংলাদেশের দাবি ও অধিকার আদায় করার পথ দেখিয়ে গেছেন।।