Home » অর্থনীতি » অনুমতি ছাড়া বাংলাদেশে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণে ভারতের একতরফা উদ্যোগ

অনুমতি ছাড়া বাংলাদেশে কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণে ভারতের একতরফা উদ্যোগ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

container terminalসরকারের কোনো অনুমতি না নিয়ে বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের উদ্যোগ নিয়েছে ভারত। কোনো অনুমতি না নিলেও ইতোমধ্যে ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে এই কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণের লক্ষ্যে টেন্ডার বিজ্ঞপ্তিও প্রকাশিত হয়েছে। কোনো দেশের অনুমতি ছাড়া এককভাবে এ ধরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণে হতবাক হয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল। একের পর এক এ ধরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের কারণে নানা প্রশ্ন উঠেছে।

ঢাকার সংবাদপত্রেও এ ধরণের খবর প্রকাশিত হয়েছে। নারায়ণগঞ্জে বেসরকারি অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ নির্মাণের প্রস্তুতি নিচ্ছে তারা। এরই মধ্যে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণে কারিগরি ও বাণিজ্যিক সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের জন্য টেন্ডারও আহ্বান করেছে এবং এটি জমা দেয়ার সময় সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ৭ জুন। কুমুদিনী ওয়েলফেয়ার ট্রাস্টের ৪৬ একর জমিতে এটি স্থাপন করা হবে বলে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটের টেন্ডার ডকুমেন্ট থেকে জানা যায়। সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধির প্রশ্নের জবাবে বলা হয়, কুমুদিনী ও বাংলাদেশ সরকার বলেছে, তারা এ সম্পর্কে কিছুই জানে না। অথচ অন্য কোনো দেশের কোনো সরকার বা কোম্পানি এ দেশে বিনিয়োগের উদ্যোগ নিলে তার সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালযের মাধ্যমে পেশ করতে হয়। বিনিয়োগ বোর্ডসহ সরকারের বিভিন্ন দফতর থেকে সে প্রস্তাব অনুমোদনের প্রয়োজন রয়েছে। এক্ষেত্রে তা মানা হয়নি বলেও বলা হয়েছে। এমনকি ভারত সরকার এমন একটি উদ্যোগ নিলেও বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কোনো প্রতিবাদও জানানো হয়নি এ প্রতিবেদন লেখার আগ পর্যন্ত। জানা যায়, এ বিষযে বাংলাদেশ সরকারের নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, সমুদ্র পরিবহন অধিদফতর ও বিনিয়োগ বোর্ড কারো অনুমতি নেয়নি ভারত সরকার। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের পরিকল্পনা ও উন্নয়ন শাখাসহ বন্দর শাখাও এ বিষয়ে কোনো কিছুই অবগত নয় বলে জানিয়েছে। বিনিয়োগ বোর্ডেও এসংক্রান্ত কোনো আবেদন জমা পড়েনি। আমাদের বুধবারএর কাছে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত টেন্ডারের যে কপি রয়েছে তাতে দেখা যায়, টার্মস অব রেফারেন্স উল্লেখ করা হয়েছে যে, বাংলাদেশের নারায়নগঞ্জে কুমুদিনী ওয়েরফেয়ার ট্রাস্ট অব বেঙ্গল লিমিটেড ও ভারতের যৌথ উদ্যোগে এটি নির্মিত হবে। এমন উদ্যোগ নিলেও ভারতের সঙ্গে তাদের আলোচনা হয়েছে কিনা, তা জানায়নি কুমুদিনী। নারায়ণগঞ্জে তাদের জমিতে অভ্যন্তরীণ কনটেইনার টার্মেনাল নির্মাণ করা হবে। এ ব্যাপারে কারো কোনো সহায়তা নেয়ার পরিকল্পনা নাকি তাদের নেই। জানা গেছে, কয়েক বছর আগে এটি নির্মাণের পরিকল্পনায় গ্রহণ করে তারা সহযোগী প্রতিষ্ঠান হিসিবে গঠন করা হয় কুমুদিনী কনটেইনার টার্মিনাল। বলা হয়, চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরের পাশাপাশি ভারতীয় আমদানিরফতানিকৃত পণ্য লোডআনলোডে নারায়ণগঞ্জ কনটেইনার টার্মিনাল স্থাপনই এর প্রধান উদ্দেশ্য।

এছাড়া ভারতের একতরফা উদ্যোগে এর আগে ট্রানজিট প্রটোকল স্বাক্ষরের আগে তিস্তা নদীর একটি অংশ ভরাট অর্থাৎ আড়াআড়ি বালু ফেলে রাস্তা করে দেয়া হয় ভারতের পালাটানায় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়ার জন্য। এতে তিস্তা নদীর গতি অনেকটাই নষ্ট হয়ে যায়। খবরে প্রকাশ হয়, বাংলাদেশের গ্যাসের ওপর নির্ভর করেই পালাটানা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ ও এটি চলবে। অথচ বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে একজন উপদেষ্টা এ ধরণের কোনো সম্ভাবনা নেই বলে জানিয়েছিলেন। অথচ ভারতের এনটিপিসির ওয়েব সাইটে এ তথ্য ছিল। ভারতের অনলাইন নিউজ পোর্টাল সিফি ডট কম ও ডেইলি ইন্ডিয়া ডট কমএ ‘ওএনজিসি সেট আপ ফার্স্ট পাওয়ার প্রজেক্ট টু রান অন বাংলাদেশ গ্যাস’ শিরোনামে প্রকাশিত এক সংবাদে ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান দি অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস করপোরেশন লিমিটেড (ওএনজিসি)-এর বরাত দিয়ে বলা হয়, ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলা থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরে পলাতনায় এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। এ প্রকল্পে ব্যয় হচ্ছে ৯ হাজার কোটি ভারতয়ি রুপি।

সংবাদে আরও বলা হয়, ভারতের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান ওএসজিসি এই প্রকল্পের কাজ করছে। এরই মধ্যে ৭২৬ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রথম ইউনিটের কাজ শেষ হয়ে গেছে। এই পুরো প্রকল্প চলবে বাংলাদেশের গ্যাসে। ওএসজিসির চেয়ারম্যান আর এস শর্মার উদ্ধৃতি দিয়ে সংবাদে আরও বলা হয়, পালাটানা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে ভারত বিদ্যুৎ পাবে। আর পুরো প্রকল্প চালু হবে ২০১২ সালের মার্চ মাসের মধ্যে। এই প্রকল্প সচল করতে এরই মধ্যে প্রকল্প এলাকায় গ্যাসলাইন বসানো হয়েছে। তবে এ ধরণের সকল সম্ভাবনাই নাকচ করেন প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানি উপদেষ্টা তৌফিকএলাহী চৌধুরী। পরবর্তী অগ্রগতি সম্পর্কে তেমন কিছু আর জানা যায়নি।

বাংলাদেশের কাছে দীর্ঘদিন যাবৎ ট্রানজিট চেয়ে আসছে ভারত। অবকাঠামোগত কারণে এখনই পূর্ণাঙ্গ ট্রানজিট দেয়া সম্ভব নয় জানিয়ে গত বছর ট্রান্সশিপমেন্ট নামে পরীক্ষামূলক ট্রানজিট চালু করে বাংলাদেশ সরকার। এর আগে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় ২০১০ সালের ১১ জানুয়ারি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরকালে। আর তা স্থান পায় ঘোষিত ৫০ দফা যৌথ ইশতেহারে। ট্রানশিপমেন্টের আওতায় ভারতের ত্রিপুরার পালাটানায় ৭২৬ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রয়োজনীয় ভারী যন্ত্রপাতি পরিবহনের জন্য ৩০ নভেম্বর ২০১০ ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হয়। সমঝোতায় বলা হয়, কোনো ধরণের ট্রানজিট ফি ছাড়াই ভারতীয় কনটেইনার পশ্চিমবঙ্গের রায় মঙ্গল থেকে নদীপথে সাতক্ষীরা হয়ে আশুগঞ্জ নদী বন্দরে আসে এবং তারপর আশুগঞ্জ থেকে সড়কপথে আখাউড়া স্থলবন্দর হয়ে ভারতের ত্রিপুরায় যায়। এজন্য অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে বাংলাদেশকে ভারত সরকার এককালীন ২৫ কোটি ৫০ লাখ টাকা প্রদানের আশ্বাস ছিল। তা পাওয়া গেছে কিনা, আজও জানা যায়নি। এ সম্পর্কে সরকারিভাবে আর কিছুই বলা হচ্ছে না।

এই স্বল্প বাজেটে পুরো অবকাঠামোগত উন্নয়ন সম্ভব ছিল না। কিন্তু তা নিয়ে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে তখন কিছু বলা হয়নি। এই টাকা দিয়ে আশুগঞ্জ বন্দর উন্নয়ন, রাস্তা মেরামত ও প্রশস্ত করা হয়। কিন্তু রাস্তার বিভিন্ন জায়গায় থাকা সেতু ও কালভার্টগুলো থেকে যায় আগের অবস্থাতেই। এগুলোর সর্বোচ্চ ভারবহন ক্ষমতা ১৫ টন। ফলে দেখা গেল, ভারতের ৩২৫ টন ওজনের ওডিসি পরিবহনে সক্ষম ১২০ ফুট দৈর্ঘ্যরে বিশাল ভারতীয় ট্রেইলার পরিবহনে এসব কালভার্ট ও সেতু কোনোক্রমেই সক্ষম নয়। তাই ভারতের আসাম বেঙ্গল কেরিয়ার বা এবিসি ইন্ডিয়াকে সেতু ও কালভার্টগুলোর পাশ দিয়ে বিকল্প রাস্তা তৈরি করার দায়িত্ব দেয়া হয়। তারা সেতু ও কালভার্টের নিচ দিয়ে বয়ে যাওয়া তিতাস নদী ও তার খালগুলোর মধ্য দিয়েই বালু ও সিমেন্টের বস্তা দিয়ে রাস্তা তৈরি করে। এবিসি তাদের বাংলাদেশি সাবকন্ট্রাক্টর গালফ ওরিয়েন্ট সিওয়েজএর মাধ্যমে এ কাজ করায়। পরবর্তীতে তীব্র প্রতিবাদের কারণে সড়কটি কেটে দেয়া হলেও তিস্তার যে ক্ষতি হয়েছে তা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হয়নি এখনো। নদীর মাঝখানের সে সড়ক কেটে দেয়া হলেও একটি বড় অংশ এখনো রয়ে গেছে।

বাংলাদেশের বহুল সমালোচিত মোবাইল ফোন অপারেটর ভারতীয় প্রতিষ্ঠান এয়ারটেল বাংলাদেশ লিমিটেডের বিরুদ্ধে আবারো বড় অঙ্কের রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। ফাঁকি দেয়া রাজস্ব বাবদ সুদসহ ১১৭ কোটি টাকা পরিশোধের নির্দেশ দিয়েছে এনবিআর। নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে এরিকসনের সঙ্গে সম্পাদিত দুটি চুক্তি মূল্যের বিপরীতে এ রাজস্ব ফাঁকি দেয় ভারতী এয়ারটেলের মালিকানাধীন এই মোবাইলফোন অপারেটরটি। সূত্র মতে, ২০০৬ সালের মাঝামাঝি ওয়ারিদ টেলিকম ইন্টারন্যাশনাল এরিকসন এবির সঙ্গে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ ও জিএসএম নেটওয়ার্ক উন্নয়নের উদ্দেশ্যে দুটি চুক্তি করে। চুক্তি মূল্য ছিল ১৮ কোটি ২৭ লাখ ৫৭ হাজার ১২১ ডলার। বাংলাদেশী টাকায় এটার মূলমান এক হাজার ২৭৫ কোটি ১৩ লাখ ৪৪ হাজার ৬২৬ টাকা। এনবিআরের প্রজ্ঞাপন ১৭০আইন/২০০০/ ২৬৯মূসক অনুযায়ী ওয়ারিদ ও এরিকসনের মধ্যকার চুক্তিটি নির্মাণ সংস্থা হিসেবে গণ্য হবে। এসব দিক বিবেচনায় সম্পূর্ণ চুক্তির ওপর ৪ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে ভ্যাট দিতে হবে। এ হিসাবে সরকারের কোষাগারে ৫৭ কোটি ৩৮ লাখ ১০ হাজার ৫০৮ টাকা পরিশোধ করার কথা ওয়ারিদের। ওই সময় মাত্র ৪৫ হাজার ১৩০ টাকা পরিশোধ করা হয়। সম্প্রতি যা এনবিআরের অনুসন্ধান দলের নজরে আসে। চুক্তি পর্যালোচনায় ৫৭ কোটি ৩৭ লাখ ৬৫ হাজার ৩৭৮ টাকা রাজস্ব ফাঁকির প্রমাণ পায় এনবিআর। নির্দিষ্ট সময়ে রাজস্ব পরিশোধ না করায় ২ শতাংশ হারে ২০১২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত এর সুদ দাঁড়ায় ৫৯ কোটি ৬৭ লাখ ১৫ হাজার ৯৯৩ টাকা। এক্ষেত্রে ২০০৮ সালের আগস্ট থেকে ৫২ মাসের সুদ হিসাব করা হয়েছে। সব মিলিয়ে এয়ারটেলের কাছে সরকারের পাওনা দাঁড়িয়েছে ১১৭ কোটি ৪ লাখ ৮১ হাজার ৩৭১ টাকা। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যমে অবশ্য এ খবরটি বেশ গুরুত্বের সঙ্গে ছাপা হয়েছিল।।