Home » আন্তর্জাতিক » চ্যালেঞ্জের সামনে নওয়াজ শরীফ

চ্যালেঞ্জের সামনে নওয়াজ শরীফ

চন্দন সরকার

nawaz sharifপাকিস্তানের ৬২ বছরের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো একটি বেসামরিক সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে জয় পাকিস্তান মুসলিম লীগ (নওয়াজ) প্রধান নওয়াজ শরীফের জয় তাকে নতুন গুরুত্ব দিয়েছে।

শুধু একটি বেসামরিক সরকারের অধীনে নির্বাচন নয়, সেই সঙ্গে এই প্রথমবারের মতো একটি বেসামরিক সরকারের নির্দিষ্ট মেয়াদান্তে এ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। প্রথমবারের মতো সামরিক বাহিনী নির্বাচনে হস্তক্ষেপ বা সরাসরি ক্ষমতার ভাগীদার হয়নি। সব মিলিয়ে পাকিস্তান তার ইতিহাসে প্রথমবার গণতান্ত্রিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পথে পা বাড়িয়েছে।

নির্বাচনী ফলাফলে প্রধান তিনটি দল উঠে এসেছে এবং এতে তেমন কোনো চমক সৃষ্টি হয়নি। ফলাফল যেমনটি ধারণা করা হয়েছিল তেমনটিই হয়েছে। নওয়াজ ও তার দল সংখ্যাগরিষ্ঠ হয়ে সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। অন্যদিকে, বিরোধী আসনে বসবে ইমরান খানের তেহরিক ইনসাফ। সদ্য বিদায়ী ক্ষমতাসীন দল পিপিপি যা হাল হবার, তাই হয়েছে।

উপমহাদেশীয় তথা, পাকিস্তানের রাজনীতিতে ডাইন্যাস্টি বা উত্তরাধিকার রাজনীতির একটি চলমান ধারা রয়েছে। পাকিস্তানের এবারের নির্বাচনে সেই ধারাও ক্ষুণ্ন হয়েছে। শুধু যে ভুট্টো পরিবার বা পরিবারের ইমেজ নির্বাচনে ব্যর্থ হয়েছে তাই নয়, সেই সঙ্গে গিলানি খার, জাতোই, চিমা, মিয়া ইত্যাদি বেশ কিছু বংশ বা পরিবার পাকিস্তানি রাজনীতিতে মৌরসী পার্বন সাজিয়ে বসেছিল, অন্তত আগামী পাঁচ বছরের জন্য তারও অবসান ঘটেছে। এসব পরিবার ও বংশের একাধিক ব্যক্তি কেন্দ্র ও প্রাদেশিক পরিষদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে হেরে গেছে। এমনকি এসব কেউ পার্লামেন্ট বা প্রাদেশিক পরিষদে নির্বাচনে আসন পায়নি। পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসে এটাও একটি মাইলফলক।

পাকিস্তানের ইতিহাসে কায়েমী রাজনৈতিক শক্তি সামরিক বাহিনী। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ৬২ বছরের ইতিহাসে তারাই ক্ষমতায় থেকেছে। লেবাস যাই হোক। এবার তার সাময়িক হলেও অবসান হয়েছে। বিকৃত হয়েছে সেনাশাসক পারভেজ মোশাররফ।

সংক্ষিপ্ত এই পটভূমিতে ক্ষমতায় আসছেন নওয়াজ শরীফ। নওয়াজ শরীফের ভবিষ্যৎ পথ যে কুসুমাস্তীর্ণ নয় তা যে কেউই বলতে পারে। দেশটির রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক যে ভিত্তি তৈরি হয়েছে তার প্রতিটি ফ্রন্টেই লড়াই করতে হবে তাকে।অভ্যন্তরীণ এই লড়াইয়ের বাইরে বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রেও স্বস্তি কতোটা মিলবে তা বলা দুষ্কর।

নওয়াজ শরীফকে আগামী পাঁচ বছরে অভ্যন্তরীণ ভাবে যে সব চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে হবে তার মধ্যে মোটা দাগে থাকছে সন্ত্রাসবাদ, বিচ্ছিন্নতাবাদ, একমাত্র পাঞ্জাব ছাড়া বাকি তিন প্রদেশের প্রতিপক্ষ শক্তির সরকার ইত্যাদি। এর প্রতিটিতেই জড়িত রয়েছে যেমন প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দল, তেমনি সামরিক বাহিনী। ওসামা বিন লাদেন হত্যাকাণ্ড নিয়ে বিপর্যস্ত সামরিক বাহিনী আপাতত পিছু হটলেও হাল ছাড়বে বলে মনে হয় না। নওয়াজ শরীফের মূল দ্বন্দ্ব সামরিক বাাহিনীর সঙ্গেই। এই দ্বন্দ্বে তার প্রধান সহায় ছিল মিয়া ইফতেখার আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন বিচার বিভাগ। বিচারপতি ইফতেখার অবসরে যাবেন শিগগিরই, এরপর যিনি প্রধান বিচারপতি হবেন নওয়াজের সঙ্গে তার সম্পর্ক ও তার ব্যক্তিত্বের ওপর অনেকাংশেই নির্ভর করবে নওয়াজের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলার শক্তি।

পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর শক্তি এখনো অসীম। দেশটির পারমাণবিক স্থাপনা, ব্যবসা বাণিজ্য, প্রশাসন সবকিছুতেই কর্তৃত্ব তাদের। দীর্ঘদিনের এই ক্ষমতার জগদ্দলের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় ব্রতী হতে হবে তাকে। সামাজিকভাবে ধর্মীয় ও বিভিন্ন সেক্টরিয়াল উপধারার যে শেকড় গভীরে প্রোথিত তাও মোকাবেলা করতে হবে তাকে।

দুর্নীতি ও অর্থনৈতিক অনিয়ম দেশটিকে বিপর্যস্ত করে ফেলেছে। বিদ্যুৎ সঙ্কটে কলকারখানা বন্ধ, বেকারত্বের বিরাট বোঝা কাঁধে। এই পরিস্থিতির উত্তরণ ও সামরিক বাহিনীকে দূরে রাখার চ্যালেঞ্জই হবে তার জন্য প্রধান। সেনাবাহিনীর কর্তৃত্ব এখন ব্যবসা বাণিজ্য থেকে শিল্প সর্বত্র প্রসারিত। করপোরেশনগুলো ফৌজি ট্রাস্টের অধীনে সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের দ্বারা পরিচালিত। প্রায় ৭০ শতাংশ ব্যবসা বাণিজ্য ও আবাসন, টেলিকমসহ সেবাখাত এখন তাদের অধীন। সরকারি সব ঠিকাদারি প্রথম যায় তাদের কাছে। তাদের সঙ্গে দোসর হিসাবে রয়েছে দুর্নীতিবাজ আমলারা।

কোনো গণতাান্ত্রিক বেসামরিক সরকার এটা বরদাশত করতে পারে না। রাষ্ট্র চালানোর দায়িত্ব বেসামরিক রাজনৈতিক শক্তির। সামরিক বাহিনীর কাজ দেশ শাসন নয়, বরং দেশ রক্ষার। পাকিস্তানে এবার প্রথমবারের ভোট তার সক্ষমতার প্রমাণ রেখেছে। এই প্রথমবার একটি নির্বাচিত রাজনৈতিক সরকারের অধীনে নির্বাচন হয়েছে। গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক শক্তির বহুধা বিভক্তি ও সাংঘর্ষিক সম্পর্কের পথ ধরেই ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে সামরিক বাহিনী। নওয়াজ শরীফকে এবার সেই ম্যাচুরিটির পরিচয় দিতে হবে।

সেপ্টে¤¦র পর্যন্ত প্রতিপক্ষ আসিফ আলী জারদারীই প্রেসিডেন্ট থাকবেন। তারপর তাকে নতুন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করতে হবে। পাকিস্তানের সংবিধান অনুযায়ী প্রেসিডেন্ট সরকারের বিভিন্ন কাজে হস্তক্ষেপ ও বাধার সৃষ্টি করতে পারে। নওয়াজ শরীফকে তাই এ ব্যাপারেও নজর রাখতে হবে।

বৈদেশিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নওয়াজের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হচ্ছে ভারত, আফগানিস্তান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র তো অবশ্যই। নির্বাচনে জয়ী হওয়ার পরই তিনি তার শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানে ভারতের প্রধানমন্ত্রীকে আমন্ত্রণ জানানোর কথা বলেছেন। তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হতে যাচ্ছে নওয়াজ। এর আগেরবার তিনি বাজপেয়ী সরকারের সঙ্গে সম্পর্কের নতুন ধারা সৃষ্টি করতে উদ্যোগী হয়েছিলেন। সে সময় সামরিক বাহিনীর কলকাঠিতে কারগিল সংঘর্ষ সবকিছু ভেস্তে দেয়। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেও সম্পর্কের ধারায়ও সামরিক বাহিনী চলে আসে। পাশের আফগান সীমান্ত সবচেয়ে ভঙ্গুর। সেখানে যেকোনো মতলববাজ তার দুরভিসন্ধি নিয়ে এগিয়ে আসতে পারে। এসব চ্যালেঞ্জকে মোকাবেলা করেই এগিয়ে যেতে হবে তাকে। সবকিছুর পর একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার মূল স্তম্ভ হচ্ছে তার প্রতিষ্ঠানগুলো। দীর্ঘ সেনাশাসন বিশেষ করে সর্বশেষ জেনারেল মোশাররফের শাসন পাকিস্তানের প্রাতিষ্ঠানিক ভিতকেই তছনছ করে দিয়েছে। মোশাররফ এটা করেছেন তার ব্যক্তিগত শাসনকে কায়েম রাখার জন্য। নওয়াজকে রাষ্ট্রের মূল স্তম্ভ এসব প্রতিষ্ঠানকে আবার প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ফিরিয়ে দিতে হবে।

পাকিস্তানের জনগণ প্রবল বাধা বিপত্তি অগ্রাহ্য করে নির্বাচনে শামিল হয়েছেন। গণতান্ত্রিক শক্তি যে অজেয় এবং ফিরে আসে তাও প্রমাণ করেছেন সে দেশের জনগণ। নওয়াজ শরীফের দায়িত্ব তা ধরে রাখা। একটি একনায়ক ও লুটেরা শক্তির বিকাশ যাতে না হয় সেদিকে নজর রাখা। জনগণ বহু আশা করে তার ওপর সেই দায়িত্ব দিযেছেন। শরীফের উচিত হবে জনগণের ওপর ভরসা রেখে এই সব দুস্তর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা।।