Home » অর্থনীতি » তেল সম্পদ লুট দেশে দেশে

তেল সম্পদ লুট দেশে দেশে

সম্পদ যখন অভিশাপ

ফারুক চৌধুরী

oil-22তেলগ্যাস লুটের প্রসঙ্গ উঠলে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের পাশাপাশি যে এলাকার নাম মাথার ভেতরে উঁকি দেয়, সেটি হচ্ছে আফ্রিকা।

আফ্রিকা মহাদেশে নানা দেশে ছড়িয়ে আছে তেল। আর এর সঙ্গে সঙ্গে এসব দেশে, দেশগুলোর সমাজে, অসংখ্য মানুষের জীবনে, রাজনীতিতে, অর্থনীতিতে লেগে আছে লুটের চিহৃ। কোন দেশের নাম বাদ দেয়া যায়? বেশ সমস্যায় পড়তে হয়। আফ্রিকার দেশে দেশে তেলগ্যাস ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদ লুটের চিহ্ন।

সুদান (এখন এ দেশটি ভাগ হয়ে গঠিত হয়েছে দুটি দেশ এবং তা তেল নিয়ে বিরোধকে কেন্দ্র করে), লিবিয়া, নাইজেরিয়া, এঙ্গোলা, গিনি, শাদ, ক্যামেরুন এমন অনেক নাম। এসব দেশ থেকে তেল নিয়ে যায় নানা নামের বড় বড় কোম্পানি। সে সব কোম্পাটির ঘরে ওঠে মুনাফার অর্থ। আর দেশগুলোর মানুষরা রয়ে যান গরিব। এদের গরিবি অবস্থা ঘোঁচে না। বরং দুর্ভাগ্য আর দুর্দশা তাদের ক্রমাগত তারা করে ফেরে।

এঙ্গোলায় দীর্ঘদিন চলেছে রক্তক্ষয়ী গৃহযুদ্ধ। আর সেই গৃহযুদ্ধের খরচ যোগাতে কার্যত বন্ধক দেয়া হয়েছে দেশটির তেল সম্পদ। গিনি উপসাগরের তেল লুটে নিতে ভিড় জমিয়েছে বড় বড় তেল কোম্পানি, চলছে নানা কৌশল, ষড়যন্ত্র। নাইজেরিয়ার কাহিনী বহু আলোচিত। রক্তে লেখা অনেক নামের একটি নাম কঙ্গো।

একদিকে লুট, গুটি কয়েক কোম্পানির বিপুল মুনাফা ও আরেক দিকে, দারিদ্র, রোগ, অনাহার, বঞ্চনা, দুর্নীতি, দুঃশাসন, লুটেরা কোম্পানিগুলোর সঙ্গে দেশি ক্ষমতাধরদের আঁতাত, পুরো রাজনীতিতে জবাবহীনতা, অসচ্ছতা, নির্যাতন এ হচ্ছে কারো কারো কথায় সম্পদ আর দারিদ্র্যের বৈপরীত্য। কেউ এ ধরণটিকে বলেন, সম্পদের অভিশাপ।

এ সম্পদকে কেন্দ্র করে এখন হাঙ্গামা বাঁধে, শুরু হয় গৃহযুদ্ধ, ঘটে বিদেশি হস্তক্ষেপ, আর এ সবের সঙ্গে থাকে রক্তপাত, তখন ‘সম্পদের অভিশাপ’ শব্দ দুটি বারবার উচ্চারিত হয়।

এঙ্গোলা : হোয়ার পেট্রোডলার্স পারপেচুয়েট প্রোভাটি শিরোনামের নিবন্ধে বলা হয়েছে, আফ্রিকায় তেল উৎপাদক দেশগুলোর মধ্যে এঙ্গোলা সবচেয়ে কার্যকরভাবে নিজ তেল সম্পদের বিপুল অংশ নিজ ঘরে রাখতে পেরেছে। তা সত্ত্বেও এ সম্পদ থেকে সবচেয়ে কম সুবিধা পান এঙ্গোলার জনগণ। এক দীর্ঘ ধ্বংসাত্মক গৃহযুদ্ধের দায় পরিশোধে এঙ্গোলার তেল সম্পদের বিপুল অংশই বন্ধক রাখতে হয়েছে। অবশিষ্ট যা থাকে, সেটাও হারিয়ে যায় সরকারের ও সরকারি তেল সংস্থা সোনানগোলয়ের কাজকর্মে স্বচ্ছতাহীনতা ও বড় বড় তেল কোম্পানির সঙ্গে আঁতাত করে কাজ করার কারণে। ফলে এঙ্গোলার গরিবদের জন্য তলানিতে থাকে যৎসামান্য।

অয়েল গ্র্যাব ইন দি গালফ অব গিনি শীর্ষক নিবন্ধে হিউ ম্যাককালাম লিখেছেন, গিনি উপসাগর বা গালফ অব গিনি দেখে মনে হয় আটলানিন্টক মহাসাগর যেন এখানে দুটি বাহু দুই দিকে ছড়িয়ে দিয়েছে। আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল এখানে বাঁক নিয়েছে বেশ বড় জায়গা জুড়ে। পৃথিবীর প্রচলিত তেলের সবচেয়ে বড় মজুদগুলোর একটি রয়েছে এ উপসাগরে। তাই এখানে জায়গা পাবার জন্য, অনুসন্ধান ও উৎপাদন অধিকার হাতিয়ে নেয়ার জন্য ঠেলাঠেলি করছে ডজন খানেক দেশ। তবে এখনো পর্যন্ত আফ্রিকায় এমন একটিও উদাহরণ নেই, যেটা দেখিয়ে দেয় যে, তেল সম্পদ দীর্ঘ মেয়াদে ইতিবাচক ফল বয়ে এনেছে। তাই অনেকের আশঙ্কা, গিনি উপসাগরের কূলে কূলে থাকা দেশগুলোও দেখবে তেল প্রাপ্তির সচরাচর দেখা ফলাফল। সে ফলাফল কেবল বয়ে আনে দুর্যোগ। এ দেশগুলোতে আগে থেকেই রয়েছে প্রবল দারিদ্র আর অগণতান্ত্রিক সরকারের অপশাসনদুঃশাসন।

টু ইয়ার্স অন : দি শাদ ক্যামেরুন পাইপ লাইন, অ্যান্ড দি ইসু অব সভরেনটি শিরোনামের নিবন্ধে চার্লস নদিকা লেখেন, শাদ থেকে ক্যামেরুন পর্যন্ত যে তেল নল বা পাইপ লাইন পাতা হয়েছে, যেটার শুরু হয়েছিল বিশ্বব্যাংকের একটি মডেল অনুসারে। যথাযথ আইনগত ব্যবস্থা যদি থাকে, তাহলে তেল আহরণের একটি প্রকল্প দেশটির জনগণের জন্য কেমন কল্যাণ বয়ে আনতে পারে, সেটটা দেখানোই ছিল এ মডেলের উদ্দেশ্য। কিন্তু দুই বছর না যেতেই দেখা গেল, দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য প্রকল্প থেকে প্রাপ্ত অর্থ নিশ্চিতভাবে ব্যবহারের ব্যবস্থাটি গড়বড় হয়ে গেছে। ভন্ডুল হয়ে গেছে সব আয়োজন। এই ভণ্ডুল হওয়ার কাজটি শুরু হয়েছিল সরকারের একটি জবরদস্তি দাবির মধ্যদিয়ে। সরকার দাবি করলো, প্রাপ্ত অর্থ নিজ ইচ্ছা মতো, নিজ পছন্দ অনুযায়ী ব্যবহার করবে সরকার। সরকারের সার্বভৌম অধিকার। তাই সার্বভৌমত্বের এ ধারণা তৈরি করলো আরো প্রশ্নের। আর এদিকে জনগণের অবস্থা যেমন ছিল, তারচেয়ে ভালো তো হলোই না বরং জনগণ যে তিমিরে ছিলেন, সে তিমিরেই রয়ে গেলেন।

অয়েল অ্যান্ড দি ন্যাচারাল রিসোর্সেস কার্য ইন নাইজেরিয়া শীর্ষক নিবন্ধে দাউদা গারুবা লিখেছেন, সাহারা সন্নিহিত এলাকায় তেলতেজি অবস্থার কথা বলুন, সঙ্গে সঙ্গে মনের পর্দায় ভেসে উঠবে নাইজেরিয়ার নাম। এই অঞ্চলে নাইজেরিয়া গোড়ার দিকে তেল তোলা শুরু করে। এই অঞ্চলে নাইজেরিয়া তেল তোলে সবচেয়ে বেশি। দেশটি তেল রফতানিকারক দেশগুলোর সংগঠন বা ওপেকের সদস্য। তেল বিক্রির শত শত কোটি ডলার দেশটিকে দিয়েছে একটি নতুন ঝকঝকে রাজধানী, আকাশছোঁয়া অট্টালিকা, চমৎকার প্রশস্ত সড়ক আর সড়ক, দেশের নানা জায়গায় বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু আফ্রিকার অন্যান্য দেশে জনসাধারণের অবস্থা যেমন নাইজেরিয়ার সাধারণ মানুষের অবস্থা তার চেয়ে একটুও ভালো নয়। আর দেশটির বদ্বীপ অঞ্চলে তেল কূপের ধারে, তেল উত্তোলন মঞ্চের ছায়ায় ছায়ায় বসবাস করেন যে নাগরিকরা, তারা যেন পুরো মাত্রায় শুরু হওয়া গেরিলা যুদ্ধের মধ্যেই আছেন।

এভাবে একের পর এক উদাহরণ পাওয়া যায়। আর এ সব উদাহরণের সঙ্গে নানা দেশের এ ধরণের ঘটনার তুলনা করলে বুঝতে পারা যায়, ভেনেজুয়েলা তেলের অর্থ জনকল্যাণে নিয়োজিত করতে গিয়ে শ্যাভেজকে কি করতে হয়েছে, কেন তিনি তেল বেপারিদের শত্রু। একই সঙ্গে প্রশ্ন তাড়া করে ফেলে, এ সব ঘটনা, এতো লুট, এতো রক্তপাত, এতো ষড়যন্ত্র কেন? সাধারণ মানুষ নিশ্চয়ই প্রশ্ন করেন, কেন? কেন? কেন? নিশ্চয়ই, প্রশ্ন দেখা দেয়, এ অবস্থা, এ চক্র থেকে পরিত্রাণের উপায় নেই। কোনো উপায় নেই?