Home » রাজনীতি » বিএনপি কি কার্যকর বিরোধী দল?

বিএনপি কি কার্যকর বিরোধী দল?

জাকির হোসেন

BNPসরকারের প্রায় শেষ সময়ে এসে বিরোধীদল দমনে চূড়ান্ত পর্যায়ে কঠোর অবস্থান নিয়েছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। সরকার যত্রতত্র বিরোধী দলের শীর্ষস্থানীয় নেতাদের বিরুদ্ধে মামলা দিচ্ছে, গ্রেফতার করে জেলে পাঠাচ্ছেএমনকি দ্রুতবিচার আইনে বিচার করারও উদ্যোগ নিয়েছে। কিন্তু বিএনপি কার্যকর কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারছে নাএ ব্যাপারে নানা বিভ্রান্তিতে ভুগছেন দলের নীতি নির্ধারকরা। বর্তমান সময়ে বিএনপি’র প্রধান দাবি নির্দলীয় সরকারের অধীনে অবাধ সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠান। এ দাবি মানতে সরকারকে এ পর্যন্ত তিন দফা আলটিমেটাম বা সময় বেঁধে দিয়েছেন বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। প্রথম দফায় ২০১২ সালের মার্চে ৯০ দিন সময় বেঁধে দেন। এ সময় শেষ হওয়ার পর ১১ জুন দাবি আদায়ে আবারও সময় দিয়ে বলেন, রোজার ঈদের (২০১২) পর কঠোর আন্দোলন করা হবে। সর্বশেষ ৪ মে শাপলা চত্বরে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন। সে সময়সীমা অতিক্রম করে এই বুধবার পর্যন্ত আরো ১৮ দিন পার হয়েছে। এরপরও নতুন কোনো কর্মসূচি দিতে পারেনি দলটি। তবে সমাবেশের মাধ্যমে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা কথা দলের পক্ষ থেকে বলা হলেও সমাবেশের অনুমতি দেয়নি সরকার। উপরন্তু গত রোববার থেকে দেশব্যাপী সভাসমাবেশের উপর নিষেধজ্ঞা আরোপ করেছে সরকার। এ প্রেক্ষিতে দেশের সার্বিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে প্রবীণ রাজনীতিক ভাষাসৈনিক আবদুল মতিন বলেন, ‘আমরা এখন একটি উল্লেখযোগ্য সময় অতিক্রম করছি। বর্তমানে বাম দলগুরোর মতো বুর্জুয়া রাজনৈতিক দলগুলোও জনবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এর প্রমাণ দুই তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের সরকার বিরোধী দল দমন করতে রাজনৈতিক পদক্ষেপের পরিবর্তে প্রশাসনিক শক্তিকে ব্যবহার করছে। অন্যদিকে সরকারের এ অগণতান্ত্রিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে বিরোধী দল কোনো গণপ্রতিরোধ গড়ে তুলতে পরছে না। এটা দেশের সার্বিক রাজনীতির জন্য একটি অশনি সংকেত। এ অবস্থার অবসান জরুরি’।

বস্তুত বিএনপি প্রধান বিরোধী দল হওয়া সত্ত্বেও গত প্রায় সাড়ে বছরে সরকারের বড় বড় দুনীর্তি যেমন, পদ্মাসেতু কেলেঙ্কারী, হলমার্ক কেলেঙ্কারী, শেয়ার বাজার কারসাজির মাধ্যমে ৩৩ লাখ ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীকে সর্বশান্ত করা ইত্যাদি ইস্যূকে প্রাধান্য না দেওয়া এবং জনজীবনের বিভিন্ন সমস্যা যেমন দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি, আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি, হত্যা, খুন, গুম, প্রশাসন ও বিচার বিভাগ দলীয়করণ ইত্যাদির বিরুদ্ধেও কার্যকর কোনো কর্মসূচি দেয়নি। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে যে ব্যাপক জনমত সৃষ্টি হয়েছে এ ব্যাপারেও বিএনপি’র তেমন কোনো ভূমিকা নেই। এ ব্যাপারে কার্যকর ভূমিকা পালন করছেন বিশিষ্ট নাগরিকবৃন্দ এবং গণমাধ্যম। জনজীবনের বিভিন্ন সংকটের সঙ্গে সম্পৃক্ত না হওয়া এবং লাগাতার সংসদ বর্জনের মাধ্যমে বিএনপি রাজনীতিতে যে অন্তর্গত সংকটের সৃষ্টি হয়েছে সে কারণে বেপড়োয়া হয়ে উঠেছে সরকার।

অন্যদিকে, একএগারোর ধাক্কায় বিপর্যস্ত বিএনপি গত চার বছরেও সাংগঠনিকভাবে গুছিয়ে উঠতে পারেনি। অনেক আগেই মেয়াদোত্তীর্ণ হলেও দলের কাউন্সিল পর্যন্ত করতে পারেনি। মাঠপর্যায়ে সাংগঠনিক কাঠামো মজবুত করতে জেলা সদরে কেন্দ্রীয় নেতাদের সফরসহ অনেক সিদ্ধান্ত হয়েছে চার বছরে। কিন্তু কোনোটাই ঠিকভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। অন্যদিকে, বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট ১৮দলীয় জোটে রূপান্তরিত হলেও সাংগঠনিকভাবে এর শক্তিসামর্থ্য সামান্যতম বাড়েনি। কারণ, এ জোটের শরিকদের বেশির ভাগই নামসর্বস্ব দল। বিএনপির বাইরে একমাত্র জামায়াতে ইসলামীর সংগঠিত জনবল বা রাজনৈতিক পেশিশক্তি রয়েছে। কিন্তু মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের মুখে জামায়াত নিজেই বেকায়দায় আছে। ১৮ দলীয় জোটের শরিক অন্য দলগুলোর মধ্যে রয়েছে ইসলামী ঐক্যজোট, বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি), খেলাফত মজলিশ ও জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম। আর নতুন যোগ হয়েছে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি), কল্যাণ পার্টি, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা), বাংলাদেশ ন্যাপ, ন্যাশনাল পিপলস পার্টি (এনপিপি), বাংলাদেশ লেবার পার্টি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এনডিপি), মুসলিম লীগ, ইসলামিক পার্টি, ন্যাপ ভাসানী, ডেমোক্রেটিক লীগ (ডিএল) ও পিপলস লীগ। এসব রাজনৈতিক দলের কোনো গণভিত্তি নেই।

এদিকে, সরকার বিএনপিকে দুর্বল করতে দলের চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবসহ প্রায় সকল কেন্দ্রীয় নেতার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা দিয়েছে। এমনকি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ এমপি ও মির্জা আব্বাসসহ ৪১ জন নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে রাজধানীর পল্টন থানার দ্রুতবিচার আইনে দায়ের করা মামলার নথি বিচারের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে।

সরকারের দমন পীড়নের বিরুদ্ধে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি রাজপথে যেমন কোনো কার্যকর আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেনি, তেমনি লাগাতার সংসদ বর্জনের মাধ্যমে সংসদেও কোনো কার্যকর ভুমিকার রাখতে পরেনি।

আগামী ৩ জুন শুরু হতে যাওয়া জাতীয় সংসদের বাজেট অধিবেশনে যোগ দেবে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। টানা ৭৭ দিন বর্জনের পর সর্বশেষ গত বছরের ১৮ মার্চ সংসদের দ্বাদশ অধিবেশনে যোগ দেন বিএনপিসহ বিরোধী দলের এমপিরা। ওই দিন ওয়াকআউটের পর আর সংসদে ফিরে যাননি তারা। বিএনপির বর্জনের মধ্যেই গত ৩০ এপ্রিল সংসদের সপ্তদশ অধিবেশন শেষ হয়। টানা ৮৩ কার্যদিবস অনুপস্থিত রয়েছে বিএনপি। সাংবিধানিক নিয়ম অনুযায়ী টানা ৯০ কার্যদিবস অনুপস্থিত থাকলে সদস্যপদ বাতিল হয়ে যাবে বিরোধী এমপিদের। সদস্য পদ বাঁচাতে হলে তাদের বাজেট অধিবেশনেই সংসদে ফিরতে হবে।

যদিও সংসদ বর্জন নিয়ে কঠোর সমালোচনার মুখে গত নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে এ সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে আসার এবং সংসদকে কার্যকর করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। দিনবদলের ডাক দিয়ে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট জাতীয় সংসদকে সব ধরণের আলোচনার কেন্দ্রে পরিণত করার ঘোষণা দেয়। আওয়ামী লীগ তার নির্বাচনী ইশতেহারের ৫.৩ ধারায় বলে, জাতীয় সংসদকে কার্যকর করা হবে এবং সরকারের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। আর বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহারের ১৫ নং অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, ‘জাতীয় সংসদ হবে জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু। সংসদকে কার্যকর ও অর্থবহ প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তুলতে জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুগুলো সমাধানের ক্ষেত্রে সংসদে বিরোধী দলের সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক আলোচনার নীতি অনুসরণ করা হবে। ইস্যুভিত্তিক ওয়াকআউট ছাড়া কোনো দল বা জোট সংসদ অধিবেশন বর্জন করতে পারবে না। সংসদের অনুমোদন ছাড়া কোনো সদস্য ৩০ দিনের বেশি অনুপস্থিত থাকলে তাঁর সদস্যপদ শূন্য হবে।’

কিন্তু বাস্তবে ওই প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেনি বিএনপি। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সংসদ বর্জনের নতুন রেকর্ড সৃষ্টি করেছে। ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে গঠিত বর্তমান নবম সংসদের প্রথম অধিবেশন বসে ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি। ২০১৪ সালের ২৪ জানুয়ারি এ সংসদের মেয়াদ শেষ হবে। সেই হিসেবে নবম সংসদের প্রায় চার বছর পূর্ণ হয়েছে। নবম জাতীয় সংসদে বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোটের সদস্যসংখ্যা ৩৭। এর মধ্যে ৩৪ জন বিএনপির, দু’জন জামায়াতে ইসলামীর ও একজন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি)। সংসদ সচিবালয় থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, চলতি নবম জাতীয় সংসদের সাড়ে ৪ বছরে অনুষ্ঠিত ১৭টি অধিবেশনে মোট ৩৭০ কার্যদিবসের মধ্যে বিএনপি উপস্থিত ছিল মাত্র ৫৪ দিন। অনুপস্থিত ছিল ৩১৬ কার্যদিবস। বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে সংসদে অনুপস্থিতির দিক থেকেও এগিয়ে আছেন খালেদা জিয়া। তিনি গত সাড়ে চার বছরে সংসদে গেছেন মাত্র ৮ দিন।

সব মিলিয়ে দেখা যায়, বিএনপি তার অভ্যন্তরীণ সঙ্কট এবং সঙ্গে সঙ্গে একটি কার্যকর বিরোধী দল হিসেবে সক্ষমতা প্রদর্শনে ব্যর্থ হয়েছে। এ সঙ্কট কাটিয়ে ওঠা ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো বিকল্প নেই।।