Home » শিল্প-সংস্কৃতি » রাষ্ট্র কাঠামো এবং একজন দোদুল্যমান ‘ভুবন সোম’

রাষ্ট্র কাঠামো এবং একজন দোদুল্যমান ‘ভুবন সোম’

ফ্লোরা সরকার

bhuban shome১৯৫৬ সালে ‘রাত ভোর’ এর মাধ্যমে যার ছবির ভুবনে যাত্রা শুরু হয়েছিল সেই মৃণাল সেন তার প্রথম ছবি নিয়ে ‘চিত্রবীক্ষণ’ এর এপ্রিলমে, ১৯৯৩ সংখ্যার এক সাক্ষাৎকারে বেশ চমকপ্রদ একটা কথা বলেছিলেন – “সত্যজিৎ রায় প্রথম ছবি করেই সমস্ত পৃথিবীকে কাঁপিয়ে দিলেন আর আমার ছবি ঠিক তার বিপরীত। আমি নিজেই কেঁপে উঠলাম, বাইরের লোকের কাছে মুখ দেখাতে পারছিলাম না।” কিন্তু পরবর্তীকালে দেখা গেলো সবাইকে কাঁপিয়ে দিয়ে ভারতের সর্বোচ্চ সম্মান পদ্ম ভূষণ সহ প্রচুর দেশিবিদেশি চলচ্চিত্র পুরস্কার নিয়ে এসেছিলেন। গত ১৪ মে, ২০১৩ এই বিশ্ববরেণ্য চলচ্চিত্র পরিচালক মৃণাল সেন একানব্বই বছরে পদর্পণ করলেন। তার জন্মদিনে জানাই আমাদের শুভেচ্ছা।

মৃণাল সেনের চলচ্চিত্র জগতের দীর্ঘ জীবনে ছবির মূল পটভূমি ছিল প্রধানত রাজনৈতিক চলচ্চিত্র। জীবনের শুরু থেকেই রাজনীতি বিশেষত বামপন্থী রাজনীতির দিকে তার ঝোঁক ছিল। তার সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে ঐ একই সংখ্যায় বলেন “ সে সময় ছাত্র হিসাবে রাজনৈতিক স্ট্যান্ড নেয়া অনেক সহজ ছিল। সে সময় ইংরেজ আমল, আমরা জানতাম আমাদের বড় শত্রু ইংরেজ, বৃটিশ ইম্পিরিয়ালিজম, তার বিরুদ্ধে জড়ো হওয়া অনেক সহজ ছিল। এখন (অর্থাৎ ১৯৪৭ এর পর) সেখানে বহু দল, বহু ব্যাপর, শত্রুমিত্র চেনা বড় ভয়ংকর হয়ে উঠছে। এখন কে শত্রু, কে মিত্র চেনা বোঝা বড় মুশকিল।” রাজনৈতিক ছবি নির্মাণ করলেও তার ছবি কখনো রাজনীতিতে জড়িয়ে পড়েনি। অর্থাৎ রাজনৈতিক বিরূপ সমালোচনায় পড়তে হয়নি। কেননা রাজনীতির গভীরে যেয়ে তার মূল অন্বেষণ করাই ছিল তার লক্ষ্য, ছবির রাজনীতিকরণ নয়। তাই ‘ভুবন সোম’ এ তিনি আমলাতন্ত্রকে আঘাত করতে চেয়েছেন। আমলাতান্ত্রিকতার ভেতরের ভাঁপা দিকগুলো উন্মোচন করতে চেয়েছেন, যা সত্যের মতোই ফুটে উঠতে দেখি।

বনফুলের একটি বড় গল্প থেকে নির্মিত ছবি ‘ভুবন সোম’ এর নায়ক ভুবন সোম রেল বিভাগের উর্ধতন, ডাকসাইটে একজন কর্মকর্তা। অবিবাহিত। অত্যন্ত সৎ। সততার কারণে নিকট আত্মীয়কেও বরখাস্ত করতে দ্বিধাবোধ করেন না। তাই রেলের একজন অসাধু টিকেট কালেক্টার যাদব প্যাটেলের ঘুষ গ্রহণের কারণে তার বিরুদ্ধে চার্জশিট তৈরি করে তার শাস্তির ব্যবস্থা করেন। ছবির শুরুতে দেখা যায় চার্জশিট তৈরি করে কোন এক সকালে ক্লান্তিকর কাজ থেকে রেহাই পাবার উদ্দেশ্যে সোম সাহেব গুজরাটের এক গ্রামের উদ্দেশ্যে পাখি শিকারের পরিকল্পনা নিয়ে রওনা হয়েছেন। তার যাত্রার পদধ্বনি আমরা ছবির একেবারে শুরু থেকে পাই, চলন্ত রেললাইনের উপর টাইটেল ওঠার মধ্যে দিয়ে। গ্রামে পৌঁছবার পথে গুজরাটের নানান মনোরম দৃশ্যবলী পার হতে দেখা যায়। ছবিটির কিছু বৈশিষ্ট্য প্রথমেই আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়। প্রথম বৈশিষ্ট্য ভুবন সোম বাঙালি হলেও ছবিটি হিন্দি ভাষায় নির্মিত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য মৃৃণাল সেনের এটাই প্রথম হিন্দি ভাষার ছবি। হিন্দি ধারাভাষ্যে আমরা সোম সম্পর্কে জানতে পারি তিনি বাঙালি, বাঙালির দৃষ্টান্ত দিতে যেয়ে স্বামী বিবেকানন্দের ছবির দেখিয়ে ধারাভাষ্যে বলতে শোনা যায় ‘বাঙাল, তারপর রবিন্দ্রনাথের ছবির ওপর শুনি ‘সোনার বাঙাল’, সত্যজিৎ রায় এবং রবি শঙ্করের ছবির ওপর ‘মহান বাঙাল’ এবং তারপরেই বৃটিশবিরোধী আন্দোলনের বিভিন্ন ফুটেজের উপর ‘বিচিত্র বাঙাল’। এই ‘বিচিত্র বাঙাল’ নিয়েই হয়তো পরিচালকের আগ্রহ কেন্দ্রিভূত হয়। অর্থাৎ বাঙালির চরিত্রের বিভিন্নমুখীতা, অনিশ্চয়তা বা অনড়তা, যা আমরা ছবির বিশ্লেষণে, খোঁজার চেষ্টা করবো। দ্বিতীয় যে বৈশিষ্ট্য দেখি তা হলো, স্থান নির্বাচন। স্থান হিসেবে পরিচালক বেছে নেন স্বরাষ্ট্র প্রদেশের গুজরাটের একটি গ্রাম। যে গ্রামের প্রাকৃতিক নয়নাভিরাম দৃশ্য একটি শান্ত সহজসরল জীবনের নির্দেশ করে। কোন ধরণের ক্লেদ যেখানে স্পর্শ করেনা। ছবির গল্পের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তা করা হয় এবং সেটাও আমরা বিশ্লেষণে পাবো। তৃতীয় এবং সব চেয়ে উল্লেখযোগ্য যে বৈশিষ্ট্য আমরা দেখি তা হলো ছবির নায়িকা হিসেবে এমন একটি নতুন মুখ বেছে নেয়া হয় (সুহাসিনী মুল) যার চরিত্র প্রকৃতির মতো নির্মল, সরল আর পবিত্র আচরণ, সহজ কথাবার্তা, মনহরণ করা হাসি আমাদেরকে ভুবন সোমের মতো জাদরেল আমলার প্রতি যেন এক তীর্যক মন্তব্য ছুঁড়ে দেয়। মেয়েটির সরলতার কাছে জাদরেল আমলাটি যেন তুচ্ছ হয়ে পড়ে। ছবির শুরুতে ধারাভাষ্যে শোনা যায় – ‘সোম সাহেব জীবনে দেখেছেন অনেককিছু কিন্তু শেখেননি কিছুই।’ গ্রামে পৌঁছানোর পর ভুবনের সঙ্গে ঘটনক্রমে নায়িকা গৌরীর সঙ্গে দেখা হয়। গৌরি, সদ্য বিবাহিতা এবং যার স্বামী রেলের সেই টিকেট কালেক্টার যাদব প্যাটেল। তারপর একের পর এক ঘটনার মধ্যে দিয়ে গৌরীর কাছে ভুবনের বিব্রত হবার পালা চলতে থাকে। গৌরির সঙ্গে প্রথম দেখাটা বড় চমকপ্রদ ভাবে দেখানো হয়। প্রথমেই দেখা হয় গৌরীর মহিষের সঙ্গে, যে মহিষের তাড়া খেয়ে সোমের অবস্থা নাজেহাল হয়ে পড়ে। ছবির এই সামান্য সূত্রটুকু আমাদের বুঝিয়ে দেয় আরও কত নাজেহালের গল্প অপেক্ষা করছে কাহিনীতে। গৌরীর বাড়িতে যেয়ে সোম জানতে পারে যাদবের কথা। যাদব চাকরি সূত্রে দূরে থাকায় গৌরীকে তার শ্বশুরবাড়িতে অবস্থান নিতে হয়। যাদবের কথা জানা সত্ত্বেও সোম গৌরীকে বুঝতে দেয়না যে যাদব তারই অধীনে চাকরি করে এবং সেই সঙ্গে আরও কিছু যা পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে। সোম শুধু এইটুকু জানায় যে সেও রেলে চাকরি করে। গৌরী তার আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে সোমকেই সে ভুবন সোম সম্পর্কে নালিশ করে। এমনকি ‘ঘুষ’ ব্যাপারটা যে একটা সামাজিক অপরাধ সেটাও সে জানেনা, স্বামী যে ঘুষ খায় সেটা তার স্বামী তাকে যেভাবে বুঝিয়েছে সে সেভাবে বুঝেছে। তাই গৌরী নির্ভয়ে বলে – “মানুষটা অন্য মানুষের সুবিধা করে দেয়, আরাম দেয় বিনিময়ে তারা তাকে কিছু পয়সা দেয় এর মধ্যে অন্যায়টা কোথায়?” গৌরীর সরলতা আর গ্রামের সরলতা যেন মিলে মিশে এক হয়ে যায়। ছবির গতি যতই এগিয়ে যায় আমরা দেখতে পাই গৌরীর স্বাভাবিক, সহজ, সরল প্রাণোচ্ছলতা ক্রমেই ডাকসাঁইটে ভুবন সোমকে ধীরে ধীরে পরিবর্তিত করে ফেলছে। কঠোর সোম যেন ‘মানুষ’ সোমে রূপান্তরিত হচ্ছে। এতোটাই রূপান্তর ঘটে যে শেষ পর্যন্ত একটা পাখিও সে শিকার করতে পারেনা। ভুবন সোম যে মেয়েটির অধিগত হয়ে গেছে ছোট্ট এক টুকরো শটে পরিচালক বড় দক্ষতার সঙ্গে বুঝিয়ে দেন। পাখি শিকারের সময় গৌরী যখন সোমের কাঁধে মুহূর্ত্তের জন্যে হাত রাখে, তখনই বোঝা যায় পাখি শিকার তার দ্বারা হবে না। ছবির এই অংশ পর্যন্ত আপাত দৃষ্টিতে মনে হয় ভুবন সোমের মতো একজন কঠোর মানুষ ভিন্ন পরিস্থিতিতে, ভিন্ন মানুষের সাহচর্যে কিভাবে রূপান্তরিত হয়েছে তা নিয়ে বেশ মজার একটা কাহিনী বটে। সোম সাহেবের জন্যে বরং একটু করুনাও জাগ্রত হয় দর্শক হৃদয়ে। কিন্তু ছবির শেষে যেয়ে দর্শককে যেন হতভম্ব করে দেন পরিচালক। যখন সোমকে দেখি অফিসে ফিরে যেয়ে যাদবের জন্যে একটা ফায়সালা করতে, কি সেই ব্যবস্থা? শেষ দৃশ্যে গৌরীর কাছে যাদবের চিঠি আসে এবং সেই চিঠিতে যাদবের কন্ঠে শোনা যায় – “— আরো ভালো জায়গায় বদলি হয়েছে উসকো মাতলাব, আউর কামাই।” অর্থাৎ যাদবের দুর্নীতির কারণে যাদবের চাকরি চলে যাওয়া দূরে থাক তাকে আরও ভালো জায়গায় বদলি করা হয়েছে, যেখানে সে আরো অধিকতর পরিমাণে ঘুষ নিতে পারবে বা দুর্নীতি করতে পারবে। ভুবন সোম ছবির আইরনিটা এখানেই। ঠিক এই জায়গাটিতেই আমরা পেয়ে যাই প্রকৃত মৃণাল সেনকে। অনেক প্রশ্ন এক সঙ্গে উঁকি দিয়ে যায়। একটা রাষ্ট্রীয় কাঠামো যখন দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয়, তখন ভুবন সোমের মতো একজন সৎ, যিনি নিজে কখনো ঘুষ খান নাই, তিনিও কি তবে সেই কাঠামোর ভেতরে থাকেন বলে ঘুষকে প্রশ্রয় দেন? অথবা সোমের মতো সৎ মানুষের কাছ থেকে যদি এই ফলাফল আসে তাহলে প্রকৃত সৎ আমরা কাকে বলবো? অথবা আমলাতন্ত্র এমন একটি জটিল তন্ত্র যে তন্ত্রের অধীনে দুর্নীতি বা তদ্বিষয়ক কোন অন্যায়কে খুব স্বাভাবিক একটি বিষয় বলে ধরে নেয়া হয়? অথবা একটি সমাজ ক্রমশ দুর্নীতিতে অভ্যস্তহয়ে উঠলে কি এই ধরণের ফলাফল দেখা দেয়?

মনে রাখা দরকার ছবিটি ১৯৬৯ সালে মুক্তি পেয়েছিল। তারপর অনেক দিনকালবছর গড়িয়ে গেছে, কিন্তু ভুবন সোমের সমস্যাটা শুধু সেই সময়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পেয়েছে এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকা সহ তৃতীয় বিশ্বের নানা দেশে। ভুবন সোমের মতো কেঁজো মানুষেরা শুধু অফিসের ফাইলের বহিরাবরণে প্রবেশে অভ্যস্ত (ছবির প্রথম এবং শেষে, সারি সারি ফাইলের স্তুপ কাটুনের ভঙ্গীতে চমৎকার ভাবে উপস্থাপন করা হয়), ফাইলের অভ্যন্তরে প্রবেশে অপারগ। সরকার আসে সরকার যায়, ভুবন সোমেরা এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকেন। তাদের সেই অনড়তায় নাড়া দেবার জন্যেই হয়তো পরিচালক মৃণাল সেন বাঙলাভাষী ভুবন সোমকে হিন্দী ভাষায় কথা বলান, কোলকাতার সোমকে নিয়ে যান গুরাটের গ্রামে এবং সাক্ষাৎ করিয়ে দেন এমন এক সরলতার সঙ্গে যার সংস্পর্শে এলে কঠিন পাথরও গলে যায়। কিন্তু তারপরেও দেখা যায় ভুবন সোমদের কোনো পরিবর্তন হয় না। কেনো পরিবর্তন হয়না সেটা না হয় মৃণাল সেনের ভাষাতেই জানা যাক চিত্রবীক্ষণের একই সংখ্যার আরেকটি সাক্ষাৎকারে – “আমি জানি এই জাত একেবারেই সংশোধনাতীত। আজকে এই মুহূর্ত্তে হয়তো একটা লোককে ছাঁটাই থেকে অব্যাহতি দিয়েছে, কিন্তু সে পরে আবার ঐ রকম করে যাবে। সেই ইঙ্গিত ছবিতে আছে। আসলে সে পরিস্থিতির হাতে বন্দী এবং সেটাই তার ট্রাজেডি।” অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় কাঠামো যদি শক্ত পোক্ত হয়ে গড়ে না উঠে, ভুবন সোমেরাও শক্ত পোক্ত হয়ে গড়ে উঠতে পারেননা। তাই সৎ আর অসততার দোলাচলে দুলতে থাকে তাদের ব্যক্তিত্ব। বলাই বাহুল্য দোলাচলের কোন অবস্থান কখনোই কোন স্থায়ী মাটি খুঁজে পায় না। শক্ত হয়ে দাঁড়াতে তো পারেই না। আর তাই ভুবন সোমের ব্যক্তিত্ব শুধু মৃণাল সেনের একার অপছন্দের নয়, সবার অপছন্দের হবার অভিপ্রায় নিয়ে সবাইকে নিয়ে তিনি দেখতে এবং দেখাতে চান, জানতে এবং জানাতে চান। তাই এতকাল পরেও ‘ভুবন সোম’ আমদের ভুবন থেকে হারিয়ে যায় না। বার বার ফিরে আসে আমাদের বাস্তবতায় আর অপেক্ষায় থাকি একটি সুদৃঢ় রাষ্ট্রীয় কাঠমোর, যে কাঠামো ভুবন সোমদের দৃঢ় কিন্তু অনড় নয়, কাঠিন্য নয় বরং গৌরীর মতো সহজ, সরলতায় নিজেদের গড়ে তুলতে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।।

১টি মন্তব্য

  1. rakiba sultana

    oshadhron lekha!