Home » বিশেষ নিবন্ধ » সরকার বিরোধী আন্দোলনের তীব্রতানাশক বটিকা

সরকার বিরোধী আন্দোলনের তীব্রতানাশক বটিকা

. তোফায়েল আহমেদ

local governmentনির্বাচন তা স্থানীয় বা জাতীয় যাইই হোক তা কখনো রাজনীতি বা দল নিরপেক্ষ হয় না। এমনকি আইন করে নির্দলীয় করলেও নয়। বর্তমানে সারাদেশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সার্বিক আয়োজন ও ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিভক্ত ও বিভ্রান্ত। কার্যত ১৯৯১ সাল থেকে পর পর চারটি জাতীয় নির্বাচন যেভাবে ও পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হয়ে এলো সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর পর সে পদ্ধতির আমূল পরিবর্তন হয়েছে। দেশ এখন ক্ষমতাসীন ১৪ দলীয় জোট ও বিরোধী ১৮ দলীয় জোটের রাজনীতি ও আন্দোলনের মূল বিষয় ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার’ ব্যবস্থার বিলুপ্তি ও পুনর্বহালের মাঝামাঝি অবস্থানে। এ রকম একটি সময়ে রাজশাহী, খুলনা, সিলেট ও বরিশাল সিটি করর্পোরেশনের নির্বাচনী তফসিল ঘোষণা। অপরদিকে বিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশন (উত্তর ও দক্ষিণ)-এর নির্বাচন স্থগিতের উচ্চ আদালতের মামলার নিষ্পত্তি এবং সঙ্গে সঙ্গে নবগঠিত গাজীপুর সিটি করপোরেশনের নির্বাচন ঘোষণার প্রস্তুতি দেশের রাজনৈতিক মহলে নতুন একটি কৌতূহলের মাত্রা যুক্ত করেছে বৈকি।

প্রথমত. জাতীয় নির্বাচন ও স্থানীয় নির্বাচনকে কখনো এক করে দেখা উচিত নয়। একটির জন্য অন্য একটিকে বিলম্বিত করাও বেআইনি এবং অনৈতিক। কিন্তু এদেশে সর্বসময়ে ক্ষমতাসীন দল বা গোষ্ঠী তাদের ক্ষমতার সমীকরণে স্থানীয় নির্বাচন বা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানসমূহকে ব্যবহার ও অপব্যবহারের অনেক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বিশেষত পাকিস্তান আমলে জেনারেল আয়ুব প্রচলিত দলীয় বলয়ের বাইরে ভিন্ন একটি রাজনৈতিক শক্তি সৃষ্টির ক্ষেত্রে ‘মৌলিক গণতন্ত্র’ ব্যবস্থাটিকে কাজে লাগিয়েছে। স্বাধীনতার পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতা কাঠামোয় স্থানীয় নেতৃত্বের শক্তিকে সঠিকভাবে পরিমাপ করতে ব্যর্থ হওয়ায় উচ্চমূল্য দিতে হয়েছে। অপরদিকে জেনারেল জিয়া এবং জেনারেল এরশাদ নব নব কৌশলে বিকল্প রাজনৈতিক শক্তির আয়ুবীয় মডেলকে ব্যবহার ও অপব্যবহার করেছে। দেশে ষাট সত্তর ও আশির দশকে ধারাবাহিকভাবে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় নেতৃত্ব ও স্থানীয় রাজনীতিকে অবহেলা ও তুচ্ছজ্ঞান করা হয়েছিল। বাম ঘরানার অনেকেই তখন স্থানীয় ক্ষমতা কাঠামোয় শ্রমিক কৃষক ও প্রান্তিক জনগণের সম্পৃক্ততা বৃদ্ধির বদলে ঢালাওভাবে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকেই ‘শ্রেণী শত্রু’ হিসাবে গণ্য করে শহুরে মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবী ছাত্র যুবকদের সব সময় তাদের আকর্ষণের কেন্দ্র বিন্দুতে স্থান দিয়ে এসেছে। ফলে তৃণমূলে তারা তাদের রাজনৈতিক আদর্শকে বিস্তৃত করতে পারেনি। ফলে দীর্ঘকাল ধরে আমাদের স্থানীয় রাজনীতি, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় নেতৃত্ব এক ধরণের প্রতিক্রিয়াশীল, নতজানু ও নেতিবাচক রাজনীতির শিকার।

বর্তমান ক্ষমতায় প্রতিভূ এবং ভাগিদার দুটি প্রধান দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় গণতন্ত্রের প্রতি তাদের কোনো স্পষ্ট অঙ্গীকার বা প্রতিশ্রুতি কখনো প্রকাশ করেনি। স্ব স্ব কেন্দ্রিয় রাজনৈতিক কার্যক্রমের ইতিবাচক ফলাফলের জন্য যতোটুকু প্রয়োজন ততোটুকুই তারা করে থাকে। স্থানীয় গণতন্ত্র, স্থানীয় নেতৃত্বের বিকাশ, স্থানীয়ভাবে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক এবং সেবাদান ও উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় প্রণোদনার কোনো স্পষ্ট অঙ্গীকার কারো দেখা যায় না। স্থানীয় রাজনীতি ও নির্বাচনকে জাতীয় রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের মোক্ষম অস্ত্র ছাড়া বেশি কিছু তারা ভাবে না।

সাম্প্রতিককালে সিটি করপোরেশন নির্বাচন যতোটুকু প্রশাসনিক ও গণতান্ত্রিক দায়িত্ববোধ, তার চেয়ে রাজনৈতিক কৌশলে তা অনেক বেশি প্রভাবিত বলে রাজনৈতিক বোদ্ধাদের ধারণা। রাজশাহী, সিলেট, খুলনা ও বরিশাল এ চারটি সিটি করপোরেশনের মেয়াদপূর্তি হবে আগামী সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে। সে নির্বাচনকে প্রায় চার মাস এগিয়ে আনা হলো। আবার সাত বছর অতিক্রান্ত হলেও ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে নানা ঠুনকো অজুহাতে ঝুলিয়ে দেয়া হলো। শেষ পর্যন্ত আদালতের ঘাড়েই দোষ বা অপবাদ চলে গেল। আদালতের স্থগিতাদেশের কারণেই নির্বাচন বিলম্বিত হচ্ছে। আদালত যে নির্দেশটি মে মাসে দিল, সে স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের আদেশ মামলা দায়েরের দুই থেকে তিন মাসের মধ্যেই দিতে পারতো। আদালত এক বছর সময় নিল। একই কায়দায় টঙ্গীগাজীপুরের নির্বাচনও নানাভাবে বিলম্বিত। এখন সব নির্বাচন এ কয়েক মাসে অনুষ্ঠিত হবে বলে সবার দৃঢ় বিশ্বাস। তাই এখানে রাজনৈতিক কিছু অপকৌশলের কারণ আবিষ্কারের অবকাশ থাকে।

সে চিরাচরিত রাজনৈতিক বটিকা বিরাজনীতিকরণ বা সরকার বিরোধী আন্দোলনের তীব্রতানাশক বটিকা হিসাবে স্থানীয় নির্বাচন বিভিন্ন সময়ে কাজ দিয়েছে। জেনারেল এরশাদের উপজেলা পরিষদ নির্বাচন, জেনারেল জিয়ার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন সঙ্গে সমসাময়িক সময়ের রাজনৈতিক আন্দোলনসমূহকে মিলিয়ে দেখলেই বিষয়টি বোঝা সহজ হবে। তবে বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা ও পরিপক্কতা সে সময়ের চেয়ে অনেক উন্নত ও উৎকর্ষতা লাভ করেছে। এসব কৌশল পশ্চাৎপদ ও প্রতিক্রিয়াশীল কৌশল হিসাবে প্রতিভাত হবে বলে ব্যক্তিত ধারণা। মানুস স্থানীয় ও জাতীয় রাজনীতির ইস্যু, গতিপ্রকৃতি ও ফলাফলকে আজকাল পৃথক করতে পারে। বিগত সময়ের নারায়ণগঞ্জ ও কুমিল্লা সিটি করপোরেশন নির্বাচন তার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ। ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগটি সৃষ্টি হলেই ভোটে মানুষ সময়োপযোগী যৌক্তিক ভোটাচারণ করে দেখিয়েছে। তাই এ মুহূর্তে প্রয়োজন ক্ষমতাসীন ও বিরোধী দল বা জোট উভয়ের পক্ষ থেকে গণতন্ত্রের প্রতি মানুষের বিচারবোধের প্রতি আন্তরিক সম্মান ও শ্রদ্ধা প্রদর্শন। এখানে পোশাকী বক্তব্য ও মেকিপনা মানুষ অতি সহজেই ধরে ফেলবে। এ নির্বাচনসমূহে বিরোধী দল বা জোটের আচরণ ও সিদ্ধান্ত অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তারা জাতীয় ইস্যুতে আন্দোলনের কারণে এ নির্বাচন থেকে পুরোপুরি মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন। আবার জাতীয় ইস্যুর আন্দোলনের পাশাপাশি বা অংশ হিসাবে স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নিয়ে সরকার, নির্বাচন কমিশন সবার প্রতি একটি চ্যালেঞ্জও ছুড়ে দিতে পারে।

সরকার ও বিরোধী দল আশ্চর্যজনকভাবে দুই পক্ষের জন্যই জয়পরাজয় দুটিতেই তাদের কৌশলগত জয়ের অবকাশ রয়েছে। সেক্ষেত্রে বিরোধী দলের দুটি কৌশলগত সুবিধা এবং সরকারের জন্য একটি সুবিধা দেখা যায়। সরকারি দল জয়ী হলেই সে প্রশ্ন জাতীয় ভাবে ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হতে পারে তা হচ্ছে নির্বাচনে নিরপেক্ষতার দাবি স্পষ্ট হবে। জয়ের পর বিরূপ প্রপাগান্ডা থাকলেও নির্বাচন যদি সুষ্ঠু, শান্তিপূর্ণ হয় তা শেষ পর্যন্ত ধোপে টিকবে না। তবে বিরোধী দল হারজিত দুই ক্ষেত্রেই উচ্চকণ্ঠ হতে পারবে। তাই সামগ্রিকভাবে এবারের স্থানীয় নির্বাচনে বিরোধী দলের নিজস্ব কৌশলগত অবস্থান মূল্যায়ন খুবই গুরুত্বপূর্ণ।

সকল সিটি করপোরেশন নির্বাচনই রমজানের আগে সমাপ্ত হওয়া ভালো। আশা করি সরকার এবং নির্বাচন কমিশন এ বিষয়ে একমত হবে। ইতোমধ্যে যে নির্বাচনী হাওয়া তাতে দেখা যাচ্ছে, চারটি সিটি করপোরেশনে সরকারি দলের বিদায়ী মেয়ররা পুনর্বার প্রার্থী হয়েছেন। বিরোধী দলের কোন একক প্রার্থীতা এখনো দেখা যায়নি। তবে ঢাকার দুটি করপোরেশনের নির্বাচন নিয়ে ইতোপূর্বে যে সব মেয়র প্রার্থী মাঠে নেমেছিলেন তারা এখনো নীরব। তবে গাজীপুরে পুরোদমে প্রচারণা চলছে। তাই জাতীয় রাজনীতিতে এ সাতটি নির্বাচন তা যদি এই জুলাই মাসের আগে শেষ করা হয় তা সামগ্রিক রাজনীতিতে কী প্রভাব ফেলে তা দেখার জন্য আরও অপেক্ষ করতে হবে। তবে শেষ বাক্য হচ্ছে, যেকোনো জাতীয় রাজনৈতিক সঙ্কটের অজুহাতে স্থানীয় নির্বাচন বিলম্বিত করা অন্যায়। স্থানীয় নির্বাচন মেয়াদ উত্তীর্নের আগে যেকোনো মূল্যে অনুষ্ঠানের রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তোলাও সামগ্রিক রাজনীতির মানউন্নয়ন জরুরি। তাই নাগরিক সমাজের প্রত্যাশা থাকবে সবার অংশগ্রহণে সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন।

আমাদের প্রায় সকল রাজনৈতিক আন্দোলন নির্বাচনকে কেন্দ্র করে শুরু এবং নির্বাচনের মাধ্যমে সাময়িক বিরতি। নির্বাচনের মাধ্যমে সঠিক নেতৃত্ব বাছাই ও ছন্দপতন থাকে। নির্বাচনে আজকাল ভালো প্রার্থীর আকাল। ফলে নামের সঙ্গে অদ্ভূত বিশেষণযুক্ত যেমন গলাকাটা, নাককাটা, বোমা, খুনি ইত্যাদি নামের মানুষের আবির্ভাব ঘটছে। খুলনা অঞ্চলে এবারের প্রার্থীর পটভূমি বিশ্লেষণে কিছু ইতিবাচকতা লক্ষ্যণীয়। সেখানে গত নির্বাচনের তুলনায় প্রার্থীদের অপরাধ সংশ্লিষ্টতা কম, শিক্ষাগত যোগ্যতায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী প্রার্থীর সংখ্যা বেড়েছে। ভালো প্রার্থী নির্বাচনে থাকলে নাগরিকের পক্ষে বাছাই করা সহজ হয়। তিনজন প্রধান প্রার্থীই যদি থাকে কালো অর্থ ও অপরাধ জগতের মানুষ তাহলে সাধারণ ভোটার বেশি কিছু করতে পারে না। খুলনায় দীর্ঘদিন ধরে নাগরিক সমাজ ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে কাজ করছে। সম্ভবত তার কিছুটা ইতিবাচক প্রভাব এ নির্বাচনে পড়ে থাকবে। তাই ঢাকা, গাজীপুর, রাজশাহী, সিলেট ও বরিশালের নাগরিক সমাজের সক্রিয় ইতিবাচক কর্মকাণ্ড এ নির্বাচনকে সত্যিকারভাবে অর্থবহ করে তুলতে পারে।।

লেখক: স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ