Home » সাক্ষাৎকার » সাক্ষাৎকার – ড. মীজানূর রহমান শেলী

সাক্ষাৎকার – ড. মীজানূর রহমান শেলী

সভাসমাবেশে বিধিনিষেধ অন্যায়। বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত সঙ্কটজনক, বিপজ্জনক ও মারাত্মক

OLYMPUS DIGITAL CAMERA. মীজানূর রহমান শেলী, সমাজবিজ্ঞানী এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষক। সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট রিসার্স বাংলাদেশ (সিডিআরবি)-এর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এবং ত্রৈমাসিক এশিয়ান এফেয়ার্সের সম্পাদক। সভাসমাবেশের উপরে সরকারি বিধিনিষেধ আরোপ, সংলাপের সম্ভাবনাসহ বিদ্যমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে কথা বলেছেন আমাদের বুধবারএর সঙ্গে।

আমাদের বুধবার: সভাসমাবেশের উপরে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এ বিষয়টিকে আপনি কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

. মীজানূর রহমান শেলী: একটি নির্বাচিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় স্বাভাবিকভাবেই এ ধরণের বিধিনিষেধ আরোপ সামঞ্জস্যহীন মনে হয়। কারণ যখন একটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতি চলতে থাকে, তখন কোনো সরকারই সুস্থ মস্তিষ্কে সভাসমাবেশের উপরে বিধিনিষেধ, নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে বিরোধী দল এবং অপরাপর যে পক্ষ রয়েছে তাদের মতপ্রকাশে বাধা দেয় না, দিতে পারে না। সাংবিধানিকভাবে সভাসমাবেশের উপরে বিধিনিষেধ আরোপ গর্হিত এবং অন্যায়।

আমাদের বুধবার: কিন্তু সরকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির স্বার্থে এ ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে বলে বলছে

. মীজানূর রহমান শেলী: যে ঘোষণাটি তারা দিয়েছে, তাতে সমন্বয় নেই বলে দেখা যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক কথা বলছেন, স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক বলছেন আরেক কথা। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে বলেছে, ঠিক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়নি, তবে যে সব সমাবেশ থেকে জননিরাপত্তা, আইনশৃঙ্খলার প্রতি নানা রকম হুমকি আসতে পারে, সে সব সমাবেশ বন্ধ করা হয়েছে। তাহলে নিশ্চয় সরকারের কাছে এমন কোনো পথ, পন্থা বা পদ্ধতি রয়েছে, যার মাধ্যমে আগামভাবে এ বিষয়ে যাচাই বাছাই করা সম্ভব। কোনো সমাবেশ থেকে হুমকি আসবে বা কোন সমাবেশ শান্তিপূর্ণ হবে তা তারা যাচাইবাছাই করে বুঝতে পারবেন। অর্থাৎ এটি সম্পূর্ণভাবে সরকারের নির্বাহী সিদ্ধান্তের উপরে নির্ভর করবে। কিন্তু এটি সংবিধান সম্মত হতে পারে না। তাছাড়া পরবর্তীকালে ঘোষণায় বলা হয়েছে, ঢালাও কোনো নিষেধাজ্ঞা দেয়া হয়নি, বরং তা বিশেষ বিশেষ ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। ওই ঘোষণায় পরিষ্কার বলা হয়েছে, সাধারণ সমাবেশ এই বিধিনিষেধের আওতার বাইরে থাকবে। তাহলে সাধারণ সমাবেশ বলতে কি বুঝা যায়, তাতো সরকারের উপরে নির্ভর করবে। এটা সাধারণ গণতান্ত্রিক সমাজে গ্রহণযোগ্য হয় না।

আমাদের বুধবার: রাজনৈতিক সভাসমাবেশ বন্ধের ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে

. মীজানূর রহমান শেলী: তবে সব রাজনৈতিক নয়। বলা হয়েছে, যে সব সমাবেশ থেকে আইনশৃঙ্খলা বা নিরাপত্তার প্রতি হুমকি আসতে পারে সেগুলো এই বিধিনিষেধের আওতায় পড়বে। তাহলে সেগুলো কে বিচার করবে, কে ঠিক করবে? বিরোধী পক্ষের হলেই সমাবেশ আইনশৃঙ্খলা ভঙ্গকারী আর সরকার সমর্থক হলে হবে না, এটা নিশ্চিত করে কে বলতে পারে?

আমাদের বুধবার: বলা হচ্ছে দেশে অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে। আপনি কি মনে করেন?

. মীজানূর রহমান শেলী: হ্যাঁ, বলা যেতে পারে যে দেশে অঘোষিত জরুরি অবস্থা চলছে। যদিও অঘোষিত জরুরি অবস্থা হতে পারে না, হওয়া উচিতও নয়, এমনকি স্বৈরতন্ত্রেও নয়। যেখানে সংবিধান থাকে এমন স্বৈরতান্ত্রিক ব্যবস্থায়ও কারণ জানিয়ে, পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করে জরুরি অবস্থা ঘোষণা করতে হয়। আমরা পাকিস্তানেও দেখেছি, বাংলাদেশেও দেখেছি। কিন্তু গণতন্ত্রে সভাসমাবেশের উপরে নিষেধাজ্ঞার এমন নজিরবিহীন অবস্থা দেখা যায় না। এমন কি স্বাধীনতার পরে জরুরি অবস্থা, বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। তবে সেখানেও আইনশৃঙ্খলার প্রতি হুমকির কথা বলা হয়েছিল। সেটিও ঢালাও ছিল না।

আমাদের বুধবার: এই অবস্থায় সংলাপ অনুষ্ঠানের পরিবেশ ও পরিস্থিতি রয়েছে কিনা?

. মীজানূর রহমান শেলী: এ ধরণের যুদ্ধাংদেহী কঠোর মনোভাব নিয়ে, কঠিন বেড়াজাল সৃষ্টি করে অন্যকে আহ্বান করলে তাতে সংলাপ হয় না। কারণ সংলাপে যদি বিরোধী পক্ষ সর্বস্বহীন, সর্বশান্ত হয়ে যোগও দেন, কিন্তু তারা কি আলোচনা করবেন, কেন আলোচনা করবেন? সরকার মনে করছে জনমত থাকলেও তাদের পক্ষে সংগঠিত হওয়ার উপায় নেই, অথবা আন্তর্জাতিক বা আন্তঃদেশীয় বা অভ্যন্তরীণ কোনো শক্তির ভরসায় সরকার অত্যন্ত আত্মবিশ্বাসী। কিন্তু সরকারের আত্মবিশ্বাসের ভিত কি তা আমাদের জানা নেই।

আমাদের বুধবার: সার্বিক পরিস্থিতিতে সংলাপ অনুষ্ঠানের পরিবেশ রয়েছে বলে আপনি মনে করেন কিনা?

. মীজানূর রহমান শেলী: সংলাপ অনুষ্ঠানের পরিবেশপরিস্থিতি রয়েছে বলে আমি মনে করি না। বরং এতে পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে যাচ্ছে, ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ আরো প্রবল হচ্ছে, বিশাল হচ্ছে, বিস্তৃত হচ্ছে।

আমাদের বুধবার: পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে হলে কি করা প্রয়োজন?

. মীজানূর রহমান শেলী: কি করে সংলাপ হবে? যারা যাবেন তারা কেন যাবেন, কি নিয়ে যাবেন? তাদের তো কিছু করার উপায় নেই। তারা বাইরেও প্রতিবাদ করতে পারেন না, ভেতরে তাদের বলার তেমন কিছু নেই। কারণ আইনগত বাধা দেখানো হচ্ছে, মামলা, আদালতের ভয় দেখানো হচ্ছে, সবশেষ আদালতের আদেশবলে তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিলোপ হয়েছে, তাতে একটি ব্যবস্থা ছিল। অর্থাৎ দরকার হলে সংসদ মনে করলে জাতীয় স্বার্থে, গণতন্ত্রের স্বার্থে আরো দু’বার তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন করা যাবে। যেহেতু সংসদ ক্ষমতাসীনদের কুক্ষিগত, কব্জায়, সে অবস্থায় তারা যদি বলে যে, এটা গ্রহণযোগ্য নয়, তাহলেই তো হলে গেল। তাহলে আইনগতও নেই, আন্দোলন করার সুযোগও নেই, সমাবেশ করারও অনুমতি নেই। ঢাল নেই, তলোয়ার নেই, নিধিরাম সর্দার হয়ে কি যুদ্ধে যাবেন? সংলাপের যুদ্ধ অর্থহীন হয়ে দাঁড়াবে।

আমাদের বুধবার: আপনি কি মনে করেন বর্তমান সরকারের অধীনে অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্ভব?

. মীজানূর রহমান শেলী: এ সম্পর্কে আমার যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। কারণ এখানে গণতন্ত্র সুপ্রতিষ্ঠিত নয়। এখানে চলছে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ভাষায় পেট্রোনক্লায়েন্ট রিলেসনশীপ অর্থাৎ যিনি সরকারে যান, তিনিই পেটোয়া বাহিনী সৃষ্টি করেন, সরকারি কর্মকর্তাদের দলীয়করণ করে, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, শিক্ষক, পেশাজীবীদের মধ্যে নিজ দল সৃষ্টি করেন। তখন ক্ষমতাসীন দলের দাপটে সাধারণভাবে নির্বাচন সুষ্ঠু এবং নিরপেক্ষ হয় না। আর এ কারণেই ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ এবং তার মিত্ররা তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থার জন্য প্রবল আন্দোলন করেছিল। এখন তারাই এর বিরুদ্ধে চলে গেছে।

আমাদের বুধবার: দেশের সার্বিক পরিস্থিতিকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

. মীজানূর রহমান শেলী: বর্তমান পরিস্থিতি অত্যন্ত সঙ্কটজনক, বিপজ্জনক ও মারাত্মক। রাজনৈতিক কারণে অর্থনৈতিক, সামাজিক ক্ষেত্রে যে ফাটল দেখা দিয়েছে, তা বিরাট ধস হয়ে রাষ্ট্রকে জর্জরিত এবং বিপন্ন করবে।

আমাদের বুধবার: আপনাকে ধন্যবাদ।।