Home » অর্থনীতি » গার্মেন্টস – তদন্ত কমিটির তদন্ত হওয়া প্রয়োজন

গার্মেন্টস – তদন্ত কমিটির তদন্ত হওয়া প্রয়োজন

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

savarবাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় ‘হত্যাকান্ড’ ঘটে গেল ২৪ এপ্রিল ২০১৩ সালে। ভবন ধস আমাদের দেশে নতুন কিছু না হলেও এবারেরটি অতীতের সব কয়েটিকে ছাপিয়ে গেছে। ভবন ধসে কত নিরীহ শ্রমিক আর সাধারণ মানুষ হতাহত হয়েছে তার সঠিক হিসাব নেই। তবে সরকারি তথ্যমতে, ১৯৯৭ সালে কলাবাগানে ভবন ধসের ঘটনায় মারা যায় ৭ জন। এরপর ২০০২ সালে শাহজাহানপুরের ঝিলপাড় এলাকায় ভবন ধসে মারা যায় ৪ জন। তার ২ বছর পর ২০০৪ সালের শাখারী বাজারের ভবন ধসে যায় যাতে হতাহত হয় প্রায় ১৭ জন। ২০০৫ সালে স্পেকট্রাম গার্মেন্টস ধসে প্রায় ৩৮জন শ্রমিক নিহত হয়যা ছিল এই পযর্ন্ত সবচেয়ে বড় ভবন ধস। তিন বছর আগে ২০১০ সালে তেজগাওয়ে বেগুন বাড়ীর ভবন ধসে মারা যায় প্রায় ২৫ জন। আর গত বছর গার্মেন্টস শিল্পে সবেচেয় বড় ট্রাজেডি হচ্ছে তাজরীন ফ্যাশন্সএর অগ্নিকাণ্ড যাতে মারা যায় শতাধিকের বেশি শ্রমিক।

সরকারি হিসাবে, গার্মেন্টস খাতে পাঁচবছরে দুর্ঘটনা ঘটেছে ২৫১টি। প্রাণ গেছে ৪৮৮ জনের। গার্মেন্ট মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতি বিজিএমইএ’র হিসাবমতে, গত ১৩ বছরে ১৬৬ দুর্ঘটনা ঘটেছে বিভিন্ন পোশাক কারখানায়। এতে নিহত হয়েছেন ২২২ জন শ্রমিক। আর গত ২৩ বছরে ভবন ধস ও আগুনে প্রাণহানি ঘটেছে ৩৮৮ জন শ্রমিকের। তবে সাভারের এই ভবনধস ছাড়াও গত ২৩বছরে পোশাকশিল্প কারখানায় ২১৭টি দুর্ঘটনা হয়েছে বলে তথ্য দিয়েছে বিজিএমইএ। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব লেবার স্টাডিজের (বিলস) হিসাবে, গত পাঁচবছরেই শুধু আগুনে মৃত্যু হয়েছে ৪৫৯ শ্রমিকের। ফায়ার সার্ভিসের তথ্যকেন্দ্রের হিসেবমতে, গত ১০বছরে গার্মেন্টে মৃতের সংখ্যা কমপক্ষে একহাজার। বিজিএমইএ’র তথ্যমতে, ১৯৯০ থেকে ২০১২ সালের জুনমাস পর্যন্ত পোশাক শিল্প কারখানায় ২১৭টি অগ্নিকাণ্ড ও ভবনধসের ঘটনা ঘটে। এরমধ্যে ২১২টি ভবনধস হয়েছে। ২৩টি কারখানার ২৭৫ জন শ্রমিক নিহত হন। গত বছর ২৪ নভেম্বর আশুলিয়ার তাজরীন গার্মেন্টে ১১৩ জনের প্রাণহানিসহ গত ২৩ বছরে মোট নিহতদের সংখ্যা দাঁডায় ৩৮৮ জনে।

কাগজেকলমে বিল্ডিং কোড মানার বাধ্যবাধকতা থাকলেও বাস্তবে রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ভবন তৈরির সময় এটা মানা হচ্ছে না। রাজধানীতে বিল্ডিং কোড না মানার পেছনে অনেকেই রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) উদাসীনতাকেই দায়ী করেছেন। এ ছাড়া ভবন নির্মাণের তদারকির দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর থাকলেও বেশির ভাগ ব্যক্তিমালিকানায় নির্মিত ভবন ঠিকাদারের তদারকিতে হয়ে থাকে। কাগজেকলমে শুধু প্রকৌশলীর উপস্থিতি হিসেবে স্বাক্ষর থাকে। এর ফলে ভবন ধসের আশঙ্কাও অনেক বেশি। অন্য দিকে বিল্ডিং কোড না মেনে তৈরি ভবন ধসে পড়লেও এর জন্য এখন পর্যন্ত কোনো ভবন মালিককে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেয়া হয়নি।

বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড যা মূলত বিএনবিসি ’৯৩ নামে সর্বাধিক পরিচিত,এতে ভূকম্পন থেকে রক্ষার জন্য কার্যকরী নকশা বিশদভাবে উল্লেখ করা আছে। এ প্রসঙ্গে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের একাধিক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দুঃখজনকভাবে সত্য যে এ বিল্ডিং কোড সরকারিভাবেই কার্যকর হয়নি। ১৯৯৭ সালে পূর্ত মন্ত্রণালয় একটি কমিটি গঠন করে এ বিল্ডিং কোড কার্যকর করার জন্য। কিন্তু এর কার্যক্রম খুব একটা অগ্রসর হয়নি। দেশের দুই কোটি ১০ লাখ মানুষ, যা সারা দেশের জনসংখ্যার ছয় ভাগের একভাগ মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাস করছেন। আরো ছয় কোটি ৫০ লাখ মানুষ মাঝারি ধরণের ঝুঁকির সম্মুখীন। কর্মকর্তারা জানান, বিল্ডিং কোড মূলত প্রকৌশলগত বিষয়। কোনো বিল্ডিংকে যেকোনো ঝুঁকি সহনীয় করে গড়ে তুলতে এ কোড প্রয়োগ করা হয়। ১৯৯৩ সালে হাউজ বিল্ডিং রিসার্স ইনস্টিটিউশনের মাধ্যমে সবপর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পূর্ণাঙ্গ বিল্ডিং কোড প্রণীত হয়, যা মাঠপর্যায়ে প্রয়োগের জন্য ২০০৬ সালে আইনগত ভিত্তি পায়। তবে বিল্ডিং কোড প্রয়োগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে আজ পর্যন্ত কোনো প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলা হয়নি।

সম্প্রতি গবেষকেরা ঢাকা মহানগরীতে ভূমিকম্পে ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ৭২ হাজার ভবন চিহ্নিত করেছেন। নগরবাসীকে ভূমিকম্পের ঝুঁকি থেকে রায় ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলোর তালিকা প্রকাশ করার উদ্যোগ নিয়েও শেষ অবধি পিছিয়ে আসে সরকার। সংশ্লিষ্টরা জানান, এ ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সংখ্যা প্রকাশের পরও এখন পর্যন্ত সরকারের তেমন কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। ঝুঁকিপূর্ণ ৭২ হাজার ভবন চিহ্নিত হলেও কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। এ ছাড়া এ সংখ্যা আরো বাড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

ভবন ধস বা ভূমিকম্প পরবর্তী উদ্ধার কাজে দেশে যন্ত্রপাতি এখনো অপর্যাপ্ত। ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানান, প্রতি বছর বাজেট প্রণয়নের আগে এ খাতে ব্যয় বরাদ্দের আবেদন করা হলেও তা জোটে না। তারা জানান, দেশে একটি বড় ভবন ধস বা গার্মেন্ট শিল্পে আগুনে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটলে এসব উদ্ধার যন্ত্রপাতির বিষয়টি উঠে আসে। সাভারে রানা প্লাজা ধসে পড়ার পর উদ্ধারকর্মীদের অনেকের হাতেই টর্চ, কাটার চাই সংবলিত পোস্টার দেখা যায়।

গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে ভয়াবহ আটটি অগ্নিকাণ্ড ও ভবন ধসে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনার পর সরকারিভাবে গঠিত তদন্ত কমিটি যেসব সুপারিশ করেছিল তার কোনটিই আজ পর্যন্ত বাস্তবায়িত হয়নি। মাঝারি ও ছোট আকারের অগ্নিকাণ্ড ও প্রাণহানির শতাধিক ঘটনায় উচ্চ পর্যায়ে ও স্থানীয়ভাবে প্রায় শতাধিক তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। তদন্ত কমিটি অগ্নিকাণ্ড, ধসের মতো ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে যেসব সুপারিশ জরুরি ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য বলেছিল সেগুলোর বেশির ভাগই বাস্তবায়িত হয়নি।

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, সংশ্লিষ্ট গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি মালিকদের তদন্ত কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএকেও জানানো হয়। তদন্ত কমিটিগুলোর প্রধান সুপারিশেই সরকারিভাবে এবং বিজিএমইএ ও বিকেএমইএকে যৌথভাবে ফ্যাক্টরিগুলোর অবস্থা সরজমিন যাচাই করতে বলা হয়। ভূমিধস ও অগ্নিকাণ্ডের সবগুলো ঘটনায়ই দেখা যায়, ফ্যাক্টরি কর্তৃপক্ষ বিল্ডিং কোড অনুসরণ করে নির্মাণকাজ করেনি। নিয়ম, বিধিবিধানের তোয়াক্কা না করে ভবন নির্মাণ করা হয়। প্রশস্ত সিঁড়ি ও অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা রাখার অপরিহার্য শর্ত রয়েছে। তা মানা হয়নি। বিজিএমইএ, বিকেএমইএ জরিপ কাজ চালিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলার পরও সব ফ্যাক্টরি কর্তৃপক্ষ তা অনুসরণ করেনি। তানজীন ফ্যাশন্সে ভয়াবহ ঘটনার পর ক্রেতাদের চাপের মুখেও উল্লেখযোগ্য প্রতিকার করা হয়নি।

আশুলিয়ায় তাজরীন ফ্যাশন্স ফ্যাক্টরিতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৬ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক প্রাণহানির ঘটনার পর সাভারে ভবন ধসে ৯০ গার্মেন্ট শ্রমিকের প্রাণহানির ঘটনা ঘটলো। ২০০৫ সালে সাভারে স্প্রেকট্রাম গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি ধসে ৬২ জনের প্রাণহানি ঘটে। এসব ঘটনাসহ অন্যান্য ঘটনার তদন্তে গঠিত কমিটি সুপারিশসহ প্রতিবেদন যথারীতি সরকারের কাছে দিয়েছে। কিন্তু কোন প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। সেপ্রকট্রামের ভবন ধসের জন্য রাজধানীর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্মাণ নীতি অনুসরণ না করা, অনুমোদনহীন নির্মাণকাজ করা, নির্মাণকাজে নিম্নমানের সামগ্রী ব্যবহারের ঘটনা উদঘাটিত হয়। গত বছরের ২৫শে নভেম্বর আশুলিয়ার নিশ্চিন্তপুর তাজরীন ফ্যাশন্সএ সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডের পর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব মাইনুদ্দিন খন্দকারের নেতৃত্বে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি ভবনে সিঁড়ি, বিকল্প সিঁড়ি, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ব্যবস্থা নিশ্চিত করার সুপারিশ করে। দীর্ঘমেয়াদি সুপারিশে বিল্ডিং নির্মাণ কোড শতভাগ মেনে ভবন নির্মাণ, ভবনে যাতে ধস দেখা দিতে না পারে তার প্রতিরোধক ব্যবস্থা নিশ্চিত করেই নির্মাণকাজ করা, দুর্ঘটনার পর দ্রুত বেরিয়ে আসার জন্য প্রশস্ত সিঁড়ি রাখার কথা বলা হয়। ২০০৫এর ১১ই এপ্রিল সাভারের পলাশবাড়ীতে স্পেকট্রাম গার্মেন্ট বিল্ডিং ধসে ৬২ জন শ্রমিক নিহত হন। গার্মেন্ট ফ্যাক্টরিতে অগ্নিকাণ্ড আর ভবন ধসে প্রাণহানির ঘটনায় সরকারিভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। বিজিএমইএ, বিকেএমইএ থেকেও তদন্ত করা হয়। কিন্তু পরে প্রতিকার কিছুই হয়নি। সুনির্দিষ্ট অভিযোগে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারও করা হয়নি। নিহত শ্রমিকদের পরিবারকে মালিকপক্ষ থেকে কিছু ক্ষতিপূরণ দেয়া হয় মাত্র। দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। সেপ্রকট্রাম, হামীম, মোহাম্মদপুরে সম্রাট ফ্যাশন্স, তাজরীনসহ বড় বড় দুর্ঘটনাগুলোর পর গঠিত কমিটি দেশের সমস্ত গার্মেন্ট ফ্যাক্টরি সরজমিন পরিদর্শন করে ভবনগুলো যথাযথ নিয়ম অনুসরণ করে নির্মাণ করা হয়েছে কিনা, পর্যাপ্ত অগ্নিনির্বাপক ও সিঁড়িসহ অন্যান্য জরুরি ব্যবস্থাসমূহ আছে কিনা পর্যবেক্ষণের সুপারিশ করে। কিন্তু কমিটির সুপারিশ কাগজেই রয়ে গেছে। বাস্তবায়ন করা হয়নি।।