Home » শিল্প-সংস্কৃতি » টেলিভিশন মানুষের বুদ্ধিগত মানকে নামিয়ে দিয়েছে – চিত্রনাট্যকার সুশো সেশি দামিকো

টেলিভিশন মানুষের বুদ্ধিগত মানকে নামিয়ে দিয়েছে – চিত্রনাট্যকার সুশো সেশি দামিকো

ফ্লোরা সরকার

Suso Cecchi d'Amicoসুশো সেশি দামিকো, একজন নারী চিত্রনাট্যকার, যিনি তার কাজের জন্যে আজও স্মরণযোগ্য। সুশো দামিকোর জন্ম ১৯১৪ সালের ২১ জুলাই, ইতালির রোমে। মূলত ইতালির ছবির সঙ্গেই তার সংশ্লিষ্টতা ছিল। টু লিভ ইন পিস, দ্যা গার্ল ফ্রেন্ড, দ্যা স্কাই উইল ফল ছাড়াও প্রায় ১০০টি ছবির চিত্রনাট্য তিনি লিখেছেন। তবে যে ছবি দুটির জন্যে তিনি আজও বিখ্যাত হয়ে আছেন তা হলো ভিক্টোরিও ডি সিকা’র ‘বাইসাইকেল থিভস’ (১৯৪৮) এবং লুচিনো ভিসকন্টি পরিচালিত ‘দ্যা লিওপাড’ (১৯৬৩)। ভিক্টোরিও ডি সিকা ছাড়াও ইতালির বিখ্যাত চিত্রনির্মাতা আ্যন্টোনিওনি, ফেদ্রিকো ফেলিনি ও অন্যান্য দিকপালের সঙ্গে কাজ করেছেন। ১৯৯৪ সালে ভেনিস ফিল্ম ফেস্টিভালে তাকে পূর্ণ কর্মময় জীবন বা লাইফ টাইম এচিভমেন্টের জন্যে গোল্ডেন গ্লোব এ ভূষিত করা হয়। ৯৬ বছর বয়সে ২০১০ এর ৩১ জুলাই মহিয়সী এই চিত্রনাট্যকারের মৃত্যু ঘটে। ১৯৯৫ সালে মাইকেল কলভিল এন্ডারসান তার পঁচাশি বছর বয়সে সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেন। তার অনুদিত অংশবিশেষ এখানে উপস্থাপন করা হলো। এটি দুই কিস্তির প্রথম পর্ব।

এন্ডারসান: আমরা যতদূর জানি ইতালির বিখ্যাত সব চিত্রনির্মাতাদের চিত্রনাট্য লেখার একটি বিশাল ব্যপ্তি আপনার রয়েছে। আপনি কি বলবেন কিভাবে শুরু হলো এই কাজটা ?

দামিকো: আসলে এটা ছিল অন্য একজনের পরামর্শ। ঠিক আমার পরিকল্পনা না। আমার বাবা যখন লিখতেন তখন থেকে রোমের সিনেমা জগতের প্রায় অনেকের সঙ্গে পরিচয় ছিল। ভালো লিখিয়ে হিসেবে বাবার খুব সুনাম ছিল। আমার মনে পড়ে আমাকে একবার একটি চিত্রনাট্য পড়ার জন্যে দেয়া হয়েছিল, কারণ তারা তরুণদের মতামত শুনতে আগ্রহী ছিলেন। আমিও ঠিক এই কাজটি সারা বছর ধরে আমার সন্তানদের সঙ্গে করেছি। কোন কমেডি লিখে তাদের হাতে দিতাম এবং জানতে চাইতাম সেটা পড়ে তাদের হাসি পায় নাকি পায় না। তারপর একদিন একজন আমাকে বললেন আমি চিত্রনাট্য লিখিনা কেন। আমি জানালাম এটা নিয়ে কখনো বিশেষ ভাবে ভাবিনি, তবে চেষ্টা করে দেখতে পারি। এরপর বেশকিছু চিত্রনাট্যের অনুবাদ করি এবং সবগুলো বেশ সানন্দে গৃহীত হয়।

এন্ডারসান: আপনার প্রথম প্রচেষ্টার পান্ডলিপি কি সিনেমা হিসেবে নির্মিত হয়েছিল ?

দামিকো: না, কিন্তু সেটা মন্দ বলে যে হয়নি তা নয়। বিশেষ একটা ঘটনার কারণে হয়নি। বিষয়টা খুলে বলি। প্রডিউসার পন্টি তখন একটা ছবি নির্মাণ করতে চাচ্ছিলেন ‘মি.জেকেল অ্যান্ড মি.হাইড’ নিয়ে। আমরা উপন্যাস নির্ভর গল্প নিয়ে কাজ করতে চাচ্ছিলাম। আমাদের বেশ গুরুত্বপূর্ণ একটি দল ছিল : পরিচালক ক্যাস্টেলানি এবং আরও দুজন সহকারি লেখক অ্যালবার্টো মোরাভিও ও এনিও ফ্লাইয়ানো।

একদিন টেবিলে গোল করে বসে সবাই মিলে গল্পটা নিয়ে গভীর আলোচনায় মগ্ন ছিলাম, এই সময় রেডিওতে খবর এলো হিরোশিমায় বোমা ফেটেছে। আমরা সবাই স্তম্ভিত হয়ে পড়লাম। সবাই মুখ চাওয়াচায়ি করলাম এবং বললাম “ পৃথিবীতে বসে আমরা কি করছি ? আমরা লেখা বন্ধ করে দিলাম তারপর পন্টিকে গিয়ে বললাম, “ দেখো, আমরা এই গল্পে আগ্রহী নই। আমরা প্রাণবন্ত কিছু করতে চাই। এমনকিছু যেখানে জীবন আছে”। তারপর আমাদের সেই ‘মি জেকেল অ্যান্ড হাইড’ নিয়ে আর কিছু করা হয়নি।

এন্ডারসান: কাজেই অ্যাটম বোমা পড়লো এবং

দামিকো: হ্যা। সেই গল্পটা আমরা লিখলাম যেখানে একজন অধ্যাপক এবং একটি মেয়ের হঠাৎ দেখা হলো যাক, আমরা এটাই ভাবছিলাম আমাদের কিছু একটা করতে হবে যা ব্যতিক্রম।

এন্ডারসান: সেই অভিজ্ঞতা থেকে কোন্ ছবিটি বের হয়ে এলো ?

দামিকো:টু লিভ ইন পিস’ ( ১৯৪৭)। আমার একটি ছোট গল্প থেকে তা নেয়া হয়েছিল, পরিচালনায় ছিলেন লুইগি জাম্পা।

এন্ডারসান: সেটাই আপনার প্রথম ছবি ?

দামিকো: হ্যা এবং এখনো আমি চিত্রনাট্য লেখাকে আমার পেশা হিসেবে মনে করি। চিত্রনাট্য আমার কাছে একটি কারিগরি কাজের মতো, কবির কাজের মতো নয়। আরও পরিস্কার করে বলতে হলে বলতে হয় আমি একজন কারিগর, কবি না।

এন্ডারসান: চিত্রনাট্য তাহলে সৃজনশীল নয় এটা শিল্পকৌশল ?

দামিকো: আমি তাই মনে করি। অন্তত সিনেমা কখনোই সৃজনশীল নয়।

এন্ডারসান: কখনো তা ছিল না ?

দামিকো: সিনেমা তোমাকে হয়তো ঐরকম কোন ধারণা দেয় কিন্তু এটাই বাস্তব। সৃজনশীল কাজ শুধু একজনের হাতে নির্মিত হয়। সিনেমা অনেকের দ্বারা নির্মিত, যেখানে অপ্রত্যাশিত অনেককিছু থাকতে পারে। সূর্য মেঘের আড়ালে চলে যাচ্ছে, অভিনেতা শীতে কাঁপতে কাঁপতে প্রবেশ করছে। কিন্তু সত্যিকার সৃষ্টি, সত্যিকার সৃজনশীলতা শুধু একজনের হাতে গড়ে ওঠে। আমি খুব দুঃখিত এভাবে একজন চিত্রনাট্যকারকে উপস্থাপন করার জন্যে। এটা খুব কাজের একটা কাজ হতে পারে, খুব চমৎকার কাজ। লিখিত কোন গল্পের মতো তার ওজন আছে, কিন্তু সে তার নিজের ওপর দাঁড়িয়ে থাকতে পারেনা।

এন্ডারসান: অনেক চিত্রনাট্যকারের কথা জানি যারা তাদের লেখার প্রেরণা পেয়েছেন সাহিত্য থেকে, যেমন ফ্লোবেয়ার, দস্তভস্কি প্রমুখের কাছ থেকে। কাজেই অনেক চিত্রনাট্যকার নিজেদের লেখক হিসেবে মনে করেন এবং তা বিশ্বাস করতে ভালোবাসেন। চিত্রনাট্য, চরিত্র, সংলাপ ইত্যাদি নির্মাণ এসব কি তাহলে লেখা নয় ?

দামিকো: হ্যা, কিন্তু একজন চিত্রনাট্যকার লেখেন তার চোখ বা দৃষ্টি দিয়ে। এটাই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ। একজন লেখককে বিষয় বর্ণনার জন্যে শব্দ খুঁজতে হয়। একজন চিত্রনাট্যকার খোঁজেন প্রতিমা। এটা অবশ্যই কিছুটা ভিন্ন। দুটোর তুলনা করা ঠিক না। দুটো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। ভিন্ন আঙ্গিকের উপস্থাপন। তুমি কোন একটি শব্দের সঙ্গে প্রতিমার তুলনা করতে পারো না।

এন্ডারসান: সিনেমার ওপর সাহিত্যের প্রভাব অনস্বীকার্য। কিন্তু সিনেমাও কি সাহিত্যের ওপর কোনভাবে প্রভাব ফেলে ?

দামিকো: ও হ্যা, অবশ্যই। বিশাল প্রভাব। বিশেষ করে যুদ্ধের সময়। এখনকার তরুণরা সেসব সাহিত্যের সঙ্গে অধিকতর অভ্যস্ত যেগুলি একসময় সিনেমা ছিল। কাজেই যখনই তুমি নতুন কোন উপন্যাস পড়ছো সেটা বিখ্যাত না হলেও তুমি সেখানে সিনেমা সদৃশ বর্ণনা খুঁজে নাও। ইংল্যান্ড বা আমেরিকার মতো ইতালিতে কখনোই বর্ণনাধর্মী উপন্যাস ছিল না। আমাদের দীর্ঘ উপন্যাসের মধ্যে যেমন আলেসান্দ্রো ম্যাজনির ‘প্রমেসি স্পসি’ র নাম করা যেতে পারে। আমাদের দীর্ঘ উপন্যাসের ঐতিহ্যের ধারাটি ছিল খুবই শীর্ণ। কিন্তু এখন প্রচুর আছে। খুব গুরুত্বপূর্ণ বা প্রতিভাবান নয়, তবে সবাই তরুণ। এই বিষয়ে সন্দেহ নেই তারা সবাই সিনেমা থেকে অবরোহণ করেছে।

এন্ডারসান: সাহিত্যের ঐতিহ্যের ধারাটি হারিয়ে গেছে তাহলে ?

দামিকো: নিঃসন্দেহে।

এন্ডারসান: কিন্তু আপনি সাহিত্য দ্বারা খুব প্রভাবিত ছিলেন।

দামিকো: হ্যা। আমি প্রচুর চুরি করেছি।

এন্ডারসান: চুরি ?

দামিকো: হ্যা। আমি সব সময় বলি সাহিত্য থেকে চুরি করাটা খুব জরুরি। দস্তভস্কির কথাই ধরো। আমরা তার থেকে প্রচুর চুরি করেছি। তার চরিত্র, পরিবেশ আর যা যা আছে। যেমন ‘রচো অ্যান্ড হিজ ব্রাদার্স’ (১৯৬০) ছবির কথাই ধরো, সেখানে রচো রাজপুত্র, যদিও চরিত্রটি ভিন্ন রকম, কিন্তু তা এসেছে দস্তভস্কি থেকে।

এন্ডারসান: ভবিষ্যতের সিনেমা কি সংকটাপূর্ণ ?

দামিকো: হ্যা, ভবিষ্যতের সিনেমা সংকটাপূণ। কারণ এখন থেকেই আমরা মাঝারি মাপের ছবি দেখতে পাচ্ছি।

এন্ডারসান: তাহলে কি পুরনো শিক্ষাগুরুদের কাছে ফিরে যেতে হবে ?

দামিকো: প্রেরণা লাভের জন্যে এখনও যেতে পারো। এখনও সেখান থেকে অনেক কিছু পাওয়া যাবে। কিন্তু তরুণরা এখন ক্লাসিক্স পড়তে চায়না। টলস্টয়ের চরিত্রদের কথা ভাবো তো একবার, কি সুবিশাল, কি তার প্রাচুর্য।

এন্ডারসান: আপনার প্রেরণা কারা ছিল ?

দামিকো: টলস্টয়, দস্তভস্কি।

এন্ডারসান: এতগুলো বছর চিত্রনাট্যকার হিসেবে কি করে কাটালেন ? যেহেতু শুরুটা হয়েছিল কিছুটা বাধ্য হয়ে ?

দামিকো: কিন্তু আমি বেশ উপভোগ করি এবং এখনও কাজ করে যাচ্ছি। দুঃখজনক হলেও সত্য এই যে আমরা ছায়াছবির খুব ভালো সময়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিনা। প্রকৃত সমস্যা হলো এর ব্যয়বহুলতা। খুব সর্তকভাবে কাজ করতে হয়। তাছাড়া খুব বেশি প্রডিউসার নেই। বিশাল বাজেটের প্রডিউসার পাওয়া যায় না। সিনেমা এখন একটি ব্যবসা, একটি শিল্পপণ্য। অংশত মন্দরুচির একটি শিল্পপণ্য, কারণ টেলিভিশান মানুষের বুদ্ধিগত মানকে নামিয়ে দিয়েছে, ক্রমেই তা আরো নামছে। আমরা এখন মাথা খাটিয়ে কিছু বুঝতে চাইনা।

মানুষ এখন টেলিভিশানের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে পড়েছে। আমি কখনো টিভি দেখি না কিন্তু ইতালিতে প্রচুর মানুষ টিভি দেখে। টিভিপ্রডিউসারদের খুব মাথা খাটাতে হয়না কারণ তার অভ্যস্ত দর্শক আছে। যার ফলে এর গুণগত মান ক্রমান্বয়ে বিলিন হয়ে যাচ্ছে। যা খুব খারাপ।

আমরা যখন ছবি নির্মাণ করতাম তখন স্বল্পব্যয়ে নির্মিত হতো। অতীতে ইতালি ছবি যখন উচ্চ সীমায় পৌঁছেছিল তখন কোন কোন ছবি সর্বনিম্ন আঠার দিন ধরে সিনেমা হলে চলতো। ছবির ব্যবসা পড়ে যাবার জন্যে আমরা নিজেরাই দায়ি। আমাদের সময়ে খুব বেশি অর্থ উপার্জন না হলেও সর্বোচ্চ ক্ষতি হতো না। ফলে প্রডিউসার এবং পরিচালক ছবি নির্মাণে সাহস করতেন। কারণ আমাদের কাছে এটাই সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, তুমি ছবি বানাবে শুধু তোমার জন্যে, লাভের জন্যে না। তুমি যদি মনে করো তুমি যা নির্মাণ করতে চেয়েছো তাই নির্মিত হয়েছে সেটাই ছিল যথেষ্ঠ। কিন্তু এখন কোন ছবির জন্যে লিখতে বসলে আগে ভাবতে হয় জাপানিরা এই ছবি বুঝতে পারবে কিনা। কিন্তু জাপানিরা কি পছন্দ করে সে সম্পর্কে আমার তো কোন ধারণা নেই। তোমাকে এমন ছবি বানাতে হবে যা পৃথিবীময় ঘুরতে পারে। শুধু তোমার আর তোমার কিছু বন্ধুবান্ধবের জন্যে ছবি বানাবে সেইদিন আর এখন নেই।।

(চলবে…)