Home » অর্থনীতি » তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

তেল আর যুদ্ধের সম্পর্ক অনেক পুরনো

ফারুক চৌধুরী

oil-22তেলের ইতিহাসের দিকে একটু দৃষ্টি রাখলে তেলগ্যাসের লুটপাট আর লুটপাটের রাজনীতি দেখা সহজ হয়। তেলের ইতিহাসের পৃষ্ঠায় চোখ রাখলে দেখা যায়, তেলের ব্যবহার শুরু হয় আড়াই হাজার বছরেরও আগে। সে সময় তেল ব্যবহৃত হয়েছিল যুদ্ধে। তবে, যুদ্ধাস্ত্র চালানোর জন্য নয়, যুদ্ধাস্ত্র হিসেবে খ্রিস্টের জন্মের ৬শ বছর আগে আকামেনিডের প্রথম শাহ তখন দ্বিতীয় কির। এই শাহের সেনাবাহিনী এক ধরণের তেল ব্যবহার করতো অস্ত্রে, আর সে অস্ত্র ব্যবহৃত হতো শত্রুর নগরে ও দুর্গে আক্রমণ চালানোর জন্য। এই আকামেনিড সাম্রাজ্য ছিল যেখানে, সেটা আজকের ইরান।

এক দেড়শ বছর পরে, হেরোডেটাস ব্যাবিলনের অগভীর গর্তে তেল থাকার বিবরণ দেন। এর সোয়াশো’ বছর পরে আলেকজান্ডারও তেল অস্ত্র ব্যবহার করলেন। শত্রুকে ভয় পাইয়ে দেয়ার জন্য তার সেনারা তেল জাতীয় সামগ্রী দিয়ে মশাল বানিয়ে তাতে আগুন ধরিয়ে তা ছুড়ে দিত শত্রুর দিকে। তেল আর যুদ্ধ যেন মিলেমিশে আছে। পেটার্ক আনুমানিক ১০০ খ্রিস্টাব্দে বিবরণ দেন যে, আজকের ইরাকের কিরকুকের কাছে মাটির তল থেকে তেলের বুদ্ধুদ বেরোতে দেখা গেছে।

প্রাথমিকভাবে প্রধানত তেলের খোঁজখবর, উল্লেখ পাওয়া যাচ্ছে আজকের পৃথিবীর তেলের জন্য সংঘাতযুদ্ধ, প্রতিযোগিতা আক্রান্ত এলাকাগুলোতে। এর পরে খবর পাওয়া গেছে এই এলাকা থেকে পূর্ব দিকে চীনে, সময় তখন ৩৪৭ খ্রিস্টাব্দ। বলা হয়ে থাকে যে, তেল আহরণের জন্য চীনারা মাটিতে গর্ত করতো। এ কাজে তারা ব্যবহার করত বাঁশ, বাঁশের সঙ্গে থাকতো আরো কিছু হাতিয়ার। এ গর্ত হতো আটশো’ ফুট পর্যন্ত গভীর।

অষ্টম শতাব্দীতে একটি তথ্য বলছে, বাকুর বাসিন্দারা জ্বালানি কাঠের অভাবে এক ধরণের মাটি জ্বালাতো। সে মাটি থাকতো তেলে ভেজা। নবম শতাব্দীতে আরবীয় পর্যটক আল বেলাজ্জবি তার বইতে বলেছেন যে, আবশেরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবন বহুকাল ধরেই যুক্ত ছিল তেলের সঙ্গে। মার্কো পলোর বিবরণীতেও বাকুতে আলো জ্বালানোর কাজে তেল ব্যবহারের তথ্য পাওয়া যায়। তার বিবরণীতে ওষুধ হিসেবে তেল ব্যবহারের তথ্যও রয়েছে। পোল্যান্ডের কার্পেন্থিয় পর্বতমালায় চুঁইয়ে চুঁইয়ে যে তেল বেরুতো, তা দিয়ে ক্রসনো শহরের রাস্তায় রাস্তায় আলো জ্বালানোর ব্যবস্থা করা হয়।

মস্কো কোম্পানি নামে একটি কোম্পানি গঠিত হয় লন্ডনে, সময় তখন ১৫৫৫ সাল। সে কোম্পানিÍ লোকদের পাঠানো হয় আজারবাইজানে। তারা বাকুতে তেলের কথা উল্লেখ করেন। মস্কো কোম্পানির লোকদের আজারবাইজানে পাঠিয়েছিলেন দু’জন ইংরেজ। একজনের নাম টমাস ব্যানিস্টার, অপর জন জেফরে ডুকেট।

প্রাপ্ত এক তথ্যে দেখা যায়, প্রায় সে সময়ে বাকুতে প্রায় ৩৫ মিটার গভীর কূপ খনন করা হতো তেল আহরণের জন্য। ইতালির পর্যটক পিয়েত্রো ডেলা ভ্যালে তার লেখায় বাকু অঞ্চলে বিপুল পরিমাণ কালো রংয়ের তেল পাওয়ার কথা উল্লেখ করেছেন। এ তেল ছিল সস্তা। তারপরও সেখানকার শাসকের অনেক আয় হতো এ তেল থেকে। এ সময়টি হচ্ছে ১৬১৮ সাল। এর ক’বছর পরে, ১৬৪৭ সালে তুরস্কের পর্যটক এভলিয়া চেলেবি বাকুতে অবস্থানকালে সেখানে অনেক তেল ক্ষেত্র দেখেন। তিনি এসবের বিশদ বিবরণ লেখেন। তার লেখা থেকেই দেখা যায় যে, বাকু থেকে তেল রফতানি হতো পারস্যে, মধ্য এশিয়ার তুরস্কে, ভারতে। ফলে শাসকের আয় হতো অনেক।

এ সময়ে ইংল্যান্ডের ও অন্য কয়েকটি ইউরোপীয় দেশের অবস্থা কেমন ছিল? টিউডর বংশ রাজ অধিকারগুলো জবরদস্ত করার চেষ্টা করলে পৃথক পৃথক মন্ত্রণালয় ও দফতর গড়ে উঠে, ইংল্যান্ডের বর্ধমান নৌশক্তি রক্ষা করছে সে দেশের বাণিজ্য, আইন ও সাহিত্যের ক্ষেত্রে ফরাসি ও লাতিন ভাষার জায়গায় বসছে ইংরেজি, শেক্সপিয়ার রচনা করছেন তার অমর সৃষ্টি, জার্মানিতে চলছে হাপসবার্গদের শাসন, পর্তুগাল তার সাম্রাজ্য সংহত করছে। পর্তুগালের নৌশক্তি এ উপমহাদেশের গোয়া দখল করে ১৫১০ সালে। তারা মালাক্কা দখল করে ১৫৫১ সালে। স্পেন ও পর্তুগালে গড়ে ওঠে সমুদ্র যাত্রা, জাহাজ চালনা ইত্যাদি বিষয়ে বেশ কয়েকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান। এসেব জায়গায় বড় বড় জাহাজ তৈরি হতে থাকে। তাদের হাতে রাইফেল উঠেছে আরো আগে। ১৪৭৫ সাল নাগাদ। ভারত উপমহাদেশে চলছে তখন মোগল শাসন। ইউরোপের সঙ্গে এ উপমহাদেশের বাণিজ্য বেড়ে চলেছে। ফ্রান্সে কর ও আইন কেন্দ্রীভূত রূপ নিয়েছে।

সে সময়ে ইউরোপের অর্থনীতি প্রসারিত হচ্ছে। বাণিজ্য তেজীভাব এনে দিয়েছে প্রাচ্যের ও আমেরিকার সোনা রূপা। বাণিজ্যের ও আর্থিক লেনদেনের নতুন নতুন পদ্ধতি গড়ে উঠছে, সেগুলোকে আরো পরিশীলিতপরিমার্জিত করা হচ্ছে। এ সবের মধ্যে ছিল জয়েন্ট স্টক কোম্পানি, বীমা, ঋণপত্র, বিনিময়পত্র। ব্যাংক অব আমস্টার্ডাম গড়ে তোলা হয় ১৬০৯ সালে। ব্যাংক অব ইংল্যান্ড গঠিত হয় ১৬৯৪ সালে। হাতঘড়ি তৈরি হয় ১৫০২ সালে। এর দরকার হয়ে পড়েছিল, বাণিজ্যের স্বার্থে। অনেক দেশের সরকার ১৬৫০ সালের মধ্যে মার্কেন্টাইল ব্যবস্থা গ্রহণ করে। এর মধ্যে দিয়ে স্ব স্ব দেশের ব্যবসায়ীদের বাণিজ্য রক্ষা করে সরকারগুলো ধাতব সম্পদ জমা করার চেষ্টা করে। কাপড় বোনা, খনিজ সম্পাদক আহরণ ইত্যাদি শিল্প সম্প্রসারিত হতে থাকে। এ ক্ষেত্রে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয় প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও বিকাশ।

জ্ঞানবিজ্ঞানের ক্ষেত্রেও এ সময় উল্লেখযোগ্য কয়েকটি ঘটনা ঘটে। প্যারিস ও অক্সফোর্ডের চিন্তাবিদরা তুলনামূলকভাবে অবাধ পদ্ধতির পথ তৈরি করেন, জ্ঞান চর্চার ক্ষেত্রে গোঁড়ামি পিছু হটতে থাকে। কোপার্নিকাস, কেপলার, গ্যালিলিও এ সময়ে অবদান রাখেন। বদ্ধমূল ধারণাগুলো চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে, প্রত্যাখ্যাত হতে থাকে। কোপার্নিকাস প্রয়াত হন ১৫৪৩ সালে, কেপলার ১৬৩০ সালে ও গ্যালিলিও ১৬৪২ সালে। গণিতে, জ্যামিতিতে নতুন নতুন ধারণা যুক্ত হয়। কেপলার ১৬০৯ সালে প্রকাশ করেন এস্ট্রোনোমিয়া নোভা। পদার্থ বিদ্যার প্রয়োজন মেটাতে উদ্ভাবিত হয় ক্যালকুলাস। প্রতিষ্ঠিত হয়। জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার কয়েকটি কেন্দ্র : ফ্রোরেন্সে ১৬৫৭ সালে।

লন্ডনে রয়্যাল সোসাইটি ১৬৬০ সালে, প্যারিসে ১৬৬৬ সালে নানা উদ্ভাবন হয়। জার্মানিতে ১৬০৯ সালে, এন্টওয়ার্পে ১৬১৬ প্যারিসে ১৬৩১ সালে প্রকাশিত হয় সংবাদপত্র। মাইকেল রোমানভ ১৬১৩ সালে রাশিয়ায় প্রতিষ্ঠা করেন রোমানভ বংশের শাসন। রাশিয়ায় জারের এ শাসন চলে ১৯১৭ সালে মজুরদের বিপ্লবে জার ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার আগে পর্যন্ত। এই গরিবদের রাষ্ট্র কায়েমে যে সংগ্রাম গড়ে তোলা হয়, তার অন্যতম কেন্দ্র ছিল বাকু, সেখানকার তেল শক্তি যোগায় মজুরদের রাজনৈতিক শিক্ষা, সংগঠন, ধর্মঘট, লড়াইয়ে। গরিবদের এ লড়াইয়ের অন্যতম নেতা স্টালিনের অন্যতম কর্মক্ষেত্রও ছিল বাকু ও সেখানকার মজুররা। লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, উপরে খুব সংক্ষেপে উল্লেখিত ঘটনাগুলো পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত। একটির প্রয়োজনে আরেকটি গড়ে উঠছে বা উদ্ভাবিত হচ্ছে বা বিকশিত হচ্ছে বা বিবর্তিত হচ্ছে। অর্থনীতির সঙ্গে সম্পর্ক রয়েছে বিজ্ঞানের, প্রযুক্তির, উদ্ভাবনের, প্রয়োজন পূরণের, রাজনীতির নানা শাস্ত্রের, পদ্ধতি আবিষ্কারের, আরো কতো কিছুর। তেলের ইতিহাস লক্ষ্য করলে এ ধরণের মজাদার নানা দিক দেখা যাবে। যেগুলো ঘটনাবলী বুঝতে ‘রহস্য’ উদঘাটনে সাহায্য করবে।

উল্লেখ করা হয়েছে যে, লন্ডনে গঠিত হচ্ছে কোম্পানি, নাম তার মস্কো কোম্পানি, সে কোম্পানির দুই ইংরেজ কর্তা লোক পাঠাচ্ছে আজারবাইজানের বাকুতে। আজও কি এমন দেখা যায় না?

ফেরা যাক তেলের ইতিহাসে। নানা বিবরণে দেখা যায় আজারবাইজানে কূপ থেকে তেল তোলা হচ্ছে। এমন বিবরণ পাওয়া যায় ১৬৬৬ সালে। রাশিয়ার সম্রাটকে বলা হতো জার। এমনই এক জার পিটার। তাকে সম্মান দেখিয়ে সম্বোধন করা হতো পিটার দ্য গ্রেট, মহামতি পিটার। সেই পিটার জার ১৭২৩ সালে তেল আহরণ করার উদ্দেশ্য জারি করেন কয়েকটি বিশেষ ডিক্রি। এগুলোকে রাজার হুকুমনামা বলা যেতে পারে। মাইকেল মাটিউশকিন নামে ছিলেন এক মেজর জেনারেল। তিনি পিটার রাজার হুকুম জারিকালে বাকু শাসন করতেন। জার পিটার মেজর জেনারেলকে হুকুম দিলেন এক হাজার পুদ বা যতো বেশি সম্ভব সাদা তেল পাঠানোর এবং তেল উৎপাদন বৃদ্ধি করার উপায় খুঁজে দেখার জন্য। পুদ হচ্ছে সে দেশের একটি পরিমাপ, আমাদের যেমন মণ, সের, ছটাক। রুশ জারতন্ত্র পারস্য অভিযান চালায় ১৭২২ থেকে ১৭২৩ সাল পর্যন্ত। এ অভিযানের মধ্যদিয়ে বাকু এবং কাসপিয়ান সাগরের পূর্ব উপকূলে দেরবেন্ডকে রাশিয়ার অঙ্গীভূত করে নেন মহান পিটার। তেলের সঙ্গে যুদ্ধের সম্পর্ক যেন অনেক পুরনো।

কারো কারো কাছে ঘটনা ধারা অবাক করে দেয়ার মতো। দেখা যাচ্ছে () শাসকের তেলতৃষ্ণা, () এ মতলবে পরদেশ আক্রমণ ও দখল করে নেয়া ঘটছে, () তেল তৃষ্ণা জারের, লোভের থাবা হানা দিচ্ছে বাকুতে। আজও কি এমন ঘটে? সাম্প্রতিক ঘটনা ধারা লক্ষ্য করলে বেশ মজাদার মিল পাওয়া যাবে।

আর কাসপিয়ান সাগর ও বাকুকে নিয়ে আজও তেলের রাজনীতি চলছে, আছে উত্তেজনা। এটাকে বলা উচিত তেলের অর্থনীতির একাংশ বা তেল লোভ লুট নীতি। লুটের তেলনীতি বললে কি ভুল হবে? আর ইতিহাসের এসব তথ্যই রয়েছে ইতিহাস বইতে। কয়েকটি ইতিহাস বই ঘাটলেই এসব খবর পাওয়া যাবে।।

(চলবে…)