Home » অর্থনীতি » বাংলাদেশে ভারতের বিনিয়োগ আধিপত্য বাড়ছে

বাংলাদেশে ভারতের বিনিয়োগ আধিপত্য বাড়ছে

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

indian investmentবাংলাদেশে বিদেশী বিনিয়োগের উৎস দেশ হিসেবে ভারতের আধিপত্য বাড়ছে। এ পর্যন্ত দেশটি বাংলাদেশে প্রায় এক বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগ করেছে। যার বড় অংশই এসেছে গত পাঁচ বছরে। বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহের তথ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে সরকারি ও বেসরকারি দুভাবেই এ বিনিয়োগ বাড়িয়েছে দেশটি। সাম্প্রতিক বিনিয়োগ চুক্তি বাস্তবায়ন হলে আগামী বছরগুলোয় এ প্রবণতা আরো বাড়বে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সব খাতেই ভারতীয় বিনিয়োগের আধিপত্য দেখা যাচ্ছে। ১৩২০ মেগাওয়াট ক্ষমতা সম্পন্ন কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ব এনটিপিসির সঙ্গে এরই মধ্যে চুক্তি হয়েছে। গ্যাস অনুসন্ধানে বাংলাদেশের সঙ্গে যৌথ বিনিয়োগে আসছে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত ওএনসিজি ভিদেশ লিমিটেড (ওভিএল) ও অয়েল ইন্ডিয়া লিমিটেডের মত বৃহৎ প্রতিষ্ঠান। সাগরের সম্প্রতি ওভিএল দেশের দুইটি ব্লকে গ্যাস অনুসন্ধান আগামী আগষ্ট মাসে চুক্তির অপেক্ষায় আছে টেলিকম খাতে বিনিয়োগ বাস্তবায়ন করেছে ভারতী এয়ারটেল। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠানটি ওয়ারিদের শতভাগ শেয়ার কিনে নিয়েছে। প্রসাধন খাতে বিনিয়োগ সম্প্রসারণ করেছে মেরিকো। আবাসন ও যানবাহন তৈরিতে নতুন বিনিয়োগের আগ্রহ দেখিয়েছে সাহারা ও টাটা। অতি সম্প্রতি বিনিয়োগ নিবন্ধন করেছে টায়ার নির্মাতা সিয়াট।

দক্ষিণ এশিয়ায় বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহ নিয়ে বিশ্ব ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৩ থেকে ২০১২ এই এক দশকে এ অঞ্চলে বিনিয়োগ প্রবাহ বাড়িয়ে নিজেদের শক্ত অবস্থান তৈরি করেছে ভারত। এ সময়ে দক্ষিণ এশিয়ায় ভারতের মোট বিনিয়োগের ২৩ দশমিক ৮৮ শতাংশই এসেছে বাংলাদেশে। শুধু বাংলাদেশ নয়, পুরো দক্ষিণ এশিয়ায় বিনিয়োগের সবচেয়ে সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে ভারতকেই দেখছে বিশ্ব ব্যাংক।

বিনিয়োগ সংশ্লিষ্টরাও বিদেশী বিনিয়োগের ক্ষেত্রে প্রতিবেশী ভারতকেই বাংলাদেশের মূল ভরসা মনে করছেন। তবে এর একমত হতে পারছে না বিনিয়োগ বোর্ড। তাদের দাবি, স্বাধীনতার পর থেকে তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে বিদেশী বিনিয়োগের যে হিসাব পাওয়া যায় তাতে ভারত এখনো অনেক পিছিয়ে। আর এক্ষেত্রে মূল বাধা ছিলো দেশটির বৈদেশিক বিনিয়োগের নীতিমালা। বিনিয়োগ বোর্ডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৪১ বছরে বাংলাদেশের মোট বিদেশী বিনিয়োগে ভারতের অবদান মাত্র ৩ শতাংশ। অবস্থানগত দিক দিয়ে এক্ষেত্রে ভারত রয়েছে ১২তম স্থানে। প্রথম অবস্থানে আছে যুক্তরাজ্য। পরের অবস্থানে আছে যুক্তরাষ্ট্র, অষ্ট্রেলিয়া ও নেদারল্যান্ডস। বিনিয়োগ বোর্ডের কর্মকর্তারা বলছেন, এ পরিস্থিতি বদলানোর চেষ্টা চলছে। এরই অংশ হিসেবে আগামী জুনেই রোড শো করতে একটি প্রতিনিধি দল ভারতে যাচ্ছে।

গার্মেন্ট খাতে ভারতের আধিপত্য: রফতানি আয়ে ৭৮ শতাংশ অবদান রক্ষাকারী বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্প খাতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন ২০ হাজার ভারতীয় নির্বাহী। বছরের পর বছর এ দেশে কাজ করলেও তারা ভিসাপাসপোর্টের ধার ধারেন না। তাদের বেশির ভাগেরই কোনো ওয়ার্ক পারমিট নেই। এ নিয়ে সরকারের কোনো মাথাব্যথাও নেই। বছরের পর বছর তারা এ দেশে থাকছেন, আসছেনযাচ্ছেন। পাচার করে নিচ্ছেন কোটি কোটি টাকা। তারাই অর্ডার আনছেন, এলসি খুলছেন, মালামাল কিনছেন, কোয়ালিটি কন্ট্রোল করছেন, শিপমেন্ট দিচ্ছেন। মালিকের সঙ্গে বনিবনা না হলে তারাই আবার কৌশলে ডুবিয়ে দিচ্ছেন পুরো প্রতিষ্ঠান। শ্রমিক অসন্তোষ বাধিয়ে কারখানা বন্ধ করে দিচ্ছেন। এরপর কৌশলে বিক্রি করে দিচ্ছেন ভারতীয় বংশোদ্ভূতদের কাছে। হাজার হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগে ৩০ বছরের তিলে তিলে গড়ে ওঠা এ শিল্প এখন ভারতীয়দের হাতে জিম্মি হয়ে পড়েছে।

বিভিন্নপর্যায়ের উদ্যোক্তার সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দেশের প্রায় পাঁচ হাজার তৈরী পোশাক কারখানায় বর্তমানে ২৫ হাজারেরও বেশি বিদেশী কর্মকর্তা কাজ করছেন। তাদের তিনচতুর্থাংশই ভারতীয়। জেনারেল ম্যানেজার, প্রোডাকশন ম্যানেজার, কমার্শিয়াল ম্যানেজার, কোয়ালিটি কন্ট্রোলার, মার্চেন্ডাইজার পর্যায়ের এসব কর্মকর্তাই কারখানার প্রাণ। সাড়ে চার হাজারের বেশি বাংলাদেশী উদ্যোক্তা অনেক ক্ষেত্রেই বাধ্য হচ্ছেন মিড লেবেল এসব ম্যানেজারের ইশারায় চলতে। কাজের অর্ডার পাওয়া থেকে শুরু করে ডেলিভারি দেয়া পর্যন্ত সব কাজই এদের হাত দিয়ে সম্পন্ন হয়। মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে সংযোগ সৃষ্টির কাজটিও করে থাকেন মিড লেবেল ম্যানেজমেন্টের এসব কর্মকর্তা। কঠোর পরিশ্রম আর ব্যক্তিগত চেষ্টাসাধনার মাধ্যমে যেসব বাংলাদেশী নিজেদের গড়ে তুলতে সক্ষম হয়েছেন, উদ্যোক্তাদের অবহেলা ও ভারতীয়দের ঐক্যবদ্ধ বিরোধিতার কারণে তারাও এখনো নীতিনির্ধারণী বড় পদগুলোয় যেতে পারছেন না। ফলে কারখানা পরিচালনায় মালিকেরা বেশির ভাগই ভারতীয়দের ওপর নির্ভরশীল। এ সুযোগে মালিককে জিম্মি করে তারা হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অঙ্কের টাকা। জানা গেছে, গত দুই বছরে অর্ধশতাধিক কারখানার মালিকানা বদল হয়েছে। বিক্রির কথাবার্তা চলছে আরো শতাধিক কারখানার বিষয়ে। কারখানা বিক্রেতাদের তালিকায় রয়েছেন বিজিএমইএর অনেক গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও নামকরা ব্যবসায়ীর নামও। বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ, আমেরিকান, কানাডিয়ান নাগরিকেরা কিনে নিয়েছেন এসব কারখানা। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) নিয়মানুযায়ী, স্বল্পোন্নত দেশ হিসেবে বাংলাদেশ পশ্চিমা দেশগুলোতে পোশাক রফতানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করে থাকে। আর ভারতীয় ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে দিতে হয় ৯ দশমিক ৬ শতাংশ শুল্ক। এ কারণে বৈশ্বিকপর্যায়ে ভারতকে বাড়তি প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে হয়। শুল্কমুক্ত সুবিধা ও সস্তা শ্রমের কারণে ভারতের তুলনায় বাংলাদেশে ২০ শতাংশ সস্তায় পোশাক উৎপাদন সম্ভব হয়। ঠিক এ কারণে খারাপ অবকাঠামো ও রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা সত্ত্বেও ভারতীয় কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে এগিয়ে আসে বলে বিশেষজ্ঞদের ধারণা। ভারতীয় পোশাক শিল্প সমিতির মহাসচিব ডি কে নায়ের এ প্রসঙ্গে বলেন, বাংলাদেশের শ্রমমূল্য ভারতের চেয়ে তিন গুণ কম। ভারতে মাসিক শ্রম খরচ গড়ে সাত হাজার রুপি আর বাংলাদেশের আড়াই হাজার রুপির মতো।

সংশ্লিষ্ট খাতের উদ্যোক্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের তীব্র আপত্তির মুখে ভারতীয়দের বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্প খাতে বিনিয়োগের সুযোগ করে দেয় সরকার। সুযোগ পেয়ে পানির দরে নামেবেনামে অসংখ্য বাংলাদেশী তৈরী পোশাক কারখানা কিনে নেন তারা। গার্মেন্ট শিল্পে বিদেশীদের অবাধে বিনিয়োগ সুযোগ দেয়ায় এসব সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে দাবি করেছেন, বাংলাদেশ তৈরী পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতির অনেক নেতা। তারা বলছেন, ট্রান্সশিপমেন্টের নামে ট্রানজিট দিয়ে সরকার যেমন আত্মঘাতী কাজ করছে, বাংলাদেশী তৈরী পোশাক শিল্পে ভারতীয়দের বিনিয়োগের সুযোগ দিয়ে সরকার তেমন ভুলই করছে।।

১টি মন্তব্য

  1. Shilabrata Barua

    নিকটতম প্রতিবেশী হিসাবে এটাই স্বভাবিক