Home » অর্থনীতি » বিপর্যস্ত মানুষ – ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও বিপাকে

বিপর্যস্ত মানুষ – ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাও বিপাকে

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

unstable-economy-1-নিউমার্কেটের ব্যবসায়ী আবদুস সালাম জানান, ‘আগে যা ব্যবসা করতাম, এখন ব্যবসা তার অর্ধেকে নেমে এসেছে। বেচাকেনা নেই বললেই চলে। আগে মানুষ যে পরিমাণ কিনতো, এখন তার অর্ধেকও কিনে না। অনেকে ধারণা করেন, জিনিসপত্রের দাম বাড়লেই মনে হয় আমাদের ব্যবসা বাড়ে। আসলে এটা ঠিক না। বরং যদি বেশি বেচা বিক্রি হয় তাহলে আমাদের পয়সা উঠে যায় এবং লাভ থাকে। কিন্তু যদি বেচাবিক্রি কম হয়, তাহলে আমাদের খরচা ওঠানোই কষ্ট হয়ে যায়, লাভ তো দূরে থাক। আগে যারা আমার দোকান থেকে নিয়মিত মুদি মালামাল কিনতেন, তাদের অনেককেই এখন আর আমি দেখি না। দুয়েক জনের সঙ্গে রাস্তাঘাটে দেখা হলে তারা বলেন, আমরা এখন মহল্লার দোকান থেকে জিনিসপত্র কিনি। আমরা ব্যবসায়ীরা, দোকানদাররা তখনই বুঝে ফেলি, স্যারদের হাতে পয়সা নাই।’

ঢাকার গ্রিনরোডের একটি দোকানের মালিক আলাউদ্দিন আহমেদ সেলিম জানান, বেচাবিক্রির অবস্থা খুবই খারাপ। বছর দেড়েক দুয়েক আগের তুলনায় এখন বেচাবিক্রি কমপক্ষে ৪০ শতাংশ কমে গেছে। তাছাড়া ক্রেতাও কমেছে সমানভাবে। এখন কর্মচারীদের বেতন দিয়ে ব্যবসা চালানোই কঠিন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক যাত্রাবাড়ীর এক মাছ ব্যবসায়ী জানান, আগে চাঁদাপাতি দেয়ার পরেও ব্যবসা যতোটা ছিল, এখন তা অর্ধেকে নেমে এসেছে। একে তো মাছ মিলে না, এর উপরে বেশি দামে যারা আগে মাছ কিনতেন, তারা এখন দোকানের ধারেকাছেও আসেন না। তারা এখন ছোট মাছ খোঁজেন। যে কারণে আমাদের অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গেছে।

মগবাজারের গৃহিণী দিলরুবা আহমেদ জানান, আগে দশ হাজার টাকার কাঁচা বাজার এবং মাছ কিনলে সারামাস চলে যেতো। আমার স্বামীর বেতন বাড়েনি কিন্তু বাজার খরচও দিনে দিনে বাড়ছে। এর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়ে গেছে বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত খরচসহ সব কিছু। এখন মধ্যবিত্তের যা হয় অর্থাৎ আমরা খাওয়াদাওয়ার উপরে এক ধরণের নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছি। এছাড়া উপায় কি বলুন?

পুরানো ঢাকার কম্পিউটারসেবা ব্যবসায়ী আলী আহমদ জানান, সকাল ১০টায় দোকান খোলার পর সারা দিনে মাত্র চার ঘণ্টা বিদ্যুৎ পাওয়া যায়। এতে ব্যবসার অবস্থা খুবই নাজুক। গত বছর দোকানভাড়া ছিল তিন হাজার ৬০০ টাকা। এ বছর তা বাড়িয়ে সাত হাজার টাকা করা হয়েছে। প্রতি মাসে দোকানভাড়া, কর্মচারীর বেতন, বিদ্যুতের বিল ও আনুষঙ্গিক খরচ পড়ে ২০ হাজার টাকা। বিদ্যুতের এই অবস্থা চলতে থাকলে এক বছরের মধ্যে ব্যবসা গুটিয়ে চলে যেতে হবে। হরতালের কারণে যে পরিমাণ ক্ষতি হচ্ছে, তাও পুষিয়ে নিতে পারছেন না তিনি।

ছাপাখানা ব্যবসায়ী আবুল রহিম জানান, কলকারখানার উৎপাদন সবই বন্ধ হয়ে আছে। কলকারখানা যেভাবে চলছে, তাতে ভবিষ্যতে ব্যবসাবাণিজ্য ছেড়ে চলে যেতে হবে। পুরান ঢাকার বাবুবাজার, নয়াবাজার, জিন্দাবাহার ও ইসলামপুর এলাকায় রয়েছে কয়েক শ ছাপাখানা। ওই এলাকার ব্যবসায়ীরা জানান, বিদ্যুতের অভাবে ছাপাখানার ব্যবসায়ীদের বেশি ভোগান্তি হচ্ছে। কাজের অর্ডার নিয়ে যথাসময়ে সরবরাহ করা যাচ্ছে না।

বাবুবাজারের ওষুধের ব্যবসায়ী জামশেদ জানান, বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর জেনারেটর দিয়ে কোনোমতে দোকানে বসে থাকা যায়। একটি লাইট ও একটি ফ্যানে মাসে ৩০০ টাকা ভাড়া দিতে হয়। গত দুই দিন জেনারেটর অকেজো ছিল। তখন দোকানে বসে থাকাই কঠিন। বাবুবাজারের একাধিক বাসিন্দা জানান, বিদ্যুতের লুকোচুরির কারণে এইচএসসি পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনায় বিঘন ছাড়াও দেখা দিয়েছে পানিসংকট। সকালের দিকে গোসল ও রান্নার কাজ শেষ করতে হয়। লোডশেডিংয়ের সময় প্রচণ্ড গরমে শিশু ও বৃদ্ধ লোকদের কষ্টের সীমা থাকে না। নাম না প্রকাশের শর্তে এক ওয়ার্ড কমিশনার জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ব্যাংকের উচ্চ সুদের কারণে ব্যবসা করা দায় হয়ে পড়ছে।

কারওয়ান বাজারের চাল ব্যবসায়ী মনিরুজ্জামান বলেন, আমরা দেশের উত্তরাঞ্চল থেকে চাল এনে বিক্রি করি। বিভিন্ন দোকানির কাছে বিপুল পরিমাণ টাকা বকেয়া থাকে। বছরের শেষে বকেয়া পরিশোধ করে নতুন করে লেনদেন শুরু করাই নিয়ম। কিন্তু এবার বকেয়া ২০ শতাংশ আদায় হবে কিনা তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।পাইকারি চাল ব্যবসায়ী নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘এই বাজারে শতাধিক চাল ব্যবসায়ী রয়েছে। এমন কোন ব্যবসায়ী নেই যাদের ৪/৫ কোটি টাকা বকেয়া নেই। ব্যবসাবাণিজ্যে মন্দার কারণে এবার মোট বকেয়ার ৩০ শতাংশ আদায় হবে না।

খাতুনগঞ্জের পেঁয়াজ, রসুন ও আদাসহ মসল্লা জাতীয় পণ্যের পাইকারি ব্যবসায়ী হাজী মোহাম্মদ আলী বলেন, গত দেড় মাস যাবত হরতাল, অবরোধসহ রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে বেচাবিক্রিতে চরম মন্দা চলছে। নগরীর ফিশারীঘাট এলাকায় রয়েছে শতাধিক মাছের আড়ত। আড়তদাররাও হালখাতা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করেছেন। আড়তদার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘যশোর, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা থেকে দৈনিক ৪/৫ ট্রাক মাছ আনা হতো। হরতালের কারণে তা আনা যাচ্ছে না।

কাঁঠাল বাগান বাজারের কাঁচাসবজি বিক্রেতা আনিস জানানা, ব্যবসার অবস্থা ভালো না। ঘন ঘন ও টানা হরতালের কারণে প্রচুর সবজি নষ্ট হয়েছে। ক্রেতারা বাজারে এসেছে কম, দামও ছিল বেশি। ভোক্তারা আগের চেয়ে চালাক হয়ে গেছে উল্লেখ করে তিনি জানান, হরতাল হলে আগে থেকেই পণ্য কিনে তারা জমা করে রাখেন। কারণ তারা জানেন, হরতালে দাম বাড়বে। কিন্তু আমাকে তো প্রতিদিনই পণ্য সরবরাহ করে নির্দিষ্ট ব্যক্তি। বিক্রি না হলে তা ফেলে দিতে হয়। অন্যদিকে কারওয়ান বাজারের কাঁচা সবজি বিক্রেতা জানান, গেল কয়েকদিনের হরতালে তার ৫ লাখ টাকার পণ্য নষ্ট হয়েছে। ট্রাকে আগুন দিয়ে আলু পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। মাছ বিক্রেতা করিম জানালেন তার মাছ নষ্ট হয়ে যাওয়ার কাহিনী। বরফ আনতে না পারায় ৭ লাখ টাকার মাছ তার নষ্ট হয়েছে তার। তবে একেবারে ভিন্ন কথা জানালেন মোহাম্মদুর বাজারের দোকানদার সবুজ। তিনি বলেন, হরতাল হলে তার বিক্রি বেড়ে যায়। মানুষ রিক্সায় এসে পণ্য কিনে নিয়ে যায়। রাস্তায় জ্যাম থাকে না বলে এটি হয়।

তবে মগবাজারের মুদি দোকানী আলম জানান, রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়া ক্রেতাদের সঙ্গে প্রায় তার ঝগড়া লেগে যায়। এছাড়া প্রতিটি পণ্যের দাম উর্ধ্বমুখী। এভাবে চলতে থাকলে ব্যবসা ছেড়ে দেয়া ছাড়া পথ থাকবে না।

ব্যাংকার হারুন বলেন, হরতালের কারণে উত্তরবঙ্গের রিকশাওয়ালারা ঢাকা ছাড়ছে। ঢাকায় কাজ নেই, রোজগার কম। চিনি, তেল, গম, চাল, সয়াবিন, আটা, ময়দা আমদানিকারকরাও আসছে ঋণ পুনঃতফসিল করতে। কিন্তু ব্যাংকগুলোর বিপদ। তারা বর্তমান খেলাপি ঋণের বোঝাই সহ্য করতে পারছে না। খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকের প্রভিশন ও মূলধন ঘাটতি দেখা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন নিয়মাধীন শ্রেণীকরণ নীতি (ক্লাসিফিকেশন রুলস) সমস্যাকে আরও তীব্র করে তুলেছে। ব্যাংকাররা নানা জালজালিয়াতির কারণে দুদকের তদন্তের সম্মুখীন। তারা কোন ঝুঁকি নিতে এখন আর চায় না। ব্যাংক ব্যবসাতেও নেমে এসেছে ভীষণ অনিশ্চয়তা। ব্যবসাবাণিজ্যে মন্দা, হরতালের কারণে সৃষ্ট বাধাবিপত্তি, রফতানি হরাস, বেচাকেনায় স্থবিরতার পাশাপাশি ব্যবসায়ীদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে নানা ধরণের প্রবণতা।।