Home » সাক্ষাৎকার » সাক্ষাৎকার – সুলতানা কামাল

সাক্ষাৎকার – সুলতানা কামাল

যখন সরকার জনগণকে রাষ্ট্রের অঙ্গ হিসেবে চিন্তা করে না বা ভুলে যায়, তখনই বিচ্ছিন্নতার প্রবণতা দেখা দেয়

sultana kamalঅ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, টিআইবি’র চেয়ারপারসন এবং মানবাধিকার সংস্থা ‘আইন ও শালিস কেন্দ্রের’ প্রধান নির্বাহী, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি, সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক পরিস্থিতিসহ বিভিন্ন প্রশ্নে কথা বলেছেন আমাদের বুধবারএর সঙ্গে।

আমাদের বুধবার: বর্তমান মানবাধিকার পরিস্থিতিকে আপনি কিভাবে বিশ্লেষণ করবেন?

সুলতানা কামাল: মানবাধিকারের পরিধি এখন অনেক বেশি বিস্তৃত। মানবাধিকারের বিভিন্ন মাত্রাকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করছে, সংজ্ঞায়িত করছে এবং অধিকারের পরিধিও অনেক বেড়েছে। কাজেই মানবাধিকার প্রশ্নটি এখন বহুমাত্রিক। মানবাধিকারকে যদি বিভিন্ন ভাবে ভাগ করে দেখা হয়, যেমন আর্থসামাজিক যে অধিকারগুলো থাকে বা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারও যখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়, এ পরিস্থিতি এবং প্রেক্ষাপটে যদি বাংলাদেশের অবস্থাকে বিবেচনা করতে হয়, তাহলে নানা বৈরিতা লক্ষ্য করা যায়। আমরা অবশ্যই দেখতে পারছি, জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদের একটা উল্লম্ফন এখানে ঘটেছে যা নারী অধিকারের বিরুদ্ধে কথা বলছে, সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তারা দাঁড়াচ্ছে। এটা তাদের বহুদিনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য । যারা দুর্বল অবস্থায় সমাজে থাকে, তাদেরকে লক্ষ্য করে আক্রমণগুলো পরিচালিত হয়। তারা এসব ভয় সৃষ্টি করে সমাজে একটা ভয়ের সংস্কৃতি তৈরি করে এবং সবাইকে ভয়ের মধ্যেই রাখতে চায়। আবার আর্থসামাজিক দিক থেকে দেখতে গেলে দেখা যাবে, আমরা কিন্তু অনেক দূর এগিয়েছি। আমরা এমডিজি’র কতোগুলো লক্ষ্যমাত্রা বা যে লক্ষ্যগুলো ছিল, তা ধরে ফেলেছি। কোনো কোনো ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে স্টার পারফরমার বলা হচ্ছে। বিশেষ করে নারী উন্নয়নের ব্যাপারে সরকারের চেষ্টা বা উদ্যোগ কিন্তু প্রশংসা কুড়িয়েছে। এছাড়া মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এখন অনেক বেশি আলোচনা হচ্ছে, মুক্তিযুদ্ধের ঐতিহ্য, ইতিহাস এখন অনেকটাই সামনে চলে আসছে। কিন্তু অন্যদিকে যদি মানবাধিকারকে রাজনৈতিক ও নাগরিক অধিকারের আলোকে দেখতে যাই, তাহলে দেখা যাচ্ছে মানুষ রাজনৈতিক ভাবে একটা অনিশ্চিত অবস্থার মধ্যে পড়ে গেছে, কোনদিকে যাচ্ছি সে ব্যাপারে কোনো দিকনির্দেশনা নেই। রাজনৈতিক দিকনির্দেশনাহীনতার কারণে সমাজে এমন কিছু ঘটনা ঘটছে, যাতে এ কথা পরিষ্কারভাবে বলতে পারি যে, মানবাধিকার সম্পন্ন সমাজে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি যেভাবে থাকে, এ দেশে তা বিরাজ করছে না, প্রচুর ঘাটতি রয়েছে। সেটা থাকার ফলে যে বিষয় নিয়ে আমরা অনেকদিন ধরে কথা বলছি, যেমন বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গুম, পিটিয়ে মেরে ফেলা এবং মানুষ স্বাধীনভাবে বের হবে, কোথায়ও যাবে বা নিশ্চিতভাবে তার কর্মসম্পাদন করবে এসব বিষয়ে জনমনে সন্দেহ রয়েই গেছে। আর এগুলো দূর করার উপায় আমরা দেখতে পাচ্ছি না বরং পরিস্থিতি ক্রমশ জটিল হচ্ছে। জটিল হচ্ছে এ কারণে যে, সরকারের পক্ষ থেকে একটা অস্বীকৃতির মনোভাব দেখতে পাই। তাদের মনোভাবটা এমন যে, না এগুলো কিছু হচ্ছে না বা হলেও সেগুলো বিচ্ছিন্ন ঘটনা। সরকার যদি সেগুলো সাদা চোখে পরিষ্কারভাবে দেখে বন্ধ করার একটা চেষ্টা বা উদ্যোগ অন্তত নিতো, তাহলে মানুষ বুঝতে পারতো যে, নিরাপত্তার পরিবেশ ফিরিয়ে আনার লক্ষ্যে এক ধরণের চেষ্টা চলছে। এখানে সারাক্ষণই সরকার এটাকে নিজেদের উপরে ব্যক্তিগতভাবে কিংবা দলীয়ভাবে ব্যর্থতার লক্ষণ মনে করে প্রতিক্রিয়া দেখাচ্ছে। যখন আমরা মানবাধিকারের প্রশ্নগুলো তুলি সরকার সেখানে সমাধান খোঁজার বদলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখায়। সরকার সহযোগিতার মনোভাব দেখানোর বদলে নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখিয়ে থাকে। যার ফলে যারা এসব মানবাধিকার বিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত থাকে, তারা সেই প্রক্রিয়ার সুযোগ দিয়ে তাদের কর্মকাণ্ড বাড়িয়ে দিচ্ছে। আর সরকার ক্ষমতায় আসার পরে প্রথম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ শর্ত দিল যে, তারা যেকোনো ধরণের সহিংসতার প্রতি শূন্য সহনশীলতা দেখাবে। সে ব্যাপারে সরকার কোনো ধরণের বিশ্বাসযোগ্য উদাহরণ রাখতে পারেনি। কাজেই মানবাধিকার পরিস্থিতির শর্তগুলো বিবেচনায় অর্থাৎ মানুষ স্বাধীনভাবে থাকতে পারবে, ন্যায় বিচারের প্রত্যাশা থাকবে এবং শান্তিতে বসবাস করবে, অভাব অনটন এবং শঙ্কামুক্ত জীবন যাপন করতে পারবে এমন পরিস্থিতি নেই। এখানে সংখ্যালঘুরা, নারীরা শঙ্কার মধ্যে রয়েছে, নারী নির্যাতন কমানো যায়নি, দুর্বল শ্রেণী দিশেহারা অবস্থায় রয়েছে। রাজনৈতিকভাবে দেশটি কোনদিকে যাচ্ছে অর্থাৎ একটা সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির মধ্যে মানুষকে ফেলে রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে বলা যায়, মানবাধিকার পরিস্থিতি অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে।

আমাদের বুধবার: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে বা যেসব প্রতিষ্ঠান আছে তাকে সরকার ব্যবহার করছে। এই পরিস্থিতিকে কিভাবে ব্যাখ্যা করবেন?

সুলতানা কামাল: এর মধ্যে যথেষ্ট সত্যতা রয়েছে। শুধু এখনকার সরকারই নয়, একের পর এক সরকার যখন ক্ষমতায় এসেছে, রাষ্ট্রীয় যে বাহিনীগুলো আছে যাদের জনগণকে সেবা দেয়ার কথা, তাদেরকে সরকার ব্যবহার করে। এটা শুধু আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীই নয়, এখানে প্রশাসনের এবং পেশাজীবীদের ভূমিকা আছে। দুঃখজনকভাবে শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীই নয়, প্রশাসনের কর্মকর্তা এবং পেশাজীবীদের মধ্যে দলীয়ভাবে ব্যবহৃত হওয়ার একটি প্রক্রিয়া প্রকটভাবে কাজ করছে। এর ফলে সাধারণ জনগণ এদের কাছ থেকে যে সুবিধা পাওয়ার কথা, সেবা ও অধিকারগুলো পাওয়ার কথা, তা তারা পাচ্ছে না।

আমাদের বুধবার: জেনেভায় জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলের বৈঠকে কি আলোচনা হয়েছে?

সুলতানা কামাল: আমাদের যে এলায়েন্স রয়েছে, হিউম্যান রাইটস ফোরাম বাংলাদেশএর পক্ষ থেকে আমরা লক্ষ্য করেছি যে, সরকার যে প্রতিবেদন তৈরি করে নিয়ে গেছে, তাতে তারা আগে যেসব কথাবার্তা উঠেছিল তা নিয়ে অনেক চিন্তাভাবনা করেছে এবং তার একটি উত্তর দেয়ার চেষ্টা করেছে। সে উত্তরটি যে সব সময় মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেয়ার চেষ্টা করা হয়েছে তা নয়, বরং তারা তাদের অবস্থানকে রক্ষা করার একটা মনোভাব থেকেই অনেক কিছু এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে। অনেক ইস্যু যেখানে তোলা হয়েছে, সে ইস্যুগুলোতে যদি সত্যনিষ্ঠ বা বাস্তবনিষ্ঠ কোনো একটা চিত্র পাওয়া যেতো, তা নয়। শুধুমাত্র সরকারের দিক থেকে গাবাঁচানো এবং নিজেদের রক্ষা করার মনোভাব থেকে উত্তরগুলো দেয়া হয়েছে। এটা অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক। বিশেষ করে আদিবাসী, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, সংখ্যালঘুদের রক্ষা নিশ্চিত করা এসব বিষয়ে সরকার যে ভূমিকা নিয়েছে, সেক্ষেত্রে প্রশ্ন করার যথেষ্ট অবকাশ রয়ে গেছে।

আমাদের বুধবার: কিন্তু জাতিসংঘ হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল কিভাবে প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে?

সুলতানা কামাল: তারা এখন কোনো প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। কারণ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সময় আছে, যাতে সরকার জানাতে পারবে যে, কোন সুপারিশ গ্রহণ করা হলো বা কোন সুপারিশ গ্রহণ করা হচ্ছে না। তবে সামগ্রিকভাবে যেসব ইস্যুগুলোর কথা বললাম, সে সব নিয়ে তারা বারবারই প্রশ্ন তুলেছেন এবং জানতে চেয়েছেন যে, সরকার ওই সব ব্যাপারে কি পদক্ষেপ নিয়েছে।

আমাদের বুধবার: আপনি বলেছেন, সরকার কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের চেয়ে প্রতিক্রিয়া দেখায় বেশি। এই প্রবণতা কেন?

সুলতানা কামাল: সরকার নিজেদের কখনই জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে দেখতে চাওয়ার সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত নয়। বিষয়গুলো যে জনগণের সঙ্গে বা নাগরিকদের সঙ্গে আলাপআলোচনার সাপেক্ষে সমাধান করা যায় সে ব্যাপারেও তারা সচেষ্ট থাকে না। যে দলই ক্ষমতায় বসুক না কেন, তারা মনে করে যে, তারা তাদের দায়দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হওয়ার দুর্বলতা থেকেই এ ধরণের মনোভাব প্রতিফলিত হয়। কাজেই তারা কখনই মনে করে না, বিরোধী দলে যারা আছে, যারা সচেতন নাগরিক রয়েছে বা তৃণমূল পর্যায়ে যারা আছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলে, সমস্যার সমাধান বের করতে হবে। সেটা তারা না করে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন বলেই এ ধরণের নেতিবাচক প্রতিক্রিয়া দেখা দেয়। যখন সরকার জনগণকে রাষ্ট্রের অঙ্গ হিসেবে চিন্তা করে না বা ভুলে যায়, তখনই বিচ্ছিন্নতার প্রবণতা দেখা দেয়।

আমাদের বুধবার: যে রাজনৈতিক সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি চলছে এর সঙ্গে মানবাধিকার পরিস্থিতির সম্পর্ক রয়েছে কি?

সুলতানা কামাল: মানবাধিকার তখনই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে যখন একটা সামগ্রিক ধারণা থাকে এবং প্রতিটি মানুষের অধিকারের প্রতি সম্মান দেখানো হয়, যেমনটি কিনা আমার নিজের অধিকারের প্রতিও সম্মান করি। সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিতে কিন্তু এটা কখনই প্রতিষ্ঠিত হতে পারে না। বরং সাংঘর্ষিক পরিস্থিতিতে অন্যকে কতোভাবে আঘাতপ্রাপ্ত করা যায়, কেমনভাবে জব্দ করা যায়, নিশ্চিহ্ন করা যায়, শক্তিপ্রয়োগ করা যায় সে মনোভাব যখন সমাজে বিরাজমান থাকে, তা মানবাধিকারের জন্য বিরাট এক হুমকি। সেখানেই মানবাধিকারের সঙ্গে সাংঘর্ষিক রাজনৈতিক পরিস্থিতি সরাসরিভাবে যুক্ত। যাদের সঙ্গে মতের মিল হচ্ছে না, আমার প্রতিদ্বন্দ্বী যারা আছে, প্রত্যেকের অধিকারকে সমানভাবে সম্মান দিতে হবে। সে মনোভাব যখন থাকে না, তখনই সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। সাংঘর্ষিক পরিস্থিতি থাকলে মানবাধিকার থাকবে না, মানবাধিকার না থাকলে সাংঘর্ষিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবেই। একটি আরেকটি সারাক্ষণই প্রভাবান্বিত করে। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি অত্যন্ত সাংঘর্ষিক। অনেক অর্থনৈতিক উন্নয়ন সত্ত্বেও বাংলাদেশ ক্রমশ একটি প্রকট বৈষম্যের সমাজে পরিণত হচ্ছে।

আমাদের বুধবার: আপনাকে ধন্যবাদ।।