Home » অর্থনীতি » চলবে জাহাজ, খাদ্যপণ্য পরিবহন, টেলিকরিডোর চায় ভারত

চলবে জাহাজ, খাদ্যপণ্য পরিবহন, টেলিকরিডোর চায় ভারত

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

coridorআগামী এক মাস সময়ের মধ্যেই বাংলাদেশকে পরিবহন সড়ক হিসেবে ব্যবহার করতে যাচ্ছে ভারত। ইতোমধ্যে ভারতের ত্রিপুরায় খাদ্যশস্য পরিবহনে বাংলাদেশ অনুমতি দিয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতের ইন্দোএশিয়ান নিউজ সার্ভিস (আইএএনএস)। ২৫ মে আইএএনএসকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এসব কথা জানিয়েছেন ত্রিপুরার খাদ্যমন্ত্রী ভানুলাল সাহা। বার্তা সংস্থাটির কাছে তিনি বলেন, ‘ইতোমধ্যে ১০ হাজার মেট্রিক টন খাদ্যশস্য নিজ ভূখণ্ডের ওপর দিয়ে ত্রিপুরায় পরিবহনে সম্মত হয়েছে বাংলাদেশ সরকার।’ নিরাপত্তা বিষয়ক কিছু বিষয় নিষ্পত্তির পর এক মাসের মধ্যে এই খাদ্যশস্য পরিবহন শুরু হবে বলে জানান ভানুলাল। পশ্চিমবঙ্গের হলদিয়া বন্দর দিয়ে প্রবেশ করে আশুগঞ্জ হয়ে ভারতের দক্ষিণপূর্ব মিজোরাম, মণিপুর ও ত্রিপুরা রাজ্যে যাবে। প্রথমবারের এই চালানে চাল, গম ও চিনি নেওয়া হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের মুখ্য সচিব বি কে রায় আইএএনএসকে জানিয়েছে, ‘এই খাদ্যশস্য পরিবহনের জন্য ইতিমধ্যে দরপত্রও ডেকেছে ফুড করপোরেশন অব ইন্ডিয়া।’ ২০১১ সালের মে মাসে ত্রিপুরায় একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে প্রয়োজনীয় যন্ত্রাপাতি নেয়া হয় বাংলাদেশের ভূখণ্ড ব্যবহার করে। ত্রিপুরার রাজধানী আগরতলা থেকে ২৬ কিলোমিটার দূরে পালটানায় ওই বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ হচ্ছে। বাংলাদেশভারত ট্রান্সশিপমেন্টের আওতায় ওই যন্ত্রাংশের চালান বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে ত্রিপুরা নেয়া হয়।

বাংলাদেশভারত সরাসরি চলবে পণ্য পরিবহন জাহাজ: পণ্য পরিবহন সহজ করতে শিগগিরই বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সরাসরি উপকূলীয় জাহাজ চলাচল শুরু হচ্ছে। দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ ও স্থলপথে পণ্য আমদানিরপ্তানিতে চাপ কমানোর অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের নৌ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী জুন মাসে দুই দেশের মধ্যে উপকূলীয় জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত চুক্তিটি হতে পারে। চুক্তি হওয়ার পর দুই দেশের দুটি করে জাহাজ পরীক্ষামূলকভাবে চলাচল করবে। এরপর নিয়মিত করা হবে। যদিও ভারতীয় দৈনিক পত্রিকা বিজনেস লাইন ভারতীয় কর্মকর্তাদের উদ্বৃতি দিয়ে জানিয়েছে যে, এ বছরের মে মাসেই এই পরীক্ষামূলক চলাচল শুরু হতে যাচ্ছে।

পণ্যবাহী জাহাজ ব্যবসায়ীরা জানান, দুই দেশের মধ্যে সরাসরি জাহাজে পণ্য পরিবহন করা হলে সময় ও ব্যয় দুটিই কমবে। চুক্তির খসড়া অনুযায়ী, ভারতের তিনটি বন্দর দিয়ে পণ্য আনানেওয়া হবে। এই বন্দরগুলো হলো পশ্চিবঙ্গের হলদিয়া, ওডিশার পারাদ্বীপ ও অন্ধ্রপ্রদেশের বিশাখাপত্তম। আর বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মংলা বন্দরে মালামাল পরিবহন করা হবে। সরাসরি জাহাজ যোগাযোগ না থাকায় এখন ভারতের কোনো বন্দর থেকে বাংলাদেশে পণ্য আনতে হলে তা প্রথম শ্রীলঙ্কার কলম্বো, মালয়েশিয়ার পেনাং অথবা সিঙ্গাপুর যায়। সেখান থেকে আবার বাংলাদেশে আসে। একই পথে বাংলাদেশ থেকে ভারতে পণ্য যায়। একটি চালান আসতে সময় লাগে ১৫ থেকে ২১ দিন।

তবে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সরাসরি জাহাজ চলাচল শুরু হলে পশ্চিমবঙ্গের হলদিয়া ও পারাদ্বীপ থেকে চট্টগ্রাম কিংবা মংলা বন্দরে পণ্যবাহী জাহাজ আসতে সময় লাগবে মাত্র ১৬ ঘণ্টা। আর বিশাখাপত্তম থেকে আসতে সময় লাগবে আড়াই থেকে তিন দিন। এতে করে পণ্য পরিবহন ভারতের ব্যয় অনেকাংশেই হ্রাস পাবে। বর্তমানে ভারতের মূল ভূখণ্ডের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্যে বাংলাদেশি পণ্য রপ্তানি এবং সেখান থেকে বাংলাদেশে পণ্য আমদানির বড় অংশই পশ্চিমবঙ্গসংলগ্ন স্থলবন্দরগুলো দিয়ে সম্পন্ন হয়। তাতে ভারতের পরিবহন ব্যয় বেশি হয়।

জানা গেছে, ভারতের চেন্নাই বা অন্য কোনো বন্দর থেকে জাহাজে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম বা মংলায় পণ্য আনতে হলে যেহেতু সিঙ্গাপুর বা শ্রীলঙ্কা হয়ে আসতে হয়, সেহেতু প্রতি টন পণ্য আমদানিতে গড়ে প্রায় এক হাজার ২০০ ডলার ব্যয় হয়। নতুন ব্যবস্থায় সরাসরি জাহাজ চালানো গেলে এ ব্যয় অন্তত একতৃতীয়াংশে নেমে আসবে। অর্থাৎ ব্যয় হবে প্রায় ৪০০ ডলার।

তবে দুই দেশের মধ্যে সরাসরি জাহাজ চলাচলসংক্রান্ত চুক্তির খসড়ায় আন্তর্জাতিক মানদণ্ড কিছুটা শিথিল করার কথা বলা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উত্তীর্ণ জাহাজের পরিবর্তে কিছুটা ছোট আকারের জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হবে। বিশেষ করে দুই দেশের মধ্যে বিদ্যমান নৌপ্রটোকলের আওতায় যে মানদণ্ডে জাহাজ চলাচল করে, সে ধরণের জাহাজে পণ্য পরিবহনের সুযোগ দেওয়া হবে। ২০১১১২ অর্থবছরে ভারত প্রায় ৪৭০ কোটি ডলারের পণ্য বাংলাদেশে রফতানি করেছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশ থেকে ভারতে রফতানি হয়েছে ৪৯ কোটি ৮০ লাখ ডলারের পণ্য।

ভারতীয় এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, সড়কপথে প্রতি একক দূরত্ব অতিক্রম করতে যে পরিমাণ জ্বালানি তেল খরচ হয়, তার মাত্র ১৫ শতাংশ দিয়েই জলপথ বা সমুদ্রপথে একই দূরত্ব অতিক্রম করা যায়। আর রেলপথের অর্ধেক জ্বালানি খরচ হয় জলপথে। আবার সড়কপথের মাত্র ২১ শতাংশ ও রেলপথের মাত্র ৪২ শতাংশ খরচ হয় জলপথে বা সমুদ্রপথে। সার্ক দেশগুলির মধ্যে ব্যবসাবাণিজ্যের প্রসারে এক অভিন্ন মুদ্রা ব্যবস্থার প্রস্তাব দিয়েছেন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত৷ অন্ততপক্ষে ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে এই মুদ্রা চালুর প্রস্তাব করেন তিনি৷ কিন্তু বিনিময়ে কি অর্থ শুল্ক হিসেবে বাংলাদেশ পাবে তা এখনও নির্ধারিত হয়নি।

টেলিট্রানজিট চায় ভারত: বাংলাদেশের ওপর দিয়ে টেলিট্রানজিট চায় ভারত। ভারতের বৃহৎ টেলিযোগাযোগ প্রতিষ্ঠান এয়ারটেল এবং টাটা রিলায়েন্স এ ব্যাপারে প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন তথা বিটিআরসিকে। সম্প্রতি প্রতিষ্ঠান দু’টির প্রতিনিধিরা ঢাকায় এসে তাদের বিস্তারিত পরিকল্পনা তুলে ধরেছেন। ভারতের মূল ভূখন্ড থেকে প্রায় বিচ্ছিন্ন তাদের সাতটি রাজ্যের সঙ্গে টেলিযোগাযোগ সহজ করতে তারা বাংলাদেশের সহযোগিতা চায়।

প্রতিনিধিরা জানিয়েছে, বাংলাদেশের অপারেটরদের মাধ্যমেই কাজ করা হবে। সেভেন সিস্টার হিসেবে পরিচিত সাত রাজ্য আসাম, মেঘালয়, মিজোরাম, মনিপুর, নাগাল্যান্ড, ত্রিপুরা এবং অরুণাচল প্রদেশে টেলিযোগাযোগের ক্ষেত্রে যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে তা দূর করতেই বাংলাদেশের ভূখন্ডের মধ্য দিয়ে ফাইবার অপটিক ক্যাবলের সুবিধা পেতে চান তারা। এতে ওই ৭ রাজ্যের সঙ্গে টেলিযোগাযোগ ব্যয় কমে যাবে। বাংলাদেশ সম্মত হলে কলকাতামেহেরপুর থেকে ঢাকা হয়ে জাফলং দিয়ে আসামের মাধ্যমে যোগাযোগ লাইন হতে পারে। বিকল্প হিসেবে কলকাতামেহেরপুর থেকে ঢাকাকুমিল্লা হয়ে আগরতলায় সংযোগ নেয়ার প্রস্তাবও রয়েছে।

এয়ারটেল এবং রিলায়েন্সের এ প্রস্তাবে বাংলাদেশ তাৎক্ষণিক সম্মতি দেয়নি। তবে বিটিআরসি এ ব্যাপারে আগ্রহী বলে সূত্র জানিয়েছে। বাংলাদেশ রাজি হলে কয়েক মাসের মধ্যেই এ সংযোগ ঘটতে পারে। ওই কোম্পানি দু’টির সঙ্গে পাকিস্তান, নেপাল এবং ভুটানের টেরিস্ট্রিয়াল লিঙ্ক চুক্তি রয়েছে। এয়ারটেল এবং রিলায়েন্সের চুক্তি করতে হলে তা করতে হবে বাংলাদেশের অপারেটরদের সঙ্গে। বিটিআরসি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে।

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সমস্যা থেকে উত্তরণে বিদ্যুৎ ভারত বিদ্যুৎ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও, তা আজো আলোর মুখ দেখেনি। একাধিক চুক্তি হওয়ার পরও ছিটমহল বিনিময় দিচ্ছে না ভারত। দোহাই দেয়া হচ্ছে ভারতের সংসদ ও আইনের। অথচ বাংলাদেশ চুক্তি মোতাবেক অধিকাংশ ছিটমহল ভারতের কাছে হস্তান্তর করেছে। সীমন্ত হত্যা এখনো বন্ধ করেনি ভারত সরকার। প্রতিশ্রুত ভঙ্গ করে মৃত্যু নিশ্চিতের জন্য এখনো ব্যবহার করা হচ্ছে মেটাল বুলেট। বাংলাদেশের অধিকাংশ টিভি চ্যানেল ভারতে দেখা না গেলে তাদের প্রতিটি এখানে চলছে বহাল তবিয়তে। এমনকি এখানকার বিজ্ঞাপন প্রদান বাবদ তারা কোটি কোটি টাকা নিয়ে যাচ্ছে নিজ দেশে। শুল্কমুক্ত পণ্য রফতানির সুযোগ পেলেও অশুল্ক বাধা আরোপ করে এ প্রক্রিয়াকে পরোক্ষভাবে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। টিপাইমুখ বাঁধসহ অভিন্ন নদীর পানিবন্টন সমস্যার সমাধান হয়নি এখনো। আইটি খাতেও ভারতের বিনিয়োগ ও আধিপত্য বাড়ছে। পর্যটন, হোটেলসহ অন্যান্য অনেক খাতে ভারতের বড় বড় কোম্পানি বিনিয়োগ করতে আগ্রহ ব্যক্ত করেছে এরই মধ্যে। এ লক্ষ্যে অবকাঠামো উন্নয়নে দেশটির সরকার অর্থ সহায়তা প্রদানসহ সরাসরি কাজ করতে চায় বলে জানা যাচ্ছে।।