Home » অর্থনীতি » তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

তেল ব্যবসার জালজালিয়াতি

ফারুক চৌধুরী

oil-22তেলের খোঁজ কেবল বাকুতেই পাওয়া গেল না। তেল ইতিহাসের পাতা উল্টালে দেখা যায়, ফ্রান্সের আলসাসেতে ১৭৩৫ সালে তেল পাওয়া যায় এবং আহরণ করা হয়। এর চার বছর পরে, ১৭৩৯ সালে লেখা হলো বই ‘এবাউট দ্য অয়েল’। শিক্ষাবিদ আইভি ভেইটব্রেখটের লেখা এ বইতে তেল বিষয়ে প্রচুর তথ্য ছিল।

এগিয়ে এলো তেল নিয়ে বাণিজ্য স্বার্থ। তখন ১৭৪১ সাল। একটি ইঙ্গরুশ বাণিজ্য কোম্পানির পরিচালক বাকুর তেল ক্ষেত্রগুলোর অবস্থা নিয়ে অনুসন্ধান চালান। তিনি ১৭৫৪ সালে প্রকাশ করেন ‘হিস্ট্রিক্যাল এসে এবাউট ইংলিশ ট্রেড ইন কাস্পিয়ান সি’। লন্ডন থেকে প্রকাশিত বইটির নাম বাংলায় হতে পারে কাস্পিয়ান সাগর অঞ্চলে ইংরেজ বাণিজ্য বিষয়ে ঐতিহাসিক রচনা।

তেলের ইতিহাসে দেখা যায় আরেক শিক্ষাবিদের নাম। তিনি স্যামুয়েল গ্যাসেলিন। স্যামুয়েল বাকুর তেল ক্ষেত্রগুলো দেখেন। তিনি জানালেন, বাকুতে কেরোসিন তৈরি হচ্ছে। তার বর্ণনায় তেল উৎপাদনের কৌশলটিও উল্লেখিত হলো।

তেল তখন টানছে অনেককে। কাউন্ট মার্কো ভয়নোভিচ ১৭৮১ সালে কাস্পিয়ান সাগরে আবশেরন উপদ্বীপের কাছে ঝিলিয় দ্বীপের পাশে সমুদ্রতলে তেল ও গ্যাসের নমুনা খুঁজে পান। মার্শল ফ্রেডেরিক বিবেরস্টেইন ১৭৯৬ সালে উল্লেখ করলেন : আবশেরন উপদ্বীপে অফুরন্ত তেল রয়েছে।

তেলের ‘যাত্রা’ ছড়িয়ে পড়লো আরেক মহাদেশে, আমেরিকায়। যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ায় ১৮১৫ সালে উৎপাদিত হলো তেল। তা উৎপাদিত হলো একটি উপজাত হিসেবে, লবণ জল আহরণের উপজাত। আবশেরনে পাওয়া প্রাকৃতিক গ্যাসে কি কি উপাদান রয়েছে তা প্রথমবারের মতো খুঁজে বের করলেন জিআই জেসি। এ কাজটি করা হলো ১৮৩৬ সালে। এর আগেই ১৮০৩ সালে আজারবাইজানের ধারে কাস্পিয়ান সাগরে বিবিহিবাট উপসাগর থেকে তেল তোলার কাজ শুরু হয়েছে। এ তেল তোলা হলো উপকূল থেকে ১৮ ও ৩০ মিটার দূরের দুটি কূপ থেকে।

এদিকে, যুক্তরাষ্ট্রে ঘটে চলেছে তেল নিয়ে তাৎপর্যবহ সব ঘটনা ধারা। তেল বাজারজাত করা হলো ১৮১৪ সালে। এ তেল সংগ্রহ করা হয় ওহাইও’র ম্যারিয়েটার কাছে। সেখানে একটি কূপ খনন করা হয় লবণ জল বা লোনা জল সংগ্রহের জন্য। সেই লোনা জলের উপজাত ছিল তেল। এটি লোনা জলের কূপের ক্ষতি করত। সে সময় মনে করা হতো এ উপজাতটি, অর্থাৎ তেল কোনো কাজে লাগে না, সহজ কথায় বলা যায়, অপদার্থ। ওহাইও’র সেই কূপটি ছিল প্রায় পাঁচশ ফুট গভীর। এখান থেকে কত তেল পাওয়া যেত? সপ্তাহে প্রায় এক ব্যারেল বা এক পিপে। এর দাম ছিল কত? গ্যালন প্রতি ৫০ থেকে ৭৫ সেন্ট।

যুক্তরাষ্ট্রের দক্ষিণপূর্বাঞ্চলে কেন্টাকিতে আরেকটি লবণ জল কূপ থেকে তেল আহরণ শুরু হয় ১৮১৮ সালে। যার জমিতে এ কূপ খনন করা হয়, তার নাম অনুসারে এ কূপের নাম রাখা হয় বেটি ওয়েল বা বেটি কূপ। এখান থেকে তেল উৎপাদিত হতো দিনে একশ পিপে। এ কূপটি তাৎপর্যপূর্ণ। এখানকার উৎপাদিত তেল ১৮২০ সাল নাগাদ পাঠানো শুরু হলো ইউরোপে এবং যুক্তরাষ্ট্রের কয়েকটি দক্ষিণাঞ্চলীয় অঙ্গরাজ্যে। সে অর্থে বলা যায়, বেটি অয়েল উত্তর আমেরিকায় প্রথমবারের মতো বাণিজ্যিক ভিত্তিতে তেল উৎপাদন করল।

এশিয়া মহাদেশে প্রথমবারের মতো আধুনিক তেল কূপ খনন করা হয় ১৯৪৮ সালে বাকুতে। এটি খনন করেন এফএন সেমিনফ। তিনি রুশ প্রকৌশলী। ইউরোপে প্রথমবারের মতো তেল কূপ খনন করা হয় পোল্যান্ডে, ১৮৫৪ সালে। সেটি ছিল ৩০ থেকে ৫০ মিটার গভীর। উত্তর আমেরিকায়, কানাডার ওন্টারিওতে প্রথমবারের মতো তেল কূপ খনন করা হয় ১৮৫৮ সালে। এর এক বছর পরে, ১৮৫৯ সালে কর্নেল এডউইন ড্রেক পেনসিলভেনিয়ার টিটসুভিলে তেল কূপ খনন করেন। সেটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রে খনন করা প্রথম তেল কূপ।

এখানে ‘কর্নেল’ এডউইন ড্রেকের গল্পটি বলা দরকার। তিনি ছিলেন সাবেক রেলমন্ত্রী। অর্থাৎ বেকার। ঘটনা পরম্পরায় ড্রেক অবস্থান করছিলেন যে হোটেলে, সে হোটেলটিতেই তেল বিষয়ে উদ্যোক্তা, নিউইয়র্কের আইনজীবী জর্জ বিশেল ও তার শরিকরাও অবস্থান করছিলেন। ড্রেকের সঙ্গে পরিচয় হয় মি. বিশেলের। অতঃপর ড্রেককে নিয়োগ করা হয় টিটসুভিন যাওয়ার জন্য। এ চাকরিপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে ড্রেকের একমাত্র যোগ্যতা ছিল তার কাছে থাকা বিনা ভাড়ায় রেলগাড়িতে চড়ার একটি পাস। আগের চাকরি সূত্রে তিনি এ পাস পেয়েছিলেন। ড্রেক কখনই সামরিক বাাহিনীতে চাকরি করেননি। কিন্তু ড্রেক যখন টিটমুভিরে গেলেন বিশেল ও তার শরিকদের তেল কোম্পানির কাজ শুরু করতে, তখন কোম্পানির মানমর্যাদা লোকচক্ষে বাড়িয়ে তোলার মতলবে নিয়োগকর্তারা, অর্থাৎ বিশেল, প্রমুখরা ড্রেকের নামের আগে জুড়ে দেন ‘কর্নেল’ পদবী। এমন জালিয়াতি ব্যবসাবাণিজ্যের জগতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে অনেক।।

(চলবে…)