Home » অর্থনীতি » নির্বাচনী নয় বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট হতে হবে

নির্বাচনী নয় বাস্তবায়নযোগ্য বাজেট হতে হবে

বিশেষজ্ঞদের অভিমত

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

budget 1আগামী ৬ জুন জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট পেশ করা হচ্ছে। অর্থনৈতিক বিশেষজ্ঞ এবং বিশ্লেষকরা সরকারের শেষ বছরের এই বাজেট নিয়ে আশাবাদের চেয়ে হতাশাই ব্যক্ত করেছেন বেশি। সঙ্গে সঙ্গে তারা নির্বাচনকে মাথায় রেখে নয়, বাস্তবায়নযোগ্য একটি বাজেট প্রণয়নের উপরই গুরুত্বারোপ করেছেন।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. আকবর আলী খান বলেন, ১৬ কোটি মানুষের অতি দারিদ্র্যপীড়িত বাংলাদেশের কাক্ষিত উন্নয়নের জন্য বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা বা এডিপির আকার বর্তমানের চেয়ে অন্তত চারগুণ হওয়া উচিৎ। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, আমরা তার চার ভাগের একভাগের সমান একটি এডিপিও বাস্তবায়ন করতে পারছি না। গত দু’ দশকের গণতান্ত্রিক সময়েও শতভাগ এডিপি বাস্তবায়নে ব্যর্থতার জন্য সরকারকে কখনো জবাবদিহি করতে হয়নি। এডিপি কেন বাস্তবায়ন হচ্ছে না, তার গভীরে না গিয়ে শুধু আমলাতন্ত্রকে দোষারোপ করা রাজনীতিবিদ ও অন্যদের একটি রেওয়াজে পরিণত হয়ে গেছে। বাংলাদেশ সরকারের ক্রয় নীতিমালা ও ভূমি হুকুম দখল নীতিমালার মধ্যে গলদ রয়েছে। এডিপি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে এ দুটি খুব বড় বাধা। সবার জন্য এক ধরণের নীতিমালা না করে মন্ত্রণালয়ভিত্তিক পৃথক পৃথক ক্রয় নীতিমালা প্রণয়ন এবং ভূমি হুকুম দখলের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পে ওই ভূমির মালিকদের শেয়ার দেয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে দুর্নীতি দমনের ক্ষেত্রেও সরকারকে আন্তরিক হতে হবে এবং প্রকল্পের টেন্ডার মূল্যায়নের কাজ প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়ার রেওয়াজ থেকেও বের হয়ে আসতে হবে। যার যেটা কাজ, তাকে দিয়েই সেটা করাতে হবে। অপরদিকে বৈদেশিক সহায়তাপুষ্ট প্রকল্পে দাতাদের সঙ্গে যত কম সংঘাতে যাওয়া যায়, ততোই মঙ্গল। এক্ষেত্রে দুর্নীতিঅনিয়ম যদি কিছু হবার আশংকা থাকে তবে তার দায় দাতাদের কাঁধেই চাপিয়ে রাখতে পারলে সরকারের সামনে কোনো ভয় থাকবে না।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বিশ্ব অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপট ও অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় এনে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রয়নের সুপারিশ করেন। তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের বিগত বাজেটগুলোয় এ দেশের সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি। জনকল্যাণমূলক অসংখ্য প্রকল্প এখনও অসমাপ্ত রয়েছে। এসব অসমাপ্ত প্রকল্পের সঙ্গে নির্বাচনে ভোট পেতে আসন্ন বাজেটের মধ্য দিয়ে নতুন আরও এক গুচ্ছ পরিকল্পনা যোগ করা হলে তা বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। তাই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় সামগ্রিক অর্থনীতিতে ভারসাম্য আনতে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার পরিবর্তে বাস্তবমুখী বাজেট প্রণয়ন করা দরকার। বাজেটে অর্থ সরবরাহে রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে লক্ষ্যমাত্রানুযায়ী আয় না হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবার বৈদেশিক ঋণের পরিমাণও কম। প্রবৃদ্ধি কমেছে, বিনিয়োগ হ্রাস পেয়েছে, রাজস্ব আয়ে আছে নেতিবাচক ধারা। এসবের মূল কারণ সহিংস রাজনৈতিক পরিস্থিতি। রাজনৈতিক অস্থিরতা থেকে আগামী দিনে মুক্তি আসবে কি না তাতে যথেষ্ট সন্দেহ আছে। এমন রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে রাজস্ব আয়, প্রবৃদ্ধির হার ও বিনিয়োগ আরও কমবে। তাই আগামী অর্থবছরে অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ উৎসাহিত করতে বিশেষ সহায়তা দিতে হবে। বর্তমান সরকার অতীতে যে হারে ভর্তুকি নির্ধারণ করেছে তা পুনর্বিন্যাসের প্রয়োজন রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, অপেক্ষাকৃত দরিদ্রদের জন্য বেশি হারে ভর্তুকি ধার্য করা উচিত। এতে ধনীদরিদ্র্যের বৈষম্য হ্রাস পাবে। আসন্ন বাজেটে বিদ্যুৎ, পরিবহন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, পানি সম্পদ ও গ্রামীণ উন্নয়নে ৮০ শতাংশ বরাদ্দ দিতে হবে। অবকাঠামো উন্নয়নে নজর দিতে হবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গর্ভনর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, একটি অস্থির পরিবেশে আসছে ২০১৩১৪ অর্থবছরের নতুন বাজেট। এ বাজেট বাস্তবায়নে সরকারের বাস্তবমুখী পদক্ষেপ থাকা উচিত। এজন্য রাজনৈতিক সদিচ্ছা, উন্নয়ন প্রশাসনে দক্ষতা, সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা জরুরি। ঘোষিত বাজেটের যথাযথ বাস্তবায়ন ও সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত হলেই সার্থকতা আসবে। রাজস্ব আয়ের উৎসগুলো যথাযথভাবে নির্ধারণ করে বেশি করে আয়ের উৎস তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি আয় বৈষম্য কমিয়ে আনতে বাজেটে কর্মপরিকল্পনা থাকা উচিত। বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দ ও ব্যয়ের যোগবিয়োগ করে নামমাত্র বাজেট প্রণয়নে সার্থকতা নেই। দেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয় এমন বাজেট দেয়া জরুরি। বাজেট বাস্তবায়নে সুশাসনের অভাব প্রবলভাবে দেখা যাচ্ছে। যদিও এর আগের কোন বাজেটই শতভাগ বাস্তবায়ন করা যায়নি। তবে কাছাকাছি যাতে যাওয়া যায় সেজন্য চেষ্টা থাকা প্রয়োজন। তিনি বলেন, নির্বাচনকে মাথায় রেখে বড় বাজেট দিয়ে জনতুষ্টির বাজেট প্রণয়ন করলে তা জনগণের জীবনমান উন্নয়নে কোনোই কাজে আসবে না।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষনা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) মহাপরিচালক ড. মুস্তাফা কে মুজেরি বলেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে চলতি অর্থবছরেই আমাদের প্রবৃদ্ধি কম। আগামী অর্থবছরে প্রবৃদ্ধির ধারাবাহিকতা ফিরিয়ে আনা হবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। ঠিক এমনই মুহূর্তে আসছে নতুন বাজেট। আগামী বাজেটে সরকারের ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা বাড়তে পারে। এ অবস্থায় পর্যাপ্ত হোমওয়ার্ক না করে পদ্মা সেতুর সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত নয়। এছাড়াও অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগের সুযোগ বন্ধ করা, ব্যাংকগুলোর ওপর বাংলাদেশ ব্যাংকের নজরদারি বাড়ানো, পুঁজিবাজারে বারবার হস্তক্ষেপ বন্ধ করা এবং সরকারের আয় বাড়াতে করের আওতা বাড়াতে হবে। এবারের বাজেট বাস্তবায়নের বিষয়টিতে জটিলতা রয়েছে। কারণ তা বাস্তবায়নের দায়িত্ব তিন সরকারের ওপর বর্তাবে। এর মধ্যে বর্তমান সরকার, নির্বাচনকালীন সরকার এবং পরবর্তীতে নির্বাচিত সরকার। তবে এটাও বাস্তব আমাদের উন্নয়ন প্রক্রিয়া সবচেয়ে চলমান, বাজেট তারই একটি অংশ। ফলে যে সরকারই আসুক উন্নয়ন কার্যক্রম ব্যাহত না হয়, সে দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে। আর্থিক খাতেও বেশ কিছু চ্যালেঞ্জ রয়েছে। চলতি অর্থবছরে কৃষিখাতে প্রবৃদ্ধি তেমন ভাল হয়নি। ফলে বিগত বছরগুলোর মতো কৃষিতে যাতে উৎপাদন বাড়ানো যায়, সে বিষয়টিকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে নিতে হবে। সরকারের মূল আয় হলো রাজস্ব আদায়। কিন্তু চলতি বছর এ খাতে প্রবৃদ্ধি কমেছে। এর প্রধান কারণ হলো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া। বেসরকারি খাতে মুনাফা না হলে শিল্পপতি ও ব্যবসায়ীরা কর দিতে পারবেন না। আমদানি কম হলে এ খাত থেকে রাজস্ব আদায়ও কমে যাবে। অর্থাৎ একটির সঙ্গে অন্যটি সম্পর্কযুক্ত। তিনি আরও বলেন, আয় বাড়াতে হলে বেসরকারি খাতের প্রবৃদ্ধি বাড়াতে হবে। এছাড়াও সরকারের রাজস্ব আয়ে ফাঁকফোকর বন্ধ করতে হবে। যারা কর ফাঁকি দিচ্ছে, তাদের চিহ্নিত করে করের আওতায় আনতে হবে। অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণ নিলে মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাবে। বেসরকারি খাতের উদ্যোক্তাদের ঋণ নেয়ার সুযোগ কমে যাবে। অস্বীকার করা যাবে না, আমাদের মুদ্রাবাজার এবং পুঁজিবাজারে একটা সংকট চলছে। বিশেষ করে পুঁজিবাজারে দীর্ঘদিন থেকে অস্থিরতা চলছে। ফলে তা উন্নয়নের ক্ষেত্রে কাঙিক্ষত ভূমিকা রাখতে পারছে না। এক্ষেত্রে মূল সমস্যা হলো পুঁজিবাজারে আমাদের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে খুব বেশি হস্তক্ষেপ করা হয়। যখনই অস্থিরতা শুরু হয়, তখনই বাইরে থেকে হস্তক্ষেপ করা হয়। এজন্য বাজার সঠিকভাবে বিকশিত হতে পারছে না। মুস্তাফা কে মুজেরির মতে, বাজারকে তার নিজস্ব গতিতে চলতে দেয়া উচিত। রেগুলেটরি মেকানিজমে বেশ কিছু ত্রুটি রয়েছে। যতটুকু আছে, তার বাস্তবায়নে সমস্যা রয়েছে। ফলে পূর্ণাঙ্গ বিকশিত না হলে এ বাজার অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখতে পারবে না। সাম্প্রতিক সময়ে ব্যাংকিং খাতের বিভিন্ন সূচক উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে খেলাপি ঋণসহ বিভিন্ন কেলেঙ্কারি বাড়ছে। এতে একদিকে যেমন ব্যাংকের মুনাফা কমছে, অপরদিকে তারা সামগ্রিকভাবে অর্থনীতিতে সঠিক ভূমিকা রাখতে পারছে না। ব্যাংকগুলোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংকের রেগুলেটরি এবং সুপারভাইজরি রোল জোরদার করা উচিত। মুজেরি আরও বলেন, উন্নয়ন বাজেটের ক্ষেত্রে আমাদের সমস্যা সবচেয়ে বেশি। প্রথম ৮৯ মাসে প্রকল্পের কাজ খুব বেশি বাস্তবায়ন হয় না। শেষের ২ থেকে ৩ মাসে তড়িৎ গতি বাস্তবায়ন দেখিয়ে ৭০৮০ শতাংশ অর্থ খরচ দেখানো হয়। কিন্তু এতে কাজের মান ভাল হয় না। এছাড়া আমাদের বাস্তবায়ন ক্ষমতা কতটুকু আছে, তা বিবেচনা না করেই বিভিন্ন প্রকল্প হাতে নেয়া হয়। অনেক ক্ষেত্রে এডহক ভিত্তিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়। এটি যৌক্তিক নয়। এক্ষেত্রে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলোর সক্ষমতা বাড়ানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নেয়া উচিত। আপেক্ষিকভাবে বিবেচনা করলে দাতাদের ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা কমে আসছে। এরপরও দাতারা উন্নয়নে বড় ধরণের ভূমিকা রাখছে। বর্তমানে পাইপলাইনে দাতাদের অনেক অর্থ জমা হয়ে আছে। কিন্তু আমরা যে কোন কারণেই হোক এগুলো ব্যবহার করতে পারছি না। বিশেষ করে জ্বালানি ও শিক্ষা খাতে বিনিয়োগ জরুরি। ফলে এ দুই খাতে এসব অর্থ ব্যবহার করতে পারলে আমরা লাভবান হতাম। এতে কর্মসংস্থান ও কর আদায় বাড়ত। এতে অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরশীলতা কমে আসত। অপ্রদর্শিত আয় বিনিয়োগ করার সুযোগ দিয়ে গত কয়েক বছরে আমরা কি পরিমাণ লাভবান হয়েছি, তা বিবেচনা করতে হবে। আর এসব বিষয় বিবেচনা না করে এ সুযোগ অব্যাহত রাখা যৌক্তিক হবে না।।