Home » আন্তর্জাতিক » নীরবতা ভাঙার এখনই সময়

নীরবতা ভাঙার এখনই সময়

মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র

অনুবাদ: মোহাম্মদ হাসান শরীফ

matin luther king jrমার্কিন মানবাধিকার কর্মী, আফ্রিকানআমেরিকান ব্যক্তিত্ব, যাজক (১৯২৯১৯৬৮) . মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র অহিংস আন্দোলনের মাধ্যমে নাগরিক অধিকার আদায়ে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য সবচেয়ে বেশি পরিচিত। ১৯৬৭ সালের ৪ এপ্রিল নিউ ইয়র্ক সিটির রিভারসাইড চার্চে ‘বিয়ন্ড ভিয়েতনাম : অ্যা টাইম টু ব্রেক সাইলেন্স’ শিরোনামে তিনি বক্তৃতা করেন। এতে তিনি ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে সরে দাঁড়ানোর কথা ঘোষণা করেন। এটি তার অন্যতম বিখ্যাত বক্তৃতা। তবে তার সবচেয়ে আলোচিত বক্তৃতা হলো ‘আই হ্যাভ অ্যা ড্রিম।’ এখানে ‘বিয়ন্ড ভিয়েতনাম : অ্যা টাইম টু ব্রেক সাইলেন্স’ বক্তৃতাটির অনুবাদ প্রকাশ করা হচ্ছে। নিউ ইয়র্ক সিটির রিভারসাইড চার্চে ১৯৬৭ সালের ৪ এপ্রিল বক্তৃতাটি করেন তিনি। এবার শেষ পর্ব ছাপা হলো।

জনগণই গুরুত্বপূর্ণ

এখন বিপ্লবের সময়। বিশ্বজুড়ে জনগণ শোষণ আর বঞ্চনার পুরনো ব্যবস্থার বিরুদ্ধে বিপ্লব করছে, জরাগ্রস্ত পৃথিবীর গহ্বর থেকে বের হয়ে ন্যায়সঙ্গত ও সাম্যের নতুন ব্যবস্থার জন্ম দিচ্ছে। জামাহীন ও নগ্ন পায়ের লোকজন উঠে দাঁড়িয়েছে, যা আগে কখনো হয়নি। ‘অন্ধকারে বসে থাকা লোকজন উজ্জ্বল আলো দেখছে।’ পাশ্চাত্যে অবস্থানকারী আমাদের এসব বিপ্লবকে অবশ্যই সমর্থন করতে হবে। দুঃখজনক সত্য হলো, স্বস্তি, তৃপ্তি, সমাজতন্ত্রের প্রতি অস্বাস্থ্যকর ভীতি, অন্যায়ের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ব্যাপারে আসক্তির ফলে পশ্চিমা জাতিগুলো আধুনিক বিশ্বে এতগুলো বৈপ্লবিক চেতনার সূচনা করার পরও এখন তীব্র বিপ্লববিরোধীতে পরিণত হয়েছে। এর ফলে অনেকের মনে এই অনুভূতির সৃষ্টি হয়েছে যে, কেবল মার্কসবাদেই বিপ্লবী চেতনা রয়েছে। আমাদের সূচিত বিপ্লবগুলোর মাধ্যমে গণতন্ত্রকে অকৃত্রিম ও অনুসরণীয় করে তুলতে আমাদের ব্যর্থতার কারণে সমাজতন্ত্র পরিণত হয়েছে রায়ে। বর্তমানে আমাদের আশা নিহিত রয়েছে কেবল বিপ্লবী চেতনা আবার ধারণ করার আমাদের সামর্থ্য এবং দারিদ্র্য, বর্ণবাদ ও সামরিকবাদকে চিরবৈরী ঘোষণা করে প্রায়ই উত্তপ্ত হয়ে উঠা পৃথিবীতে বেরিয়ে পড়ার উপর। এই দৃঢ় প্রতিশ্রুতির মাধ্যমে আমরা বিদ্যমান পরিস্থিতি ও অন্যায় আচরণগুলোকে সাহসিকতার সঙ্গে চ্যালেঞ্চ করব এবং এর মাধ্যমে সেই দিনকে ত্বরানি¦ত করব যখন ‘প্রতিটি উপত্যকা হবে মহীয়ান, প্রতিটি পর্বত, প্রতিটি পাহাড় হবে নিচু, এবং প্রতিটি বাঁক হবে সোজা, অসমতল স্থানগুলো হবে সমতল।’

চূড়ান্ত বিশ্লেষণে মূল্যবোধের কোনো সত্যিকারের বিপ্লব বলতে বোঝায় আমাদের আনুগত্য কোনো খণ্ডিত অংশের প্রতি না হয়ে হবে সার্বজনীনতার প্রতি। প্রতিটি জাতিকে তাদের নিজস্ব সমাজের সর্বোত্তম বিষয়টিকে সংরক্ষণ করার লক্ষ্যে নিজস্ব গণ্ডির ঊর্ধ্বে ওঠে সার্বিকভাবে মানবজাতির প্রতি আনুগত্যের ধারণা অর্জন করতে হবে।

বৈশি¡ক বন্ধুত্বের এই আহ্বান যা প্রত্যেককে তার নিজের গোত্র, বর্ণ, শ্রেণী ও জাতির সংশ্লিষ্টতা থেকে ঊর্ধ্বে তুলে নেয়বাস্তবে সব মানুষের জন্য সর্বব্যপ্ত ও শর্তহীন ভালোবাসার আহ্বান। এই বহু ভুল বোঝাবুঝি ও ভুল ব্যাখ্যার ধারণাটিযেটাকে নিৎসেবাদীরা দুর্বল ও ভীরু হিসেবে আখ্যায়িত করে দৃঢ়তার সঙ্গে খারিজ করে দিয়েছেনএখন মানুষের অস্তিত্বের জন্য অনিবার্য প্রয়োজন হিসেবে দেখা দিয়েছে। আমি যখন ভালোবাসার কথা বলি, তখন আমি কোনো ভাবাবেগ তাড়িত ও দুর্বল প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করি না। আমি সেই শক্তির কথা বলছি, যে শক্তিকে সব মহান ধর্ম বিবেচনা করেছে জীবনের সমন¦য় সাধনকারী সর্বোচ্চ মূলনীতি। ভালোবাসা এমন এক চাবি, যা চূড়ান্ত সত্যপথের দুয়ার খুলে দেয়। চূড়ান্ত সত্য সম্পর্কে এই হিন্দুমুসলিমখ্রিস্টানইহুদিবৌদ্ধ বিশ্বাসটির চমৎকার সারাংস টেনেছেন প্রথম ধর্ম প্রচারক সেইন্ট জন

আসুন আমরা সবাই একে অন্যকে ভালোবাসি, কারণ ঈশ্বরই ভালোবাসা এবং যে ভালোবাসে সে ঈশ্বরের সৃষ্টি এবং ঈশ্বরকে জানে। যে ভালোবাসতে জানে না সে ঈশ্বরকে জানে না; কারণ ভালোবাসাই হলো ঈশ্বর। আমরা একে অন্যকে ভালোবাসলে ঈশ্বর আমাদের মাঝে বাস করেন। আমাদের মধ্যে তার ভালোবাসাই নিখুঁত।

আসুন আমরা এই আশাবাদ ব্যক্ত করি, এই উদ্দীপনা আমাদের নিয়মে পরিণত হোক। আমরা আর ঘৃণার দেবতার উপাসনা করতে কিংবা প্রতিহিংসার বেদীতে নত হয়ে থাকতে পারছি না। ঘৃণার সদাবর্ধিত ঢেউয়ে ইতিহাসের মহাসাগর উত্তাল হয়ে উঠছে। জাতি ও ব্যক্তি বিনাসের গোলমেলে ইতিহাস ঘৃণার এই আত্মপরাজয়ের পথে নিয়ে যায়। আরনল্ড টয়েনবির ভাষায় : ‘ভালোবাসা হলো চূড়ান্ত শক্তি। এটাই মৃত্যু ও কদর্যতার ভয়াল থাবার বিপরীতে জীবন ও সুন্দরের পথ রচনা করে। আর এ কারণেই আমাদের স্বপ্নের প্রথম আশা অবশ্যই এমন আশা হবে যে, ভালোবাসাই হবে আমাদের শেষ শব্দ।’

আগামীকালই আজআমরা এখন এই বাস্তবতার মুখে রয়েছি। আমরা বর্তমানের প্রচণ্ড তীব্রতার মুখোমুখী। জীবন ও ইতিহাসের এই বিস্তৃত গোলকধাঁধায় অতিরিক্ত দেরি হয়ে যাওয়া বলতে একটা বিষয় আছে। দীর্ঘসূত্রতা অবলম্বন এখনো সময় নষ্টকারী বিষয়। জীবন অনেক সময়ই আমাদের সুযোগ হারানো অনাবৃত, নগ্ন ও হতোদ্যম করে রাখে। ‘মানবীয় বিষয়াদির স্রোত’ বন্যার মতো সব সময় বহাল থাকে না, ভাটা আসে। আমরা বেপরোয়াভাবে সময়ের কাছে একটু দম নেওয়ার সুযোগ দেওয়ার আকুতি করতে পারি, কিন্তু সময় প্রতিটি আবেদনই বধির, সে ছুটেই চলে। অসংখ্য সভ্যতা থেকে পাওয়া হাড়গোড় আর ধ্বসং¯তূপের মধ্যে যে মর্মান্তিক কথাগুলো লেখা আছে তা হলো : ‘অনেক বিলম্ব।’ জীবনের অদৃশ্য গ্রন্থে আমাদের সদা সচেতনতা কিংবা আমাদের অবজ্ঞতার কথা বিশ্বস্ততার সঙ্গে লিখিত হয়ে আসছে। ‘চলমান আঙুল লিখে চলে, এবং লেখা অব্যাহত থাকে।’ এখন আমাদের সামনে একটি বিকল্প আছে : অসহিংস সহাবস্থান কিংবা সহিংস সহধ্বংস।

আমাদেরকে অবশ্যই অতীতের সিদ্ধান্তহীনতা ঝেড়ে ফেলতে হবে। আমাদেরকে অবশ্যই ভিয়েতনামে শান্তি এবং উন্নয়নশীল বিশ্বজুড়ে, যে বিশ্বের সীমান্ত আমাদের দুয়ারে দুয়ারে, ন্যায়বিচারের পক্ষে কথা বলার জন্য নতুন পথ খুঁজে নিতে হবে। আমরা যদি এই কাজটি না করি, তবে নিশ্চিতভাবেই আমাদেরকে সময়ের সেই দীর্ঘ অন্ধকার ও লজ্জাজনক করিডোরে টেনে নামিয়ে দেওয়া হবে যেটা তাদের জন্যই সংরক্ষিত যারা সহানুভূতিহীন ক্ষমতা, নৈতিকতাহীন প্রতিপত্তি এবং দৃষ্টিহীন শক্তির অধিকারী।

আসুন আমরা এখন শুরু করি। আসুন আমরা এখন নতুন বিশ্বের জন্য দীর্ঘ, তিক্ততবে সুন্দরসংগ্রামের জন্য নিজেদের নতুন করে পরিচালিত করি। এটা ঈশ্বরের পুত্রদের আহ্বান এবং আমাদের ভাইয়েরা অধীর আগ্রহে আমাদের সাড়া পাওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে। আমরা কি বলব যে প্রতিকূলতা অনেক বেশি? আমরা কি তাদের বলব যে সংগ্রাম খুবই কঠিন? আমাদের বার্তা কি এমন হবে যে আমেরিকান জীবনের সৈনিকবৃত্তি পূর্ণ মানুষ হিসেবে তাদের আগমনের বিরুদ্ধে এবং আমরা আমাদের গভীরতম অনুশোচনা প্রকাশ করব? কিংবা অন্য ধরণের বার্তা, যা হবে আকুল আকাক্সক্ষার, আশার, তাদের আকুলতার প্রতি সংহতিপূর্ণ, তাদের প্রতি প্রতিশ্রুতিপূর্ণ, মূল্য যাই হোক না কেন? পছন্দ করার দায়িত্ব আমাদের, আমাদেরই পথ বেছে নিতে হবে, অন্যথায় আমরা মানব ইতিহাসের এই সঙ্কটময় মুহূর্তটাকেই বেছে নেব।

নিকট অতীতের প্রখ্যাত চারণকবি এমনটাই বলেছেন

একদা প্রতিটি মানুষ ও জাতির

কাছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময় এসেছিল,

সত্য ও ভুলের বৈপরীত্যে,

ভালো আর মন্দের পক্ষ নিতে;

অনেক মহান কারণে, ঈশ্বরের নতুন ত্রাণকর্তা,

স্বপ্ন আর দুঃস্বপ্নের বার্তা নিয়ে,

এবং পছন্দ ছিল চির দিনের

অন্ধকার ও আলোর মাঝামাঝি।

যদিও মন্দের সঙ্গী বেশি,

তবুও সত্য একাই শক্তিধর;

যদিও তার অংশ উঁচু হয়ে থাকে,

এবং কণ্টকরাশি ভুলই হয় :

যদিও উঁচুরাই ভবিষ্যত শাসন করে,

এবং অন্ধকারের পেছনটা অজানা,

ছায়ার মধ্যে ঈশ্বর দাঁড়ান

তার নিজের ঊর্ধ্বে সবাইকে দেখতে থাকেন।