Home » রাজনীতি » সংলাপ অনিশ্চিত – জটিল হচ্ছে পরিস্থিতি

সংলাপ অনিশ্চিত – জটিল হচ্ছে পরিস্থিতি

জাকির হোসেন

conversation-4সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ২০১১ সালের ৩০ জুন তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থা বাতিল করে রাজনৈতিক সঙ্কটকে আরো জটিল এবং সাংঘর্ষিক করেছে বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সরকারকে অত্যন্ত স্পস্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, দলীয় সরাকারের অধীনে তারা জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেবে না। এ প্রেক্ষিতে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গণে একটি জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। সংকট সমাধানে দুই প্রধান দল বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের মধ্যে সংলাপের বিষয়টি নানাভাবে সামনে এসেছে। বিদেশী কূটনীতিকরাও সংলাপের মাধ্যমে চলমান রাজনৈতি সংকট সমাধানের প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। এমন একটি পরিস্থিতিতে সংকট সমাধানে গতমাসের শেষ দিকে বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া এক বিবৃতিতে প্রধানমন্ত্রীকে আলোচনা উদ্যোগ নেয়ার জন্য আহ্বাণ জানান। এর দু’দিন পর বিরোধী দলীয় নেত্রীর প্রস্তাবে সারা দিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদ এবং সংসদের বাইরে সংলাপের প্রস্তাব দেন। এ প্রেক্ষিতে বিএনপির পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়ার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বাণ জানানো হয়। এ আহ্বানের পরিপ্রেক্ষিতে সরকারের পক্ষ থেকে শিগগিরই বিএনপিকে আনুষ্ঠানিক প্রস্তাব দেয়া হবে উল্লেখ করা হয়। এদিকে হেফাজতে ইসলাম তাদের পূর্ব ঘোষিত কর্মসূচি অনুযাযী ১৩ দফা দাবিতে ৫ মে ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির মাধ্যমে ঢাকা অচল এবং সরকারকে ফেলে দেয়ার হুমকি দেয়। আর ৪ মে রাজধানীর মতিঝিলে ১৮ দলের মহাসমাবেশে বিরোধী দলীয় নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রস্তাব মেনে নেয়ার জন্য সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেন। ক্ষমতাসীনদের পক্ষ থেকে এ আল্টিমেটাম প্রত্যাখ্যান করা হয় এবং হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীদেরকে ৫ মে সন্ধ্যার পর শাপলা চত্বর ত্যাগ করার নির্দেশ দেওয়া হয়, অন্যথায় কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে বলে হুশিয়ারী উচ্চারণ করা হয়। সেদিন হেফাজতে ইসলামের কর্মী সমর্থকরা ঢাকার প্রবেশ পথের ৫টি পয়েন্টে অবস্থান নেয় এবং বিকেলে মতিঝিল এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনীর সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং ব্যাপক আকারে জ্বালাও পোড়া শুরু হয়। অন্যদিকে এদিন সন্ধ্যায় হেফাজতে ইসলামের নেতাকর্মীরা দাবি দায়ায় না হওয়া পর্যন্ত মতিঝিলের শাপলা চত্বর ছাড়বেন না বলে ঘোষণা দেন। এ ঘোষণার কিছু সময় পর বেগম খালেদা জিয়া বিএনপি’র নেতাকর্মীদের হেফাজতে ইসলাসের পাশে দাঁড়ানোর নিদের্শ দেন। কিন্তু প্রশাসন ৫ মে দিবাগত রাত প্রায় সাড়ে তিনটা থেকে সশস্ত্র এবং সহিংস পথে অভিযান চালিয়ে শাপল চত্বর হেফাজতকে হঠিয়ে দেয়। এরপর সরকার ধীরে ধীরে সংলাপ থেকে দূরে সরে যায়। ফলে সংলাপের মাধ্যমে সংকট নিরশনের বিষয়টি এখন অনিশ্চিত এবং নতুন করে জটিল হয়ে উঠছে দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি।

উল্লেখ্য, গত ৩০ এপ্রিল বিরোধীদলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া এক বিবৃতিতে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের গঠন প্রক্রিয়া নিয়ে প্রতিনিধিত্বশীল রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার উদ্যোগ নেয়ার জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রতি আহ্বান জানান। ওই বিবৃতিতে তিনি প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে বলেন, অনতিবিলম্বে নির্দলীয় ও নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের ব্যবস্থা করুন। একই সঙ্গে তিনি আলোচনার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য বিরোধী দলের আটক নেতাকর্মীদের মুক্তি, মিথ্যা মামলা প্রত্যাহার, গ্রেফতারনির্যাতন বন্ধ এবং সভাসমাবেশমিছিলসহ শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক কর্মসূচি পালনের অধিকার নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। বিরোধীদলীয় নেতার এ আহ্বানের দুইদিন পর গত ২ মে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সংসদের ভেতরে কিংবা বাইরে যে কোনো স্থানে সংলাপে বসার কথা বলেন। অবশ্য, এর আগে প্রধান দুই রাজনৈতিক দলসহ সমাজের বিশিষ্টজনরা সংলাপের কথা বলাবলি করলেও শর্তের বেড়াজালে তা আটকে যায়। সংলাপ অনিশ্চিত হয়ে পড়ায় ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের কার্যনির্বাহী সংসদের সর্বশেষ বৈঠকে তাদের পক্ষ থেকে বিএনপিকে সংলাপে আহ্বান জানানো হবে না বলেও নীতিগত সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সংলাপের সম্ভাবনাটি জোরালো হয়ে উঠে।

গত ২ মে গণভবনে ঝালকাঠি জেলা আওয়ামী লীগের নেতাদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় সংলাপ প্রসঙ্গে বিরোধীদলীয় নেত্রীকে উদ্দেশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনারা যেখানেই আলোচনায় বসতে চান, আমরা সেখানেই বসতে রাজি আছি। অবশ্য প্রধানমন্ত্রী বিরোধী দলকে সংলাপের আহ্বান জানালেও তাদের প্রধান দাবি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে নাকচ করে দেন। নির্বাচিত সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেভাবে নির্বাচন হয়, সেভাবেই আমাদের এখানে নির্বাচন হবে।

প্রধানমন্ত্রীর এ বক্তব্যের প্রেক্ষিতে গত ২ মে দুপুরে পূর্ব নির্ধারিত এক সংবাদ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রীর সংলাপের আহ্বাণের জবাব দেয় বিএনপি। দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উপদেষ্টা শামসুজ্জামান দুদু সাংবাদিকদের বলেন, আমাদের বক্তব্যে স্পষ্টনির্দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন হবেএই ঘোষণা দিয়ে লিখিতভাবে আলোচনার প্রস্তাব দিলে আমরা অবশ্যই সাড়া দেব।

অন্যদিকে, ওই দিন (২ মে) বিকেলে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেন, আমরা অল্প সময়ের মধ্যেই বিরোধী দলের সঙ্গে যোগাযোগ করব। যাতে করে আলোচনাটা শুরু হয়। দু’এক দিনের মধ্যেই বিরোধী দলকে প্রস্তাব দেয়া হবে এ সময়ে আশরাফ ইঙ্গিত দেন।

এর দুদিন পর ৪মে বিকালে মতিঝিলে ১৮ দলীয় জোটের সমাবেশে সংলাপের প্রস্তাবকে ‘নাটক’ আখ্যায়িত করে নির্দলীয় সরকার প্রতিষ্ঠার দাবি মেনে নেয়ার সুস্পস্ট ঘোষণার জন্য সরকারকে ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দেন বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া। এই দাবি মেনে নিতে সরকারকে ৪৮ ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়ে এর মধ্যে দাবি পূরণ না হলে সরকারের পরিণতি আরও খারাপ হবে বলে হুশিয়ারি দেন তিনি। খালেদা জিয়া এ সময় হেফাজতে ইসলামের ৫ মে’র ঢাকা অবরোধ কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে বলেন, না হলে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটামই দিতাম।

এ প্রেক্ষিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন ১৪ দলের নেতারা অভিযোগ করেন হেফাজতে ইসলামের ওপর ভর করে বিরোধীদলীয় নেতা ৪৮ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন। ক্ষমতাসীন জোট এ আলটিমেটামকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবিলা করার ঘোষণা দেয়।

এর আগে পড়ে জাতিসংঘ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা এবং মধ্যপ্রাচ্যের কূটনীতিকেরা দফায় দফায় সংলাপ অনুষ্ঠানের ব্যাপারে উভয় পক্ষের উপরে চাপ প্রয়োগ করতে থাকে। বিএনপির পক্ষ থেকে এক পর্যায়ে বলা হয়, সরকার সংলাপের ব্যাপারে আন্তরিক নয়। তারা যা করছে তা আন্তর্জাতিক পর্যায়ের চাপের কারণে লোক দেখানো। কিন্তু এখন পর্যন্ত তাদের সংলাপ উদ্যোগ কোনো ধরণের সফলতা দেখাতে পারেনি। বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, আন্তর্জাতিক মহল সংলাপ নিয়ে যে জটিলতা এবং বিপাকের পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাতে তারা বিরক্ত ও উদ্বিগ্ন।

দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিষয়ে দেশ বরেণ্য বুদ্ধিজীবী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, এখন দেখা যাচ্ছে উভয় পক্ষই তাদের অবস্থানে অনড় এবং সংলাপের তেমন কোনো আশা নেই। আর সমঝোতার বিষয়টি সুদূর পরাহত। ফলে নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে দেশ ততই রাজনৈতিক সংকট জটিল হচ্ছে এবং দেশ একটি সংঘাতের দিকে ্এগিয়ে যাচ্ছে।

এ ব্যাপারে প্রখ্যাত প্রাবন্ধিক, শিক্ষাবিদ ও বুদ্ধিজীবী অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, নির্বাচন যতই এগিয়ে আসছে চলমান রাজনৈতিক সংকট ততই ঘণিভূত হচ্ছে। নির্বাচন পদ্ধতির মীমাংসা না হলে সংকট আরো বাড়বে। নির্বাচন পদ্ধতির পরিবর্তন না হলে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে প্রশ্ন উঠবে এবং নতুন সংকটের সৃষ্টি হবে। সমঝোতার মাধ্যমে নির্বাচন কেন্দ্রিক রাজনৈতিক অস্থিরতার যদি মীমাংশা না হয়, তাহলে পরিস্থিতির আরো অবনতি ঘটবে। এই এক্ষেত্রে আমরা না চাইলেও অগণন্ত্রিক শক্তি ক্ষমতা দখল করবে। তিনি বলেন, তাই বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে সকল রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহনে একটি অবাধ, সুষ্ঠু এবং গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি। এ ছাড়া অন্য যত চেষ্টায় করা হোক না কেনসহিংসতা আরো বাড়বে এবং পরিস্থিতি ক্রমেই আরো জটিল হবে।

তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা বিশিষ্ট রাজনৈতিক বিশ্লেষক ড. আকবর আলী খান বলেন, সংলাপের মাধ্যমে চলমান রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। ফলে দেশ একটি সংঘাতময় এবং জটিল পরিস্থিতির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণে একমাত্র পথ রাজনৈতিক সমঝোতা। দুই দল সংলাপের পরিবেশ তৈরি না করলে এবং চলমান সংকটে সমাধান না হরে পরিস্থিতি ক্রমেই জটিল হবে।

বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, সংলাপ কোনো ইস্যূ নয়, সংলাপ হলেও দেশ সংঘাতের দিকে যাতে পারে, আবার না হলেও যেতে পারে। মূল বিষয় হলো সমঝোতার মাধ্যমে সংকট থেকে উত্তোরণ। সমঝোতার জন্য আওয়ামী এবং বিএনপি উভয়কেই ছাড় দিতে হবে। কিন্তু কোনো পক্ষই ছাড় দিতে নাজার এবং এ ব্যাপারে অভয় পক্ষই অনড়। ফলে বর্তমান জটিল পরিস্থিতির জন্য উভয় পক্ষই দায়ী। তিনি সংলাপ বিষয় বিদেশী মহলের তৎপরতা বিষয়ে বলেন, সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতার বিষয়ে বিদেশীদের আন্তরিকতা নিয়েও সন্দেহ রয়েছে। তারা এদেশে জামায়াতে ইসামের সঙ্গে আলোচনা করছে এবং তারা রকম তৎপতায় লিপ্ত। ফলে বিদেশীদের আসল উদ্দেশ্য বোঝা এখন খুবই মুশকিল।।