Home » রাজনীতি » সংসদ বর্জন – বিএনপির সর্বনাশা ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত

সংসদ বর্জন – বিএনপির সর্বনাশা ও আত্মঘাতী সিদ্ধান্ত

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

parliamentসামরিক স্বৈরশাসক জেনারেল এরশাদের পতনের মধ্যদিয়ে দীর্ঘকালের কখনো সেনা এবং কখনো অগণতান্ত্রিক বা অনুদার গণতান্ত্রিক শাসনের পরে বাংলাদেশে ‘গণতান্ত্রিক’ সরকারের যাত্রা শুরু হয়। ১৯৯১ সালে সংবিধানের দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ১৭ বছর পর দেশে পুনরায় সংসদীয় পদ্ধতির সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হয়। নির্বাচিত গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা, সংসদীয় পদ্ধতির প্রত্যাবর্তনের পরে এমনটা আশা করা হয়েছিল যে, জাতীয় সংসদই হবে সবকিছুর কেন্দ্রবিন্দু। রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকেও জাতীয় সংসদকে সচল, সজীব, সবল এবং কার্যকর করার অঙ্গীকার করা হয় দফায় দফায়, বারে বারে। ১৯৯১এর নির্বাচন থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত প্রতিবারের নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক দলগুলো জাতীয় সংসদকে কার্যকর একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার কথা বলেছিল তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে। কিন্তু ১৯৯১ থেকে এ পর্যন্ত প্রধান দুই দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি কখনই জাতীয় সংসদের ব্যাপারে আগ্রহ দেখায়নি। এটা ক্ষমতায় থাকলেও হয়নি, বিরোধী দলে গেলে তো নয়ই। সংসদ বর্জনের এই সংস্কৃতি দুই দলই পাল্লা দিয়ে জারি রেখেছে। বর্তমান জাতীয় সংসদে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং তার জোট তিনচতুর্থাংশের বেশি আসন পাওয়া সত্ত্বেও এই সংসদেও কোরাম সঙ্কট দেখা যায় হরহামেশা।

বর্তমান জাতীয় সংসদে এই পর্যন্ত ৩৭০ কার্যদিবসের মধ্যে মাত্র ৫৭ দিন প্রধান বিরোধী দল বিএনপি জাতীয় সংসদে উপস্থিত ছিল। টিআইবি’র এক হিসেবে দেখা যায়, এই সংসদে প্রথম থেকে পঞ্চদশ অধিবেশন পর্যন্ত বিরোধী দলের অনুপস্থিতির গড় হিসাব ৮৩ দশমিক ৩৮ শতাংশ। অথচ বিএনপি তার নির্বাচনী ইশতেহারের ১৫ নম্বর দফায় উল্লেখ করেছিল, ‘ইস্যু ভিত্তিক ওয়াকআউট ছাড়া কোনো দল বা জোট সংসদের অধিবেশন বা বৈঠক বর্জন করতে পারবে না। কোনো সংসদ সদস্য সংসদের অনুমোদন ছাড়া ৩০ দিনের অধিক অনুপস্থিত থাকলে তার সদস্য পদ শূন্য হবে।’ ওই সময় তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া বলেছিলেন, বিএনপি বিরোধী দলে গেলেও সংসদ বর্জন করবে না।

শুধুমাত্র বিরোধী দলই যে সংসদে অনুপস্থিত থাকছে তাই নয়, এক হিসেবে দেখা গেছে, অনেক মন্ত্রী, বিভিন্ন সংসদীয় কমিটির সভাপতি এবং সরকার দলীয় সংসদ সদস্যদের অনেকেই মোট বৈঠক দিবসের অর্ধেকেরও কম সময় সংসদে উপস্থিত ছিলেন।

বর্তমানে ক্ষমতাসীন দল আওয়ামী লীগ এমন একটা ভাব দেখাচ্ছে এবং জনগণকে এমন একটি ধারণা দেয়ার চেষ্টা করছে যে, তারা জীবনে কোনোদিন সংসদ বর্জন করেননি। জাতীয় সংসদ বর্জনের হিসাব যদি দেখা যায় তাহলে দেখা যাবে, স্বৈরশাসক এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে শুরু হওয়া অর্থাৎ পঞ্চম জাতীয় সংসদে তৎকালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ ৪০০ বৈঠক দিবসের মধ্যে ১৩৫ বৈঠক দিবস সংসদ বর্জন করে।

১৯৯৬ সালে শুরু হওয়া সপ্তম জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ৩৮২ বৈঠক দিবসের মধ্যে ১৬৩ বৈঠক দিবস সংসদ বর্জন করে।

২০০১এ শুরু হওয়া অষ্টম জাতীয় সংসদের প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ নতুন এক রেকর্ড সৃষ্টি করে। তারা স্থূল কারচুপির অভিযোগ এনে প্রথম এবং দ্বিতীয় অধিবেশনই বর্জন করে। আওয়ামী লীগ ৩৭৩ বৈঠক দিবসের মধ্যে ২২৩ বৈঠক দিবস সংসদ বর্জন করে।

সংসদীয় রাজনৈতিক ইতিহাসে সংসদ ভবনের সিঁড়ির উপরে পাল্টা সংসদ বসানোর ইতিহাস বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আছে। কাজেই সংসদ বর্জনের সংস্কৃতিতে বাংলাদেশের রাজনীতি যে কোনোক্রমেই লাভবান না হয়ে বরং চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, তা সবাই বুঝতে পারছেন। একটি গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা হতে পারার বদলে বাংলাদেশ এখন শুধুমাত্র একটি নির্বাচনী গণতন্ত্র কেন্দ্রীক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে। এ অবস্থাও বা কতোদিন চলবে তাও বর্তমান পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা খুবই দুষ্কর।

বর্তমান জাতীয় সংসদে বিএনপি প্রথমসারিতে আসন বির্ন্যাসের মতো ঠুনকো বিষয় নিয়ে সংসদ বর্জন করে। এরপর নতুন নতুন দাবিতে তারা সংসদ বর্জন করতে থাকেন। অন্যদিকে বিরোধী দল বিএনপি যখনই সংসদে গেছে তখনই প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামী লীগের প্রথমসারির নেতারাসহ একেবারে সদ্য সংসদ সদস্য নির্বাচিতরাও যে ভাষা ব্যবহার করেছেন, তা শোনা যেকোনো কাণ্ডজ্ঞানসম্পন্ন এবং সুস্থ মানুষের পক্ষে অসম্ভব। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী অন্যান্যদের সঙ্গে নিয়ে মৃত মানুষকে নিয়ে যেভাবে তিরষ্কার করেছেন, অশ্রাব্য ভাষা ব্যবহার থেকে শুরু করে এমন সব শব্দাবলী ব্যবহার করেছেন যা সংসদীয় ইতিহাসে নজিরবিহীন তো বটেই, কোথাও এমনটি ঘটেছে বলে কেউ বলতে পারবেন না। বিশ্বের কোনো কোনো দেশে সংসদ সদস্যদের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটলেও, যে শব্দগুলো ব্যবহার করা হয়েছে, তা আরো বেশি ভয়ঙ্কর এবং মারাত্মক। বিরোধী দল যাতে সংসদ অধিবেশনে না থাকে, এটা যে তারই কৌশল ছিল তা যে কেউ বুঝতে পারছেন। কারণ বিরোধী দল বিএনপি সংসদে থাকলে দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি সঙ্কট এবং এই সঙ্কটের পাশাপাশি দফায় দফায় মূল্যবৃদ্ধি, ছাত্রলীগযুবলীগসহ ক্ষমতাসীনদের অবাধ চাঁদাবাজিটেন্ডারবাজি, শেয়ারবাজার, হলমার্ক, বিসমিল্লা কেলেঙ্কারি, পদ্মা সেতুর দুর্নীতি, হত্যা, গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, আইনশৃঙ্খলার সীমাহীন অবনতি, যৌন সন্ত্রাস, ট্রানজিট, তিস্তা, টিপাইমুখসহ অসংখ্য বিষয় সংসদে উত্থাপিত হতে পারতো। সংসদে উত্থাপিত হতে পারতো সরকারের নানা কর্মের ফিরিস্তি। কিন্তু ক্ষমতাসীন দল এবং এর প্রধান অন্তত এই কৌশলে জয়ী হয়েছেন, তারা সফল। কারণ বিএনপি সংসদ বর্জনের মাধ্যমে জনসম্পৃক্ত বিষয়গুলো এবং জনগণ যাতে বিপর্যস্ত হয়েছে, আঘাত প্রাপ্ত হয়েছে এমন সব বিষয় সংসদে উত্থাপন করতে পারতো। আর তা করলে বিএনপি যে একটি কার্যকর বিরোধী দল তা প্রমাণ সহজ হতো। কিন্তু সংসদ বর্জনের মাধ্যমে বিএনপি একটি ঐতিহাসিক এবং ক্ষমাহীন ভুল করে ফেলেছে। এর মাশুল দেয়ার সুযোগও এখন নেই। যিনি বা যারা বিএনপির সর্বনাশকারী এমন আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের পরামর্শদাতা, তারা বিএনপির শত্রু, বন্ধু নয়।।

১টি মন্তব্য

  1. Shilabrata Barua

    নির্বাচন প্রার্থীদের অনিবার্য কারণ ছাড়া সংসদ বর্জন করব না এমন অঙ্গীকার দিতে হবে মনোনয়নপত্রে । তা না করলে মনোনয়নপত্র বাতিল হেবে এমন বিধান রেখে আইন পাস করতে হবে ।