Home » আন্তর্জাতিক » ৪০ হাজার সেনার স্ট্রাইক কোর – উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারতের নতুন প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা

৪০ হাজার সেনার স্ট্রাইক কোর – উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভারতের নতুন প্রতিরক্ষা পরিকল্পনা

আমীর খসরু

indian army-4চীন সীমান্তজুড়ে ভারত তার উত্তরপূর্বাঞ্চলে পার্বত্য বা মাউন্টেন স্ট্রাইক কোর গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ভারতের নিরাপত্তা বিষয়ক মন্ত্রিসভা কমিটি খুব শিগগিরই এ ব্যাপারে আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেবে বলে ১ জুনের টাইমস অব ইনডিয়াসহ সে দেশীয় সংবাদ মাধ্যম খবর দিয়েছে। ওই সংবাদ মাধ্যমগুলো বলছে, এই অনুমোদন দেয়া শুধুমাত্র আনুষ্ঠানিকতা ছাড়া কিছু নয়। ভারতের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এ ব্যাপারে ইতোমধ্যে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে দিয়েছে। এতে বলা হয়, চীনের সঙ্গে উত্তরপূর্ব সীমান্তে আক্রমণ হানার শক্তি বাড়ানোর কারণেই ওই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নেয়া হচ্ছে।

প্রস্তাবিত পার্বত্য স্টাইক কোরে থাকবে অন্তত ৪০ হাজার সৈন্য। আর এই বাহিনীর একাংশ মোতায়েন থাকবে বাংলাদেশের উত্তর সীমান্ত সংলগ্ন চিকেনস নেক নামে পরিচিত ভারতের উত্তরপূর্বাঞ্চলীয় এলাকায়। আর এর সদর দফতর হবে পশ্চিমবঙ্গের পানাগড়ে। এর মাধ্যমে চীনের আক্রমণ মোকাবেলায় ভারত প্রথমবারের মতো চীনের তিব্বত অঞ্চলে হামলা চালানোর সামর্থ্য অর্জন করবে বলে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম বলছে। এই বাহিনীর পার্বত্য উঁচু এলাকায় যুদ্ধ করার মত সক্ষমতাসম্পন্ন দুটি বিশেষ ডিভিশনও থাকবে। ওই স্ট্রাইক কোরের জন্য ভারতের দ্বাদশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনাকালে (২০১২২০১৭) মোট ৬২ হাজার কোটি রুপি ব্যয় হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

দ্বাদশ পরিকল্পনা মেয়াদে পুরো নতুন বিন্যাসের জন্য মোট ব্যয় বাড়বে ৮১ হাজার কোটি রুপি। অবশ্য, স্বতন্ত্র ব্রিগেডসহ পুরো সমরসজ্জার কিছুব্যয় মোটানো হবে ত্রয়োদশ পরিকল্পনার মাধ্যমে। ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম এ খবর দিয়েছে।

ভারতীয় সেনাবাহিনী চীন সংলগ্ন সীমান্তে তাদের আক্রমণাত্মক সামর্থ্য বাড়াতে ওই স্ট্রাইক কোরের বাইরেও দুটি স্বতন্ত্র পদাতিক ব্রিগেড এবং দুটি স্বতন্ত্র সাজোয়া ব্রিগেড মোতায়েনের প্রস্তাব দিয়েছে। এটিও অনুমোদন পাবে বলে ভারতীয় সংবাদ মাধ্যম ধারণা করছে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এই পরিকল্পনার আওতায় ৬টি আর্মার্ড রেজিমেন্ট মোতায়েনের পরিকল্পনা নিয়েছে। আর এতে থাকবে ৩৫০টি ট্যাংক। এছাড়া তিনটি পদাতিক ব্যাটালিয়ন তারা গঠন করবে, যাদের থাকবে ১৮০ বিএমপি১১ সাঁজোয়া যানবাহন। লাদাককেন্দ্রিক সেনা সংখ্যাও বাড়ানো হবে। এছাড়া ভারতীয় বিমানবাহিনী জঙ্গী বিমান সংখ্যাও বাড়াবে এই অঞ্চলে।

ভারত ২০০৯১০ সালেই আসামের লেখাপানি ও মিসামারিতে দুটি নতুন পদাতিক ডিভিশন গড়ে তুলেছে। এই ডিভিশন দুটি অরুনাচল প্রদেশকে রক্ষার কাজ করতে সক্ষম বলে বলা হচ্ছে।

টাইমস অব ইনডিয়া জানায়, ভারত গত দশক থেকে চীনের সামরিক ও অবকাঠামোগত সামর্থ্যরে সঙ্গে তাল মেলানোর কার্যক্রম হাতে নিলেও সেটা বাস্তবায়নের জন্য সত্যিকার অর্থেই এখন তাড়াহুড়া করছে। সেনাবাহিনীর এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, পার্বত্য স্টাইক কোর হবে চীনের সামর্থ্যরে কাছাকাছি পৌঁছার একটি তাৎপর্যপূর্ণ পদক্ষেপ।

সংবাদ মাধ্যম বলছে, ভারতচীন সীমান্তে চীনের ক্রমবর্ধমান সামরিক সামর্থ্য ও উন্নত অবকাঠামোর সঙ্গে তাল মেলাতে ভারত সীমান্ত এলাকায় তার ক্ষেপণাস্ত্র ও জঙ্গি বিমান সামর্থ্য বাড়াচ্ছে। ভারতের প্রথম পার্বত্য স্টাইক কোর গঠনের প্রস্তাবটি কয়েক বছর ধরেই ঝুলে ছিল। বিপুল অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় অর্থ মন্ত্রণালয় অতীতে ফাইলটি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠিয়ে দিত। কিন্তু পরিস্থিতি এখন পাল্টে গেছে।

এখানে উল্লেখ্য, আন্তর্জাতিক প্রভাবশালী নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা বিষয়ক গবেষণা সংস্থা স্টকহোম ইন্টারন্যাশনাল পিস রিসার্স ইনস্টিটিউট (সিপরি)’র সিনিয়র গবেষক সিমন ওয়েজম্যান এ বছরেরই ১০ এপ্রিল শুধুমাত্র আমাদের বুধবারএর জন্য এক বিশ্লেষণে লিখেছিলেন, প্রধান অস্ত্র আমদানিকারক হিসেবে ভারত এখনো শীর্ষ স্থান ধরে রেখেছে। এমনকি দ্বিতীয় স্থানে থাকা দেশটির চেয়েও সে অনেক দূর এগিয়ে। ২০০৮২০১২ সময়কালে চীনের চেয়ে এই দেশটি দ্বিগুণেরও বেশি অস্ত্র আমদানি করেছে। দেশটির আমদানি পরিকল্পনাও অনেক বেশি রয়ে গেছে। ইতোমধ্যেই বেশ কিছু চাহিদাপত্র দেয়া হয়েছে এবং অদূর ভবিষ্যতে আরো কিছু আমদানি চুক্তি করতে যাচ্ছে তারা।

সিপরি’র গবেষণা পত্রে দেখা যায়, ২০১২ সালে বিশ্বের প্রথম পাঁচটি অস্ত্র আমদানিকারক দেশের তালিকায় শীর্ষ স্থানে রয়েছে ভারত এবং তারা আমদাানি করেছে বিশ্ব বাজারের ১২ শতাংশ অস্ত্র। চীন কিনেছে ৬ শতাংশ এবং পাকিস্তান ৫ শতাংশ। ২০০৩ থেকে ২০০৭এর তুলনায় ২০০৮ থেকে ২০১২ সময়কালে ভারতের অস্ত্র আমদানি বেড়েছে শতকরা ৫৯ শতাংশ।

ভারত প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় বরাদ্দও বাড়িয়েছে। ২০১৩ সালে ঘোষিত বাজেটে দেখা যায়, প্রতিরক্ষা খাতে তাদের ব্যয় বেড়েছে ৫ দশমিক ৩১ শতাংশ, যার শতকরা ৪২ ভাগ ব্যবহৃত হয়েছে অস্ত্র ও সমরসরঞ্জামাদি আমদানি এবং সশস্ত্র বাহিনীকে আধুনিকায়নের জন্য।

ভারত ২০১২ সালে প্রতিরক্ষা খাতে ব্যয় করেছে ৪৬ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলার (১ বিলিয়ন = ১০০ কোটি)। যদিও ২০১২ সালে ভারতের প্রতিরক্ষা ব্যয় শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ কমেছিল। এই ব্যয় আবার বেড়েছে।

তবে ভারতের দারিদ্র্যও ব্যাপকহারে বেড়েছে। সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাংকের এক হিসেবে দেখা যায়, দৈনিক ১ দশমিক ২৫ ডলারের নিচে আয় করেন এমন দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৪০ কোটি। আর দৈনিক ২ ডলারের নিচে আয় করেন এমন মানুষের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৮৪ কোটির বেশি। অন্য এক হিসেবে দেখা যায়, আফ্রিকার ২৬টি দেশের চরম দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মোট সংখ্যার চেয়ে ভারতের দরিদ্র জনগণের সংখ্যা বেশি।।