Home » রাজনীতি » কোনো সুসংবাদ নেই

কোনো সুসংবাদ নেই

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

conversation-4প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত সপ্তাহে স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছেন, সংলাপের পথ বন্ধ হয়ে গেছে। বন্ধ হওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি বললেন, বিরোধী দলের কারণেই এটা হয়েছে। সংলাপ নিয়ে ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে একেক সময় একেক কথা বলা হচ্ছে। এবং এটা তাদের অভ্যাসে পরিণত হয়েছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করার পর থেকেই নানা মহল থেকে সঙ্কট নিরসনের যে আহবান বারংবার করা হচ্ছিল, তখন প্রধানমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীনরা ওই আহবানকারীদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে নানা বক্তব্যও দিয়েছিলেন। অশ্লীল বাক্যবাণ থেকে বয়োবৃদ্ধ বিশিষ্টজন থেকে শুরু করে সাংবাদিকরা পর্যন্ত কেউ রেহাই পাননি। কিছুদিন সংলাপের কথা বলা হচ্ছিল, এখন আবার পথ বন্ধ হয়ে গেছে এমন কথা বলা হচ্ছে।

যখন জাতিসংঘের বিশেষ দূত, পশ্চিমা দেশগুলো এমনকি মধ্যপ্রাচ্যের ঢাকাস্থ প্রতিনিধিরা দৌড়ঝাপ করছিলেন, তখন হঠাৎ করেই একদিন প্রধানমন্ত্রী বলে উঠলেন সংলাপের কথা। তবে সঙ্গে সঙ্গে তিনি এও বলতে থাকলেন, তত্ত্বাবধায়ক বা অন্তবর্তী দলনিরপেক্ষ কোনো সরকারের অধীনে নির্বাচন হবে না। নির্বাচন হবে এই সরকারের অধীনেই। তিনি এ কথাও স্পষ্টভাষায় জানিয়ে দিলেন যে, বিরোধী দল যদি কিছু বলতে চায়, তা তারা যেন সংসদে এসে বলে যায়। এরই এক পর্যায়ে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ বললেন, সংলাপ প্রশ্নে দুইএকদিনের মধ্যে বিরোধী দল বিএনপিকে চিঠি দেয়া হবে। আবার এর পরেই শেখ হাসিনা দলীয় আলোচনায় সংলাপ সম্পর্কে নেতিবাচক বক্তব্য দিতে থাকলেন। সৈয়দ আশরাফও বললেন, কোনো চিঠি দেয়া হবে না। তবে দুইজনেই আবার বললেন, সংসদে এসে বিরোধী দল তাদের যা বলার তা বলতে পারেন। একথা সবারই জানা যে, তিনচতুর্থাংশের বেশি আসন থাকার পরে সংসদে যাইই আলোচনা হোক, তা এক ধাক্কায় বাতিল করার ক্ষমতা তাদের আছে।

সংলাপের ব্যাপারে সুনির্দিষ্ট কোনো প্রস্তাব সরকারের দিক থেকে দেয়াই হলো না। চিঠি দেয়া তো দূরের কথা, আনুষ্ঠানিক কোনো প্রস্তাবও যখন দেয়া হলো না বা উত্থাপিতও হলো না তখন সংলাপের পথ খুললো না বন্ধ হলো তা বোঝার উপায় কি? সংলাপ সংলাপ বলে যা কিছু বলার তা প্রধানমন্ত্রীসহ ক্ষমতাসীনদের দিক থেকেই বলা হলো, এখন বন্ধ করার কথাও তাদের দিক থেকেই বলা হচ্ছে। কাজেই এটা যে একটি রাজনৈতিক ভেলকিবাজি তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এর মধ্যে বিএনপির একজন সংসদ সদস্যের পক্ষ থেকে মুলতবি প্রস্তাব এনে আবার তা দলীয় সিদ্ধান্তের কারণে প্রত্যাহার করা হলো। এখানে দুটি বিষয় স্পষ্ট। এক. বিএনপির মধ্যে সমন্বয়ের লেশমাত্র নেই। দুই. আওয়ামী লীগ এখন এটাকে অজুহাত হিসেবে দেখাচ্ছে রাজনৈতিক এক কৌশল হিসেবে। মুলতবি প্রস্তাবে আলোচনা হলেই কি নির্দলীয় বা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়টি নিষ্পত্তি হয়ে যেতো? আলোচনা হতো, গালাগাল হতো, তারপর প্রস্তাবটি স্বাভাবিকভাবে মৃত্যুবরণ করতো। কাজেই মুলতবি প্রস্তাব আনা না আনার বিষয়টিকে তারা বড় করে দেখাচ্ছে ভিন্ন উদ্দেশ্যে। যতোক্ষণ পর্যন্ত না সরকারের দিক থেকে, ইতিবাচক সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব আসবে এবং সরকার রাজি হবে ততোক্ষণ পর্যন্ত সংলাপ সংলাপ বলে চিৎকারের সিঁকি পয়সারও কোনো মূল্য নেই।

প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সংবিধান অনুযায়ী নির্বাচন হবে অর্থাৎ তার সরকারের অধীনেই নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হবে। এতে মনে হয়, সংবিধান ১৯৭২ সালে যেভাবে প্রণীত হয়েছিল তা বহাল তবিয়তে এখনো জারি রয়েছে। কেউ কোনো দিন এর পরিবর্তন করেনি বা কোনোদিন কোনো সংশোধনীও আসেনি। এও মনে হয়, কোনোদিন এদেশে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের জন্য কেউ কোনো আন্দোলন করেনি, হরতাল হয়নি, সংঘাতসংঘর্ষ জনগণ দেখেনি। ভাবটা এমন যে, এদেশে কোনোদিনই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ছিল না। এবার নতুন করে অদ্ভূত এক ব্যবস্থা হাজির হয়ে গেছে বলেই ক্ষমতাসীনরা প্রকারান্তরে প্রচার করতে চাইছে। পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে এই সরকারই সংবিধান পরিবর্তন করে নিজেদের ইচ্ছামতো। তাহলে সংবিধান অনুযায়ী সব হবে, সংবিধানই সবএমন কথা বলা হচ্ছে কেন? সংবিধান সংশোধনীর মাধ্যমে ১৯৭২এর সংবিধানে জরুরি অবস্থার বিধান, একদলীয় শাসন ব্যবস্থা কায়েমের বিধান ওই সময়ের ক্ষমতাসীনরাই এনেছিলেন। ওই সব সংশোধনীর মাধ্যমে সংবিধানের গণতান্ত্রিক চেতনাকে রক্তাক্ত এবং ক্ষতবিক্ষত করা হয়েছিল। পঞ্চদশ সংশোধনীর আগে তখন কি বলা হয়নি যে, ১৯৭২এর মূল সংবিধানে আমরা ফিরে যাবো। তারা কি তা করেছে? বরং যা করা হয়েছে, তা হলো নিজেদের সুবিধার জন্য, ক্ষমতাকে পাকাপোক্ত করার লক্ষ্যে যা যা করার, ঠিক তাই। সুতরাং সংবিধানের অতীত নিয়ে ভেবে দেখে বর্তমান সম্পর্কে মন্তব্য করাটাই হচ্ছে বাস্তবসম্মত কাজ।

সংবিধান যদি প্রধানমন্ত্রী মেনেই চলতেন, তাহলে তিনি কেমন করে সংসদের মেয়াদ স্থির করে দেন। প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, সংসদের মেয়াদ শেষ হবে ২৫ অক্টোবর। সংবিধান প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় অনিচ্ছায় চলে না, সংসদের আয়ুও নির্ধারিত হয় না। প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় অনিচ্ছায় সংসদের আয়ু নির্ধারিত হয় এমন কথা সংবিধানে সরাসরি তো নয়ই, আকার ইঙ্গিতেও কোথাও উল্লেখ নেই। বরং প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ বা কার্যক্রম সম্পর্কে সংবিধানে স্পষ্ট ভাবে বলা আছে।

এভাবে অসংখ্য উদাহরণ দেয়া যায়। সংবিধানে সভাসমাবেশের অধিকার, বাকব্যক্তি স্বাধীনতাসহ বেশ কিছু অধিকারকে নিশ্চিত করা হয়েছে। কিন্তু কোনো বৈধ কারণ ছাড়াই সভাসমাবেশ বন্ধ করে দেয়া হয়েছে। এখানে সংবিধানের প্রশ্ন উঠে না কেন?

রাষ্ট্র, সরকার, দল এবং ব্যক্তি যে এক বিষয় নয় সে বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। স্বৈরতন্ত্রের চূড়ান্ত পরিণতিতেই শাসক মাত্রই নিজেকে দল, সরকার এবং রাষ্ট্রের সঙ্গে নিজেকে সমার্থক করে ফেলে। অথবা রাষ্ট্রের চেয়েও নিজেকে উচ্চতর ও ক্ষমতাধর মনে করে। আর যে দেশেই এ ঘটনাটি ঘটে সে দেশ এবং জনগণের জন্য নেমে আসে এক চরম এবং বিপদজ্জনক পরিণতি। গণতন্ত্র নির্বাসিত হয়, মানুষের অধিকার খর্ব হয় নিদারুনভাবে, বিরোধী পক্ষ বলে কারো অস্তিত্ব স্বীকারই করা হয় না। এমনই দুঃসহ এক পরিস্থিতির মধ্যে থমকে আছে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি। যে শাসক রাষ্ট্রের চেয়ে, সংবিধানের চেয়ে নিজেকে বড় ও ক্ষমতাধর মনে করে এবং সেভাবেই শাসন কার্য পরিচালনা করে, তার কাছ থেকে শুভ কোনো কিছুই আশা করা যায় না।

যে পরিস্থিতি চলছে তাতে সাংঘর্ষিক রাজনীতির অবসান হবে, একটি অবাধ গ্রহণযোগ্য, সব দলের অংশগ্রহণে একটি নির্বাচনের পথ তৈরি হবে এমনটা কোনো সামান্য জ্ঞানবুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ বিদ্যমান পরিস্থিতিতে এখন আর চিন্তা করে না। বরং সাধারণ মানুষ কামনা করে, পরিস্থিতির আর যেন অবনতি না হয়। বরং পরিস্থিতি যেদিকে যাচ্ছে তাতে জটিলতা, সঙ্কট এবং সাংঘর্ষিক অবস্থার আরো অবনতি হবে এমনটাই আশঙ্কা করা হচ্ছে। পুরো দেশ একটি সুসংবাদের জন্য উগ্রিব থাকলেও সামগ্রিকভাবে কোনো সুসংবাদ নেই। ক্ষমতাসীন গুটি কয়েক বাদে সবাই এই অবস্থা থেকে রেহাই চায়।।