Home » প্রচ্ছদ কথা » ক্ষমতার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত

ক্ষমতার চিরস্থায়ী বন্দোবস্ত

আমীর খসরু

ban on rallyসংবিধান, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাসহ মানুষের সামগ্রিক অধিকার বাতিল করে দিয়ে অতীতে যখন দেশে সামরিক শাসন এসেছিল, তখন নানা অদ্ভুত বিষয় দেশবাসীকে দেখতে হয়েছে। সেনা শাসকরা যখন নিজেদের দল গঠন প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতেন, তখন ‘ঘরোয়া রাজনৈতিক তৎপরতা’ নামে অতি সীমিত আকারে কিছু অধিকার দেয়া হতো। এই ব্যবস্থায় প্রকাশ্যে সভাসমাবেশ নয়, ঘরের মধ্যে বসে সীমিত পরিসরে নিয়ন্ত্রিত রাজনৈতিক চর্চা সম্ভব হতো। এটা সেনা শাসক ও শাসনের সংস্কৃতি।

কিন্তু দুর্ভাগ্যজনকভাবে বর্তমানে নির্বাচিত একটি সরকারের সময়ে এসে সেই পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। দেশে প্রকাশ্যে সভাসমাবেশের অধিকার নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর সবশেষ উদাহরণ হচ্ছে, প্রধান বিরোধী দল বিএনপিকে সমাবেশ অনুষ্ঠানে অনুমতি না দেয়া। বিএনপির পক্ষ থেকে বুধবারে সমাবেশের অনুমতি চেয়ে মহানগর পুলিশের কাছে আবেদন করা হয়। কিন্তু অনুমতি দেয়া হয়নি। পুলিশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সভাসমাবেশের উপরে উচ্চমহলের নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। এ বিষয়টি সংসদে উত্থাপন করেন বিএনপি দলীয় একজন সংসদ সদস্য। এরই পরিপ্রেক্ষিতে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহিউদ্দিন খান আলমগীর সংবাদ মাধ্যমকে বলেছেন, সভাসমাবেশে করা যাবে, তবে প্রকাশ্যে নয়।

বিএনপি একমাস আগেও সমাবেশ করার অনুমতি চেয়েছিল। কিন্তু তখনো অনুমতি দেয়া হয়নি। শুধুমাত্র বিএনপিই নয়, কাউকেই সভাসমাবেশের অনুমতি দেয়া হচ্ছে না বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে। এমনকি অরাজনৈতিক সংগঠনও কোথাও সমাবেশ তো দূরের কথা, সামান্য মানববন্ধন পর্যন্ত করতে পারছে না। সরকার যুক্তি হিসেবে কখনও জঙ্গীবাদ আবার কখনও সহিংসতার কথা বলে থাকে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ব্যাপারে খোদ আওয়ামী লীগের নেতা মোহাম্মদ নাসিমসহ অনেকেই প্রথমদিকে এর সমালোচনা করেছিলেন। যদিও এখন তারা যথারীতি চুপচাপ হয়ে গেছেন। অবশ্য হবারই কথা।

সরকার প্রধানসহ সরকার এবং ক্ষমতাসীন দলের পক্ষ থেকে কথায় কথায় সংবিধানের কথা বলা হয়। সংবিধানের মৌলিক অধিকার অংশে ৩৭ অনুচ্ছেদে সমাবেশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করে বলা হয়েছে, ‘জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে শান্তিপূর্ণভাবে ও নিরস্ত্র অবস্থায় সমবেত হইবার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদান করিবার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকের থাকিবে।’

একইভাবে সংবিধানে মৌলিক অধিকার হিসেবে বাক, ব্যক্তিস্বাধীনতা, সংগঠনের স্বাধীনতা, চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে।

কি এমন পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে যে, সভাসমাবেশ করার অধিকার হরণ করা হলো? নিষিদ্ধ হলো? যে যুক্তি দেখান হচ্ছে তা রাজনৈতিক অধিকাহরণের বাইরে কিছুই নয়। সরকার ‘জনশৃঙ্খলা বা জনস্বাস্থ্যের’ দোহাই দিয়ে পুরো রাজনীতিকেই নিষিদ্ধ করে দিয়েছে। অথচ সরকার দলীয় নেতাকর্মী হলে অস্ত্র হাতে প্রকাশ্যে বিরোধী পক্ষের সভাসমাবেশের উপরে হামলা করা জায়েজ। সংবাদ মাধ্যমে প্রচারিত এবং সংবাদপত্রে কি এমন চিত্র দেশবাসী একাধিকবার দেখেনি? ওই সব অস্ত্রধারীদের একজনকেও কি আটক করা হয়েছে? স্পষ্ট জবাব না। কারণ সংবিধান, আইন এখন তাদের জন্য প্রযোজ্য নয়।

সংবিধানের ১৪১ () অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, দেশে জরুরি অবস্থার সময়ে সংবিধানের ৩৬, ৩৭, ৩৮, ৩৯, ৪০ এবং ৪২ অনুচ্ছেদের বিধান স্থগিত হয়ে যায়। ৩৬ অনুচ্ছেদে চলাফেরার স্বাধীনতা, ৩৭ অনুচ্ছেদে সমাবেশের স্বাধীনতা, ৩৮ অনুচ্ছেদে সংগঠনের স্বাধীনতা, ৩৯ অনুচ্ছেদে চিন্তা ও বিবেকের স্বাধীনতা এবং বাকস্বাধীনতা, ৪০ অনুচ্ছেদে পেশা বা বৃত্তির স্বাধীনতা এবং ৪২ অনুচ্ছেদে সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে।

দেশে কি তাহলে জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছে? দেশে কি একদলীয় শাসন কায়েম হয়েছে? তা না হলে জনগণের অধিকার কেন নিষিদ্ধ বা বাতিল ঘোষণা করা হচ্ছে?

সরকার বিরোধী দল, মত সহ্য করতে রাজি নয়। এ কারণে একদিকে সভাসমাবেশ, বাকব্যক্তি, সংগঠনের স্বাধীনতানসহ সব কিছুকেই অস্বীকার করছে। অন্যদিকে, টেলিভিশনের টক শো’তে যারা মুক্ত মত প্রকাশ করেন, তাদের যাচ্ছেতাই ভাষায় গালাগাল করেন স্বয়ং সরকার প্রধান। প্রধানমন্ত্রীর এ ধরণের বক্তব্যও এক ধরণের নিষেধাজ্ঞা।

বিরোধী দল, মতকে সহ্য করতে না পারা চরম স্বৈরতন্ত্রের অপর নাম। এতে সংঘাত, সহিংসতা কমবে না বরং বাড়বে। আর এর মাধ্যমে চরম সর্বনাশ হবে দেশেরই, সঙ্গে সঙ্গে এখন যারা ক্ষমতাসীন তাদেরও। কিন্তু সর্বনাশা পথে থেকে শাসকদের পক্ষে ভালোমন্দ বিচার করার বোধবুদ্ধিটুকুও লোভ পায়। বর্তমানই হচ্ছে তার প্রমাণ। কিন্তু ইতিহাস যদি মিথ্যা না হয়, তাহলে এ কথাও সত্য যে, অধিকারহরণের মাধ্যমে কেউই কোনোদিন ক্ষমতায় চিরস্থায়ী হতে পারেনি, পারে না। এটাই নির্মম সত্যি।।