Home » আন্তর্জাতিক » চীন-ভারত উত্তেজনা বাড়ছে

চীন-ভারত উত্তেজনা বাড়ছে

মোহাম্মদ হাসান শরীফ

china-india border tensionচীন ও ভারতের মধ্যকার সীমান্ত উত্তেজনা বাড়ছে। চীনা প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর সত্ত্বেও জম্মু ও কাশ্মীরের লাদাখ এলাকার প্রকৃত নিয়ন্ত্রণরেখা (লাইন অব অ্যাকচুয়াল কন্ট্রোলএলএসি) বরাবর দেশ দুটির মধ্যে যে অস্থিরতার সৃষ্টি হয়েছিল, তা প্রশমিত হয়নি।

ভারত অভিযোগ করেছে, চীনের গণমুক্তি বাহিনীর (পিএলএ) একটি প্লাটুন ১৫ এপ্রিল এলএসি অতিক্রম করে ভারতীয় ভূখণ্ডের ১০ কিলোমিটার ভেতরে ঢুকে রাখি নালায় (উত্তরাঞ্চলীয় লাদাখে দৌলত বেগ ওলদির ৩০ কিলোমিটার দক্ষিণে) তাঁবু গেড়েছে। এর জবাবে ভারতীয় সেনাবাহিনী ওই এলাকায় কিছু সৈন্য মোতায়েন করেছে, চীনা সেনা তাঁবু থেকে প্রায় ১৫০ মিটার দূরে শিবির স্থাপন করে।

এলএসি লঙ্ঘন করার ভারতীয় অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে চীন দাবি করেছে, পিএলএ চীনা ভূখণ্ডের অভ্যন্তরেই শিবির স্থাপন করেছে। চীনা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনইয়িং বলেছেন, ‘আমাদের সেনারা এলএসি’র চীনা এলাকায় টহল দিচ্ছে, তারা কখনোই এলএসি অতিক্রম করেনি।’

উল্টা চীন অভিযোগ করেছে, ভারতীয় সেনাবাহিনী সীমান্তজুড়ে ‘আগ্রাসী টহল’ দিচ্ছে। তারা এ ধরণের টহল বন্ধ করার জন্য ভারতের প্রতি দাবি জানায়। লাদাখে পরিবহন অবকাঠামো বিশেষ করে রাস্তা ও সেতু নির্মাণের জন্য ভারতের সমালোচনাও করে দেশটি।

এলএসি নিজেই এখনো বিতর্কিত সীমানা হিসেবে বিরাজ করছে। কয়েকটি স্থানে একে স্পষ্টভাবে চিহ্নিতও করা হয়নি।

২০ দিনের ওই অস্থিরতার সময় ভারতীয় টেলিভিশনসহ সংবাদমাধ্যমে ‘চীনা আগ্রাসনের’ কথা ব্যাপকভাবে প্রচার ও প্রকাশ করা হয়। অথচ চীনা মিডিয়া আশ্চর্য নীরবতা পালন করছিল। চীনা রাষ্ট্রীয় মিডিয়া তাদের সেনাদের আন্তর্জাতিক সীমানা অতিক্রম না করার সরকারি ভাষ্য প্রচার করেই ক্ষান্ত থেকেছে।

আর আনুষ্ঠানিক প্রতিবাদ জানাতে ভারতীয় পররাষ্ট্রসচিব রঞ্জন মাথাই চীনা রাষ্ট্রদূতকে পর্যন্ততলব করেন। ভারত যে বিষয়টিকে অন্ত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে, তা বোঝাতে ভারতীয় সেনাপ্রধান জেনারেল বিক্রম সিং কাশ্মীরে গিয়ে স্থানীয় কমান্ডারদের সঙ্গে বৈঠক করেন, ব্যক্তিগতভাবে পরিস্থিতি মূল্যায়ন করেন। মিডিয়ার খবরে বলা হয়, ভারতীয় সেনাবাহিনী সম্ভব সব বিকল্পের একটি তালিকা সরকারের কাছে উপস্থাপন করেছে। এমনকি ‘বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় সামরিক বাহিনীর আগ্রাসী ব্যবহারের’ সুপারিশও ছিল। ভারতীয় প্রতিরক্ষামন্ত্রী এ কে অ্যান্টনি এমনও বলেছেন, ভারত তার স্বার্থ রক্ষায় প্রতিটি পদক্ষেপ নেবে। গত জানুয়ারিতে পাকিস্তানের সঙ্গেও সীমান্তে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছিল। তখনো ভারত একই ধরণের পদক্ষেপ গ্রহণ করেছিল।

এই উত্তেজনা যখন চলছে সীমান্তে তখন তারই প্রক্ষাপটে চীনা প্রধানমন্ত্রী লি কেকিয়াং মে মাসে ভারত সফর করেন। এটাই ছিল তার প্রথম বিদেশ সফর। চীনা প্রধানমন্ত্রীর এই সফরকে কূটনৈতিক এবং আন্তর্জাতিক নতুন প্রেক্ষাপটে গুরুত্বের সঙ্গেই বিবেচনা করতে হবে। কারণ চীন ইতোমধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত মহাসাগর, দক্ষিণপূর্ব এশিয়ার রাজনীতিতে ভারতের নয়া অংশীদারিত্বের প্রেক্ষাপটে এই সফরকে বিশ্লেষকরা ইঙ্গিতবাহী বলে মনে করছেন। অনেকে মনে করেছিল, এই সফরে বেইজিং নমনীয় হবে, দিল্লির উদ্বেগ দূর করার আশ্বাস দেবে। কিন্তু চীন ওই পথে হাঁটেনি, ভারত কোনো আশ্বাস বা ব্যাখ্যা পায়নি। তবে দুই পক্ষ সীমান্ত সমস্যা নিয়ে আলোচনা অব্যাহত রাখার ব্যাপারে একমত হয়েছে।

চীনা প্রধানমন্ত্রীর ভারতকে দেয়া ‘হিমালয়জুড়ে করমর্দন’ প্রস্তাবটি ছিল আসলে বিশ্বের সবচেয়ে জনবহুল দুটি দেশের বৈশ্বিক অর্থনীতির নতুন চালিকাশক্তিতে পরিণত হওয়ার প্রস্তাব। কিন্তু চীনভারত সম্পর্কে দীর্ঘ দিন ধরে জটিলতা সৃষ্টিকারী প্রধান ইস্যুগুলো নিরসনে ইঙ্গিত দেয়া হয়নি। ওইসব সমস্যা সমাধানের দিকে না গিয়ে লি’র সফরে ভারত থেকে গরুর গোশত ও মাছ সামগ্রী এবং স্বাস্থ্য পণ্য রফতানির মতো গুরুত্বহীন বিষয় প্রাধান্য পায়। সীমান্ত সমস্যা সাইনোইন্ডিয়ান দ্বিপীয় সম্পর্ক হুমকিগ্রস্ত করলেও ভারতীয় ও চীনা প্রধানমন্ত্রী কেবল তাদের বিশেষ প্রতিনিধিদের সমাধানের পথ বের করার দায়িত্ব দিয়েছেন।

অন্যদিকে সাম্প্রতিক সময়ে চীনের বিরুদ্ধে ভারত তার সামরিক অবস্থান জোরদার করতে আগের চেয়ে জোরালো পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। এলএসি’র কাছে পরিবহন ও সামরিক অবকাঠামো নির্মাণ করছে। গত বছর ভারতীয় নৌবাহিনী প্রধান অ্যাডমিরাল ডি কে যোশি দক্ষিণ চীন সাগরে ‘নৌ চলাচলের স্বাধীনতা’ নিয়ে ভারতীয় উদ্বেগের কথা প্রকাশ করেন। মনে রাখতে হবে, এই সাগরের বেশির ভাগ অংশের মালিকানা দাবি করে চীন। তিনি আরো বলেন, সেখানে ভারতীয় নৌবাহিনী মোতায়েন করা উচিত : ‘আমরা কি সে ধরণের কাজ করব? সংক্ষিপ্ত জবাব হচ্ছে হ্যাঁ।’

অবশ্য, ভারত সরকার দাবি করেছে, তারা সীমান্ত বিতর্ক নিরসনে ‘শান্তিপূর্ণ’ পন্থা অবলম্বন করছে।

চীনা সরকার প্রকাশ্যে অবশ্য বিষয়টি নিয়ে মাতামাতি করেনি। নিয়মিত প্রেস ব্রিফিংয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র হুয়া চুনিং বলেছেন, ‘সীমান্ত এখনো চিহ্নিত না হওয়া পর্যন্ত সীমান্ত এলাকায় সমস্যাবলীর সৃষ্টি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়।’

তিনি আরো বলেন, ‘সীমান্ত এলাকায় সমস্যার সৃষ্টি হলে দুই পক্ষের উচিত বিদ্যমান পদ্ধতি ও চ্যানেলগুলো ব্যবহার করে বন্ধুসুলভ আলাপ আলোচনার মাধ্যমে তার নিরসন করা। আমরা বিশ্বাস করি, এই ঘটনাটিরও যথাযথ সুরাহা করা যাবে এবং তা সীমান্ত এলাকার এবং সেইসঙ্গে ভারতচীন সম্পর্কের শান্তি ও স্থিতিশীলতায় কোনো প্রভাব ফেলবে না।’

ভারত ও চীনের মধ্যকার এই সামরিক অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা প্রশাসনের ‘এশিয়ায় ভরকেন্দ্র’, এবং ‘এশিয়ায় ভারসাম্যের পুনঃবিন্যাস’এর প্রেক্ষাপটে বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে ওয়াশিংটনের যুদ্ধ প্রস্তুতির মধ্যে। এশিয়ায় যুক্তরাষ্ট্রের প্রধান হুমকি বিবেচিত চীনের বিরুদ্ধে ভারতকে ব্যবহারের জন্য ওয়াশিংটন ইতোমধ্যে দিল্লির সঙ্গে কৌশলগত অংশীদারি গঠন করেছে।

চীনের সঙ্গে ভূখণ্ডগত বিরোধে আগ্রাসী অবস্থান গ্রহণের জন্য যুক্তরাষ্ট্র এখন জাপান, ভিয়েতনাম ও ফিলিপাইনকে উৎসাহিত করছে। যুক্তরাষ্ট্র তার মিত্র দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের মিত্র উত্তর কোরিয়ার মধ্যে উত্তেজনায় ইন্ধন দিচ্ছে। ওবামা প্রশাসন অস্ট্রেলিয়ার সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সম্পর্ক বাড়িয়েছে, চীনকে মোকাবিলার জন্য আমেরিকা, অস্ট্রেলিয়া ও জাপানের সঙ্গে ভারতকে নিয়ে চার দেশীয় জোট গঠনে উদ্যোগ নিয়েছে।

ভারতের কংগ্রেস নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স (ইউপিএ) জানুয়ারিতে পাকিস্তানের সঙ্গে তার সীমান্ত সংঘর্ষ এবং চীনের সঙ্গে বিরোধকে তার দেশের অভ্যন্তরীণ উত্তেজনা থেকে দৃষ্টি ফেরানোর কাজে ব্যবহার করার সুযোগ হিসেবে দেখছে। বিশ্বের মোট গরিবের এক তৃতীয়ংশ বাস করে ভারতে। সেখানে আগামী বছর নির্বাচনও অনুষ্ঠিত হবে। ফলে দৃষ্টি অন্য দিকে সরিয়ে নেয়ার মওকা হাতছাড়া করতে তারা নারাজ।

ইউপিএর সরকার গত সেপ্টেম্বরে যে নতুন, সামজিকভাবে পশ্চাৎপদ ‘বিগ ব্যাং’ অর্থনৈতিক সংস্কার প্রবর্তন করেছিল, তা শ্রমিক এবং গ্রাম এলাকার শ্রমজীবী মানুষের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়। সেপ্টেম্বর ও ফেব্রুয়ারিতে দেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট পালিত হয়।

চীনভারত সীমান্ত বিতর্ক কয়েক দশকের ইস্যু। এই সীমান্তে ১৯৬২ সালে দুই দেশ লড়াই করেছিল। চীন দাবি করেছে, ভারতীয় রাজ্য অরুনাচল প্রদেশের প্রায় ৯০ হাজার বর্গ কিলোমিটার ভূমি তার। আর ভারত অভিযোগ করেছে, চীন আকসাই চিন মালভূমিতে তাদের ৩৮ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা দখল করে আছে। সীমান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে ২০০৫ সাল থেকে দেশ দুটি ১৫ রাউন্ড বৈঠক করেছে। কিন্তু কোনো ফল আসেনি। এতে তাদের মধ্যকার বিরোধের গভীরতা আন্দাজ করা যায়।

ভারত ও চীনের মধ্যকার বিরোধের আরেকটি প্রধান উৎস হলো চীনের তার দীর্ঘ দিনের মিত্র পাকিস্তানকে অস্ত্র সরবরাহ করা।

কয়েক যুগের বিরোধ সত্ত্বেও ভারত ও চীন গত দশকে ঘনিষ্ঠ বাণিজ্যিক সম্পর্ক গড়ে তুলেছে। ২০০২ সালে দুই দেশের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য যেখানে ছিল পাঁচ বিলিয়ন ডলার, ২০১১ সালে তা দাঁড়ায় ৭৫ বিলিয়ন ডলারে। অবশ্য ভারতীয় কর্মকর্তারা মনে করছে, ভারতের বিরুদ্ধে চীন ব্যাপক বাণিজ্য উদ্বৃত্ত ভোগ করছে।

চীন ও ভারত তাদের বর্তমান বিরোধী নিষ্পত্তির জন্য যে চেষ্টাই গ্রহণ করুক না কেন, বর্তমান পরিস্থিতি যুক্তরাষ্ট্রের ‘এশিয়ায় ভরকেন্দ্র’ এবং ‘কৌশলগত ভারসাম্যের পুনর্বিন্যাস’ কর্মসূচির মধ্যে আঞ্চলিক ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের উত্তেজক প্রকৃতি ফুটিয়ে তুলেছে।।

(wsws.org সহ অন্যান্য ওয়েবসাইট থেকে তথ্য নেয়া হয়েছে)