Home » অর্থনীতি » তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

তেল-গ্যাস লুট দেশে দেশে

একদা তেল গণ্য হতো ওষুধ হিসেবে

ফারুক চৌধুরী

oil-22অন্য সব ইতিহাসের মতো তেলের ইতিহাসেরও পাতায় পাতায় ছড়িয়ে আছে মজার মজার ঘটনা।

যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ার পশ্চিম অঞ্চলে তেল চুঁইয়ে আসতো অনেক জায়গাতে। সেখানকার আদিবাসী সেনেকা ইন্ডিয়ানরা এ খবর জানতো। তারা এ তেল ব্যবহার করত। তাদের কাছে এর এর ব্যবহার ছিল ওষুধ হিসেবে, মশা তাড়ানোর সামগ্রী হিসেবে। এমনকি টনিক বা বলবর্ধক হিসেবেও এর ব্যবহার ছিল। সে অঞ্চলে বসতি স্থাপন করলো যারা, তারাও মনে করত এ তেল ওষুধ সমতুল্য। নানা রোগের দাওয়াই হিসেবে বোতলে ভরে ফেরিওয়ালারা বিক্রি করত এ তেল। এর নাম ছিল সেনেকা অয়েল বা সেনেকা তেল। এমন বিক্রির ঘটনা ১৭৯২ সালেও ঘটেছে বলে জানা যায়।

এ জায়গারই কাছে দুটি নদী উপত্যকাতেও তেল পাওয়া যেত। তবে, তা ছিল মাটির নিচে। সে তেল এসে দূষিত করত লবণ জলের কূপ। সে সময় পিটসবার্গ এলাকার লবণ শিল্পের রমরমা অবস্থা। সে শিল্পে যোগান দেয়া হতো এ লবণ জল। তাই লবণ জলের কূপ তেলে দূষিত হলে ব্যবসার ক্ষতি হতো।

পিটসবার্গের এক ওষুধ দোকানদার, নাম তার স্যামুয়েল ফিয়ার। তিনি ১৮৫০এর দশকের প্রথম দিকে বোতলে ভরে তেল বিক্রি করতেন। এ তেলের নাম দেয়া হয়েছিল পেনসিলভেনিয়া রক অয়েল। বলবর্ধক হিসেবে বিক্রি করা এ তেল স্যামুয়েল পেতেন তার বাবার লবণ জলের কূপ থেকে।

কর্নেল এসি ফেরিস নামে এক ব্যক্তি তিমির তেল বেচাকেনা করতেন। ফেরিস একদিন স্যামুয়েলের বলবর্ধক এ তেল প্রক্রিয়া করে হালকা এক ধরণের তেল বানালেন যা স্যামুয়েলও সে কাজে হাত লাগালেন। তার রক অয়েলকে তিনি বানালেন বাতির তেল।

এ খবর কানে গেল নিউইয়র্কের আইনজীবী জর্জ বিসেলের। তিনি ইয়েল বিশ্ববিদ্যালয়ের বেঞ্জামিন সিলিম্যানকে নিয়োগ করলেন সেনেকা অয়েলকে বাতি জ্বালানোর মতো ভালো মানের তেলে রূপ দেয়ার কাজে। বেঞ্জামিন সফল হলেন।

পাওয়া গেল বাতি জ্বালানোর কেরোসিন তেল। এ সাফল্যে ভর করে বিসেল গঠন করলেন পেনসিলভেনিয়া রক অয়েল কোম্পানি। পরবর্তী কালে এর নাম হয় সেনেকা অয়েল কোম্পানি। এই সেনেকা তেল কোম্পানিরই কাজে নিয়োজিত হয়েছিলেন কর্নেল ড্রেক।

ওই এলাকার তেল সংগ্রহের পদ্ধতিও ছিল বেশ বুদ্ধিসম্মত। তেল মাটি থেকে চুইয়ে বেরিয়ে একটি ক্ষীণ ধারা হয়ে বয়ে যেত। সে ধারায় দেয়া হতো বাঁধ। জলাশয়ের মতো সেখানে পানি জমতো। তখন পানির ওপরে ভেসে থাকা তেল সংগ্রহ করা হতো।

ড্রেক এমন এক জায়গায় তেল সংগ্রহের চেষ্টা করেন যেখানে ড্রেক যাওয়ার আগে সেখানে ছিল করাতকল। এ কলের যন্ত্রপাতিতে তেল দিয়ে যন্ত্রপাতির ঘোরাফেরা বা চালানো স্বচ্ছন্দ করতে সেখানকার তেল ব্যবহার করা হতো। ড্রেক সেখানে তেলের উৎপাদন বাড়াতে পারলেন সামান্যই। সেখানে আগে দিনে উৎপাদন হতো তিন চার গ্যালন। ড্রেক এ পরিমাণকে বৃদ্ধি করতে পারলেন ছয় থেকে দশ গ্যালনে। কিন্তু এ পরিমাণ তেল আর্থিকভাবে লাভজনক ছিল না।

তাই মজুরদের নিয়োগ করা হলো মাটিতে খাড়াভাবে গর্ত খোঁড়ার কাজে। কিন্তু পানিতে সে গর্ত ভরে গেল। অবশেষে ড্রেক সিদ্ধান্ত নিলেন তেল যেখান থেকে চুইয়ে আসে, সে বরাবর কূপ খনন করা হবে। এ কাজে বাস্পচালিত যন্ত্র ব্যবহৃত হলো। লবণ জলের কূপ খননের কাজে এ যন্ত্র আগেও ব্যবহৃত হয়েছে।

কূপ খননের কাজে ড্রেক নিয়োগ করেছেন এক কামারকে। নাম তার বিলি স্মিথ। বিলির অভিজ্ঞতা ছিল লবণ জলের কূপ খননের। হেনেকে সঙ্গে নিয়ে বিলি শুরু করলেন কূপ খনন। তখন ১৮৫৯ সালের গ্রীষ্ম মওসুম। কাজের অগ্রগতি খুব ধীর, দিনে তিন ফুটের বেশি নয়। তাদের কূপের গভীরতা পৌঁছলো সাড়ে ৬৯ ফুটে। তারিখটি ২৭ আগস্ট। ড্রেকেরও পকেট তখন খালি হয়ে এসেছে। ড্রেক দুর্ভাবনায় রয়েছেন। পরদিন কূপ খননকারী দুই মজুর যখন গর্ত থেকে যন্ত্রাপাতি তুলে নিলেন, তারা দেখলেন তেল উঠছে ওপর দিকে, নিঃশব্দে। সেই দুই মজুর পা চালিয়ে কাছে এক রান্নাঘর থেকে ধার করে নিয়ে এলেন হাতে চালানো লিভার পাম্প। সেটি বসানো হলো। প্রথমদিনে পাওয়া গেল ২৫ পিপে তেল। পরে তা কমে দাঁড়ায় দিনে ১০ পিপে।

অল্পকালের মধ্যে জায়গাটি হয়ে উঠলো তেলের অর্থে জমজমাট শহর। জায়গাটি এতোদিন ছিল শান্ত, স্থির কৃষি শহর। সেখানে তৈরি হলো রাস্তা। সে রাস্তা মাটির। পানিতে তা কাদায় থিকথিক করে। যন্ত্রপাতি ঘুরতে লাগলো। সে সবের শব্দ ভেঙে খান খান করল এতদিনের নৈশব্দ। শুরু হলো জমজমাট পেনসিলভেনিয়া তেল পর্ব।

এসব ঘটনা যখন ঘটছে পেনসিলভেনিয়ায় তখন ঘটে চলেছে আরো কিছু। কয়লা দিয়ে চালনো বাস্পকল তৈরি হলো ১৮০১ সালে, কয়লার তেল দিয়ে আলো জ্বালানো হলো লন্ডনের পথে পথে, ১৮০৭ সালে। যুক্তরাষ্ট্রে ১৮১৬ সালে শুরু হলো গ্যাস তৈরি। শোনা গেল নাম গ্যাসলাইট কোম্পানি অব বাল্টিমোর। প্রাকৃতিক গ্যাস বাণিজ্যিকভাবে প্রথমবারের মতো উৎপাদন ও ব্যবহার শুরু হলো, নিউইয়র্কের ফ্রেডোনিয়াতে। সেটি ১৮২৫ সাল। যে গ্যাস কূপের গভীরতা ছিল ২৭ ফুট। গাছের কাণ্ড কুঁদে ভেতরটা ফাঁপা করে তার ভেতর দিয়ে সে গ্যাস পাঠানো হলো আশপাশের বাড়িগুলোতে। কানাডার ভূতত্ত্ববিদ ড. আব্রাহাম গেসনার তেল থেকে একটি প্রক্রিয়ায় কেরোসিন তেল বের করেন ১৮৪৯ সালে। কেরোসিন ঠেলে সরিয়ে দেয় তিমির তেলকে, বাড়ির আলো আরো উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। অশোধিত তেলের বাজার তৈরি হয়। বাজারে আসে কেরোসিন বাতি, হটে যায় তিমি তেলের বাতি। সময় তখন ১৮৫৭ সাল। আমাদের এ উপমহাদেশে তখন ইংরেজ কোম্পানির শাসনের বিরুদ্ধে জ্বলে উঠেছে মহাবিদ্রোহের আগুন।

এর চার বছর পরে ১৮৬১ সালে পেনসিলভেনিয়া থেকে তেল পাঠানো হলো ইংল্যান্ডে। পরের বছর ফ্রান্সে ফোর স্ট্রোক বা চার ঘাত ইঞ্জিনের প্যাটেন্ট হলো।

এর পরের বছর ১৮৬৩ সালে জেডি রকফেলার গঠন করলেন তেল শোধন কোম্পানি। তিনি ১৮৭০ সালে গঠন করলেন স্ট্যান্ডার্ড অয়েল। সে কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে থাকলো সে দেশের তেল শোধনের ১০ শতাংশ। দুই বছরের মাথায় ১৮৭২ সালে রকফেলার ২২ জন প্রতিযোগীর ব্যবসা কিনে নিলেন। বাজারের ২৫ শতাংশ এলো তার কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে। পাঁচ বছরের মধ্যে তেল শোধন বাজারের ৯০ শতাংশ আসেরকফেলারের মুঠোর মধ্যে।

এসব ঘটনার পাশাপাশি পৃথিবীর নানা জায়গায় ঘটে চলেছে নানা ঘটনা। আমেরিকা মহাদেশের রূপা আর আলু, তামাক, ভুট্টা, বাদাম, চকলেট, রাবার ইউরোপে ফেলেছে বিপুল অর্থনৈতিক প্রভাব। ইউরোপ থেকে যাওয়া নানা রোগ মেরে ফেলেছে আমেরিকা মহাদেশের জনসংখ্যার বিপুল অংশ। নেদারল্যান্ডে উত্তরের অপেক্ষাকৃত নগরায়িত প্রদেশগুলো বিদ্রোহ করেছে হপাসবার্গ শাসিত স্পেনের বিরুদ্ধে। তারা গড়ে তুলেছে কতিপয় শাসিত এক বাণিজ্যতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র। বাল্টিক অঞ্চলের শস্য বাজারে তারা নিয়ন্ত্রণ কায়েম করেছে। এর মাধ্যমে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চলে খাদ্য দ্রব্যের স্বল্পতাকে তারা নিজেদের সুবিধা মতো ব্যবহার করতে পারছে।

ইংল্যান্ডের কৃষিতে হয়েছে কয়েকটি উন্নতি। সে সবের মধ্যে রয়েছে বীজ বপনের একটি যন্ত্র ও পশু প্রজনন। বড় বড় খামারে এসব পন্থা অনুসৃত হচ্ছে। কৃষি এবং বিদেশ বাণিজ্য ও উপনিবেশ থেকে আসা মুনাফা শত শত ব্যাংক ও শেয়ারবাজারের মাধ্যমে শিল্পের নতুন নতুন প্রক্রিয়ায় ঢালা হচ্ছে। নিউকমেন বাষ্প যন্ত্র খনি থেকে কয়লা তুলতে সাহায্য করলো। সে কয়লা আবার জ্বালানি যোগালো বাষ্প কলকে। যন্ত্রের জন্য সস্তায় মজবুত লোহা বানানোর প্রক্রিয়াও শুরু হলো। বড় বড় কাপড় কলে ব্যবহার শুরু হলো ফ্লায়িং শাটল ও স্পিনিং জেনির। ফ্রান্সে হয়েছে বিপ্লব। সে আদর্শে উজ্জীবিত হয়ে ফ্রান্সের আশপাশে গড়ে উঠেছে কয়েকটি প্রজাতন্ত্র, যুক্তরাষ্ট্রে বিপুল সংখ্যক অভিবাসী আর বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ শক্তি যোগালো অর্থনীতির দ্রুত বিস্তারে।

ইংল্যান্ডে শিল্প বিপ্লবের কারিগরি নানা প্রক্রিয়া আর ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে নানা উদ্ভাবন ছড়িয়ে পড়লো ইউরোপে ও যুক্তরাষ্ট্রে। শিল্প উৎপাদন বেড়ে গেল অনেক। ফলে বেড়ে গেল কাঁচা মালের চাহিদা, সেই সঙ্গে বাজারের জন্য প্রতিযোগিতা। পরিবহন ও যোগাযোগ ক্ষেত্রে অভাবনীয় উন্নতি দেখা গেল। রেলপথ, বাষ্প কলচালিত জাহাজ, টেলিগ্রাফ ইত্যাদি এলো। এ সবের দরকার হয়ে পড়েছিল ব্যবসাবাণিজ্যের, অর্থাৎ অর্থনীতির স্বার্থে। এসব আবিষ্কার উদ্ভাবন আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রাজনীতির গতি দেয় বাড়িয়ে।

এভাবে দেখা যাবে, একটি অন্যটিকে যেন টানছে, একটির গতি বাড়লে আরেকটির গতি বৃদ্ধির দরকার হয়ে পড়ছে, প্রয়োজন হয়ে পড়ছে নতুন প্রক্রিয়ার যন্ত্রের, ফলে ঘটছে আবিষ্কার, উদ্ভাবন। এমনই করে তেল এসে মেশে ঘটনা ধারায়। তা আগামীতে আরো উল্লেখিত হবে।।

(চলবে…)