Home » রাজনীতি » নির্বাচনে প্রস্তুত আ’লীগ – কোনোই প্রস্তুতি নেই বিএনপির

নির্বাচনে প্রস্তুত আ’লীগ – কোনোই প্রস্তুতি নেই বিএনপির

জাকির হোসেন

election-3সরকার পরিচলনায় নানামাত্রিক ব্যর্থতার মাঝেই অত্যন্ত কৌশলে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রায় সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। অন্যদিকে এ ব্যাপারে কোনো প্রকার প্রস্তুতি এবং তৎপরতা নেই প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র। বিগত ২০০৮ সালের ২৯ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি’র পক্ষ থেকে যারা নির্বাচনে অংশ নিয়ে ছিলেন তাদেরকেই নিজ নিজ নির্বাচনী এলাকায় আন্দোলনের পাশাপাশি নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া নির্বাচন নিয়ে বিএনপি’র আর কোনো তৎপরতা নেই।

এদিকে নির্দলীয় সরকার ছাড়া আগামী জাতীয় নির্বাচন অংশ নেবে না বলে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি ঘোষণা দিয়েছে এ দিয়ে এখন খুব একটা ভাবছে না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। এ বিষয়টি নিয়ে তারা এরই মধ্যে মহাজোটের অন্যান্য শরিক জাতীয় পার্টি এবং ১৪ দলের শরিক জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ), বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি ও অন্যান্য দলের সঙ্গে কয়েক দফা আলোচনা করেছে। বিএনপি নির্বাচনে অংশ নিলে অথবা না নিলে জোটের সমীকরণ কী হবে সেই বিষয়টিও এরই মধ্যে চূড়ান্ত করা হয়েছে। বিএনপি যদি নির্বাচনে অংশ না নেয় তাহলে জোটের শরিকরা জোটবদ্ধভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে কিনাএ ব্যাপারে মহাজোটের কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ নেতার কাছে জানতে চাইলে নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা বলেন, ‘সময় এলে আপনারা সব কিছু জানতে পারবেন। কারণ সময় অনেক প্রশ্নের উত্তর দেয়’। অর্থাৎ পরিবর্তিত অবস্থার প্রেক্ষাপটে জোটের সমীকরণ আগেই তৈরি করে রেখেছে আওয়ামী লীগ এবং মহাজোটের বর্তমান শরিক দলগুলো। যদিও মহাজোটের শরিক নেতাদের কেউ কেউ বেশ কিছু দিন থেকে এককভাবে নির্বাচনের কোরাস গাইছেন। কিন্তু ভেতরের পরিস্থিতি সম্পূর্ন উল্টো। মহাজোটের শরিকরা কে কিভাবে নির্বাচন করবে সেই বিষয়টি নির্ধারিত হবে সময়ের প্রয়োজন।

তবে পরিবর্তিত অবস্থার প্রেক্ষাপটে জোটের সমীকরণ যাই হোক না কেন নির্বাচনের সকল প্রস্তুতি নিয়েছে আওয়ামী লীহ তথা ক্ষমতাসীন মহাজোট। এ প্রস্তুতির অংশ হিসেবে এরই মধ্যে ৪টি গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ এবং মহাজোটের শরিক প্রার্থীদের জনপ্রিয়তা যাচাই করা হয়েছে, তৈরি করা হয়েছে প্রাথমিক তালিকা, জনপ্রশাসন সাজানো হয়েছে ৩ স্তরে, প্রধামমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারী সফরে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে চষে বেড়িয়েছেন। সমাবেশে অংশ নিয়েছেন চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙ্গামাটি, খুলনা, যশোর, সিলেট, মৌলভীবাজার, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, নাটোর, রাজশাহী, রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাটসহ দেশের প্রায় সকল জেলায়। এসব সমাবেশে তিনি আগামী নির্বাচনে আবারো নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে আওয়াম আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় বসানোর আহ্বাণ জানিয়েছেন। অর্থাৎ আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রাথমিক সংযোগের কাজটি সরকারী খরচে আওয়ামী লীগ সভানেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিন এরই মধ্যে সুসম্পন্ন করেছেন বেশ ভালোভাবেই। অন্যদিকে এখন তিনি গণভবনে শুরু করেছেন বিভিন্ন জেলার তৃণমূল নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা। এরই মধ্যে তিনি চাপাইনবাবগঞ্জ, টাঙ্গাইল, পাবনা, হবিগঞ্জসহ বেশ কয়েকটি জেলার তৃণমূল নেতৃবৃন্দের সঙ্গে আলোচনা করেছেন। তৃণমুল নেতৃবৃন্দেকে তিনি স্পস্টতই জানিয়ে দিয়েছেন যে, আগামী নির্বাচনে যাকে মনোনয়ন দেয়া হবে তার পক্ষে সবাই মিলে কাজ করতে হবে। এর কোনো ব্যত্যয় ঘটলে তা সহ্য করা হবে না এবং দলীয় ঐক্য বিনষ্টকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এদিকে গত ১৫ মে প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবনে দলের বর্ধিত সভায় আগামী নির্বাচন, নির্বাচন পদ্ধতি কি হবে, সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড, মন্ত্রীএমপিদের সমন্বয়হীনতা, বিরোধী দলের আন্দোলন সংগ্রাম রাজনৈতিক অবস্থা সহ বর্ধিত সভায় বিস্তারিত আলোচনা হয়। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে অনুষ্ঠিত এ রুদ্ধদ্বার সভায় দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা সবাইকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিতে নির্দেশ দেন। তিনি বলেন, নির্বাচনের আর বেশি সময় বাকি নেই। এখনই সবাইকে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে। তবে দলের বর্ধিত সভায় আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতারা সংসদ সদস্যসহ দল সমর্থিত স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কর্মকাণ্ডের কঠোর সমালোচনা করেছেন। তারা বলেছেন, এমপিরা সংগঠনের খোঁজখবর রাখে না। তারা এসি রুমে বসে বসে ঘুমান। এমপিদের সঙ্গে নেতাদের দূরত্বের কারণে কর্মীরা রাজনীতিবিমুখ হয়ে পড়েছে। ত্যাগী কর্মীদের দলীয় কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা যাচ্ছে না। এভাবে জেলার রাজনীতি চলতে পারে না। আর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা সম্পর্কে বগুড়া, লালমনিরহাট, রাজশাহী ও বান্দরবানসহ বেশ কয়েকজন তৃণম–ল নেতা বলেছেন, এ ব্যবস্থায় আর ফিরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আদালত এ ব্যবস্থা বাতিল করেছে। বিরোধী দলের আন্দোলনের চাপে বা অন্য কোনো কারণে এ ব্যবস্থায় ফিরে গেলে দলের নেতাকর্মীরা নৈতিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়বে। সুতরাং আগামী নির্বাচন হবে অন্তবর্তী সরকারের অধীনে। সেই সরকারের নেতৃত্বে থাকবেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

এ প্রেক্ষিতে এখন অন্তবর্তী সরকারের প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনার বিকল্প অন্য কাউকে ভাবতে চাইছে না ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট।

আওয়ামী লীগ ও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা জানিয়েছেন, সংলাপের কথা বলা হলেও অনির্বাচিত ব্যক্তিদের সমন্বয়ে নির্বাচনকালীন সরকারের বিরুদ্ধে আওয়ামী লীগের অবস্থান ক্রমশই শক্ত হচ্ছে। এমনকি নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে সংসদ বা সংসদের বাইরে আওয়ামী লীগ আনুষ্ঠানিক কোনো আলোচনার প্রস্তাব না দেওয়ার পক্ষে। তবে বিরোধী দল সংসদে এ ব্যাপারে প্রস্তাব আনলে সরকার আলোচনার সুযোগ দেবে।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকেরা জানান, দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি সরকার ও আওয়ামী লীগের নিয়ন্ত্রণে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পক্ষে বিরোধী দল নতুন করে আন্দোলন চাঙা করতে পারবে না বলে তাঁদের ধারণা। হেফাজতে ইসলামকে নিয়ে রাজপথে বিরোধী দলের বড় আন্দোলন শক্ত হাতে মোকাবিলা করায় সরকারের মনোবল বেড়ে গেছে।

সরকার মনে করছে, সরকারকে বিপাকে ফেলে দেওয়ার মতো আন্দোলন করার শক্তি আর বিএনপিজামায়াতের নেই। আন্দোলনে তাদের সর্বোচ্চ শক্তি এবং কৌশল এরই মধ্যে দেখানো হয়ে গেছে। তা ছাড়া সিটি করপোরেশন নির্বাচনে বিএনপি অংশ নেওয়ায় তাদের আন্দোলনের যাওয়ার আপাতত এবং কার্যকর কোনো সম্ভাবনা নেই। এরপর রোজা এবং ঈদের পর ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে আন্দোলন জমানোর সুযোগ থাকবে না।

অন্যদিকে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি’র যেমন সংগঠনিক কোনো তৎরপরতা নেইতেমনি তাদের প্রধান ইস্যূ নির্দলীয় সরকারের অধীনে আগামী নির্বাচন অনুষ্ঠানের দাবিতে আপাতত আন্দোলন থেকে দূরে থাকছে। চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফল দেখে আন্দোলনের পরবর্তী কৌশল নির্ধারণ করবে দলটি।

এ ছাড়া নির্বাচনকালীন সরকারব্যবস্থা নিয়ে আগ বাড়িয়ে কোনো ধরণের প্রস্তাব না দেওয়ারও সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। এ ব্যাপারে সরকারের অবস্থান পরিষ্কার হলেই কেবল বিএনপি তাদের অবস্থান জানাবে। গত ৮ জুন বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়।

স্থায়ী কমিটির বৈঠকে বলা হয়, ১৮ জুন সরকারের এ অঘোষিত নিষেধাজ্ঞা উঠে যাবে। এরপর সমাবেশ ও গণমিছিল কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে। এসব কর্মসূচি করতে দেওয়া হলে ঈদুল ফিতরের আগে নতুন করে কঠোর কর্মস–চি না দেওয়ার ব্যাপারে একমত হন স্থায়ী কমিটির সদস্যরা। এখন থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে কেন্দ্রীয় নেতাদের গণসংযোগ, খালেদা জিয়ার ঢাকার বাইরে সমাবেশ এবং রোজার মাসজুড়ে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। বৈঠকে রোজার মাসকে সাংগঠনিক মাস ঘোষণা করে কর্মকাণ্ড পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়। অর্থাৎ আওয়ামী লীগ যেখানে প্রায় সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে সেখানে বিএনপি আসছে রোজার মাসে সংগঠনিক তৎপরতা শুরু করতে যাচ্ছে।।