Home » অর্থনীতি » সকল চাপ জনগণের জন্য

সকল চাপ জনগণের জন্য

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

budget 2মহাজোট সরকারের শেষ বাজেট দিলেন অর্থমন্ত্রী। শেষ সময়ে ব্যয় বাড়ানোর নানা চাপ ছিলো অর্থমন্ত্রীর ওপর। ফলে বিশাল আকারের বাজেট দিতে হলো তাকে। তবে সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে বিশাল আকারের এই বাজেটের অবশ্য বড় অংশই বাস্তবায়ন করতে হবে নতুন সরকারকে। অর্থমন্ত্রীর বাজেটে অতীতের অনেক গুণগান আছে। থাকতে হবেই। কিন্তু ব্যর্থতার তেমন কিছু জানাননি মুহিত। এই বাজেট দিয়ে ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন আর মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নিয়ন্ত্রণে রাখাই হবে অর্থমন্ত্রীর জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। অর্থমন্ত্রী তাঁর দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতার নাম দিয়েছেন ‘উন্নয়নের চার বছর স্বপ্ন পূরণের পথে বাংলাদেশ’। ১৯৭ পৃষ্ঠার পুরো বাজেটবক্তৃতায় গত চার বছরের উন্নয়নের লম্বা ফিরিস্তি আছে। অর্থমন্ত্রীর আশা, গত চার বছরের খতিয়ানই আগামীর পথ রচনা করবে।

এ জন্য অর্থমন্ত্রীর বড় ভরসা, ‘অনুমান করা হয়েছে, ২০১২ সালে বিশ্বঅর্থনীতি, বিশেষ করে ইউরোপে মন্দার যে পুনরাবির্ভাব ঘটে, ২০১৩ সালে বিশ্বঅর্থনীতি তা থেকে বেরিয়ে আসবে।’ অর্থমন্ত্রীর কাছে সম্ভবত আরেক ভরসার নাম রাজস্ব আদায়ে প্রবৃদ্ধি। পুরো অর্থবছরটি সাধারণ মানুষের কেটেছে উচ্চ মূল্যস্ফীতির মধ্যে। মূল্যস্ফীতি বেশি থাকলে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) খানিকটা সুবিধা হয় রাজস্ব বাড়াতে। কারণ, কর ধার্য হয় মূল্যের ওপর। মূল্যস্ফীতিকে তাত্ত্বিকভাবেই বলা হয় এমন একটি বৈষম্যমূলক কর, যা কেবল দরিদ্র মানুষেরই দিতে হয়।

সংকট আরও তীব্র হয় যখন প্রতিমাসেই মূল্যস্ফীতি ও করের পরিমাণ বাড়তে থাকে। শেষ দুই মাস বাদ দিলে বিদায়ী পুরো অর্থবছরের পরিস্থিতি এখন এ রকমই। মূল্যস্ফীতিই হচ্ছে গরীব মানুষের জীবনযাপনের সবচেয়ে বড় অর্থনৈতিক শত্রু। নতুন যে বাজেট বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী দিলেন, তাতে মূল্যস্ফীতি কমানোর আশাবাদ আছে, নির্ভর করার মতো পদক্ষেপ নেই।আগামী ২০১৩১৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে বাড়ানো হয়েছে গুরুত্বপূর্ণ অনেক পণ্যের শুল্ক। ফলে এসব পণ্যের দাম ব্যাপক বৃদ্ধি পাবে। এর চাপ সরাসরি গিয়ে পড়বে মধ্যবিত্তের ওপর। এছাড়া কৃষি ও বিপিসির ভর্তুকির পরিমাণ কমানো হয়েছে। এতে করে কৃষি উৎপাদন ব্যয় ও জ্বালানি ব্যয় বেড়ে যাওয়ারও সম্ভাবনা রয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটে যে সব পণ্যের দাম বাড়ানো হয়েছে তার মধ্যে রয়েছেগুঁড়ো দুধ, লোহার কাঁচামাল, গ্যাস সিলিন্ডার, বিস্কুট, পটেটো চিপস্, মশলা, মশার কয়েল, সব ধরণের মাছ আমদানি, বিদেশী ফল, এনার্জি ড্রিংক, অলংকার প্রভৃতি। এছাড়া রাজস্ব আয় বাড়াতে প্রত্যক্ষ কর না বাড়ালেও করজালে ৫০ হাজার নতুন করদাতাকে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বাজেট বক্তৃতায় এসব পণ্যের শুল্ক বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গুঁড়া দুধ, বিস্কুট, বিদেশী ফল ও আমদানি করা মাছের দাম মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে চলে যেতে পারে। বাজারে ইতিমধ্যে এর প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এদিকে প্রস্তাবিত বাজেটের কারণে শিশু খাদ্য গুঁড়ো দুধের দাম বেড়ে গেলে শিশু খাদ্য তালিকায় নিয়মিত দুধ রাখতে হিমশিম খেতে হবে মধ্যবিত্তদের। এবার আমদানি করা মাছের ওপর শুল্ক আরোপ করা হলে দেশীয় মাছের দামও বেড়ে যেতে পারে। এছাড়া রডের কাঁচামালের ওপর আমদানি শুল্ক বাড়ানো হলে দেশে রডের দাম বাড়বে হুহু করে। এতে আবাসন খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কৃষিতে ভর্তুকি কমানোর বিষয়ে সেন্টার ফল পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) বলেছে, আগামী বছরে বাজেটে ভর্তুকি বাড়ানোর প্রয়োজন হতে পারে। চলতি বছরে জিডিপির ৩ দশমিক ৬ শতাংশ ছিল ভর্তুকির পরিমাণ। ২০১৪ সালে তা কমিয়ে ২ দশমিক ৪ শতাংশ করা হয়েছে। কৃষি ও বিপিসির ভর্তুকি কমানো হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির মূল্য স্থিতিশীল, ভালো উৎপাদনের কারণে চাহিদা কম থাকায় ভর্তুকির পরিমাণ কমতে পারে। এটি আইএমএফের সীমার মধ্যে রাখা হয়েছে। সিপিডির পক্ষ থেকে বলা হয়, চলতি বছর মূল বাজেটে ১২ শতাংশ কৃষি ভর্তুকি ছিল। আগামী বছরে কমিয়ে ৮ শতাংশে আনা হয়েছে যা মোট ৯ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু শুধু সার বাবদ ৮ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ভর্তুকির প্রয়োজন হবে।

নতুন অর্থবছরে এনবিআরের জন্য রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে এক লাখ ৩৬ হাজার ৯০ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরের জন্য ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা। চলতি অর্থবছরের প্রথম এ লক্ষ্যমাত্রা ধরা আছে ১ লাখ ১২ হাজার ২৫৯ কোটি টাকা। লক্ষ্যমাত্রা কমাতে এরই মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয়কে অনুরোধ করা হয়েছিল সংস্থাটির পক্ষ থেকে। কেননা চলতি অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা আদায়ে হিমশিম খেতে হয়েছে। নতুন করারোপ সম্পর্কে এনবিআরের ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তা বলেন, রাজস্ব আহরণের বড় লক্ষ্যে পৌঁছাতে মধ্যবিত্তের ওপর চাপ সৃষ্টি হবে। এতে কোন সন্দেহ নেই। এজন্য সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের কর্তাদের কয়েক দফায় অনুরোধ করা হয়েছে। কিন্তু কেউই বিষয়টি আমলে নেয়নি।

আগামী অর্থবছর আয়করের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৮ হাজার ২৯৭ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর তা ৩৫ হাজার ৩০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ আয়করের মাধ্যমে জনগণের কাছ থেকে অতিরিক্ত আদায় করা হবে প্রায় ১৩ হাজার কোটি টাকা। এদিকে ভ্যাট হিসাবে আগামী অর্থবছরের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৪৯ হাজার ৯৫৬ কোটি টাকা। ভ্যাটের পরিমাণ না বাড়ালেও আওতা বাড়িয়ে এ খাতে অতিরিক্ত ৯ হাজার ৪৯০ কোটি টাকা। চলতি অর্থবছর এ খাতের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৪০ হাজার ৪৬৬ কোটি টাকা। বিপুল এ ভ্যাট আহরণ করা হবে ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে। অতিরিক্ত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ভ্যাটের আওতা বাড়ানো হয়েছে। যার পরোক্ষ প্রভাব পড়বে মধ্যবিত্তের ওপর। অতিরিক্ত ভ্যাট মূলত ক্ষুদ্র ও ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আহরণ করা হবে। এলাকাভিত্তিক বার্ষিক ২ হাজার ৭০০, ৫ হাজার ৪০০, ৭ হাজার ২০০ ও ৯ হাজার টাকার ভ্যাটের বদলে যথাক্রমে ৩ হাজার, ৬ হাজার, ৯ হাজার ও ১২ হাজার টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।

রেকর্ড পরিমাণ রাজস্ব ঘাটতি নিয়ে চলতি অর্থবছর শেষ করতে যাচ্ছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এরপরও আগামী অর্থবছরের জন্য ২০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা। এক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ কর না বাড়ানো হলেও এর আওতা বাড়ছে। প্রস্তাবিত বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত কর জালে ৫০ লাখ নতুন করদাতা অন্তর্ভুক্ত করার ঘোষণা দিয়েছেন। ফলে করের বোঝা পড়তে যাচ্ছে মধ্যবিত্তের ঘাড়ে।

রেন্টাল ও কুইক রেন্টালে জোগানো ভর্তুকির বোঝাও চাপছে জনগণের কাঁধে। জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়েও শেষ রক্ষা করতে পারেনি সরকার। এখানে বড় অঙ্কের ভর্তুকি দিতে না হলে উন্নয়ন ব্যয় বাড়ানো সহজ হতো এবং জনগণের কাঁধে ভর্তুকির দায়ও চাপত না। নিজস্ব অর্থায়নে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে বড় অঙ্কের বরাদ্দও এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে বরাদ্দ কমানো হয়েছে, কমানো হয়েছে কৃষির ভর্তুকিও। সব খাত থেকে অর্থ কেটে পদ্মা সেতু নির্মাণে বরাদ্দ রাখা কতটা যৌক্তিক হয়েছে, সে প্রশ্ন তুলছে বিশেষজ্ঞরা।।