Home » অর্থনীতি » সরকারি উদ্যোগে দুর্নীতিবাজ হইবার সহজ উপায়

সরকারি উদ্যোগে দুর্নীতিবাজ হইবার সহজ উপায়

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

black money২০১৩১৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে আবাসন খাতে গত বছরের ‘বিপর্যয়’ মোকাবেলায় প্লট ও ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে অপ্রদর্শিত আয় বা কালো টাকা বৈধ করার ‘বিশেষ সুযোগ’ দেয়া হয়েছে। বর্তমান আইন অনুযায়ী, অপ্রদর্শিত আয়ে যে করহার প্রযোজ্য তার সঙ্গে ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে তা বিনিয়োগ বা বৈধ করা যায়। এক্ষেত্রে টাকার কোনো উৎস জানা হবে না বলে অর্থ আইন২০১৩ তে বলা হয়েছে। আয়কর অধ্যাদেশের ১৯ () ধারা সংশোধন করে এই সুযোগ দেয়া হয়েছে। ‘বিশেষ সুযোগ’ হিসেবে এবার এলাকাভেদে ফ্ল্যাট অথবা প্লট কিনতে নির্দিষ্ট হারে কর দিয়ে টাকা সাদা করা যাবে বলে বাজেট প্রস্তাবে জানান অর্থমন্ত্রী। তবে বাজেট বক্তৃতায় পুঁজিবাজারের বিষয়টি উল্লেখ না থাকায় এ নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। বিভিন্ন গণমাধ্যমে বলা হয়, এবার আবাসন ছাড়া অন্য খাতে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ রাখা হয়নি। এই প্রেক্ষাপটে বাজেটোত্তর সংবাদ সম্মেলনে এক প্রশ্নের জবাবে মুহিত বলেন, শুধু আবাসন নয়, যে কোনো খাতে ১০ শতাংশ জরিমানা দিয়ে কালো টাকা সাদা করা যাবে।

বাংলাদেশে কালো টাকার পরিমাণ তিন লাখ কোটি টাকারও বেশি। যা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ৮১ শতাংশ। অথচ ১৯৭৩ সালেও দেশে কালো টাকার হার ছিল সর্বনিম্ন ৬ দশমিক ৮ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ মাত্র ৭ দশমিক ২ শতাংশ। অর্থ মন্ত্রণালয়ের এক সমীক্ষা অনুযায়ী, বর্তমানে কালো টাকা জিডিপির সর্বনিম্ন ৪৬ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ প্রায় ৮১ শতাংশ। সে অনুযায়ী এখন কম করে ধরলেও কালো টাকার পরিমাণ এক লাখ ৭৭ হাজার ৪৭ কোটি টাকা। আর সর্বোচ্চ হার ধরা হলে দেশে কালো টাকার পরিমাণ হবে তিন লাখ ১০ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা। ‘বাংলাদেশের অপ্রকাশ্য অর্থনীতির আকার: একটি অর্থনৈতিক বিশ্লেষণ’ নামের এই সমীক্ষায় বলা হয়েছে, সাম্প্রতিক সময় জমির অতি উচ্চমূল্য এবং শেয়ারবাজারের তেজিভাবের সঙ্গে বিপুল পরিমাণ এই কালো টাকার যোগসূত্র রয়েছে। এছাড়া কালো টাকা বাড়ায় কিছু ব্যক্তির কাছে সম্পদ ঘনীভূত হচ্ছে। এতে সমাজে জীবনযাত্রার মানেও বৈষম্য তৈরি হচ্ছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তথাপি অর্থমন্ত্রী শেয়ারবাজার ও আবাসন খাতে বিনিয়োগ সুবিধা দেয়ার মাধ্যমে কালো টাকা সাদা করার বিধান জারি রেখেছেন, তাও আবার ১০ শতাংশ করারোপের মাধ্যমে। এটি সৎ করদাতাদের সঙ্গে বৈষম্য সৃষ্টি করছে বৈকি।

স্বাধীনতা অর্জনের পর থেকে বাংলাদেশের কালো টাকা নিয়ে অনেকগুলো সমীক্ষা হয়েছে। এর মধ্যে সরকারি এ হিসাবের বর্তমান অঙ্কটিই সবচেয়ে বেশি। এছাড়া কালো টাকা নিয়ে বিশ্বব্যাপী সবচেয়ে স্বীকৃত সমীক্ষাটি করেছেন অস্ট্রিয়ার জোহানস কেপলার ইউনিভার্সিটি অব লিনজের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ফ্রেডারিক স্নাইডার। ২০ বছর ধরে তিনি বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ধারাবাহিকভাবে সমীক্ষাটি করেন। সর্বশেষ ২০১০ সালে প্রকাশিত সমীক্ষা অনুযায়ী, বাংলাদেশে কালো টাকার হার জিডিপির ৩৭ শতাংশ। এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থসচিব ও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা আকবর আলি খান বলেন, টাকা ‘কালো’ বললেই বুঝতে হবে, এটা একটা আইনি সমস্যা। আর কালো টাকা মানেই হলো, বেআইনি টাকা। তাই আইন প্রয়োগ করে এ ধরণের টাকা তৈরির পথ বন্ধ করতে হবে।

এদিকে ১৯৮৯ সালে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক মহাপরিচালক সাদরেল রেজার ‘বাংলাদেশের কালো অর্থনীতি: কিছু প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ’ নামের সমীক্ষা অনুযায়ী, ১৯৮৫৮৬ সালে কালো টাকার পরিমাণ ছিল জিডিপির একতৃতীয়াংশ। ১৯৯৫ সালে বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থা (বিআইডিএসেরই) আরেক সিনিয়র গবেষক আসাদুজ্জামানের ‘আনরেকর্ডেড ইকোনমি অব বাংলাদেশ’ নামের গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, ১৯৯২৯৩ অর্থবছরে অপ্রকাশিত অর্থের পরিমাণ জিডিপির ১৯ দশমিক ৯ শতাংশ। এছাড়া ২০০৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক আবুল বারকাত ‘বাংলাদেশে কালো টাকা এবং এর উৎস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে জানান, দেশে কালো টাকার পরিমাণ এক লাখ ৭৫ হাজার কোটি। আর ১৯৯৭ সালে গবেষক এম কবির হাসানের এক সমীক্ষায় বলা হয়, ১৯৭২ থেকে ১৯৯৫ সাল পর্যন্ত দেশে কালো টাকার পরিমাণ ছিল জিডিপির ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ। ২০০৫ সালে কোরিয়া ইনস্টিটিউট অব পাবলিক ফাইন্যান্সের গবেষক নোউক পার্কের এক সমীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৯২২০০০ সময়ে বাংলাদেশে কালো টাকা ছিল জিডিপির ৩৫ দশমিক ৬ শতাংশ। ২০০০২০০১ অর্থ বছরে তা ৩৬ দশমিক ৫ এবং ২০০২০৩ এ ছিল ৩৭ দশমিক ৭ শতাংশ। এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থ উপদেষ্টা মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, দেশের অর্থনীতিতে বিপুল পরিমাণ কালো টাকা আছে ঠিক। তবে এ নিয়ে সরকারের হিসাব নিরূপণ পদ্ধতিটি তার মনপুত হয়নি। তার মতে, সরকারের হিসাব অনুযায়ী এত বেশি পরিমাণ কালো টাকা থাকলে মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ হওয়ার কথা। তা তো হচ্ছে না।

সমীক্ষাগুলোর প্রায় প্রতিটিতেই বলা হয়েছে, বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও কালো টাকার প্রভাব দিন দিন বেড়েই চলছে। অথচ দেশের অর্থনৈতিক সূচকগুলোর প্রক্ষেপণ করা হচ্ছে বিপুল অঙ্কের এই টাকাকে বাদ দিয়েই। আবার এর ওপর ভিত্তি করেই প্রণয়ন করা হচ্ছে দেশের আর্থিক ও রাজস্বনীতি। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই সঠিক নির্দেশনা পাওয়া যাচ্ছে না। পাশাপাশি মূলধনের এই বিরাট অংশ আনুষ্ঠানিক অর্থনীতির বাইরে থাকলে সম্পদের বুদ্বুদ (এসেট বাবল) তৈরি হবে, যা নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতেও। অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, কালো টাকাকে অর্থনীতির মূল ধারায় আনতে স্বাধীনতার পর থেকেই চেষ্টা করা হচ্ছে।

অবৈধভাবে উপার্জিত বিপুল পরিমাণ টাকা কালো তালিকায় চলে যাওয়ায় সরকারের রাজস্ব আয়ে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সামগ্রিকভাবে দেশের অর্থনীতিতে তৈরি হয়েছে আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি। আর এসব বিবেচনার কথা বলেই বিভিন্ন সরকারের আমলে কালো টাকাকে প্রকাশ্যে আসার সুযোগ দিয়ে রাজস্ব আয় বাড়ানোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়াটি শুরু হয়েছিল জিয়াউর রহমানের শাসনামলে ১৯৭৫৭৬ অর্থবছরে। ওই বছরই প্রখম দেশে অবৈধ উপায়ে উপার্জিত টাকাকে বৈধতা দানের সুযোগ দেয়া হয়। এরপর এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৭৮৮ অর্থবছর থেকে টানা ৩ বছর একই ধরণের সুযোগ দেওয়া হয়। এরমধ্যে প্রথম বছর ২০ শতাংশ হারে কর পরিশোধের বিধান করা হয়। ১৯৮৮৮৯ এবং ১৮৮৯৯০ অর্থবছরে ১০ শতাংশ কর দিয়ে শিল্পখাতে অবৈধ অর্থ বিনিয়োগের সুযোগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ১৯৯৭ সাল থেকে ১৯৯৯ সাল পর্যন্ত ৩ বছর ১০ শতাংশ কর পরিশোধের শর্তে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়।

বিএনপি সরকার ক্ষমতায় এসে অবৈধ অর্থ বৈধ করার সুযোগকে আরো প্রসারিত করে। ২০০২ সালের জুন মাসে সরকার একটি অধ্যাদেশ জারি করে ৫টি খাতে অবৈধ অর্থের বিনিয়োগ প্রশ্নহীন করে দেয়। এমনকি ওই বিনিয়োগের জন্য কোনো কর দেয়ারও প্রয়োজন পড়েনি। আর বাড়ি, জমি বা গাড়ি কেনার ক্ষেত্রে মোট মূল্যের ৫ শতাংশ আয়কর পরিশোধ করলেই টাকার উৎস সম্পর্কে প্রশ্ন না করার বিধান করা হয়। ২০০৩০৪ এবং ২০০৪০৫ অর্থবছর শেয়ারবাজারে বিনাপ্রশ্নে কালো টাকা বিনিয়োগের সুযোগ দেয়া হয়। আর ২০০৫০৬ অর্থবছরের সাড়ে ৭ শতাংশ হারে কর দিয়ে ‘অপ্রদর্শিত আয়’ বৈধ করার সুযোগ দেয়া হয়। নির্ধারিত কর পরিশোধ করলেই ওই টাকার উৎস ও ব্যবহার সম্পর্কে কোনও প্রশ্ন না তোলার বিধান রাখা হয়। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় এসে দুর্নীতিবাজ ও অবৈধ অর্থের মালিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের ঘোষণা দিয়ে অভিযান শুরু করে। কিন্তু কিছু দিন না যেতেই পিছু হটতে বাধ্য হয় তারা। নির্ধারিত করের সঙ্গে মাত্র ৫ শতাংশ জরিমানা দিয়ে অপ্রদর্শিত আয় বৈধ করার সুযোগ দেয়া হয়। কিন্তু এ ধরণের সুযোগ গ্রহণ করে বরাবরের মতোই অনীহা দেখিয়েছে অপ্রদর্শিত অর্থের মালিকরা।

কালো টাকা ব্যবহারের সুযোগ নিয়ে অধ্যাপক আবু আহমেদ বলেন, “অর্থনীতিতে কালো টাকার কোনো সুফল নেই। বিভিন্ন শর্তে কালো টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়া হলেও তা পূরণ হয় না। এইসব টাকা বিদেশে পাচার হয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতিতে কালো টাকার ব্যবহারের কারণে রাষ্ট্রে দুর্নীতি বাড়ে। রাজনীতিবিদরা যদি সিদ্ধান্ত না নেন তাহলে কালো টাকা পাচার বন্ধ হবে না। মূল ধারার অর্থনীতিতে কালো টাকা সাদা করে এর বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রকে কঠোর হতে হবে।”

স্বাধীনতার পর থেকে এ পর্যন্ত ১৩ হাজার ৫১৫ কোটি ৮৪ লাখ টাকা সাদা হয়েছে। আর এ থেকে সরকার রাজস্ব পেয়েছে মাত্র এক হাজার ৪০৭ কোটি ২১ লাখ টাকা। জিয়াউর রহমানের সময় মাত্র ৫০ কোটি ৭৬ লাখ টাকা সাদা হয়েছিল। জিয়াউর রহমানের সময় মাত্র ৫০ কোটি ৭৬ লাখ টাকা সাদা হয়েছিল। ১৯৯১ থেকে ’৯৬ সাল পর্যন্ত ১৫০ কোটি ৭৯ লাখ টাকা সাদা হয়েছিল। ১৯৯৭ থেকে ২০০০ সাল পর্যন্ত ৯৫০ কোটি ৪১ লাখ টাকা সাদা হয়। ২০০১ থেকে ২০০৬ পর্যন্ত সময়ে কালোটাকা সাদা হয় ৮২৭ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থা জারির পর আবারও কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেওয়া হয়। নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দিয়ে বলা হয়, এর মধ্যে সুযোগ না নিলে সর্বোচ্চ ২৫০% পর্যন্ত জরিমানা করা হবে। অপ্রদর্শিত অর্থ বৈধ করার এই সুযোগ নেয় ৩২ হাজার ৫৫৮ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান। আর এতে বৈধ হয় নয় হাজার ৬৮২ কোটি ৯৯ লাখ টাকা। ২০০৯ সালে নতুন সরকার গঠন করার পর আওয়ামী লীগ আরও কালোটাকা সাদা করার সুযোগ দেয়। এমনকি আয়কর অধ্যাদেশে স্থায়ীভাবে নতুন একটি ধারা সংযোজন করে কালোটাকা সাদা করার আইনি সুযোগ রাখা হয়। এই ধারাটি হচ্ছে ১৯ ই। এর ফলে প্রযোজ্য আয়করের সঙ্গে ১০ শতাংশ জরিমানা দিলে যে কেউ অর্থ সাদা করতে পারবেন।

২০০৭ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গাড়ি, জমি ও ফ্ল্যাট কিনে কালোটাকা সাদা করাসংক্রান্ত আয়কর অধ্যাদেশের সব কটি ধারা (১৯বি, ১৯ বিবি, ১৯ বিবিবি) বিলুপ্ত করে দিয়েছিল। বর্তমান সরকার আবার গাড়ি ছাড়া বাকি সবগুলো সুযোগ নতুন করে দিয়েছে। এনবিআর সূত্রে জানা গেছে, ২০০৭০৮ অর্থবছরে ফ্ল্যাট ও গাড়ি কিনে এক হাজার ৪৭৫ জন ৭৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকা কর দিয়েছিলেন। আর জমি কিনে ১৭৬ জন পাঁচ কোটি ৮৪ লাখ টাকা কর দেন। ২০০৯১০ অর্থবছরে কালোটাকা দিয়ে জমি ও ফ্ল্যাট কিনেছিলেন এক হাজার ৩২০ জন। আর তাতে সরকার কর পায় ২৮ কোটি ৯১ লাখ টাকা।।