Home » সাক্ষাৎকার » সাক্ষাৎকার – মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

সাক্ষাৎকার – মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম

দুটো মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়া উচিত

mujahidul-islam-selim-1মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি)। এক সময়ের তুখোড় ছাত্রনেতা এবং ডাকসুর সাবেক ভিপি। বর্তমান সময়ের রাজনীতি, ভবিষ্যৎ নির্বাচনী সঙ্কট, বাম আন্দোলনসহ বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন, আমাদের বুধবারএর সঙ্গে।

আমাদের বুধবার: আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং স্থানীয় সরকার মন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম আপনাদের উপস্থিতিতেই এক আলোচনা সভায় বলেছেন, আওয়ামী লীগের বিকল্প বিএনপি নয়, বামদলগুলো। আপনিও কি তাই মনে করেন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি আর্থসামাজিক অবস্থার দৃষ্টিভঙ্গিতে একই ধারার দল। তারা সাম্রাজ্যবাদের সমর্থক এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির নামে লুটপাটের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা এই দেশে চালু করার পক্ষপাতি। সেই বিবেচনায় আওয়ামী লীগ এবং বিএনপি সমমনা দল। সুতরাং আওয়ামী লীগই ক্ষমতায় থাকুক বা বিএনপিই ক্ষমতায় থাকুক একই ধরণের নীতিতে দেশ পরিচালিত হবে। সুতরাং আসলেই বিকল্প যদি কিছু করতে হয়, তাহলে সত্যিকার নীতি যারা অনুসরণ করে তারা হলো এই দেশের বামপন্থী। একমাত্র বামপন্থী দলগুলোর নেতৃত্বে যদি একটি বৃহত্তর বলয় গড়ে উঠে, তাহলে তারাই আওয়ামী লীগ বা বিএনপির বিকল্প হয়ে দেশকে ভিন্ন পথে অগ্রসর করতে সক্ষম। মনে রাখতে হবে, আওয়ামী লীগের দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে বিএনপির দিকে তাকালে মানুষের কল্যাণ হবে না।

আমাদের বুধবার: আপনি বলছেন, যদি সব বাম দল এক হতে পারতো তাহলে একটি বিকল্প গড়ে তোলা সম্ভব হতো। কিন্তু বামদলগুলো নানাভাবে বিভক্ত, নানা অবস্থানে অবস্থিত। এই অবস্থায় বাম দলগুলোর ঐক্য আদৌ কি সম্ভব?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: বামপন্থীদের ভেতরে অনেকগুলো ভাগ আছে। যদিও ডানপন্থীরা তার চেয়েও অনেক বেশি বিভক্ত। তবুও বামপন্থীদের এই বিভক্তি দূর করে নিজেদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে এনে, তারা যদি বলেন, এখন আর আওয়ামী লীগ বিএনপির দিকে তাকানো প্রয়োজন নেই এবং একত্রিত হওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে হবে

আমাদের বুধবার: এখানে বাধাটা কোথায়?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: বামপন্থী অনেক দল রয়েছে এখানে। কারো কারো ভেতরে আত্মবিশ্বাসের অভাব রয়েছে এবং তাদের কিছু কিছু ত্রুটিবিচ্যুতি রয়েছে। আর এটাই ঐক্যের পথে বাধা।

আমাদের বুধবার: ত্রুটিবিচ্যুতিগুলো কি?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: অনেকগুলো দল পেটিবুর্জোয়া প্রভাবে আক্রান্ত। জনগণের মধ্যে বাম আন্দোলনের ব্যাপারে যতোটা কাজ করা দরকার তাদের সে মনোযোগ নেই। এ কারণে সমস্ত প্রক্রিয়াটা দুর্বল হয়ে আছে।

আমাদের বুধবার: অতীত নির্বাচনের অভিজ্ঞতায় দেখা যাচ্ছে, বামদলগুলো খুবই কমসংখ্যক ভোট পেয়েছে। আসলে বামপন্থীদের সত্যিকার শক্তি কতোটুকু?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: বামপন্থীরা তো ঠিক মতো নির্বাচনই করেনি। আমাদের বামপন্থী দলগুলোর ভেতরে কেউ কেউ তো আওয়ামী লীগের সঙ্গে ১৪ দলীয় জোটে ঢুকে আছে। তারা যদি সেখান থেকে বেরিয়ে এসে সমস্ত বামপন্থীদের সঙ্গে একত্রিত হয়ে নির্বাচনের সংগ্রামে অবতীর্ণ হন, তাহলে নিঃসন্দেহে একটি বিশাল সমর্থন নিয়ে আবির্ভূত হওয়া সম্ভব। আর এক ধাপেই আমরা একটা প্রভাবক শক্তি হয়ে উঠতে পারি। আর পরে সরকার গঠন করতে সক্ষম হবো।

আমাদের বুধবার: বাম নামধারী অনেক নেতা ১৪ দলীয় জোটে আছেন। তাদের যোগদান এবং কর্মকাণ্ডকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করেন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: ১৪ দলে গিয়ে বাম নেতারা ভুল কৌশল গ্রহণ করেছেন। আওয়ামী লীগকে ভেতর থেকে প্রভাবিত করার কোনো সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ আগে মধ্য বামপন্থার বা মধ্য পন্থা দল ছিল। এখন মধ্য ডানপন্থী দল। আওয়ামী লীগের চরিত্র বদল হয়েছে। আওয়ামী লীগ যখন মধ্যবিত্তদের স্বার্থরক্ষা করতো তখন মধ্যবাম বা মধ্যপন্থার দল ছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব বদল হয়ে চলে গেছে লুটেরা শ্রেণীর হাতে। আমরা বামপন্থীদের প্রতি আগেও আবেদন জানিয়েছি, আবারও আবেদন জানাবো, বিকল্প গড়ে তোলাই হচ্ছে প্রধান কাজ। আর তা না হলে বার বার আওয়ামী লীগ আর বিএনপির ভেতরেই ক্ষমতার হাতবদল হতে থাকবে। যারা ভুল কৌশল গ্রহণ করেছেন, তাদের ভুল সংশোধন করে আওয়ামী লীগ বা বিএনপির সঙ্গে কোনো ধরণের জোটবদ্ধ না হয়ে একটি বিকল্প বাম গণতান্ত্রিক বলয় গড়ে তোলা উচিত।

আমাদের বুধবার: . কামাল ও মাহমুদুর রহমান মান্নার সঙ্গে আপনাদের এক সঙ্গে নির্বাচনের কোনো সম্ভাবনা আছে কিনা?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: আদৌ নির্বাচন হবে কিনা বা হলে কি পরিস্থিতিতে হবে তার উপর জবাব নির্ভর করে। দ্বিতীয়ত, স্বাভাবিকভাবেই সমস্ত বামপন্থীদের সঙ্গে উদার গণতন্ত্রীদের নিয়ে আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির বাইরে একটি বৃহত্তর বলয় গড়ে তুলতে চাই। তবে আলোচনা এখনো শুরু হয়নি।

আমাদের বুধবার: বিএনপি এবং জামায়াত জোটকে আপনি সব সময় সাম্প্রদায়িক বলে উল্লেখ করেন। কিন্তু আওয়ামী লীগ কতোটা অসাম্প্রদায়িক?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: আওয়ামী লীগ সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে সাধারণভাবে আমাদের সঙ্গে থাকলেও, এই প্রশ্নে তাদের ইতিহাস আগাগোড়া দোদুল্যমানতা এবং দুর্বলতার। বর্তমানে আমরা খুবই দুঃখের সঙ্গে লক্ষ্য করছি যে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের কি সম্পর্ক হবে এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে, বিশেষ করে সংবিধান প্রশ্নে তারা জিয়াউর রহমানের সংশোধনীকে বহাল রেখেছে। আওয়ামী লীগ সাম্প্রদায়িকতার প্রশ্নে ক্রমাগত আপস করে চলেছে। সাম্প্রদায়িকতা বিরোধী সাফল্য আওয়ামী লীগের উপরে নির্ভর করে আসবে না। বামপন্থী সংগঠনগুলোকে শক্তিশালী অবস্থান নিয়ে এবং নিজেদের শক্তি বৃদ্ধি করলেই এটা সম্ভব।

আমাদের বুধবার: সংলাপের সম্ভাবনা কতোটুকু?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: সংলাপের উদ্দেশ্য হচ্ছে, সমঝোতা। সংলাপ করে সমঝোতা করতে পারেন আবার নাও করতে পারেন। প্রশ্নটা হলো, কি ধরণের সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে সে ব্যাপারে যদি গ্রহণযোগ্য ফর্মুলা থাকে তাহলেই সকলে অংশগ্রহণের ভিত্তিতে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব।

আমাদের বুধবার: তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা জরুরি বলে আপনি মনে করেন কিনা?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: সুপ্রিমকোর্ট যে রায় দিয়েছে তা অনুসরণ করা অর্থাৎ দুটো মেয়াদে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন হওয়ায় উচিত। তাছাড়া নির্বাচন কমিশনকে শক্তিশালী করতে হবে। এটা করতে হবে এ কারণে যে, মানুষের চেতনার জগতে এমন একটা আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে নিয়ে আসা যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়াও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন সম্ভব।

আমাদের বুধবার: আগামী নির্বাচনের সম্ভাবনা কতোটুকু?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: অনেক সম্ভাবনাই দেখতে পাচ্ছি। নির্বাচন হতে পারে, নাও হতে পারে, একএগারোও হতে পারে। আর এ কথা অবশ্য শেখ হাসিনা, খালেদা জিয়া বার বার বলছেনও। নির্বাচন হলেও তা একতরফাও হতে পারে, সকলে অংশগ্রহণে নির্বাচনের পরিস্থিতিও সৃষ্টি হতে পারে। সমস্ত বিকল্পগুলো এখনো পরিষ্কার নয়। যারা কলকাঠি নেড়ে ভাগ্য নির্ধারণ করে, সম্ভবত তারাও চূড়ান্তভাবে মনস্থির করেনি।

আমাদের বুধবার: বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ কি বলে আপনি মনে করেন?

মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম: বাংলাদেশের গণতন্ত্রের ভবিষ্যৎ নাজুক। একটা সংঘাত ও সহিংসতার মধ্যে থাকবে, যতোক্ষণ না গণতান্ত্রিক ও বাম শক্তির নতুন মেরুকরণ তৈরি হচ্ছে।

আমাদের বুধবার: আপনাকে ধন্যবাদ।।