Home » শিল্প-সংস্কৃতি » স্বতন্ত্র ঋতুপর্ণ

স্বতন্ত্র ঋতুপর্ণ

বিধান রিবেরু

Rituparnoগল্প বলার আপনকার রীতি রপ্ত করেছিলেন ঋতুপর্ণ ঘোষ। বাজারি ছবি বানাবার রীতি অবশ্য তেমনটা রপ্ত করতে পারেন নাই তিনি। ৪৯ বছরের জীবনে তিনি চেষ্টা করেছেন জীবনঘনিষ্ঠ ও শৈল্পিক মানের চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে, মানবিক সম্পর্ক নিয়ে তাঁর আগ্রহ ছিল বিস্তর। সেই সকল সম্পর্ক প্রেমবর্জিত নয়, আবার শুদ্ধ নরনারীই তাতে মূখ্য নয়, মানব জীবনে যতপ্রকার প্রেম ও অপ্রেমের সম্পর্ক হাজির থাকতে পারে, তার সবটাই যেন উল্টেপাল্টে দেখবার আগ্রহ জারি রেখেছিলেন ঋতু।

ঋতুর প্রথম স্বীকৃতিপ্রাপ্ত চলচ্চিত্রের নাম যদি নেই, তাহলে সেটি ‘উনিশে এপ্রিল’(১৯৯৪)। মা ও মেয়ের সম্পর্কই সেখানে প্রাধান্য পেয়েছে। পার্শ্ব সম্পর্ক হিসেবে উপস্থিত ছিলো নারী পুরুষের প্রেমের সম্পর্ক। সরোজিনী জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত নৃত্যশিল্পী, তার মেয়ে অদিতি, বাবার অনুপ্রেরণায় চিকিৎসক হয়েছে। কিন্তু মা সরোজিনী শিল্পীজীবন নিয়ে এতোটাই ব্যস্ত থেকেছেন, কখন যে মেয়ে অদিতি দূরে সরে গেছে সেদিকে আর খেয়াল ছিল না তার। অদিতির জীবনে বাবা গুরুত্বপূর্ণ। ঋতুর এই ছবি দেখতে দেখতে কখনো মনে হবে অদিতি ইলেক্ট্রা কমপ্লেক্সে ভুগছে। সেই জটিলতার জট খুলে যায় ঝড়ের রাতে রান্নাঘরে। মা ও মেয়ে মিলে যখন রান্নাঘরের ভেতরে গুদামঘরের দরজা ঠেলছিল তখনই দর্শক বুঝতে পারেন, দুজনই চাইছেন নিজেদের ভেতরকার আবেগের দরজাখানা খুলে দিতে। এরপর অদিতি যখন মায়ের বিরুদ্ধে তার অভিযোগগুলো ক্ষোভাকারে মায়ের সামনে বলে ফেলে, ওপাশে চুলোর উপর বসানো প্রেসার কুকার হুইসেল বাজিয়ে প্রেসার রিলিজ করে, তখন বুঝি একটা ভার ছিল, সেটা নেমে গেল। আসলেও তাই, এরপর আমরা দেখি মা মেয়ে একে অপরের সঙ্গে কথা বলছে। সরোজিনীর সঙ্গে স্বামীর সম্পর্ক সরল ছিল না। ঐ জটিলতার নাম ছিল পুরুষতন্ত্র। স্ত্রীর সাফল্যে ঈর্শান্বিত ছিলেন অদিতির বাবা। এই সত্য যখন অদিতির সামনে খোলাসা হল তখন মায়ের প্রতি বিদ্বেষ উবে যেতে থাকে অদিতির। মা ও মেয়ের এক বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের সূচনা দিয়ে শেষ হয় ঋতুর ‘উনিশে এপ্রিল’।

এরপর যদি ‘বাড়িওয়ালি’র (১৯৯৯) কথা বলি, সেখানে দেখা যায় অসম বয়স ও অসামঞ্জস্যপূর্ণ দুই দুনিয়ার বাসিন্দার মধ্যে গড়ে ওঠা এক অদ্ভুত সম্পর্কের গল্প। ঋতু সেখানে দেখান এক নি:সঙ্গ বাড়িওয়ালি, যে নিজেকে পরিচয় দেন বনলতা বলে, তার সঙ্গে পরিচয় হয় এক চলচ্চিত্র পরিচালকের। সেই সম্পর্ক প্রথমে ভাইবোনের মনে হলেও একপর্যায়ে নারী পুরুষের প্রেম প্রকাশ পেতে থাকে। চিরকুমারী ও বয়স্ক বনলতা নিজের স্বপ্নের রাজপুত্রের জায়গায় স্থান দিতে থাকেন পরিচালককে। এরইমধ্যে তিনি আবিষ্কার করেন পরিচালকের সঙ্গে স্ত্রী ও নায়িকার সম্পর্ক। এই আবিষ্কারে হাজির থাকে ঈর্শা ও অধিকারবোধ। কি বিচিত্র সম্পর্কই না ঋতু আমাদের দেখিয়েছেন এই চলচ্চিত্রে।

আরেকটি চলচ্চিত্র ‘অন্তরমহল’ (২০০৫), এখানে আমরা দেখি বহুমাত্রিক সম্পর্কের এক জটিল ও সফল চলচ্চিত্রয়ান। ভুবনেশ্বর চৌধুরী উনবিংশ শতাব্দীর একজন বাঙালি জমিদার। জীবনে তার প্রধানতম দুটি চাওয়া, দুটিই ভীষণভাবে বৈশ্বিক। এক, তার অর্জন ও সম্পদের মালিক যেহেতু সে তার বংশের পুত্রকেই দান করবেন তাই তার দরকার এক পুত্র সন্তানের। সন্তান না হওয়ায় দ্বিতীয় বিয়ে করেন তিনি। দুই নম্বর চাওয়া হল ব্রিটিশ রাজের কাছ থেকে রায়বাহাদুর খেতাব। এই খেতাব পাওয়ার জন্য তিনি দূর্গাপূজায় মা দূর্গার মুখমণ্ডল গড়াবেন রানি ভিক্টোরিয়ার আদলে। সেজন্য বাড়িতে আনা হয় নতুন পটুয়া। জমিদার বাবু তার বৈশ্বিক চাওয়া পাওয়ার জন্য গৌণজ্ঞান করেন স্বামীস্ত্রীর সম্পর্ককে। এই সুযোগে জমিদার ও দুই স্ত্রী, এই তিনজনের ভেতর তৈরী হতে থাকে অন্যরকম সম্পর্কের চোরাগুপ্তা পথ। এই চলচ্চিত্র দেখে যা মনে হয়েছে, তা হল ঋতু এতে একইসঙ্গে ধরতে চেয়েছেন সামন্তযুগের পুরুষতন্ত্রে নারীপুরুষের সম্পর্ককে। এই সম্পর্ক কতটা প্রভু ও ভৃত্যের, কতটা প্রেমের এবং পাশাপাশি কতটা ধর্মীয় ভণ্ডামির কাছে আবদ্ধ, কতটা বৈশ্বিক লাভ লোকসানের নিক্তিতে পরিমাপিত, সেটাই যেন নিবিড় করে তুলে আনতে চেয়েছেন ঋতু। সফলও হয়েছেন তিনি।

জমিদারের ছোটবউ যখন দেখল মা দূর্গার মুখ রানি ভিক্টোরিয়ার মত হয়নি, হয়েছে তার মতো, মানে তরুণ পটুয়া আপন মানসে তাকে দেখেই মূর্তি গড়েছে, তখন ছোটবউ বুঝে যায় জমিদারের হাতে তার মৃত্যু অনিবার্য। বউ হওয়ার পর থেকে যে জমিদারের ভৃত্য হিসেবেই দিন কাটাচ্ছিলো, আত্মহনন করে সেই ছোট বউই প্রমাণ করে প্রভুকে টেক্কা দেয়ার ক্ষমতা তারও আছে। এই জায়গায় মনে পড়ে যায় ফ্রান্স ফানোর কথা। যিনি হেগেলের প্রভু ভৃত্যের সম্পর্কের সমালোচনা করে বলেছিলেন, ভৃত্যও প্রভুকে ছাড়িয়ে যেতে চায়। তাদের সম্পর্ক শুদ্ধ একে অপরের উপর নির্ভরশীলতার সম্পর্কে আটক থাকে না।

স্বল্পায়ুর ঋতুর জীবনের শেষভাগে এসে সম্পর্কের একেবারে ভিন্নমাত্রা নিয়ে কাজ করলেন ঋতু। তিনি নির্মাণ করলেন ‘চিত্রাঙ্গদা: দ্য ক্রাউনিং উইশ’ (২০১২)। এই চলচ্চিত্র মুক্তি পাওয়ার পর নতুন বিতর্ক উস্কে ওঠে। অনেক সমালোচকের মতে এই চলচ্চিত্র তাঁর মনেরই কথা। জীবনের প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন। মোতাবেক ২০১১ সালের ১৬ মার্চ আনন্দবাজার পত্রিকায় এক সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন ঋতু। তাঁর মুখোমুখি হন দেবশ্র“তি রায়চৌধুরী। প্রশ্ন ছিল চিত্রাঙ্গদা কেন? জবাবে ঋতু অনেক কিছুই বলেছিলেন, পাশাপাশি চলচ্চিত্রখানা নিয়ে তাঁর কল্পনার কথাও বলেছিলেন “একটা কুয়াশাচ্ছন্ন পাহাড়, তার দু’পাশ দিয়ে দু’টো রাস্তা উঠে গেছে। একটা রাস্তা দিয়ে পুরনারীরা যাচ্ছে পুজোর ডালা নিয়ে মদনের মন্দিরে। আর অন্য রাস্তা দিয়ে চিত্রাঙ্গদা ঘোড়া ছুটিয়ে আসছে তার শিকারিদের নিয়ে। ‘আমার এই রিক্ত ডালি’ গানটা নিয়ে ভেবেছিলাম, একটা থালায় ধনুর গুণটা নিয়ে মদনের কাছ গেছে চিত্রাঙ্গদা। মানে ছিলাটাকে ছাড়িয়ে নিয়ে। বোঝাতে চেয়েছে, আমি আমার পৌরুষ দিলাম। এর বিনিময়ে আমায় রূপলাবণ্য দাও— এ রকম কত ভাবনা যে ছিল!”

চিত্রাঙ্গদার ভেতর লৈঙ্গিক বিষয়টা যে অনেক বড় করে রয়েছে তা নাকি আগে বুঝতে পারেন নেই ঋতু। চলচ্চিত্র যদি ভাষার মত হবে, তাহলে সেই ভাষার পথ ধরে ঋতুর অচেতনের ঘরে কে বসত করছে, তা সহজেই অনুমেয়। সেই বসতকারী পৌরুষ বিসর্জন দেয়ার জন্য উদগ্রীব, নারীসুলভ লাবণ্য তাঁর কাম্য, কারণ অন্যের বাসনার ভেতর দিয়েই আপনকার বাসনা নির্মাণ হয়, অন্যের বাসনা তাই হয়ে ওঠে নিজের বাসনা। পার্থ পুরুষ, তাই পুরুষের প্রচলিত বাসনাকেই ধারণ করতে থাকে রুদ্র। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সে দেখে বাসনা পরিবর্তনশীল, নিয়তির অপর নামই বাসনা।

রুদ্র বহিরাঙ্গে পুরুষ কিন্তু ভেতরে তার নারীর মন। পার্থর সঙ্গে বন্ধুত্ব হয় রুদ্রর। পার্থ ভালোবেসে ফেলে রুদ্রকে। পুরুষের সমকামিতায় যখন সন্তানের অভাব ভাবাকারে প্রকাশ হয় তখন রুদ্র নিজের শরীরকে নারীতে রূপান্তর করে। কিন্তু পার্থর সেটা পছন্দ হয়নি। কারণ সে ভালোবেসেছে রুদ্রর পুরুষ শরীর, নারী শরীর নয়। পার্থ বিয়ে করে ফেলে নাট্যদলেরই আরেক মেয়েকে। ঋতু এখানে পৌরাণিক চরিত্র চিত্রাঙ্গদাকে স্বাক্ষী মেনে তৃতীয় লিঙ্গের সঙ্গে পুরুষ ও নারীর যে সম্পর্ক দাঁড় করিয়েছেন তা সত্যিই নতুন তরঙ্গ সৃষ্টি করে প্রচলিত ভাবনার জলাশয়ে।

চিত্রাঙ্গদায় ঋতু শুদ্ধ দেখিয়েছেন বললে ভুল হবে কারণ তিনি অভিনয়ও করেছেন রুদ্র নামের রক্ষণশীল পরিবারের নারীসুলভ ঐ ছেলের চরিত্রে। যাকে প্রায় বাধ্য করা হয় পুরুষ হয় উঠতে। তাকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ানো হয়, যদিও নৃত্যশিল্পী হওয়ার ইচ্ছা রুদ্রর। রবীন্দ্রনাথের চিত্রাঙ্গদায় মণিপুরের রাজা তাঁর মেয়েকে জোর করে পুরুষের শিক্ষায় বড় করেছিলেন এবং ঋতুর ছবিতে নারীসুলভ এক ছেলেকে পুরুষ হতে বাধ্য করা হয়।

সাংবাদিক দেবশ্র“তি ঋতুকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, সমকামী প্রেমের গল্প লোকে বেশ খাচ্ছে, সেই কারণেই কি এই বিষয়ে চলচ্চিত্র? ঋতু অস্বীকার করে বলেছিলেন, একজন মানুষ কি করে সকল কিছুর সঙ্গে লড়াই করে নিজেরে প্রতিষ্ঠা করে, এটা সেই প্রতিষ্ঠানের গল্প।

চলচ্চিত্রের পরতে পরতে যা যা ঋতু প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন, বিশ্ব সংসারে সম্পর্কের যে নানা রূপ, রস ও গন্ধ ঋতু আমাদের সামনে পরিবেশন করেছিলেন, সেই সকলকে ছাপিয়ে আজ ঋতু নিজেই প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছেন! তাঁর সৃষ্টির সঙ্গে সুইডেনের বিখ্যাত পরিচালক ইঙ্গমার বেরিম্যানের বিস্তর মিল পাওয়া যায়। ব্যারিম্যান যে তাঁর প্রেরণার জায়গা তা ভিন্ন জায়গায় অবশ্য স্বীকারও করেছেন ঋতু।

ঋতুপর্ণ ঘোষ ১৯৯৪ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত, এই ১৯ বছরে তাঁর নির্মাণসংখ্যা ১৯ খানা চলচ্চিত্র, অবশ্য বিজ্ঞাপনও তৈরি করেছেন তিনি। উল্লেখ করতে হলে, হীরের আংটি, আবহমান, রেইনকোট, নৌকাডুবি, লাস্ট লিয়ার, দহন, দোসর প্রভৃতি তাঁর নামজাদা চলচ্চিত্র। ১৯৯৫ সালে ঋতু প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান, দ্বিতীয় ছবি ‘উনিশে এপ্রিলে’র দৌলতে। এরপর একে একে ১২ খানা জাতীয় পুরষ্কার পান ঋতু। মেধাবী ও আদতে ক্ষণজন্মা ঋতুপর্ণ জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৬৩ সালের ৩১ আগস্ট, কলকাতা শহরে। আর হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে অকালে প্রস্থান করেন সেই কলকাতাতেই, ২০১৩ সালের ৩০ মে। তাঁর এই প্রস্থান দু:খের সন্দেহ নাই, কিন্তু আরো এক দু:খ আমাদের অন্তরে খেলা করে, তা হল, ঋতুর মত প্রতিভা হয় তো এই বাংলাদেশেও আছে, কিন্তু আমাদের দেশের প্রযোজকরা তাদের এখনো খুঁজে বের করতে পারেননি।।