Home » মতামত » সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে ড. আকবর আলি খান এবং অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ-এর বিশ্লেষণ

সিটি করপোরেশন নির্বাচনের ফলাফল সম্পর্কে ড. আকবর আলি খান এবং অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ-এর বিশ্লেষণ

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

cityআকবর আলি খান

চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে এমন এক সময়, যখন জাতীয় সংসদ নির্বাচন এগিয়ে এসেছে। সুতরাং সবগুলো রাজনৈতিক দলই এই নির্বাচনের আগে থেকেই রণকৌশল নির্ধারণ করে রেখেছিল। সুতরাং তাদের যে বক্তব্য অর্থাৎ হারলেও তাদের বক্তব্য আছে, জিতলেও আছে। তবে প্রকৃত পরিস্থিতির দিকে যদি আমরা তাকাই তাহলে দেখা যাবে যে, বিএনপি চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে জয়লাভ করার পরে তাদের মধ্যে নতুন করে রাজনৈতিক উদ্দীপনা সঞ্চারিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তৃণমূল পর্যায়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন আশা সঞ্চারিত হবে, তার ফলে সংগঠনটির জন্য এটি একটি লাভের দিক। তবে এতে বিএনপি’র বিপদও রয়েছে। বিপদ হলো এই জন্য যে, সরকার বলছে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে এবং অবশ্যই সুষ্ঠু নির্বাচন না হলে চারটি আসনে এতো বিপুল ভোটাধিক্যে এভাবে জয়লাভ করা সম্ভব ছিল না। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী যারা ছিলেন তারা বেশ শক্তিশালী প্রার্থী। কাজেই এ প্রেক্ষিতে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হওয়াতে সরকারের পক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে কিনা সে সম্পর্কে পুনরায় প্রশ্ন তোলা হবে।

আর বিএনপি’র ভেতরেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া নির্বাচনের জন্য একটি চাপ সৃষ্টি হবে। কারণ তৃণমূলের নেতাকর্মীরা দেখছেন যে, এই অবস্থাতে নির্বাচন করেও যদি এতো ভোটে জয়ী হওয়া যায়, তাহলে পরে হয়তো নির্বাচনে অংশগ্রহণ করলে ভবিষ্যতেও তারা লাভবান হবেন। সুতরাং এই প্রশ্নে বিএনপি’র উপরে দুই ধরনের চাপ সৃষ্টি হবে।

আর সরকারি দলের পক্ষ থেকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নে তারা মনে করছেন যে, এই প্রশ্নে তারা তাদের বক্তব্য আরো গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারবেন। তারা এখন এটিকে তাদের জন্য লাভ হিসেবেই দেখতে চাইবেন।

এই নির্বাচন যদিও জাতীয় নির্বাচনের একেবারে অগ্রদূত অর্থাৎ এখন যা ঘটছে আগামী নির্বাচনেও এমনটা ঘটবে তা বলা যায় না। তার কারণ হলো, আগামী কয়েক মাসের মধ্যে অনেক কিছুর পরিবর্তন হতে পারে। সরকারের পক্ষ থেকেও ভোটারদের খুশি করার জন্য অনেক ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে। সুতরাং সেটা না ঘটলেও মোটামুটি ভাবে ভোটারদের পক্ষ থেকে সরকারি দলের জন্য একটি বার্তা এখানে দেখা যাচ্ছে। ভোটের ব্যবধানটা বেশি এবং চার বিভাগে এ ধরনের ফলাফল দেখে মনে হয়, ভোটারদের মধ্যে গত জাতীয় নির্বাচনে যে পরিস্থিতি ছিল, তার পরিবর্তন হয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটা কতোটুকু খাটবে এবং কি পরিবর্তন হবে সেটা এ মুহূর্তে নিশ্চিত করে বলা মুশকিল।

আনু মুহাম্মদ

চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনের এ ফলাফলটা খুব বিশ্বয়কর বলে মনে করার কারণ নেই। যদিও এটি স্থানীয় নির্বাচন, তথাপি মানুষ এটাকে দলগতভাবে বিবেচনা করেছে বলে মনে হচ্ছে। বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দুই ধারাতে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। এ মুহূর্তে তারাই মূল রাজনৈতিক শক্তি। ক্ষমতাসীন দলের ওপর মানুষের ক্ষোভ বা হতাশা কিংবা বিরক্তির প্রকাশ হিসেবে ভোটকে ব্যবহার করায় সেটা বিএনপির পক্ষে গিয়েছে। এটাকে বিএনপির পক্ষে জনগণের রায় হিসেবে না দেখে ক্ষমতাসীনদের বিপক্ষে রায় হিসেবে দেখতে হবে। একই চিত্র আমরা আগেও দেখেছি। এ হিসেবে বর্তমান সরকারের ওপর মানুষের ক্ষোভ ও হতাশার একটি প্রকাশ চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে ঘটেছে বলে ধারণা। স্থানীয়ভাবে নির্বাচনের ক্ষেত্রে প্রার্থীদের দোষগুণ তাদের ভূমিকা; যারা মেয়র ছিলেন তারা কি কি কাজ করেছেনসেগুলো ভোটারদের বিবেচনার বিষয় ছিল বৈকি। পাশাপাশি এবার দলীয় বিবেচনাটাও অধিক কাজ করেছে বলে ধারণা। গেল সাড়ে চার বছরে অনেক বড় ধরনের অভিযোগ সরকারের বিরুদ্ধে উঠেছে। হলমার্ক কেলেঙ্কারি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, শেয়ারবাজারের লুটপাট, পদ্মা সেতু দুর্নীতি, ডেসটিনি ও বিসমিল্লাহ কেলেঙ্কারি এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য। শিক্ষাঙ্গনে অস্থিরতা, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস তো রয়েছেই।

পাশাপাশি স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি দলের বিভিন্ন স্তরের নেতাকর্মীদের ভূমিকায়ও মানুষ বিরক্ত হয়েছে। দখলসন্ত্রাসসহ মানুষের প্রতি তাদের আচারণ সিটি করপোরেশনের এবারের নির্বাচনে বড় ভূমিকা রেখেছে। খুলনা সিটি করপোরেশন নির্বাচনে শক্তিশালী মেয়র প্রার্থী ছিলেন তালুকদার আবদুল খালেক। চার সিটি করপোরেশনের মধ্যে তিনিই ছিলেন ক্ষমতাসীন দলের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রার্থী। তার সম্পর্কে একটি ধারণা প্রচলিত ছিল, তিনি দুর্নীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। গেলবার অর্থাৎ প্রথমবার সিটি করপোরেশনে নির্বাচনের আগের ঘের দখল ও এসংক্রান্ত দুর্নীতি নিয়ে তিনি প্রতিবাদ করতেন বলে জানা যায়। এখন তিনি রীতিমতো কোটিপতি, নির্বাচন কমিশনে দাখিল করা হিসাব বিবরণ থেকেই এটি জানা যাচ্ছে। এখানেই সুন্দরবন সংলগ্ন এলাকাকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য। বাগেরহাটের রামপালে এ বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের জন্য তিনি খুব তৎপর ছিলেন। সুন্দরবন ধংস হতে পারে জেনেও তিনি কাজ করেছেন। তিনি শুধু প্রকল্প বাস্তবায়নের আইনী প্রক্রিয়ায় সক্রিয় ছিলেন না, প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে গিয়ে স্থানীয়দের হুমকি দেয়ামানুষকে উচ্ছেদ করে মাছের ঘের বসানো প্রভৃতি নেতিবাচক কাজ করেছেন। পাশাপাশি স্থানীয় রাজনীতি ও ব্যক্তিকেন্দ্রীক নেতিবাচক ভূমিকার চেয়ে সামগ্রিকভাবে দলের ভূমিকার কারণে ক্ষমতাসীন দলের এ পরাজয়। মানুষের প্রত্যশা ভঙ্গের প্রতিবাদ হিসেবে ভোটের মাধ্যমে তার জবাব দিয়েছে। তারা প্রতারিত হয়েছে, বিশ্বাস ভঙ্গ করা হয়েছে তাদের। এ বোধ যখন মানুষের মধ্যে তৈরি হয় তখন তারা এর জবাব দিতে চায়। বাংলাদেশের মানুষের মৌলিক অধিকার বা অন্য কোনো অস্ত্র নেই। একটা অস্ত্রই তাদের আছে সেটি হলো ভোট। সেটা তারা শেষ পর্যন্ত ব্যবহার করে। বিভিন্ন সময়ে আমরা সেটিই দেখে আসছি।

দুর্নীতিসন্ত্রাসদখলে মানুষ বিক্ষুব্ধ হয় বটে, তার চেয়ে মানুষ অনেক বেশি বিক্ষুব্ধ হয় যখন সে কাউকে উদ্বত আচারণ করতে দেখে। এটি বাংলাদেশের মানুষ একদমই পছন্দ করে না। সরকারি দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে যেভাবে এর প্রকাশ দেখি, তাতে মনে হয় না তারা সাধারণ মানুষকে আমলে নিচ্ছে। এটা মানুষকে ক্ষুব্ধ করেছে, যার বর্হিপ্রকাশ ঘটেছে সিটি করপোরেশন নির্বাচনে। আমাদের মতো দেশে নির্বাচন খুব সুষ্ঠু ও গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় হয়এটি বলা যাবে না। এর ভেতরে অনেক ধরনের আঞ্চলিকতা, সাম্প্রদায়িকতা, গোষ্ঠিতন্ত্র, পরিবারতন্ত্র, কালো টাকা, পেশী শক্তি, প্রচারণা প্রভৃতি কাজ করে। এবারের নির্বাচনেও এসবের ভূমিকা রয়েছে। তবে সবকিছু মিলিয়ে যে প্রার্থীরা এক সময়ে অর্থাৎ গেল সরকারের আমলে নির্বাচিত হয়েছিলেন তাদের এ পরাজয়ের মধ্যে অনেক বিষয় লুকায়িত রয়েছে। জনরায়কে বিএনপির প্রতি মানুষের সমর্থনের বর্হিপ্রকাশ হিসেবে দেখলে ভুল হবে। বর্তমান সরকারের ভূমিকায় মানুষ খুবই বিক্ষুব্ধ। ভালো বিকল্প না থাকায় মানুষ তাদের ভোট দিয়েছে। জনগণ ভালো কিছু চায়, চায় পরিবর্তন।।