Home » শিল্প-সংস্কৃতি » আতিকুল হক চৌধুরী – একটি নক্ষত্রের বিদায়

আতিকুল হক চৌধুরী – একটি নক্ষত্রের বিদায়

ফ্লোরা সরকার

atiqul h chowসময় ১৯৬৬ সাল। বর্তমান বিটিভি প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান ডি.আই.টি. ভবনে। ছোট্ট একটা স্টুডিও। ঐ একটি মাত্র স্টুডিওতে নাটক, গান, নাচ ও অন্যান্য অনুষ্ঠান রেকর্ডিং (ভি.টি.আর.) বা সরাসরি সম্প্রচার করা হতো। তবে অধিকাংশ অনুষ্ঠানই হতো সরাসরি সম্প্রচার। নাটকগুলো অধিকাংশ ক্ষেত্রে রেকডিং এর মাধ্যমে সম্প্রচারিত করতে হতো। কোন নাটকের রের্কডিং অসমাপ্ত থেকে গেলে শিল্পী এবং কলাকুশলীদের নাটক সম্প্রচারের সময় পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হতো। কেননা সেই সময় টিভির সময় সূচী ছিল বিকেল পাঁচটা থেকে রাত বারটা পর্যন্ত। কাজেই বিকেল পাঁচটার মধ্যে কোন নাটকের রেকডিং শেষ না হলে ঐ একটা স্টুডিও ছেড়ে দিতে হতো অন্যান্য অনুষ্ঠান সম্প্রচারের জন্যে। তারপর নির্ধারিত নাটকের সময়ে অর্ধসমাপ্ত রেকর্ডেড নাটক সম্প্রচারের পর নাটকের বাকি অংশটুকু সরাসরি সম্প্রচারের ব্যবস্থা করা হতো। একটা মাত্র সাজঘর। হাতে গোনা কয়েকজন মেকআপ আর্টিস্ট। কোন নাটকের জন্য আউটডোর শুটিং এর প্রশ্নই ওঠে না। ঐ একটি মাত্র স্টুডিও, কয়েকটি ক্যামেরা, কয়েকজন ক্যামেরা ম্যান, লাইট ম্যান আর কিছু অভিনয় শিল্পী কুশলীদের নিয়ে আজকের বিটিভির নাটকের যাত্রা শুরু হয়েছিল ঠিক এভাবেই। কঠিন সেই সময়ে আমাদের টিভি নাট্যজগতে এক বিশাল নক্ষত্রের আবির্ভাব ঘটে যার নাম আতিকুল হক চৌধুরী। গত ১৮ জুন ৮৩ বছর বয়সে আমাদের ছেড়ে চিরকালের জন্যে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু রেখে গেছেন তার হাতে নির্মিত অসংখ্য স্মরণীয় নাটক। যেসব নাটকের শুরু হয়েছিল ডি.আই.টি. ভবনের ছোট্ট সেই স্টুডিও থেকে। রুচিশীল, নান্দনিক নাটক নির্মাণের জন্যে স্টুডিও বা যান্ত্রিক কলাকৌশল যার কাছে কোন বাঁধা হয়ে দাঁড়ায়নি কখনো। শুধু টিভি নয় বেতার বা রেডিও, যেটা তার প্রথম কর্মক্ষেত্র ছিল সেখানেও রেখে গেছেন স্মরণীয় অসংখ্য নাটক।

রেডিও এবং টিভি উভয় ক্ষেত্রেই নাট্যকার, পরিচালক এবং প্রযোজক আতিকুল হক চৌধুরী কর্মক্ষেত্রে নিয়োজিত থাকলেও নাটক নির্মাণকে তিনি শুধু কর্ম হিসেবে দেখেননি, ধর্ম হিসেবে দেখেছেন। একজন শিল্পী যখন তার শিল্পজীবন এবং বাস্তবজীবন অর্থাৎ জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক আর্থসামাজিকরাজনৈতিকঐতিহাসিক জীবন এই দুটো জীবনকে একত্রে মূল্যায়ন করতে পারেন তখনই তিনি হয়ে উঠেন মহান শিল্পী। ১৯৩০ সালের ১৫ ডিসেম্বর বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ থানার উলানিয়া গ্রামের প্রসিদ্ধ জমিদার বাড়িতে জন্ম গ্রহণ করেছিলেন আতিকুল হক চৌধুরী। তার সময়কাল ব্যাপী বৃটিশ উপনিবেশিক শাসন, ভারত এবং পাকিস্তানের স্বাধীনতা প্রাপ্তি এবং শেষে বাংলাদেশ স্বাধীনতার ভেতর দিয়ে বিস্তর এক ঐতিহাসিক সময় অতিক্রম করেছেন। সূচনালগ্নে টিভি নাটক মাত্র জন্ম নিয়ে আঁতুর ঘরে অবস্থান করছে। কিন্তু তিনি তাঁর প্রতিভার গুণে, শৈল্পিক গুণে, জাতীয় এবং আন্তর্জাতিক ঘটনাপ্রবাহের সচেতনতার গুণে সেই নাটকগুলোকে পুষ্টি দিয়ে, যতœ দিয়ে লালন করেন। আর আমরা পাই তার হাতে ৪৫০ টির ওপরে মানসম্পন্ন অসংখ্য নাটক। গত শতাব্দীর সত্তর এবং আশির দশক ছিল তার নির্মিত নাটকের স্বর্ণোজ্জ্বল সময়। কয়েকটি নাটক নিয়ে এখানে আমরা আলোচনা করতে পারি। শামসুর রহমানের একটি কবিতাকে কেন্দ্র করে নির্মাণ করেন ‘অক্টোপাস’। যেখানে দেখা যায় একজন লেখক তার গল্পের নায়িকাকে এতোটাই ভালোবেসে ফেলে যে তার স্ত্রীকে গল্পের সেই নায়িকা ভেবে মাঝে মাঝে ভুল করেন। একজন লেখকের মনোজগতের অনেক গভীরে ঘটে যাওয়া ঘটনা নিয়ে নাটক। ‘সেই চোখ’ এ আমরা দেখি নাটকের নায়ক (হুমায়ূন ফরিদি) তার বন্ধুর স্ত্রী (ডলি জহুর)’র চোখের দিকে শুধু তাকিয়ে থাকে। ঘটনা এগিয়ে গেলে আমরা জানতে পারি নায়কের সঙ্গে পূর্বে দেখা হওয়া আরেকজন নারী আয়েশার চোখের কর্ণিয়া সেই বন্ধুর স্ত্রীর চোখে স্থাপন করা হয়েছিল। আয়েশার চোখের প্রেমে পড়েছিল নায়ক। তাই আয়েশাকে হারিয়ে তার হারানো চোখদুটোকে খুঁজে বেড়ায় নায়ক বন্ধুর স্ত্রীর চোখে। ভালোবাসা কত নির্মল, কত পবিত্র হতে পারে, তারই ছবি যেন আমরা পাই নাটকে। ‘সুখের উপমা’ য় দেখা যায় একজন ধনী লোক তার স্ত্রী বিয়োগের পর একটি অল্প বয়স্ক নারীকে বিয়ে করে তার ব্যবসাবাণিজ্যে মেয়েটিকে ব্যবহারের জন্যে। সুখের কারণে বিয়ে করা কিন্তু সুখকে কোথাও খুঁজে পাওয়া যায় না। ‘উৎসব উৎসব’ নাটকটির বৈশিষ্ট্য ছিল, নাট্যাঙ্গনের প্রায় সব বিখ্যাত শিল্পীদের আতিকুল হক চৌধুরী একত্রিত করেছিলেন। ডলি জহুর থেকে শুরু করে মিতা চৌধুরী, পিযুষ বন্দোপাধ্যায়, আবুল হায়াত, হুমায়ূন ফরিদি সহ আরো অনেকে। একজন বৃদ্ধ যিনি খুব অসুস্থ, দেশবিদেশ থেকে তার ছেলে, ছেলের বউ, মেয়ে, মেয়ের জামাই সবাই বাবাকে দেখতে আসে। কিন্তু প্রকৃত উদ্দেশ্য পিতার মৃত্যুর পর সম্পত্তির মালিকানা দখল। নাটকের শেষে দেখা যায় বৃদ্ধ বাইরের একটি মেয়ে (মিতা চৌধুরী) কে তার সম্পত্তির সবকিছু দান করে দেন। মানসিক দূরত্ব যে বৈষয়িক দূরত্বকেও ডেকে নিয়ে আসে নাটকটিতে আমরা তাই দেখতে পাই।

আশির দশকে যখন এদেশে যৌথ পরিবার ভাঙ্গনের মুখে পড়ে সেই সময়ে তিনি নির্মাণ করেন তার অন্যতম আরো একটি অনবদ্য নাটক, .এনামুল হক রচিত ‘গৃহবাসী’। চার ভাই এক বোনের সংসারে বিধমাকে নিয়ে বিপত্তি ঘটে। তিন ভাই বিবাহিত, সবাই পৃথক বাড়িতে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়। কিন্তু অবিবাহিত বোন আর মা’কে কার কাছে রাখা হবে কেউ তার দাযিত্ব নিতে চায় না। শেষে মা’র মৃত্যুর মাধ্যমে সেই সমস্যার সমাধান ঘটে। নাজমুল আলম রচিত নাটক ‘অথচ পবিত্র’ তে আমরা দেখতে পাই বাড়ির বউকে বাড়িরই আত্মীয় (বউয়ের মামা শ্বশুর) কীভাবে ধর্ষণ করে পার পেয়ে যায়। তবে আতিকুল হক চৌধুরীর সব থেকে সাড়া জাগানো যে নাটকটি হয়েছিল তা হলো ‘বাবার কলম কোথায়’। বাবা তার কলম হারিয়ে পাগলের মতো সেই কলমের খোঁজ করেন। কিন্তু কেনো? সামান্য একটি কলম খোঁজার কি এমন হলো? কারণ কলমটি ছিল মূল্যবোধের প্রতীক। মানুষের ভেতর মূল্যবোধের অবক্ষয় আতিকুল হক চৌধুরীকে সারাজীবন তাড়া করে বেরিয়েছে। জাতীয় এবং আন্তজার্তিক সব ক্ষেত্রে মূল্যবোধের অবক্ষয়ের দিকে তার ছিল সচেতন দৃষ্টি। ‘বাবার কলম কোথায়’ তার একটি অনবদ্য দৃষ্টান্ত। পরিচালক আতিকুল হক চৌধুরীর নাটকের আরেকটি বৈশিষ্ট্য নাটকে প্রতীক, রূপক ইত্যাদির মধ্যে দিয়ে নাটককে আরও অর্থময় করে তোলা। প্রতীক বা রূপকের মধ্যে দিয়ে একদিকে যেমন অব্যাখাত বিষয়কে ব্যাখ্যা করতেন তেমনি ছোট কোন বিষয়কে বিশালতার জায়গায় পৌঁছে দিতেন।

অভিনয় শিল্পী নির্বাচনের ক্ষেত্রেও তার বিশাল ভূমিকা আমরা দেখতে পাই। প্রায় সব নাটকে তিনি নতুন মুখ উপহার দেয়ার চেষ্টা করতেন। তার হাত ধরে অনেক শিল্পী প্রতিষ্ঠা পেয়েছেন এবং প্রতিষ্ঠিত শিল্পী আরও এগিয়ে গেছেন। শুধু তাই নয়, যে নাটকের পান্ডুলিপি কিছুটা দুর্বল সেখানে তিনি প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের নিয়ে কাজ করেছেন আর ভালো পান্ডুলিপির ক্ষেত্রে অপ্রতিষ্ঠিত বা অজনপ্রিয় শিল্পীদের সুযোগ করে দিয়েছেন। নাটক পরিচালনার সময় দুটো বিষয় অত্যন্ত কড়াকড়ি ভাবে পালন করতেন . নিয়মানুবর্তিতা ২. শৃঙ্খলা। তার সময়কালে নাটক নির্মিত হবার আগে কম করে হলেও চার থেকে পাঁচ দিন রিহার্সাল বা মহড়ার নিয়ম ছিল। কোন শিল্পী যদি রিহার্সালে ( রেকডিং এর কথা আরো পরে) পাঁচ মিনিট বিলম্বে উপস্থিত হতেন, লোকসম্মুখে তার উপস্থিতিই সঙ্গীন হয়ে উঠতো। রেকর্ডিং এর আগের দিন, অর্থাৎ চুড়ান্ত মহড়ার দিন সব শিল্পীর কাছ থেকে পান্ডুলিপি নিয়ে নিতেন এবং সংলাপ শুধু মুখস্তই বলতে হতো না তার সামনে, কান্নার অভিনয় থাকলে কেঁদেও দেখাতে হতো। নাটক নির্মাণের ক্ষেত্রে এতোটাই ছিল তার কঠোরতা। তার মতো কোমল হৃদয়ের মানুষ তার সময়কালে দ্বিতীয়জন খুঁজে পাওয়া মুশকিল, অথচ নির্মাণের ক্ষেত্রে তিনি কাউকে ছাড় দিতে রাজি ছিলেন না। রেকডিং এর দিন শুধু অভিনয় শিল্পীরাই নয়, সব কলাকুশলী ক্যামেরা ম্যান থেকে শুরু করে মেকআপ ম্যান, লাইট ম্যান, ফ্লোর ম্যান, এডিটার সকলে যেন তটস্থ হয়ে থাকতেন। সংলাপের প্রতি ছিল তার দারুণ সচেতনতা। যত বড় লেখকের কাছ থেকে পান্ডুলিপি নেয়া হোক না কেনো, সংলাপ দুর্বল হলে তিনি তা নিজের মতো করে সাজিয়ে নিতেন। শিল্পের জায়গায় তিনি নিজে যেমন আন্তরিক ছিলেন তার চারপাশের মানুষকে ঠিক তেমনি আন্তরিক দেখতে পছন্দ করতেন। তার এই আন্তরিকতার পুরস্কার তার জীবদ্দশাতেই তিনি পেয়েছিলেন। জাতীয় বিভিন্ন পুরস্কার ছাড়াও ১৯৯০ সালে দিল্লী থেকে অনারারি অফ ডক্টোরেট ডিগ্রী প্রদান করা হয়। এই বিরল সম্মান টিভি প্রযোজকদের মধ্যে খুব কমই ঘটেছে।

বিটিভি থেকে অবসর নেয়ার পরও তিনি কর্মরত ছিলেন। প্রায় এগার বছর জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাট্য ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগে অধ্যাপনা করেন এবং শেষের দিকে একুশে টিভি চ্যানেলে উপদেষ্টার পদে দীর্ঘদিন কাজ করেন। একুশে টিভিতে কর্মরত অবস্থায় একদিন দেখা করতে গিয়েছিলাম। জিজ্ঞেস করেছিলাম ‘ নাটক নির্মাণ করা কমিয়ে দিলেন কেনো?’ উত্তরে বললেন ‘ কেনো কমাবো না? কোন রিহার্সাল হয় আজকাল? রিহার্সাল ছাড়া নাটক নির্মাণের কথা কেউ কল্পনা করতে পারে?’ খুব কষ্ট লাগলো উত্তরটা শুনে। তাকে বলার সাহস পেলাম না যে রিহার্সাল দূরে থাক, আজকাল পান্ডুলিপি ছাড়াই নাটক নির্মিত হয়। শিল্পের পরিসর যে কতটা বড়, তা শুধু বড় মাপের শিল্পীরাই অনুভব করতে পারেন। আতিকুল হক চৌধুরীর ছবি নির্মাণের একটি শেষ ইচ্ছাও ছিল এবং ছবির নামও তিনি ঠিক করে রেখেছিলেন – “ একটি নক্ষত্রের প্রতীক্ষায়”। কিন্তু যে কারণেই হোক তা সম্ভব হয়নি। তার মৃত্যুর মধ্যে দিয়ে আমরা আমাদের একটি উজ্জ্বল নক্ষত্রকে হারালাম। কিন্তু তিনি যে পথ ও পাথেয় আমাদের দেখিয়ে দিয়ে গেছেন, সেই পথে চলে আমরা কি তার মতো আরেকটি নক্ষত্র পেতে পারি না? বাংলাদেশের বর্তমান সময়ে টিভি ও রেডিও নাটকের জায়গাটাকে আমরা আরও উন্নততর করে তার স্মৃতিকে সম্মানিত করতে পারি না? হয়তো পারি, হয়তো সেই নক্ষত্র আছে, না হলে আতিকুল হক চৌধুরী কেনইবা সেই নক্ষত্রের অপেক্ষায় ছিলেন।।