Home » রাজনীতি » এই ফলাফল কি জাতীয় নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের ইঙ্গিতবাহী?

এই ফলাফল কি জাতীয় নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের ইঙ্গিতবাহী?

হায়দার আকবর খান রনো

voteরাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস, গণতন্ত্র হরণ এবং সরকার কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা এবং শাসনের নামে ক্ষমতাসীনদের অপশাসনের ভারে ভারাক্রান্ত নিজেদের অপকর্মের কারণে চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে হেরে গেছে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ক্ষমতাসীন জোটের প্রার্থীরা। এটা যেন নিজে নিজেই ধসে পড়ার মতো। অন্যদিকে বিএনপি’র জন্য জনসংশ্লিষ্ট ইস্যুতে জনগণের পক্ষে কোনো আন্দোলনসংগ্রাম গড়ে তুলতে না পারা, জামায়াতসহ ধর্মীয় দলগুলোর সঙ্গে সম্পৃক্ততা, জামায়াতহেফাজতর নানা সাম্প্রদায়িক দাবিদাওয়ার মাধ্যমে যে পরিবেশ তৈরি করে রেখেছে তাতে রাজনৈতিক সঙ্কট ক্রমাগত গভীরতর হচ্ছে। ঠিক সেই রকম পরিবেশে চারটি বড় শহরে মেয়র নির্বাচন নিয়ে অনেক শঙ্কা ছিল। কিন্তু শান্তিপূর্ণ পরিবেশে জনগণ যে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পেরেছে এবং একটি সুষ্ঠু নির্বাচন হয়েছে তা অনেক দুঃসংবাদের মধ্যে একটি শুভ সংবাদ বৈকি। জাতীয় নির্বাচনের ঠিক পূর্ব মুহূর্তে চারটি বড় শহরের সিলেট, বরিশাল, খুলনা ও রাজশাহীর সিটি করপোরেশনের নির্বাচনের ফলাফল তাৎপর্যপূর্ণও বটে। চারটি মেয়র পদে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বা ১৪ দলের সমর্থিত প্রার্থী ব্যাপক ভোটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছেন। বিজয়ী হয়েছেন বিএনপির প্রার্থী বা ১৮ দলের সমর্থিত প্রার্থী। এই ফলাফল অবশ্যই জাতীয় নির্বাচনকে প্রভাবিত করবে এবং নির্বাচনের এই ফলাফল বর্তমান সরকার ও আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা হ্রাসের ইঙ্গিত বহন করে। এখানে লক্ষ্যণীয় যে, পরাজিত চার আওয়ামী লীগের প্রার্থী মাত্র পাঁচ বছর আগে মেয়র পদে বিপুলভাবে বিজয়ী হয়েছিলেন। সেই বছর জাতীয় নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ ও মহাজোট বিপুলভাবে বিজয়ী হয়েছিল। এবার ঠিক উল্টোটি ঘটলো।

আমি মনে করি এই জয় পরাজয়ের মধ্যে ব্যক্তিগতভাবে প্রার্থীর গুণাগুণ অথবা আগের মেয়ররা কতোখানি কাজ করেছেন, তা নির্ণয় করা যাবে না। ভোটারদের ভোটদানের ক্ষেত্রে তা খুব একটা কাজ করেছে বলেও মনে হয় না। যদিও এই সকল স্থানীয় নির্বাচনকে বলা হচ্ছে নির্দলীয় নির্বাচন। বস্তুত নির্বাচনগুলো হয়েছে সম্পূর্ণ রাজনৈতিক ভিত্তিতে। বিগত সাড়ে চার বছরে আওয়ামী লীগ তথা মহাজোট সরকার যা করেছে অর্থাৎ যতো অপকর্ম করেছে, সীমাহীন ও নজিরবিহীন দুর্নীতি, স্থানীয় পর্যায়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের বেপরোয়া লুটতরাজ, সন্ত্রাস ও দুর্নীতি, বিশেষ করে ছাত্রলীগের দাপট, প্রকাশ্যে খুন, গুম, মানবাধিকার লঙ্ঘন, শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারি, পদ্মা সেতু নিয়ে দুর্নীতি, নজিরবিহীন ব্যাংক কেলেঙ্কারি ও জালিয়াতি, গার্মেন্টস শিল্পে শ্রমিক নির্যাতন, ইন্ডাস্ট্রিয়াল পুলিশ দিয়ে শ্রমিকদের দাসশ্রমে বাধ্য করা, ট্রেড ইউনিয়ন অধিকার থেকে বঞ্চিত রাখা, এখনো পর্যন্ত গণহত্যার দায়ে অভিযুক্ত তাজরিনের মালিককে গ্রেফতার না করা, দ্রব্যমূল্যে বৃদ্ধি, সামাজিক অনাচার ও অস্থিরতার কারণে সরকার ও সরকারি দল আওয়ামী লীগের উপর থেকে মানুষের মন উঠে গেছে। জনগণ মেয়র নির্বাচনের মাধ্যমে সরকারের অপকর্মের উপযুক্ত জবাব দিয়েছে ব্যালটের মাধ্যমে। অথচ পাঁচ বছর আগে পরিস্থিতি ঠিক উল্টো ছিল। সেদিন বিএনপির অপশাসনের জবাব দিয়েছিল মেয়র নির্বাচন, উপজেলা নির্বাচন ও জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপি প্রার্থীদের পরাজিত করে। মানুষ পালাক্রমে বিএনপির বদলে আওয়ামী লীগ অথবা আওয়ামী লীগের বদলে বিএনপিকে বেছে নিচ্ছে। অন্য কোনো শক্তি তেমনভাবে দৃশ্যমাণ না হওয়ায় এই দুইয়ের মধ্যে মানুষ বার বার বেছে নিতে এবং প্রতিবারই হতাশ হতে বাধ্য হচ্ছে।

মেয়র নির্বাচনে সরকারি দলের ভরাডুবি নিশ্চয়ই আওয়ামী লীগকে ভাবিত করবে এবং বিএনপিকে উৎসাহিত করবে। ভবিষ্যতের জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে এরই পরিপ্রেক্ষিতে এই দুই দল কি ধরণের পদক্ষেপ ও কৌশল নেবে তা এখন দেখার বিষয়। প্রধানমন্ত্রী একটু ঢোক গিলে পরাজয়কে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা করেছেন। বরং তিনি দেখাতে চেয়েছেন যে, বর্তমান সরকারের আমলে অবাধ নির্বাচন হওয়া সম্ভব। অতএব তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবির যৌক্তিকতা আর থাকছে না। কিন্তু এই সহজ কথায় তত্ত্বাবধায়ক সরকার সংক্রান্ত সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে বলে মনে হয় না।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগের অন্যান্য শীর্ষস্থানীয় নেতারা বলছেন, এটা স্থানীয় নির্বাচন। অতএব তা জাতীয় নির্বাচনে প্রভাব ফেলবে না। তাই যদি হয়, তাহলে মেয়র নির্বাচন সুষ্ঠু হয়েছে এই দৃষ্টান্ত টেনে জাতীয় নির্বাচনে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিকে নাকচ করাও যাবে না। এর আগেও চট্টগ্রামের মেয়র নির্বাচনেও আওয়ামী লীগ প্রার্থী মহিউদ্দিন আহমদ পরাজিত হয়েছিলেন যিনি তার আগে বিএনপি শাসনামলেই বিপুলভাবে বিজয়ী হয়েছিলেন। যে কোনো শাসক দলের জন্য জাতীয় নির্বাচনটি নিশ্চিতভাবে গুরুত্বপূর্ণ। দুই চারটি স্থানীয় সরকার হাতছাড়া হলে তেমন এসে যায় না।

বস্তুত স্থানীয় সরকারগুলো তেমন ক্ষমতা রাখে না। সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, উপজেলা ও ইউনিয়ন পরিষদের ক্ষমতা একেবারেই সীমিত এবং তাদেরকে কেন্দ্রীয় সরকারের অধীনস্থ এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে আমলাতন্ত্রের অধীনস্থ করে রাখা হয়েছে। এতে প্রকৃতপক্ষে গণতন্ত্রই দুর্বল হয়েছে। ক্ষমতায় বিকেন্দ্রীকরণ গণতন্ত্র বিকাশের একটি পূর্বশর্তও। আওয়ামী লীগবিএনপিসহ কোনো বড় দলই ক্ষমতার বিকেন্দ্রীকরণে রাজি নয়। সংবিধান অনুসারে সংসদ আইন প্রণয়ন করবে, পলিসি নির্ধারণ করবে, বাজেট তৈরি করবে এবং কেন্দ্রীয় সরকারকে নির্বাচন করবে।

কার্যত দেখা যায় এই সকল বিষয়ে সংসদ সদস্যদের ভূমিকা এমনকি চিন্তাভাবনা নেই বললেই চলে। তারা মন্ত্রণালয়ে তদবির নি য়ে ব্যস্ত থাকেন, পড়াশোনা করেন খুবই কম। তবে স্থানীয় পর্যায়ের বিভিন্ন সরকারি কাজের সঙ্গে যুক্ত থাকেন। কিন্তু উন্নয়নমূলক ও সেবামূলক কাজের দায়িত্ব বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় প্রতিনিধি ও স্থানীয় সরকারের হাতে দেয়া প্রয়োজন। সামান্য সংখ্যক আদিবাসীদের বাদ দিলে (তাদের জন্য স্বতন্ত্র স্বায়ত্তশাসন ও সাংবিধানিক স্বীকৃতি থাকা প্রয়োজন), বাংলাদেশের ৯৮ শতাংশ মানুষ এক ভাষাভাষী। অতএব এখানে ইউনিটারি ফর্ম অফ গভর্নমেন্ট হবে। প্রদেশের কথা যারা বলেন, তারা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে চান। কিন্তু ৬৪ জেলা পর্যায়ে, উপজেলা পর্যায়ে, ইউনিয়ন পর্যায়ে, পাশাপাশি বড় শহরে করপোরেশন পর্যায়ে ও পৌরসভা পর্যায়ে পর্যন্ত ক্ষমতা সম্পন্ন, কেন্দ্রীয় সরকার ও আমলাতন্ত্রের প্রভাবমুক্ত শক্তিশালী স্থানীয় সরকার গঠন করা দরকার।

সকল স্থানীয় সরকার নির্বাচনের মতো এটিকেও অরাজনৈতিক ও দল নিরপেক্ষ নির্বাচন বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তাই আওয়ামী লীগের কোন কোন শীর্ষস্থানীয় নেতা এই নির্বাচনের ফলকে তাৎপর্যহীন বলে দেখাতে চেয়েছেন। বস্তুত নিজেদের পরাজয়ের গ্লানিকে ঢাকবার এই কৌশল। কিন্তু আমরা জানি মেয়র পর্যায়ের নির্বাচন অথবা উপজেলা পর্যায়ের নির্বাচন কখনই দল নিরপেক্ষ হয় না। তাহলে এতো লুকোচুরি খেলা কেন?

ভারতে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে গ্রাম পর্যায়ে পঞ্চায়েত নির্বাচনে সকল রাজনৈতিক দল নিজস্ব মার্কা নিয়ে নির্বাচন করে। স্থানীয় সরকার ও সেখানকার কাজকর্ম সম্পর্কে প্রত্যেক দলের নিজস্ব কর্মসূচি থাকা উচিত। সেক্ষেত্রে কেন দলীয় ভিত্তিতে নির্বাচন হবে না? বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলের নির্বাচন কমিশন একদিকে যেমন স্থানীয় নির্বাচনকে গুরুত্ব দিতে চেয়েছিল, অপরদিকে সেই সকল নির্বাচনকে নির্দলীয় রাখার ব্যাপারেও তৎপর ছিল। বস্তুত এটা ছিল বিরাজনীতিকরণের একটি কৌশল মাত্র। সকল পর্যায়ের নির্বাচন আনুষ্ঠানিকভাবে দলীয় ভিত্তিতে এবং দলীয় মার্কার ভিত্তিতে হওয়াটাই বাঞ্ছনীয়। কারণ তা অধিক গণতন্ত্রসম্মত।

সম্প্রতি অনুষ্ঠিত চারটি মেয়র নির্বাচন যে পরিপূর্ণ রূপে দলীয় ভিত্তিতে হয়েছে এবং ভোটাররা যে রাজনৈতিক বিবেচনা থেকে ভোট দিয়েছেন তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

একটা ভাত টিপলে পুরো হাড়ির খবর পাওয়া যায়। তার মানে জনগণের মন কোন দিকে ঝুকছে তার একটা আভাস পাওয়া গেল। ১৯৯০এর পর থেকে দেখছি জনগণ পালাক্রমে দুটি বড় দলকে ভোট দিচ্ছে। প্রতিবার ভোট হচ্ছে নেতিবাচক। অর্থাৎ একবার বিএনপি অথবা আওয়ামী লীগকে ভোট দিয়ে হতাশ হয়ে পরেরবার অন্য একটিকে বেছে নিচ্ছে। কিন্তু বার বার দুটি দলই জনগণকে হতাশ করেছে। কারণ শ্রেণী চরিত্রতগত ভাবে উভয়ই লুটেরা ধনীক শ্রেণীর প্রতিনিধি। ঐতিহাসিক কারণে দুই দলের মধ্যে কিছু পার্থক্য আছে। যেমন আওয়ামী লীগ মুখে হলেও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার কথা বলে, যদিও বিশ্বাস করে না। কিন্তু বিএনপি জামায়াতের সঙ্গে জোট করে মুক্তিযুদ্ধ কথাটি পর্যন্ত উচ্চারণ করতে চায় না। জামায়াতের সঙ্গে এক ধরণের মৈত্রী আওয়ামী লীগও করেছিল, যদিও বিএনপির মতো এতটা অগ্রসর হয়নি। এই ধরণের পার্থক্য সত্ত্বেও উভয় দলই লুটেরা ধনীক শ্রেণীর প্রতিনিধি। তাই জনজীবনের সমস্যার কোন সমাধান হয় না। উন্নয়নের নামে যা হয় তার প্রকৃত ফলভোগ করতে পারে না সাধারণ মানুষ। এমনকি মধ্যবিত্ত জনগণ। উপরন্তু বুর্জোয়া গণতন্ত্রও এই দুই দলের হাতে নিশ্চিত নয়।

পালাবদলে দুই দলের কোনো একটি মেয়র নির্বাচিত হলে অথবা সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হলে জনগণের ভাগ্যের কোনো বড় পরিবর্তন হয় না। কিন্তু যে লুটেরা ধনীক শ্রেণী আসলে রাষ্ট্র ক্ষমতা ভোগ করে তাদের শোষণ লুণ্ঠনের ব্যবস্থা অব্যাহত থাকে এবং তাদের প্রভু সাম্রাজ্যবাদেরও ভয়ের কোনো কারণ নেই। তাই পশ্চিমা সাম্রাজ্যবাদ আমাদের দেশে হয়, দ্বিতীয় ধনীক শ্রেণীর রাজনৈতিক ব্যবস্থা অথবা সেনাসমর্থিত কোন ধরণের সরকার ব্যবস্থার পক্ষে। খোদ আমেরিকাতেই এই ধরণের দ্বিদলীয় ব্যবস্থা (বৃটেনসহ অধিকাংশ বুর্জোয়া দেশে) চালু আছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতেই বুর্জোয়া রাজনীতির বিকাশ ধারায় এই রকম দ্বিদলীয় ব্যবস্থার উদ্ভব ঘটে যুক্তরাষ্ট্রে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্রেট যা এখনো পর্যন্ত চালু আছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতেই এঙ্গেলস বলেছিলেন, যে দুটি দলই সেই দেশের প্রধান পুঁজিপতিদের প্রতিনিধি। এঙ্গেলস আরও বলেছিলেন, আমেরিকানরা ইউরোপীয় বিশ্বের কাছে প্রমাণ করেছে যে, বুর্জোয়া রিপাবলিক হচ্ছে পুঁজিপতি ব্যবসায়ীদেরই রিপাবলিক, যেখানে রাজনীতি হচ্ছে অন্যান্য বাণিজ্যিক ব্যবসার মতোই একটা ব্যবসা।

কথাটি আজকের বাংলাদেশ সম্পর্কেও হুবহু খাটে। তাই এখন দরকার এই দুটি পরীক্ষিত গণবিরোধী দলের বাইরে একটি বিকল্প শক্তি গড়ে তোলা যারা হবে সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী, গরিব মধ্যবিত্ত অভিমুখী, জনগণের স্বার্থে প্রকৃত উন্নয়ন অভিমুখী, সেক্যুলার ও গণতান্ত্রিক। সেই শক্তি যতো দিন পর্যন্ত না গড়ে উঠবে ততোদিন জনগণকে দুর্ভোগ্য বহন করতে চলতেই হবে।।