Home » অর্থনীতি » তেল গ্যাস লুট দেশে দেশে

তেল গ্যাস লুট দেশে দেশে

তেলের কেন্দ্রীভূত নিয়ন্ত্রণ

ফারুক চৌধুরী

oil-22তেলের ইতিহাসে ১৯০১ সাল থেকে শুরু হলো ঘটনাবহুল সংঘাতবিক্ষুব্ধ সময়। সে পর্ব উত্তেজনাতেও ভরপুর। অর্থনীতি, রাজনীতি, কূটনীতির বহু ঘটনা এ সময়ে আবর্তিত হয়েছে তেলকে ঘিরে।

টেক্সাস তেল শিল্পের জন্ম ১৯০১ সালে, স্ট্যান্ডার্ড অয়েল ট্রাস্টের নানা কর্মরীতি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিচ্ছিল। এই একচেটিয়া ব্যবসা নিয়ে একটি পত্রিকায় পর পর কয়েকটি নিবন্ধ প্রকাশিত হয়। এ নিবন্ধগুলো ছাপা হয় ১৯০২ থেকে ১৯০৪ সাল পর্যন্ত। যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল বা কেন্দ্রীয় সরকার ইন্টিট্রাস্ট আইনে স্ট্যান্ডার্ড অয়েলের নামে মামলা করে ১৯০৬ সালে। যুক্তরাষ্ট্র সুপ্রিমকোর্টের আদেশে জন ডি রকফেলারের সাম্রাজ্য স্ট্যান্ডার্ড অয়েল ট্রাস্ট ১৯১১ সালে ভেঙে গঠিত হয় স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব নিউ জার্সি, স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব নিউইয়র্ক, স্ট্যান্ডার্ড অব ক্যালিফোর্নিয়া, স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব ওহিও, স্ট্যান্ডার্ড অয়েল অব ইন্ডিয়ানা, কন্টিনেন্টাল অয়েল ও আটলান্টিক অয়েল। পরে ওহিও’র কোম্পানিটি কিনে নেয় ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম (বিপি), ইন্ডিয়ানার কোম্পানিটির নাম হয় এমোকো, কন্টিনেন্টালের নাম হয় কনোকো, আটলান্টিকের নাম হয় এরকো, এ হচ্ছে তেলের জন্য কোম্পানির ভাঙা গড়ার খেলা, তবে সাম্রাজ্য ঠিকই বহাল থাকে, নিয়ন্ত্রণ আরো কেন্দ্রীভূত হয়।

এদিকে, পারসো, অর্থাৎ আজকের ইরানে তেলের খোঁজ পাওয়া যায় ১৯০৮ সালে। গঠিত হয় অ্যাংলো পার্শিয়ান অয়েল কোম্পানি। পরে, এরই নাম হয় ব্রিটিশ পেট্রোলিয়াম বা বিপি। সে ঘটনা ঘটে ১৯৫৪ সালে। এর দু’বছর পরে তেলের খোঁজ পাওয়া যায় মেক্সিকোতে, তেলের খোঁজ বাহরাইনে পাওয়া যায় ১৯৩২ সালে, সৌদি আরব ও কুয়েতে ১৯৩৮ সালে, আলজেরিয়া ও নাইজেরিয়ায় ১৯৫৬ সালে, নর্থ সিতে বা উত্তর সাগরে ১৯৬৯ সালে।

এরই পাশাপাশি ঘটতে থাকে অন্যান্য ঘটনা। রাইট ভাইয়েরা বিমান চালিয়ে উড়লেন ১৯০৩ সালে। একই বছরে গঠিত হয় ফোর্ড মোটর কোম্পানি। ব্রিটিশ তেল কোম্পানি শেল ও রয়েল ডাচ মিলে গঠিত হলো রয়্যাল ডাচ শেল। ঘটনাটি ঘটলো ১৯০৭ সালে। নাম বদলের আরেকটি ঘটনা ঘটেছিল আরো পরে ১৯৪৪ সালে, ক্যাসোক হয়ে ওঠে এরামকো বা এরাবিয়ান আমেরিকান অয়েল কোম্পানি।

পৃথিবী তখন লোভ আর হিংসায় জর্জর। পৃথিবীর ভাগাভাগি নিয়ে ঔপনিবেশিক প্রভূদের মধ্যে বাধলো যুদ্ধ, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। সে যুদ্ধ শুরু হলো ১৯১৪ সালে, শেষ হলো ১৯১৮তে। এ যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখলো তেল। যুদ্ধের শেষ দিকে রণক্ষেত্রে এসেছে ট্যাংক। কিন্তু জাহাজ, গাড়ি, বিমান, এসবতো ছিলই আগে থেকে। তাই তেল সরবরাহ নিজ নিয়ন্ত্রণে রাখা যুদ্ধরত পক্ষগুলোর কাছে একটি বড় বিষয় হয়ে ওঠে। যুদ্ধের শেষে পৃথিবীর মানচিত্রে অনেক রদবদল হলো। পৃথিবীতে মজুররা গঠন করলেন রাষ্ট্র সোভিয়েত রাশিয়া, ১৯১৭ সালে।

এ যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগে, ১৯১০ সালে যুক্তরাষ্ট্র কংগ্রেস আইন প্রণয়ন করে একট্ িএলাকাকে ন্যাভাল পেট্রোলিয়াম রিজার্ভস বা নৌ পেট্রোলিয়াম মজুদ হিসেবে চিহিৃত করে রাখে। এনিয়ে বন্ধুদের আনুকূল্য দেখানোর ঘটনায় ১৯২৪ সালে পদত্যাগ করেন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অব ইনটেরিয়র বা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এলবার্ট ফল এবং নৌমন্ত্রী এডউইন ডেনবি। সে কেলেঙ্কারি টিপট ডোশ স্ক্যান্ডাল পরিচিতি পায়।

তেল নিয়ে কত ঘটনা, অর্থনীতিতে, প্রযুক্তিতে, রাজনীতিতে, যুদ্ধ, কেলেঙ্কারিতে এসব ঘটনা ঘটেই চলেছে। একদিকের খবর দেখতে গেলে আরেক দিন বাদ পড়ে যায়।

প্রযুক্তির কথা উল্লেখ করা যাক। ভূকম্পন তরঙ্গ ঘটিয়ে মাটির নিচের ছবি তোলার পরীক্ষা হয় ১৯২১ সালে, যুক্তরাষ্ট্রে পৃথিবীর গভীরতম তেল কূপ খনন করা হয় ১৯৩০ সালে। সে কূপের গভীরতা ছিল ৯,৬২৯ ফুট। পানির নিচে খনন করার যন্ত্র কাজে লাগানো হয় ১৯৩৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানায়। ভূকম্পন ঘটিয়ে তেলের খোঁজ প্রথম পাওয়া যায় ১৯৩৬ সালে যুক্তরাষ্ট্রে, ক্যালিফোর্নিয়ায়। তেছরা করে ভেল্ল কূপ খনন করা হয় বাকুর কাছে ১৯৪১ সালে। সে কূপের গভীরতা ছিল ২,০০০ মিটার। সেটি খনন করেন ড্রিলিং মাস্টার বা খনন ওস্তাদ আগা নেয়ামতউল্লাহ ও তার সহকর্মীরা। খনন করা তেল কূপের গভীরতা বাড়তে থাকে। তা ১৯৪৩ সালে পৌছায় ১৬,২৪৬ ফুটে এবং ১৯৫৩ সালে ১৭,৮৯৫ ফুটে। গভীরতার কথা কি কল্পনা করা গিয়েছিল প্রথমদিকে হাতে তেলকূপ খননের সময়? তেলের জন্য ক্ষুধা তা হলে কত বেড়েছে? কোন সে শক্তি, যা এত গভীরে নিয়ে যায় তেলের খোঁজে? প্রয়োজনটাই বা কি? আবার, এত গভীরে খননের জন্য প্রযুক্তিতে, প্রযুক্তির কতো দিকে কতো উন্নতি হয়েছে।

এ উদ্দেশ্য বিজ্ঞানের কতো কায়দা কানুন পদ্ধতি সূত্র কাজে লাগানো হয়েছে। তবে এ সবই বন্দি হয়ে গেছে তেল থেকে। মুনাফা পকেটে ভরে নেয়া হাতের কাছে। এ সংক্রান্ত ব্যবসা বাণিজ্য সংগঠনের দিকে তাকালে বিষয়টি সম্পর্কে সামান্য ধারণা পাওয়া যাবে।

সৌদি আরব ১৯৩৩ সালে স্ট্যান্ডার্ড অব ক্যালিফোর্নিয়াকে কনসেশন দেয়। কনসেশন হচ্ছে তেল সংক্রান্ত এক ধরণের চুক্তি। স্ট্যান্ডার্ড অব ক্যালিফোর্নিয়া নাম দেয় ক্যালিফোর্নিয়া এরাবিয়ান স্ট্যান্ডার্ড অয়েল কোম্পানি (ক্যামক)। এ কেবল নাম বদল নয়। এখানে রয়েছে মালিকানা, সরিকানা, ইত্যাদির হেরফের। সৌদি আরবের সঙ্গে ১৯৫০ সালে চুক্তি হয় আরামকোর। সৌদি সরকার ১৯৭৩ সালে আরামকোর ২৫ শতাংশ কিনে নেয়। এ কোম্পানির বাকিটুকু সৌদিরা কেনে ১৯৮০ সালে। শেবরন ১৯৮৪ সালে কেনে গালফ অয়েল। এ কেনা নিয়ে আরকোর সঙ্গে শেভরনের চলেছিল দর দামের লড়াই। যুক্তরাষ্ট্রের একটি নৌ পেট্রোলিয়াম মজুদ ১৯৯৮ সালে বিক্রি করা হয় অক্সিডেন্টাল পেট্রোলিয়মের কাছে। নাম ছিল তিন দশমিক ৬৫ বিলিয়ন বা ৩৬৫ কোটি ডলার। এ বছরই বিপি ৪৮ দশমিক ২ বিলিয়ন বা ৪৮২০ কোটি ডলারে এমেকো কেনার পরিকল্পনার কথা ঘোষণা করে এবং এক্সন ৭৫ দশমিক ৪ বিলিয়ন বা ৭৫৪০ কোটি ডলারে কিনে নেয় মবিল। কনোকো আর ফিলিপস এ দু কোম্পানি ২০০২ সালে একীভূত হয়, কোম্পানির নাম দাঁড়ায় কনোকো ফিলিপস। এর পরের বছর রাশিয়ার চতুর্থ বৃহত্তম তেল কোম্পানি টিএনকের অর্ধেক কিনে নেয় বিপি। বেশ বড় দরের নাম হাঁকা হয় ২০০৫ সালে, শেভরন টেক্সাকো ১৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন বা ১৬৪০ কোটি ডলারে ইউনোকোল করপোরেশন কিনে দেয়ার প্রস্তাব দেয়, চায়না স্টেট অয়েল কোম্পানি দর হাঁকে ১৮ দশমিক ৫ বিলিয়ন বা ১৮৫০ কোটি ডলার। কয়েক মাস পরে এ কোম্পানি কেনার প্রস্তাব চীনা কোম্পানি প্রত্যাহার করে। সে সময়ই শেভরনের ইউনোকোল কেনার কথাবার্তা পাকা হয়। এ বছরই কনোকো ফিলিপস ও বার্লিংটন রিসোর্সেস একীভূত হয়। এদের একীভূত কোম্পানির নাম দাঁড়ায় ৩৫ দশমিক ৬ বিলিয়ন বা ৩৫৬০ কোটি ডলার। এভাবে ২০১২ সাল পর্যন্ত ননানা বেচাকেনা, একীভূত হওয়া চলে। কোনোটির দর ছিল ২১ বিলিয়ন বা ২১০০ কোটি ডলারের বেশি, কোনোটির ৯২ বিলিয়ন বা ৯২০০ কোটি ডলারের বেশি, কোনোটির রুশ কোম্পানি গ্যাজপ্রম কিনছে, কোনোটি কিনচে চীনা কোম্পানি, কোনো বেচাকেনা চলছে সাখালিন দ্বীপে, কোনোটি টেক্সাসে।

তেলের ইতিহাসে এসব বেচাকেনা, একীভূত হওয়া গভীর অর্থ বহন করে। অর্থনীতিতেও তা তাৎপর্যবহ। এটা আবার প্রভাব ফেলে রাজনীতিতে। প্রথমেই লক্ষ্য করার বিষয় দর দাম, বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার।

টাকার অংকে এ পরিমাণ দাঁড়ায় হাজার কোটি, হাজার কোটি টাকা। আর ইতিহাসের পাতা পেছন দিকে ফেরলে তুলনা করা যাবে এক বোতল বা এক গ্যালন বা এক পিপে তেলের দামের সঙ্গে অথবা তুলনা করা যাবে একদিনে উৎপাদিত তেলের দামের সঙ্গে। এর পরে, ভাবতে কষ্ট হওয়ার কথা নয় যে, এত অর্থ বা এতো দাম যে সব প্রতিষ্ঠানের আছে, সে সব প্রতিষ্ঠান বা প্রতিষ্ঠানের মালিকরা কতো ক্ষমতাধর। অনেক কোম্পানিরই সম্পদ অনেক দেশের সরকারের হাতে থাকা সম্পদের চেয়ে বেশি তো বটেই, অনেক বেশি। এত দাম কেন? এত দাম কিসের প্রতিফলন। এত দাম থেকেই বুঝতে পারা যায় অর্থনীতিতে তেলের গুরুত্ব। আর এত দাম যখন হয়, মুনাফাও তেমন। মুনাফা যদি এত হয়, তা হলে সে মুনাফা অর্জনে ও রক্ষায় কত শক্তি সদাসর্বদা তৈরি থাকে? ব্যাপারটি ভেবে নিতে কষ্ট হওয়ার কথা নয়।।

(চলবে…)