Home » অর্থনীতি » প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় বিদ্যুৎ আছে বাস্তবে নেই

প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতায় বিদ্যুৎ আছে বাস্তবে নেই

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

power failureসরকার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী এ বছরে লোডশেডিংমুক্ত বাংলাদেশ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। বিদ্যুতের অভাবে শিল্পকারখানার উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, লোডশেডিং রাজধানীতে মারাত্মক আকার ধারণ করেছে। জেলা ও গ্রামাঞ্চলের অভাব আরো খারাপ। বর্তমান সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়ে স্বল্প মেয়াদী সমাধান হিসেবে ভাড়া ও দ্রুত ভাড়াভিত্তিক (কুইক রেন্টাল) বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের উদ্যোগ নেয়। প্রতিশ্রুতি দেয়া ২০১৩ সালের মধ্যে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের মাধ্যমে ভাড়া ও দ্রুত ভাড়ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ ও এর দাম কমিয়ে আনা হবে। এর জন্য কোটি টাকা ব্যয়ে রোড ম্যাপ তৈরি ও তা জাতির সামানে তুলে ধরা হয়। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বিদেশী বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য কোটি কোটি টাকা ব্যয় করে বিদেশে একাধিক স্থানে মেলা পর্যন্ত আয়োজন করা হয়, যার ফলাফল শুন্য। এখন অর্থমন্ত্রী বলছেন, ২০১৫ সালের মধ্যে নাকি বিদ্যুৎ সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। অথচ ২০১২ সালে ফেব্রুয়ারিতে জানিয়েছিলেন ২০১৩ সালে বিদ্যুৎ সমস্যা কেটে যাবে। বিদ্যুতের অভাবে থ্রিজি টাওয়ার চালু করা যাচ্ছে না।

সরকারি ভাষ্যমতে, ৩ হাজার ৮৭০ মেগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন ৫৫টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মিত হয়েছে। দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৮ হাজার ৮৭০ মেগাওয়াটে উন্নীত হয়েছে। আরো ৩২টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণাধীন। এগুলো থেকে আসবে ৬ হাজার ৩৪৪ মেগাওয়াট। এছাড়া ২১টি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের লক্ষ্যে টেন্ডার প্রক্রিয়াধীন। এর পরও লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত দেশ। এতোই যদি উন্নয়ন বিদ্যুতের হয়ে থাকে, তাহলে লোডশেডিং কেন, বিদ্যুৎ কোথায়?

বর্তমানে প্রতিটি বিতরণ অঞ্চলে একাধিকবার এক ঘণ্টা করে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রেখে ঘাটতি পূরণ করা হচ্ছে। তেলভিত্তিক ভাড়া বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর ওপর বিদ্যুৎনির্ভরতা বাড়ছে। এর ফলে বেশি দাম দিয়ে বিদ্যুৎ কিনতে হচ্ছে গ্রাহকদের। অপরদিকে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের হিসাবে চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে খুব একটা ফারাকও দেখানো হচ্ছে না। পিডিবির দেয়া তথ্য অনুযায়ী সর্বোচ্চ ব্যবহারের সময় চাহিদা দেখানো হচ্ছে ৬০০০ থেকে ৬১০০ মেগাওয়াট। অথচ এক বছর আগেও একই পরিমাণ চাহিদা দেখানো হয় বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে। এছাড়া সর্বশেষ উৎপাদনের তথ্য অনুযায়ী চলতি বছরে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ হয়েছে ৬৩১৪ মেগাওয়াট। অথচ গত বছর উৎপাদনে সর্বোচ্চ রেকর্ড হয়েছিল ৬৩৫০ মেগাওয়াট। যদিও বিদ্যুৎ বিভাগের হিসাবে প্রতি বছর অন্তত ১০ ভাগ করে চাহিদা বাড়ে। কিন্তু সরবরাহকৃত তথ্যে তার কোন হিসেব নেই।

গত সাড়ে চার বছরে বড় আকারের মাত্র একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র উৎপাদনে এসেছে। দফায় দফায় দরপত্র আহ্বান, জমি অধিগ্রহণ জটিলতা ও অর্থায়ন সংকটের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে বড় প্রকল্পগুলো। সরকারি উদ্যোগে নির্মিত কেন্দ্রগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতের বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোও আটকে আছে নানা জটিলতায়। এটা কি রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য? আর এ কারণে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করতে হচ্ছে সরকারকে। এরই মধ্যে ব্যয়বহুল ৬টি বিদ্যুৎকেন্দ্রর সঙ্গে চুক্তি নবায়ন করা হয়েছে। এসব বিদ্যুৎকেন্দ্রকে দীর্ঘমেয়াদি করারও পরিকল্পনা নেয়া হয়েছে।

দেশে বর্তমানে ২৪টি রেন্টাল (ভাড়াভিত্তিক), ১৮টি কুইক রেন্টাল (দ্রুতভাড়া) বিদ্যুৎকেন্দ্র রয়েছে। সাধারণভাবে এই কেন্দ্রগুলোকে অস্থায়ীভিত্তিক ধরা হয়। দীর্ঘ মেয়াদে এগুলোর কার্যকারিতা নেই।

দেশের ‘কুইক রেন্টাল’ বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রগুলো যখন কিছু লোকের পকেট ভারি করার উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, অন্যদিকে তা এখন পিডিবি তথা জাতীয় অর্থনীতির বোঝায় পরিণত হয়েছে। এর মধ্যেও সরকার আগামী ২০১৬ সাল নাগাদ দেশে বেসরকারি খাতে মধ্যম ও বৃহদাকারের ৩৬টি রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানা গেছে। এই কেন্দ্রগুলো পুরোপুরি ভর্তুকিনির্ভর। আগামী কয়েক মাসে এই ভর্তুকির পরিমাণ ৩৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে বলে জানা গেছে।

সার্বিক পরিস্থিতিতে বিপর্যয়ের আশঙ্কা বাড়ছে।২০১০১১ অর্থবছর থেকে দ্রুত ভাড়ভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদনে আসতে শুরু করে। এরপর গত বছরে সবগুলো কেন্দ্রই উৎপাদনে চলে আসে। পিডিবির ভর্তুকির তথ্যে দেখা যায়, ২০১০১১ অর্থবছরে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর জন্য ব্যয় হয়েছে ভর্তুকির ৭৫ দশমিক ৭২ শতাংশ। এর পরের বছর এটি বেড়ে হয় ৯১ দশমিক ৩২ শতাংশ। আর চলতি অর্থবছরে এটি ১০০ শতাংশে পৌঁছেছে। এর মধ্যে শুধু দ্রুত ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গেছে ৮৪ শতাংশ। এসব কারণে বর্তমান সরকারকে বারবার বাড়াতে হয়েছে বিদ্যুতের দাম। পাইকারি পর্যায়ে ৬ বারে ৯৮ দশমিক ৩১ শতাংশ ও গ্রাহকপর্যায়ে ৫ বারে ৪৩ দশমিক ৭৫ শতাংশ বাড়ানো হয় বিদ্যুতের দাম। গ্রাহকপর্যায়ে আরো বাড়ানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়ে আছে। যদিও সরকারের শেষ সময়ে বিদ্যুতের বর্ধিত এ মূল্য পুরোটাই সরকারের পক্ষ থেকে দেয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।

বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) সূত্রে জানা গেছে, বিনিয়োগসংকটে ঝুলে গেছে সরকারিবেসরকারি একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্র।একের পর এক সংকটে ঘুরপাক খাচ্ছে বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের কাজ। দুই বছর পার হয়ে গেলেও বাণিজ্যিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ শুরু হয়নি। দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে গত বছর চূড়ান্ত সমঝোতা হলেও একটি পিছিয়ে গেছে অর্থায়ন অনিশ্চয়তায়। আর অন্যটি কয়লা আমদানি ও বন্দরে খালাসসংক্রান্ত জটিলতায় আটকে আছে। দফায় দফায় পিছিয়ে গেছে ভারত থেকে ৫০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়টি।

এদিকে রেন্টাল ও কুইক রেন্টাল বিদ্যুৎ খাতে এক শুভঙ্করের ফাঁকি চলছে বলেও জানা গেছে। একদিকে কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎ কেন্দ্র থেকে সরকারকে উচ্চমূল্যে বিদ্যুৎ কিনে গ্রাহকের কাছে কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য তাদের ভর্তুকি দিয়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ করতে হচ্ছে। এ খাতে সরকার ডিজেলে ২৫ টাকা ও ফার্নেস অয়েলে লিটার প্রতি ১২ টাকা করে ভর্তুকি দিচ্ছে। আবার, এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্রের যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করার শর্ত ছিল তা তারা করতে পারছে না। নিম্নমানের যন্ত্রপাতি এনে ব্যবহার করার কারণে শর্ত অনুযায়ী বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে না। এছাডা সরকার এসব কেন্দ্র থেকে বেশি বিদ্যুৎ না নেয়ায় বেশির ভাগ সময় উৎপাদন বন্ধ থাকছে। সরকার পরিস্থিতি সামাল দিতে না পেরে জ্বালানি তেল ও বিদ্যুতের দাম দফায় দফায় বাড.িয়ে গ্রাহকের কাছ থেকে ভর্তুকির টাকা আদায়ের চেষ্টা করছে। সরকারের তিন বছরে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড.িয়েছে ৩৩ হাজার ৭৫৭ কোটি ৬২ লাখ টাকা। লোকসানের এ ধারা অব্যাহত থাকলে ২০১৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেড় বছরে এই দুই খাতে অতিরিক্ত ৩৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

তিন বছরে বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ দ্বিগুণের বেশি হয়েছে। পিডিবির হিসাবে ২০০৯১০ অর্থ বছরে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ হয়েছে দুই দশমিক ৫৯ টাকা। সেখানে ২০১২১৩তে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ ধরা হয়েছে পাঁচ দশমিক ৫৭ টাকা। এই সময়ের মধ্যে দেশের বিদ্যুত উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে ৪৭ ভাগ। পিডিবির হিসাব পর্যালোচনা করে দেখা গেছে স্বল্পমেয়াদী ভাড়াভিত্তিক এবং দ্রুত ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্রের জন্য বিদ্যুতের উৎপাদন খরচ বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের হিসাবে দেখা যায়, বর্তমান সরকারের দায়িত্ব গ্রহণের বছর ২২৬ দশমিক ১৩ কোটি ইউনিট বিদ্যুত কিনেছে ভাড়ায়চালিত কেন্দ্র থেকে। কিন্তু চলতি বছর সরকার ভাড়াভিত্তিক কেন্দ্র থেকে বিদ্যুত কিনবে এক হাজার ছয় দশমিক পাঁচ কোটি ইউনিট। দেশে ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপনের হার বলছে গত তিন বছরে সাড়ে তিনগুণ ভাড়ায়চালিত বিদ্যুত কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। অন্যদিকে সরকারী বিদ্যুত কেন্দ্র চলতি অর্থবছরে দুই হাজার কোটি ইউনিট বিদ্যুত উৎপাদন করবে। তিন বছর আগে যা ছিল এক হাজার ৬০০ কোটি ইউনিট। এখন তেলচালিত ভাড়ার বিদ্যুত কেন্দ্রগুলো প্রতি ইউনিট বিদ্যুত উৎপাদন করে ১৭ থেকে ২০ টাকায়। তবে দুটি গ্যাসভিত্তিক কুইক রেন্টালের জন্য গড় উৎপাদন ব্যয় ইউনিট প্রতি ১২ থেকে ১৩ টাকার মধ্যে ওঠানামা করে। বিইআরসির হিসেবে সরকারী খাত গড়ে প্রতি ইউনিট বিদ্যুত উৎপাদন করে তিন দশমিক ৫৫ টাকায়। গ্যাসচালিত হওয়ায় সরকারী বিদ্যুত কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন খরচ কম। পিডিবির গ্যাস চালিত কেন্দ্রগুলোর উৎপাদন খরচ ইউনিট প্রতি দুই টাকার কিছু নিচে। অন্যদিকে গ্যাসচালিত বেসরকারী খাতের কেন্দ্রগুলো প্রতি ইউনিট বিদ্যুত তিন টাকায় উৎপাদন করছে। এ ছাড়া গত বছর বিদ্যুতের খুচরা মূল্য আরও এক টাকা প্রতি ইউনিটে বৃদ্ধি করা হয়। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সিস্টেম লস নিয়ন্ত্রণ করলে বিদ্যুতের সব ক্ষেত্রে ব্যয় সাশ্রয় হতো। দেশে এখনও গড়ে ১৫ ভাগ সিস্টেম লস রয়েছে। এতে উৎপাদন প্রান্ত থেকে বিতরণ প্রান্তে চলতি বছর ঘাটতি থাকবে ৬০০ কোটি ইউনিট।।