Home » রাজনীতি » সরকারের কূটকৌশল – বিএনপি’র প্রধান চ্যালেঞ্জ

সরকারের কূটকৌশল – বিএনপি’র প্রধান চ্যালেঞ্জ

জাকির হোসেন

vote 3শাসক দলের ঔধত্যপূর্ণ আচরণ, জন আকাঙ্খার প্রতি চরম অবহেলা, সীমাহীন দুর্নীতি ও দু:শাসনের বিরুদ্ধে চার সিটির জনগণের যুগান্তকারী রায়ে পাল্টে দিয়েছে ক্ষমতাসীনদের রাজনীতির প্রায় সকল সমীকরণ। একই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে সৃষ্টি করেছে এক নতুন রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট। চার সিটিতেই বিরোধী দল বিএনপি’র প্রার্থীরা ব্যাপক ভোটে জয়লাভ করেছে। জনগণের স্বতস্ফূর্ত ঐক্য এবং রাজনৈতিক সচেতনতাই বিএনপি প্রার্থীদের এ বিজয় নিশ্চিত করেছে। তবে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ বা দলগতভাবে বিএনপি’র এক্ষেত্রে বিশেষ কোনো ভূমিকা নেই। তাদের কোনো সচেতন দিক নির্দেশনা এবং কার্যকর সহযোগিতা ছাড়াই চার সিটির জনগণ আওয়ামী দু:শানের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। এ পুরো রাজনৈতিক প্রক্রিয়া সংগঠিত হয়েছে ঘটনার সাধারণ নিয়মে। অধিকাংশ বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজ এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মধ্যে এ রাজনৈতিক রূপান্তরের কোনো সূক্ষ প্রতিক্রিয়া হয়নি। আসল ঘটনা ঘটে যাওয়ার পর এখন রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা আপন আপন গর্ত থেকে বেড়িয়ে সমস্বরে জয়ধ্বনী তুলছেন। অথচ ঘটনা ঘটবার কিছু সময় আগেও এমনকি ভোট গণনা শুরুর অব্যবহিত পরও বিভিন্ন বেসরকারী চ্যানেল সমূহে অনুষ্ঠিত টক শোএ অংশ নেয়া রাজনীতিক, বুদ্ধিজীবী, রাজনৈতিক বিশ্লেষক এবং স্থানীয় সরকার গবেষকদের কথাবার্তায় এর বিন্দুমাত্র ছায়াপাত ঘটেনি বা ইঙ্গিত পাওয়া যায়নিবরং ক্ষেত্র বিশেষ তাদের চোখে ফুটে উঠেছে কালো ছায়া, অনেকে প্রকাশ করেছেন হতাশা।

চার সিটির জনগণের এই রাজনৈতিক সচেতনার বহিপ্রকাশ আমাদের আবারো মনে করিয়ে দিয়েছে মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর একটি উক্তি-“ এদেশের মানুষ সব সময়ই রাজনৈতিক সচেতন। তবে আমাদের জাতীয় জীবনে কখনো কখনো এমন সময় আসে যখন সাধারণ মানুষের রাজনৈতিক সচেতনতা রাজনীতিকদেরকেও ছাড়িয়ে যায়”। সর্বজন শ্রদ্ধেয় রাজনীতিক মওলানা ভাসানীর এই বক্তব্য বার বার এদেশের প্রমানিত হয়েছে। চার সিটির নির্বাচনের ফলাফলের মাধ্যমে আবারো এরই বহি:প্রকাশ ঘটলো।

এদিকে চার সিটি নির্বাচনের আগে গোয়েন্দা প্রতিবেদনের ভিত্তিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নিশ্চিত ছিল যে সিলেট ও খুলনায় তাদের প্রার্থী বিজয়ী হবে, বরিশালে বিএনপি প্রার্থীর সঙ্গে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে এবং রাজশাহীতে সরকারী দলের প্রার্থী পরাজিত হবে। এমন হিসেবের ভিত্তিতে নির্বাচন অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। কিন্তু নির্বাচানে চরম পরাজয়ে ক্ষমতাসীন দল দেখা দিয়েছে চরম হতাশা।

অন্যদিকে পরাজয়ের নেতিবাচক দিক থেকে জনগণের দৃষ্টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য ক্ষমতাসীনরা এখন দাবি করছে, চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের অধীনে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অনুষ্ঠানের বিষয়টি প্রমাণিত হয়েছে। স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও কথা বলছেন একই সুরে। রবিবার জাতীয় সংসদে পয়েন্ট অব অর্ডারে দেয়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদের বক্তব্যের জবাব দিতে গিয়ে তিনি বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ সরকারে রয়েছে বলেই এই নির্বাচন অবাধ ও নিরপেক্ষ হতে পেরেছে। …. কাজেই ভবিষ্যতে তাদের কোনো (নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের) দাবি থাকবে না। এ দেশে আর কোনো অসাংবিধানিক কাউকে আনার চেষ্টা করবেন না। তাতে কারো লাভ হবে না। নির্বাচনই হবে না।’ জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এমন অসাংবিধানিক বক্তব্য মাধ্যমে চরম স্বৈরাচারী আচরনের বহিপ্রকাশ ঘটছে। প্রধানমন্ত্রীকে মনে রাখতে হবে, জাতীয় নির্বাচন হওয়া কিংবা না হওয়ার বিষয়টি তাঁর ব্যক্তিগত বিষয় নয়। এ ব্যাপারে সংবিধানে সুস্পস্ট নির্দেশনা রয়েছে। সাংবিধানের ১২৩এর () অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে সংসদ সদস্যদের সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইবে () মেয়াদ অবসানের কারণে, সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার ক্ষেত্রে, ভাঙ্গিয়া যাইবার পূর্ববর্তী ৯০ দিনের মধ্যে। সাংবিধানের ৭৩এর ৩ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে রাষ্ট্রপতি পূর্বে ভাঙ্গিয়া না দিয়া থাকিলে প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে ৫ বছর অতিবাহিত হইলে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবে। তবে দেশে যুদ্ধাবস্থা বিরাজ করলে সংসদের মেয়াদ এক বছর বাড়ানো যাবে।

জাতীয় সংসদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নির্বাচন না হওয়া যে ইঙ্গিত দিয়েছেন এর মাধ্যমে শুধু যে তাঁর স্বৈরাচারী আচরণের বহিপ্রকাশের মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে নানা রহস্যের জš§ দিয়েছেন। নির্বাচন না দিয়ে চতুর্থ সংশোধনীর মাধ্যমে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান যেমন সংসদের মেয়ান বাড়িয়ে ছিলেন তেমনটি করবেন, নাকি তিনি দেশের মধ্যে একটি নৈরাজ্য এবং যুদ্ধাবস্থার সৃষ্টি করবেনএসব প্রশ্ন এখন বিভিন্ন রাজনৈতিক মহল এবং সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রতিনিয়ত ঘুরপাক খাচ্ছে। এবং এর পরিনাম কী হতে পারে এ নিয়েও শুরু হয়েছে নানা আলোচনা।

পরাজিত হলেও একটি জায়গায় লাভ নেয়ার চেষ্টা করছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রয়োজন নেই এমন একটি পরিস্থিতি তারা সৃষ্টি করার চেষ্টা করছে। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রশ্নে আওয়ামী লীগের অনড় অবস্থা এবং জাতীয় পর্যায়ে তাদের চরম ব্যর্থতার কারণে বিএনপি’র নীতি নির্ধারকদের একটি অংশ মনে করে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নিলেও বিএনপি জয়লাভ করবে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, চার সিটিতে ক্ষমতাসীনদের ভরাডুবি বিএনপি’র ওইসব নীতি নির্ধারকদের আরো উৎসাহিত করতে পারে। ফলে আওয়ামী লীগের পক্ষে থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলকে দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার জন্য যে আহ্বাণ জানানো হচ্ছেএই ফাঁদে যদি বিএনপি পা দেয় তবে বিএনপি’র জন্য এর পরিনাম ভয়াবহ হবে। কারণ চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন অনুষ্ঠান হয়েছে বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম, দেশিবিদেশি পর্যবেক্ষকসহ গভীরভাবে মনিটরিংয়ের মাধ্যমে। কাজেই চারটি সিটি করপোরেশন নির্বাচন আর তিনশ আসনের নির্বাচন এক কথা নয়। এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন এবং আইন শৃঙ্খলা প্রয়োগকারী সংস্থার নিরপেক্ষতার প্রশ্নটি বিবেচনা নিতে হবে। এ লক্ষেই চার সিটি নির্বাচনের ব্যর্থতা ক্ষমতাসীনরা এখন দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠানের ব্যাপারে একটি ট্রাম্পকার্ড হিসেবে ব্যবহার করতে চাইবে। স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ব্যর্থতাকে জাতীয় নির্বাচনে সাফল্যের চাবিকাঠি হিসেবে ব্যবহার করতে চাইবে। এ ব্যাপারে বিএনপিকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ চার সিটির নির্বাচন আর তিন শ’ আসনে জাতীয় সংসদ নির্বাচন এক নয়। আওয়ামী লীগ যদি সকল স্থানীয় সরকার নির্বাচনে পরাজিত হলেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পরিবর্তন হবে। কিন্তু জাতীয় নির্বাচনে পরাজিত হলে তাদেরকে ক্ষমতা থেকে বিতাড়িত হতে হবে। ক্ষমতার জন্য যারা রাজনীতি করেন তারা জাতীয় নির্বাচনে পরাজয় কোনো দিন মেনে নেয়নি এবং বর্তমান ক্ষমতাসীনরাও মেনে নেবে না। তাই জনগণকে সঙ্গে নিয়ে তত্ত্বাবধাযক সরকারের দাবি আদায় করাই এখন বিএনপি’র কেন্দ্রীয় নেতৃন্দের জন্য এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ।।