Home » সাক্ষাৎকার » সাক্ষাৎকার – এম সাখাওয়াত হোসেন

সাক্ষাৎকার – এম সাখাওয়াত হোসেন

সন্ত্রাসবিরোধী আইনটি রাজনৈতিক কারণেই প্রতিপক্ষ দমনে অপব্যবহার হবে

m-sakhawat-hossainএম সাখাওয়াত হোসেন, সাবেক নির্বাচন কমিশনার, বিশ্লেষক এবং অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল কথা বলেছেন, সদ্য পাস করা সন্ত্রাস বিরোধী আইনের নানা দিক নিয়ে আমাদের বুধবারএর সঙ্গে।

আমাদের বুধবার: সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধনী) আইন এ মাসেরই প্রথমদিকে তড়িঘড়ি করে সংসদে পাস হয়। এই আইনটি সম্পর্কে আপনার প্রতিক্রিয়া কি?

সাখাওয়াত হোসেন: সন্ত্রাস দমন আইনে যে পরিবর্তনগুলো আনা হয়েছে, এর মধ্যে প্রধানতঃ দুটো জায়গায় যথেষ্ট আপত্তি রয়েছে। আর তড়িঘড়ি করার কারণ হয়তো বর্হিঃদেশীয় চাপ। কিন্তু যে আইন জাতীয় সংসদে আনা হয়েছে, তাতে সংশোধনীর মধ্যে যে বিষয়গুলো আছে, তা নিয়ে কিন্তু বাংলাদেশে তুলকালাম কাণ্ড হবে। সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে, পুলিশ শুধুমাত্র ম্যাজিস্ট্রেটের অনুমোদন নিয়েই আদালতের আদেশ ছাড়া মামলা শুরু করতে পারে। এটা তো মারাত্মক পর্যায়ে মানবাধিকার লঙ্ঘন। কারণ কোনো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এভাবে গ্রেফতার, তদন্ত এবং আদালতকে না জানিয়ে, তাদের আদেশ ছাড়া বা কোনো রূপ বিচারিক অনুমোদন ছাড়া চার্জশিট দাখিল করার ক্ষমতা প্রদানের বিষয়টি নিঃসন্দেহে ভয়াবহ। যেকোনো সরকার এই আইনটির অপব্যবহার এবং যথেচ্ছাচার করতে পারবে। যাকে দমন করার অভিপ্রায় আছে তার বিরুদ্ধে ব্যবহার করতে পারবে। সন্ত্রাস দমন আইনটির মাধ্যমে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমন পীড়নের জন্য ব্যবহার হবে। এটি খুবই মারাত্মক। আর মারাত্মক এই কারণে যে, এটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকারের মানদণ্ডেও গ্রহণযোগ্য নয়। দ্বিতীয় যে বিষয়টি হচ্ছে, সাইবার ক্রাইম রোধ করতে গিয়ে না জানিয়ে, কোনো কারণ না দেখিয়ে এবং ভিন্ন উদ্দেশ্য ইন্টারনেটকে হ্যাক করার বৈধ অধিকার দেয়া হয়েছে। এই অধিকার বলে বলা হবে, ওই ব্যক্তি বা যেকোনো ব্যক্তি অবৈধ, সন্ত্রাসী কাজ করছে, সন্ত্রাসকে মদদ দিচ্ছে। ইন্টারনেটের যেকোনো মাধ্যমে লেখা দিয়ে সন্ত্রাসকে উৎসাহিত করা হচ্ছে এমন অভিযোগও যে কারো বিরুদ্ধে, যেকোনো সময় আনা যাবে। কাজেই যে কারো বিরুদ্ধে এই পদ্ধতিতে ব্যবস্থা গ্রহণের অন্যায্য বৈধতা ভয়াবহ হতে বাধ্য।

আমাদের বুধবার: আপনি আন্তর্জাতিক চাপের কথা বলছেন। এই চাপের কারণ কি?

সাখাওয়াত হোসেন: আন্তর্জাতিক চাপ কারা দেয় এবং কেন দেয় এটা সবারই জানা। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে পৃথিবীর প্রায় সব দেশেই সন্ত্রাস বিরোধী আইন করা হচ্ছে। কিন্তু মারাত্মক বিষয়টি হচ্ছে, কোনো দেশকে তো এমন মাপকাঠি দেয়া হয়নি কিংবা বলা হয়নি, সুনির্দিষ্ট কোন কোন বিষয়ে আইন করতে হবে বা হবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রেও টেলিফোনে আড়িপাতা নিয়ে হুলস্থূল ঘটনা ঘটছে। শেষ পর্যন্ত ওই দেশে এটা টিকবে কিনা তা নিয়েও সন্দেহ দেখা দিয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশেও তো আড়িপাতা হয়, কিন্তু আনুষ্ঠানিকভাবে আমরা তা জানি না।

আমাদের বুধবার: সংসদীয় কমিটির প্রধান তার রিপোর্টে জাতিসংঘ রেজ্যুলেশন, কনভেনশন এবং আন্তরাষ্ট্রীয় আলাপআলোচনার কারণে আইনের সংশোধনী এনে এমন একটি আইন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেছেন। এ বিষয়টিকে আপনি কতোটা যুক্তিযুক্ত বলে মনে করেন?

সাখাওয়াত হোসেন: বিশ্বের বহু দেশ আছে যারা রেজ্যুলেশন বা কনভেনশনে স্বাক্ষর করেন কিন্তু তা মানেন না। আবার নিজের দেশের প্রয়োজনীয়তা এবং বাস্তবতার নিরিখে কোন কোনটি মানা হয়। আইন করতে গেলে দেখতে হবে, সংশ্লিষ্ট দেশের বাস্তবতা এবং তার নিজস্ব প্রয়োজনীয়তা। অর্থাৎ বিষয়টি একান্তই দেশটির নিজস্ব আদলে তৈরি হয়। অনেক ক্ষেত্রে কোনো কোনো অংশ ওইগুলো থেকে নেয়া হয় আইন তৈরির সময়। তাই বলে পুরোটা বা এর ভিত্তিতেইএই প্রশ্নে আপনাকে জানাতে চাই, মহাজোটের শরীক ও ওয়ার্কার্স পার্টির প্রধান রাশেদ খান মেননকে জিজ্ঞেস করেছিলাম যে, আপনারা কি আইনটি দেখেননি? এতে যে মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয় আছে তাও কি লক্ষ্য করেননি? তিনি জবাবে বললেন না, আমরা বিষয়টি অতভাবে দেখেনি। কিন্তু আলোচনা করবো এবং প্রয়োজনে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করবো।

আমাদের বুধবার: এই আইনের ২১ ধারায় বলা হয়েছে, স্বাক্ষ্য হিসেবে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার উপস্থাপিত তথ্যই চূড়ান্ত, অন্য কিছু নয়। এ বিষয়টিকে আপনি কিভাবে দেখেন?

সাখাওয়াত হোসেন: পুলিশকে যে সীমাহীন ক্ষমতা এই আইনের মাধ্যমে দেয়া হয়েছে, সে পুলিশের ভূমিকা কি ধরণের তা তো আমরা সবাইন দেখছি। যে সরকার আসে সে সরকারই তাদের ব্যবহার করে। পুলিশ স্বাধীনভাবে কাজও করে না বা একটি সংস্থা হিসেবে আস্থা অর্জন করতেও পারেনি। রাজনৈতিকভাবে ব্যবহৃত হবে না তা তো নয়। তারা রাজনৈতিক ভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে। এমনকি তাদের নিয়োগ প্রাপ্তি এবং পদোন্নতির ক্ষেত্রেও তো রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। আমরা হরহামেশাই তাদের ভূমিকা দেখছি। আমাদের উৎকণ্ঠা, শঙ্কা, ভয়টা তো সেখানেই। বিশ্বের কোনো দেশে পুলিশকে এতোটা ক্ষমতা এবং কর্তৃত্ব দেয়া হয়েছে বলে আমার জানা নেই।

আমাদের বুধবার: আইনে ২৩এর () এবং ৩৪ খ ()-এ তদন্তকালীন সময়ই সম্পত্তি ক্রোক এবং বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা দেয়া আছে।

সাখাওয়াত হোসেন: আইনটি এমনই বিপদজ্জনক যে, যে কারো বাড়ি, গাড়ি, ব্যাংকে গচ্ছিত অর্থ বাজেয়াপ্ত করার বা ক্রোক করার সীমাহীন ক্ষমতা দেয়া হয়েছে। কোনো ব্যক্তি সন্ত্রাসী প্রমাণিত হোক বা না হোক, তদন্তকালীন সময়ই সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা যাবে। এটা কিন্তু আদালত করছে না, পুরো সিদ্ধান্ত নিচ্ছে পুলিশ। এটা কতো বড় যে মারাত্মক বিষয়, এ থেকেই তা স্পষ্ট হওয়া যায়। এককভাবে রাষ্ট্রের কোনো অঙ্গ বা সংস্থাকে এমন ক্ষমতা দেয়া কাম্য নয় বা দেয়া যায়ও না। আইন বা বিচার বিভাগকে পরিপূর্ণভাবে বাদ দেয়া হয়েছে, অথচ তাদের ক্ষমতার মধ্যে এটা রয়েছে। বিচার বিভাগ বহির্ভূত পথে পুরো আইনটিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। এটি একটি মৌলিক প্রশ্ন।

আমাদের বুধবার: আপনি কি মনে করেন, ভবিষ্যতে যে সরকারটি আসবে সে সরকার এই আইনটি বাতিল করবে?

সাখাওয়াত হোসেন: বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার হান্নান শাহকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, আপনারা ক্ষমতায় আসলে এই আইনটি কি আপনারা পরিবর্তন করবেন? জবাবে তিনি বললেন, তারা বিবেচনা করবেন। অর্থাৎ, বিবেচনা করা আর নিশ্চিতভাবে বলার মধ্যে তফাৎ আছে। আমি নিশ্চিত, এই আইনটি ব্যবহার করা হবে, রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা হবে যে সরকারই ক্ষমতায় আসুক। ১৯৭৪এর বিশেষ ক্ষমতা আইনটি তো কোনো দলই বাতিল করেনি।

আমাদের বুধবার: এই আইনের উদ্দেশ্য কি তাহলে বিরোধী দল, মত ও পথকে দমন করা?

সাখাওয়াত হোসেন: আমি আপনার সঙ্গে পরিপূর্ণভাবে একমত। সন্ত্রাসবিরোধী আইনটি রাজনৈতিক কারণে প্রতিপক্ষ দমনে অপব্যবহার করা হবে। বিরোধী মত প্রকাশ বা বিরুদ্ধে কথা বললে এই আইনের অপব্যবহার হবে। যাদের পছন্দ করেন না, তাদের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে এই আইনটি ব্যবহৃত হবে। যে কাউকে বিমান, স্থল বা নৌ বন্দরে আটকে দিয়ে বলা যাবে, তাকে সন্দেহ হচ্ছে বা প্রতীয়মান হচ্ছে যে, ওই ব্যক্তি সন্ত্রাসী বা সন্ত্রাসের সঙ্গে যুক্ত। আপনি কার কাছে বিচার চাইবেন? আইনের মধ্যেই যদি বিচার বিভাগের সম্পৃক্ততা না রাখা হয়, কোথায় যাবেন বিচারের আশায়? কিন্তু আমার প্রশ্ন হচ্ছে, তথাকথিত প্রগতিশীলরা সংসদে কেন কোনো আপত্তি উত্থাপন করলেন না? বিরোধী দল সংসদে এখনো আছে। কিন্তু তারাও তো এই বিলটি নিয়ে আলোচনা করছে না। এই আইনকে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করার জন্য তারা সবাই প্রস্তুত। যে যখন ক্ষমতায় আসবেন, থাকবেন তিনি এর অপব্যবহার করবেন বলেই মনে হচ্ছে।

আমাদের বুধবার: সামগ্রিকভাবে সন্ত্রাস বিরোধী আইনকে আপনি কিভাবে মূল্যায়ন করছেন?

সাখাওয়াত হোসেন: সন্ত্রাস বিরোধী আইনের নামে যে আইনটি করা হয়েছে তা সরাসরি মানবাধিকার লঙ্ঘনকারী। দেশে ও আন্তর্জাতিকভাবে এটা গ্রহণযোগ্য বলে মনে করি না। এই আইনটিকে আবার পুনঃপরীক্ষানিরীক্ষা করা প্রয়োজন। এক কথায় এই আইনটি মানবাধিকারের জন্য বিপদজ্জনক, ভয়ঙ্কর এবং মারাত্মক।

আমাদের বুধবার: আপনাকে ধন্যবাদ।।