Home » অর্থনীতি » আর কতো বাড়বে দ্রব্যমূল্য

আর কতো বাড়বে দ্রব্যমূল্য

আমাদের বুধবার প্রতিবেদন

unstable-economy-1-এখন চালের ভরা মওসুম। দাম কমার কথা। গত দু’সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন জাতের চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ২ থেকে ৮ টাকা। অস্থির হয়ে উঠছে নিত্যপণ্যের বাজার। সামনেই রমজান। তার আগেই পণ্যের দাম বাড়িয়ে নিচ্ছেন অনেকে। চাল, ডাল, চিনি, ছোলা, পিয়াজ, রসুন, আদা, লবণবাদ যাচ্ছে না কিছুই। সবজি বাজারেও একই অবস্থা। দাম শুধু বাড়ছে।

সরকার বিরুদ্ধমত এবং পথকে নিশ্চিহ্ন করার জন্য যতোটা সময় ব্যয় করে তার সামান্য একটু সময়ও যদি বাজার তদারকি এবং তাদের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নের পেছনে ব্যয় করতো তাহলে দ্রব্যমূল্যে বৃদ্ধির এ দশা হতো না।

পণ্যমূল্য বাড়ায় জনজীবনে উঠছে নাভিশ্বাস। বিপাকে পড়ছেন মধ্য ও নিম্ন আয়ের মানুষেরা। রমজানের পণ্য ছোলা, চিনি, পিয়াজ, মশুর ডালের দাম বাড়ছে। ক্রেতা ও ব্যবসায়ীরা জানান, অসাধু ব্যবসায়ীদের তৎপরতা, সরকারের নজরদারির অভাব ও আসন্ন রমজানকে সামনে রেখে পণ্য গুদামজাত করাই দাম বাড়ার কারণ। এজন্য বাজারে চলছে রীতিমতো প্রতিযোগিতা। সারা দেশের একই অবস্থা। রাজধানীর কাওরান বাজার, মোহাম্মদপুর টাউন হল, মিরপুারের কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা গেছে, দোকানগুলোতে মূল্য তালিকা টাঙানো হয়নি, তদারকও নেই। এ সুযোগে ইচ্ছামতো দাম নিচ্ছেন ব্যবসায়ীরা। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, রোজার মাসকে সামনে রেখে কর্তৃপক্ষকে এখনই এ বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হবে। নইলে রমজানে ভোক্তাদের দুর্ভোগ বাড়বে।

নির্বাচনী ইশতেহারে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, ‘দ্রব্যমূল্যের দুঃষহ চাপ প্রশমনের লক্ষ্যে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে জনগণের μয় ক্ষমতার মধ্যে স্থিতিশীল রাখার ব্যবস্থা করা হবে। দেশজ উৎপাদন বৃদ্ধিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সময় মতো আমদানির সুবন্দোবস্ত, বাজার পর্যবেক্ষণসহ বহুমুখী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। মজুতদারি ও মুনাফাখোরি সিন্ডিকেট ভেঙে দেওয়া হবে, চাঁদাবাজি বন্ধ করা হবে। ‘ভোক্তাদের স্বার্থে ভোগ্যপণ্য মূল্য নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ’ গড়ে তোলা হবে। সর্বোপরি সরবরাহ ও চাহিদার ভারসাম্য সৃষ্টি করে দ্রব্যমূল্য কমানো হবে ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠা করা হবে।’ গেল সাড়ে চার বছরে এর প্রতিফলন পরিলক্ষিত হয়নি।

বিক্রেতারা জানান, গত সপ্তাহে ছোলার দাম ছিল কেজি প্রতি ৫৮ থেকে ৬০ টাকা। আর এখন তা বিক্রি হয়েছে ৭০৭৫ টাকায়। একই অবস্থা পিয়াজের ক্ষেত্রেও। দেশে উৎপাদিত ও আমদানি করা পেয়াজ কয়েক সপ্তাহ ধরে বিক্রি হয়েছে ৩৩ থেকে ৩৫ টাকা ও ২৮ থেকে ৩০ টাকা কেজি দরে। এখন দেশি পেয়াজ বিক্রি হচ্ছে ৪০৪২ টাকায়। আমদানি করা পেয়াজ ৩৫ টাকা। বেড়ে গেছে চিনির বাজারদর। প্রতি কেজি চিনি ৪৫ টাকা থেকে বেড়ে এখন তা ৫০৫২ টাকায় কিনতে হচ্ছে ভোক্তাদের। খুচরা ব্যবসায়ীরা জানিয়েছেন, বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) চিনির দাম বেড়েছে ২০০ থেকে ২৫০ টাকা। ছোট দানার দেশী মশুর ডাল কেজিতে ১০ টাকা বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ১১০১১৫ টাকায়।

আমদানি করা ভোল্ডার মশুর ডাল বিক্রি হচ্ছে ৮০ থেকে ৯০ টাকায়। এছাড়া মুগ ডাল, খেসারি ডাল, ডাবলি, বুটসহ সব ধরণের ডালে কেজিতে বেড়েছে ৫ থেকে ১০ টাকা। মোহাম্মদপুর টাউন হল কাঁচাবাজারের দোকানী মো. আলম জানান, নিত্যপণ্যের মূল্যের দাম নিয়ে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় বা টিসিবির কোনো নির্দেশনা ও মূল্য তালিকা তারা পাননি। আর এজন্য প্রত্যেক দিন ক্রেতাদের সঙ্গে তর্কবিতর্ক হচ্ছে। ক্ষোভের সঙ্গে তিনি জানান, আমরা খুচরা ব্যবসায়ী। পাইকারি ও আড়তদারদের মতো আমরাতো পণ্য মজুদ করি না। তারপরও যত দোষ আমাদের। ক্রেতাদের হাজারও কথা শুনতে হয়। ব্যবসায়ীরা জানান, গত দু’সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন জাতের চালের দাম বেড়েছে কেজিতে ২ থেকে ৮ টাকা। মানভেদে বিভিন্ন নাজিরশাইল প্রতি কেজি ৪৪ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ৫২ টাকা, মিনিকেট ৪২ টাকা থেকে ৪৬ টাকা, বিআর২৯ ও বিআর২৮ ৩৪ থেকে ৩৬ টাকা, গুডি স্বর্ণা ৩৪ তেকে ৩৬ টাকা, পারিজা ৩৬ তেকে ৩৮ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। বাবুবাজারের ব্যবসায়ী বাবু জানান, ক’দিন ধরেই চালের বাজার অস্থির।

কিনতে গিয়ে দামে বেশি পড়ছে। তাই খুচরা বাজারেও এর প্রভাব পড়েছে। তিনি জানান, চাতাল ও মিল মালিকরা নানা অজুহাতে দাম বাড়াচ্ছেন। অথচ এখন চালের ভরা মওসুম। দাম কমার কথা। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, প্রতিদিন নিত্যপণ্যের দাম বাড়লেও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)-সহ বাজার মনিটরিং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের এ বিষয়ে নেই কোন তৎপরতা। বাজারগুলোতে টিসিবির পুরনো তালিকা টানিয়ে রাখা হয়েছে। যার সঙ্গে বাস্তবতার কোন মিল নেই। ফলে প্রতিনিয়তই বিভ্রান্ত হচ্ছেন ক্রেতারা। অবশ্য বাজারে মূল্য নিয়ন্ত্রণ ও তদারকিতে টিসিবির কোন ক্ষমতা নেই বলে জানিয়েছেন টিসিবি’র একাধিক কর্মকর্তা। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান তথ্য কর্মকর্তা ও আমদানি শাখা (অতিরিক্ত দায়িত্ব)’র মো. হুমায়ুন কবীর ভূঁইয়া বলেন, বাজার মনিটরিং ও নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব মূলত বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের। টিসিবি শুধু বাজারদর কি আছে, কত আছে তা দেখভাল করে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করবে। বাজার স্থিতিশীলতায় রক্ষায় ভোক্তা অধিদফতরের কার্যক্রমও চোখে পড়ছে না। তবে রমজানে এবারও টিসিবির প্রস্তুতি যথেষ্ট জানিয়ে বলা হচ্ছে, রোজার অত্যাবশ্যক ৩টি পণ্য ছোলা, চিনি, মশুর ডালসহ সয়াবিন খোলা দরপত্রের মাধ্যমে সংগ্রহ করা হয়েছে। কবে বাজারে ছাড়া হবে, তা তিনি জানেন না।

রমজান মাসের বাকি আর মাত্র ২৪ থেকে ২৫ দিন। অথচ বাজারে সব ধরণের মাছ ও মাংসের দামের সঙ্গে বাড়তে শুরু করেছে বেগুন, টমেটো, কাকরোল, শশা, বরবটি ও কাঁচামরিচের দাম। পাশাপাশি লুজ সয়াবিন তেল, লুজ পাম অয়েল, লুজ সুপার পাম অয়েল, চিনি, ছোলা, ডিম (ফার্ম), মুরগির (ব্রয়লার) দামও বেড়েছে। তবে গত এক সপ্তাহের চেয়ে দাম কমেছে পটল, ধুন্দল, পেঁপের দাম। এক মাস আগে এসব পণ্যের দাম কেজিতে ৫ থেকে ৭ টাকা কম ছিল বলে খুচরা ব্যবসায়ীরা জানান। এছাড়া অন্যান্য পণ্যের দাম অপরিবর্তিত রয়েছে।

রাজধানীর খুচরা বাজারগুলোতে এক কেজি আলুর দাম ১৬ টাকা, টমেটো, চিচিঙ্গা, করলা, কাকরল, ধুন্দল, গাঁজর, কচু লতির কেজি ৪০ টাকা, পটল ও শশা ৩০ টাকা, পেঁপে ৩৫ টাকা, কাঁচকলা হালি প্রতি ৩০ থেকে ৪০ টাকা, লেবুর হালি ২০ থেকে ২৫ টাকা, কাঁচামরিচ ও ঝিঙ্গার কেজি ৫০ টাকা এবং বেগুন ৬০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। ৮শগ্রামের ইলিশ প্রতি পিস সাড়ে ৭শথেকে ৮শটাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বড় সাইজের রুই প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ২২০ টাকায। পাঙ্গাস প্রতি কেজি ১০০১৪০ টাকা, কৈ ২০০৩০০ টাকা, শিং ৪৫০ থেকে ১ হাজার টাকা, কাতল ২০০২৮০ টাকা ও চিংড়ি আকারভেদে ৫০০১২শটাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।ফার্মের ডিম ২৮ থেকে ৩০ টাকা, দেশি হাঁসের ৪০ থেকে ৪২ টাকা, দেশি মুরগি ৪২ থেকে ৪৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। বাজারে গরুর মাংসের দর কেজিতে ২০ টাকা বেড়ে ৩০০ টাকা, খাশি ৫০ টাকা বেড়ে ৪৫০ টাকা, ব্রয়লার মুরগি ১০ টাকা বেড়ে ১৬০ টাকায় দাঁড়িয়েছে। দেশি মুরগি প্রতি হালি (বড়) ১৬শটাকা যা আগে ১২ থেকে ১৪শটাকায় বিক্রি হতো। বাচ্চা মুরগির হালি ১২শটাকা বিক্রি হচ্ছে।

মুদি দোকান ও কাঁচামালের ব্যবসায়ীরা জানান, প্রতি বছর রমজানের আগে ব্যবসায়ী সংগঠন ও সরকারকে দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন ধরণের উদ্যোগ নিতে দেখা যায়। তবে সেসব উদ্যোগ কাগজকলমে আর মিডিয়াকে দেখানোর জন্য করে থাকে বলে সাধারণ মানুষের অভিযোগ। যার ফল সাধারণ মানুষ ভোগ করতে পারেন না। আর এজন্য অসাধু ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট দায়ী বলে মনে করেন ব্যবসায়ীক নেতা ও বিশ্লেষকরা। ক্রেতারা বলছেন, বাজেটের পরদিনই বিক্রেতারা বাড়িয়ে দিয়েছেন সব ধরণের কাঁচা পণ্যের দাম। এদিকে বাজেটে হিমায়িত মাছ আমদানির ওপর কর আরোপ করায় এর প্রভাব পড়েছে মাছের বাজারেও।।