Home » প্রচ্ছদ কথা » জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনিশ্চিত

জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনিশ্চিত

পীর হাবিবুর রহমান

parliament 2জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনিশ্চিত। নির্বাচনের ছয় মাস আগেও সরকার এবং বিরোধীদলের মধ্যে রাজনৈতিক সমঝোতার বরফ গলা দুরে থাক উল্টো মুখোমুখি অবস্থান তীব্র হয়ে উঠেছে। প্রধান বিরোধীদল বিএনপি তাদের অবস্থানে অনড় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনের দাবি সরকারকে মেনে নিয়ে সংসদে বিল এনে সংবিধান সংশোধন করতে হবে। চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীদের বিশাল বিজয় সরকারের বিরুদ্ধে মানুষের অনাস্থা হিসেবে বিবেচনায় নিয়ে ভাবছে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনই তাদের ক্ষমতায় ফিরিয়ে নিতে পারে। বিএনপি নিশ্চিত একটি অবাধ নির্বাচনে গণরায় প্রতিফলিত হলেই তাদের বিশাল বিজয় অনিবার্য। পর্যবেক্ষকরাও বলছেন সরকার জনমত হারিয়েছে। সিটি নির্বাচনের ফলাফলের প্রভাব জাতীয় নির্বাচনে প্রতিফলিত হবে। পশ্চিম বঙ্গের প্রভাবশালী দৈনিক আনন্দবাজার বলেছে শেখ হাসিনা সরকারের জনপ্রিয়তা তলানিতে। জনমত এখন তাদের অনুকুলে এই আত্মবিশ্বাসে হেফাজত প্রলয়ে বিপর্যস্ত বিএনপি চার সিটি কর্পোরেশনের ফলাফল নিয়ে রাজনীতির ময়দানে নতুন রূপে আবির্ভূত হয়েছে। রাজনীতির ময়দানেও ছয়টি সিটি মেয়র পদে তাদের নির্বাচিত মাঠ নেতা থাকায় বাড়তি শক্তি হিসেবে যোগ হয়েছে।

এদিকে সরকার শুরু থেকেই বিএনপিকে বাইরে রেখে নীল নকশার নির্বাচনের রূপরেখা নিয়ে হাটছে বলেই গণমাধ্যম সহ নানা মহলে বারবার খবর চাউর হয়েছিল। বলা হচ্ছিল মহাজোটের প্রধান শরীক এরশাদের জাতীয় পার্টিকে আলাদা নির্বাচন করিয়ে বিরোধীদলের আসনে বসানো হবে। এরশাদও এক সময় স্বপ্ন দেখেছিলেন বিএনপি বাইরে থাকলে সরকার বিরোধী গণঅসন্তোষ নিরব ব্যালট বিপ্লবে তার পার্টিকে ক্ষমতায় বসাবে। এই হিসেব থেকে নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে দেশের বাইরে গণতান্ত্রিক দুনিয়াও ঘুরেছিলেন। কিন্তু নির্বাচনের বছরে এসে এবং একেকটি কেলেঙ্কারী ঘিরে সমালোচনার মুখে পতিত সরকারের দিকে তাকিয়ে তার সেই হিসেবের খাতা বন্ধ রেখেই নতুন ছক আকেন। এরশাদ উপলব্ধি করেন, বিএনপিকে বাইরে রেখে নির্বাচন হলেও তা গ্রহণযোগ্যতা পাবে না। অন্যদিকে ওই নির্বাচনে জাতীয় পার্টি আলাদা ভোট করতে গেলে তার আসনগুলোতে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থীরা দাড়িয়ে বাজিমাত করবে এবং তার আম ছালা দুটোই যাবে। ২০০৭ সালের বাতিল নির্বাচনের আগে যে বিএনপি এরশাদের সঙ্গে ভোটের ঐক্য করার দোরগোরায় গিয়েছিল সেই বিএনপিকে ফেলে রেখে এরশাদ আত্মগোপনে থেকে পল্টনে মহাজোট মঞ্চে ঐক্য গড়েছিলেন। এবার জনমত সরকারের বিরুদ্ধে ঝুকতে দেখে আন্তর্জাতিক মুরব্বিদের কাছে গিয়েছিলেন আওয়ামী লীগের বিকল্প হওয়ার আবদার নিয়ে। তারা তার পার্টির শক্তি নিয়ে প্রশ্নতুলে ফিরিয়ে দেন। আগামী নির্বাচন হলে এরশাদ কাদের সঙ্গে যাবেন সেই প্রশ্ন এখনও ফুরিয়ে যায়নি। মহাজোটে আনুষ্ঠানিক ভাবে থাকলেও জাপার এরশাদ ও তার নেতাদের মুখে সরকারের সমালোচনার খই ফুটছে। বিএনপিকে বাইরে রেখে সরকারের সাজানো নির্বাচনে বিরোধীদলের আসনে বসা পরিকল্পণা ইতি ঘটিয়েছেন এরশাদ নিজেই।

এদিকে সরকার বিরোধীদলের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবি মানবে না বলে যে অবস্থান নিয়েছিল চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের পর তা আরও পরিষ্কার হয়ে উঠেছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার অবস্থানের পক্ষে যুক্তি দেখাতে গিয়ে বারবার স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচন বাতিল করার মধ্য দিয়ে আসা সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দুই বছরের শাসনামল। এমনকি তিনি সবশেষ বলেছেন অসাংবিধানিক সরকার এলে নির্বাচনই হবে না। মাঝখানে দুই নেত্রীকে জেলে যেতে হবে। এ নিয়ে সরকার ও বিরোধীদলের সংসদের ভিতরে বাইরে বাহাস জমে উঠলেও রাজনৈতিক সমঝোতার আলোর রেখা দেখা যাচ্ছেনা। টানেলের শেষ প্রান্তে এখনও কালো ঘুটঘুটে অন্ধকার। সরকার ও বিরোধীদল ভুলে যাচ্ছেন উভয়ের অনমনীয় মনোভাব ও একগুয়ে নীতির কারণ ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির একতরফা জাতীয় নির্বাচন ঘিরে যে সহিংসতা দেখা দিয়েছিল তার অবসানেই দেখে জরুরি অবস্থা ও সেনা সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকার এসেছিল। ব্যপক গণসমর্থন নিয়ে আসা সেই সরকারের দুই বছর রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী বা মানুষের জন্য সুখকর হয়নি। সরকার যতই বলছে অসাংবিধানিক সরকারের হস্তক্ষেপ বন্ধেই উচ্চ আদালতের রায়ের আলোকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল করেছে কিন্তু পিছন ফিরে তাকিয়ে দেখছে না রাজনৈতিক অনৈক্য ও সংঘাত নৈরাজ্যের পথেই বারবার অসাংবিধানিক শক্তি ক্ষমতায় আসে বা এসেছে। সংবিধানে যতই সাজার বিধান করে সংশোধনী আনা হোক না কেন সরকার ও বিরোধীদলের রাজনৈতিক সংঘাত দেখা দিলে অসাংবিধানিক শক্তি আগমন আদৌ ঠেকানো যাবে কিনা? কারণ অসাংবিধানিক শক্তি সংবিধান অনুসরণ করে আসে না। যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী ইংরেজী দৈনিক গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে সামনে রাজনৈতিক সংঘাতের সম্ভাবনা রয়েছে নির্বাচন নয়। দেশের সিভিল সোসাইটি থেকে সব মহল বলছে সংঘাতের রাজনীতি আরেকটি ওয়ান ইলেভেন নিয়ে আসবে।

সরকার বারবার সংলাপের কথা বললেও বিরোধীদলের সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংলাপের উদ্যোগ এখনও নেয়নি। সংলাপ প্রশ্নে সরকারের আন্তরিকতা প্রশ্নবিদ্ধ। বিএনপির এমন সব নেতাদের বাস পোড়ানো মামলাসহ এমন সব মামলায় জেলে নেওয়া হয়েছিল যা পারষ্পরিক রাজনৈতিক আস্থা ও বিশ্বাসের মাঝখানে দেয়ালটিকে আরও সুদৃঢ় করেছে। আন্তর্জাতিক মহলও বারবার সংলাপের তাগিদ দিয়েছে। জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের প্রতিনিধি সংলাপের মাধ্যমে সমঝোতায় যেতে সরকার ও বিরোধীদলের শীর্ষ পর্যায়ে দৌড়ঝাপ করেছেন। পশ্চিমা দুনিয়া থেকে বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ বারবার বলেছে সকলের অংশ গ্রহণে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সংলাপের মাধ্যমে সংকট সমাধানের পথ বের করতে। সরকার সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী আনতে গিয়ে বিরোধীদলের বক্তব্যকে তো আমলে নেয়ইনি, তত্ত্বাবধায়ক সরকার বাতিল প্রশ্নে নিজেদের প্রজ্ঞাবান নেতা যারা সংবিধান সংশোধন কমিটিতে ছিলেন তাদের পরামর্শকেও গ্রহণ করেনি। সিভিল সোসাইটির পরামর্শ আমলই পায়নি। শাসক আওয়ামীলীগ তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে ব্যপক গণ আন্দোলনই গড়েনি পঞ্চম সংসদ থেকে শরীকদের নিয়ে পদত্যাগও করেছিল। এমনকি তারা বলেছিলেন এই ব্যবস্থা দুনিয়ায় মডেল হবে। জন্মের পর থেকে সাম্প্রদায়িকতা ও সেনা শাসনের পথে হাটা জঙ্গিবাদের ছোবলে ক্ষতবিক্ষত পাকিস্তান এই মডেল নিয়ে নির্বাচন শেষ করলেও বাংলাদেশে সরকার তা বাতিল করে নির্বাচনকে অনিশ্চিত করে দিয়েছে। ২০০৭ সালের বাতিল নির্বাচনের আগে আজকের শাসক মহাজোট তত্ত্বাবধায়ক সরকার প্রধানের পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দাবিতেও আন্দোলন করেছিল। প্রশাসনকে ঢেলে সাজানোর দাবি করেছিল। নির্বাচনের ছয়মাস আগে প্রধানমন্ত্রী যতই বলছেন নির্বাচন সুষ্ঠু হবে ভোট চুরির নিয়ত নেই। কিন্তু সারাদেশের প্রশাসনের দিকে তাকালে সেই বিএনপি জমানার মতই তিন স্তরের আওয়ামী লীগের দলীয় প্রশাসনের ছায়া দেখা যাচ্ছে। বর্তমান নির্বাচন কমিশনও প্রশ্নের উর্ধ্বে নয়। এই সরকারের পছন্দের মনোনীত ব্যাক্তিরাই নির্বাচন কমিশনে। যারা গণপ্রতিনিধিত্ব অধ্যাদেশ৭২ সংশোধন করে নির্বাচনকালীন রিটার্নিং অফিসার হিসেবে জেলা প্রশাসককেই আনতে যাচ্ছেন। সবচেয়ে বড় বিষয় সংবিধানের অনেকগুলো বিষয় এখনও অমিমাংসিত। নির্বাচন কালে সংসদ বহাল থাকবে কিনা সেই প্রশ্নও রয়ে গেছে। নির্বাচনের সময় সেনাবাহিনীর ভুমিকা কি হবে সেই বিতর্ক থেকেও পিছু হটেনি সরকার ও বিরোধীদল। বর্তমান নির্বাচন কমিশনও নির্বাচনের দিন তারিখ নির্ধারণে প্রধান দুই দলের সমঝোতার দিকে তাকিয়ে আছে। অক্টোবরের মধ্যে দুই দলের সমঝোতা হলে ৪৫ দিন হাতে রেখে নভেম্বরের শেষ সপ্তাহ বা ডিসেম্বরে নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার প্রাথমিক পরিকল্পনা করেছে কমিশন। একই সঙ্গে অক্টোবর থেকে জানুয়ারির মধ্যে নির্বাচনের প্রস্তুতিও নিয়ে রাখছে। তত্ত্বাবধায়ক না দলীয় অন্তর্বর্তী সরকার এই বিতর্কের ঝড়ের আড়ালে নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসন ঢেলে সাজানোর ইস্যূ এখনও বাকি রয়েছে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা হস্তান্তর ও মেয়াদ নিয়ে সাংবিধানিক জটিলতা রয়েছে বলেও মনে করছেন সংবিধান বিশেষজ্ঞরা। যদিও নির্বাচন কমিশন বলছে ২৪ জানুয়ারির পরে বর্তমান সরকারের ক্ষমতায় থাকার সুযোগ নেই। তার আগেই সংসদ নির্বাচন হবে। তবে ইসির সংসদ নির্বাচনের পরে নতুন সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর জটিলতা এড়াতেই সরকারের শেষ সময় নির্বাচন করতে চায়।

এদিকে চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচন মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই এখন শপথ নিয়ে বেকায়দা অবস্থা। পর্যবেক্ষকদের মতে সেনা শাসক এরশাদ জমানায়ও ৮৮ সালের একতরফা নির্বাচন ক্ষমতাকে দু বছরের বেশী স্থায়ী করতে পারেনি। গণতন্ত্রের জমানায় ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারির একতরফা নির্বাচন একমাসও টেকেনি। যদিও প্রভাবশালী দেশের কূটনীতিকদের নেপথ্য মধ্যস্ততার কারণে সেটি হয়েছিল সংবিধান সংশোধন করে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বহাল করার জন্য। ২০০৭ সালের ২২ জানুয়ারির নির্বাচন একতরফা করতে গিয়েই রাজনীতিতে মহা বিপর্যয় নেমে এসেছিল। দিন এখন আরও পাল্টেছে। সবচেয়ে বড় বাধা সরকার ও বিরোধীদলের বিগত দিনের রাজনীতি সমঝোতার বদলে, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের রাজনৈতিক চেতনা প্রতিষ্ঠার বদলে প্রতিহিংসার ধারাকেই প্রাধান্য দিয়েছে। দুই দলের মাঝখানে চরম অবিশ্বাস অনাস্থার দেওয়াল তুলেছে। দুই রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বের হৃদয়ে রাজনৈতিক প্রতিহিংসার ক্ষত দাগ। সেই দাগ শুকায়নি। সমঝোতার কোন সম্ভাবনাই নেই। বড় কথা বিরোধীদলের আসনে বসার গণতান্ত্রিক চেতনা দুই দলের কারোর মধ্যে নেই। যখন ছিল তখন ৯১ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মাধ্যমে উভয়ের ভাগ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে। বর্তমানে সেই বোধ নির্বাসিত হওয়ায় জাতীয় নির্বাচন বড় বেশী অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।।